গায়ে ভীষণ জ্বর উঠেছে সালমা বেগমের। রাতে ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছিলেন ঠিকই। তবে জ্বর কমার বদলে যেন আরো বেড়েছে। কে জানে আজকাল ওষুধপাতিও তার সাথে ষড়যন্ত্র করছে কিনা। হয়তো কেউই তাকে আর বাঁচতে দিতে চাইছে না।
রাতে কিছু না খেয়ে খালি পেটেই ওষুধটা খেয়েছিলেন। খিদেতে পেটটা চো চো করছে। বেশ সকাল সকাল ওনার ঘুম ভেঙে গেল। শরীরটা ভীষণ দুর্বল লাগছে। কাউকে যে একটু ডেকে বলবেন যেন ওনাকে একটু খাবার দিয়ে যায় তেমন কাউকে খুঁজে পেলেন না। কাকেই বা বলবেন? নিজের ছেলে মেয়েরাই তো ঠিক নেই। নিজের ছেলে মেয়েরাই তো ওনার খোঁজ নেয় না। বাকি রইল ছেলের বউ।
ঋতু আগে ওনার কথা শুনতো। বরং বেশ ভয়ও করতো ওনাকে দেখে। তবে আজকাল ঋতুর স্বভাবের বিস্তর পরিবর্তন এসেছে। সালমা বেগম কোন কিছু বললে যেন এক কান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে সেই কথাগুলো বের করে দেয়। কোন গুরুত্ব নেই, কোন প্রাধান্য নেই সালমা বেগমের এই সংসারে। সবাই নিজের মতন চলাফেরা করছে। সবাই নিজেদের মতন জীবন কাটাচ্ছে। কেউ কারো জীবনে নাকও গলায় না, নিজেদের জীবনেও কাউকে নাক গলাতে দেয় না।
শেষে বাধ্য হয়ে সালমা বেগম ভাবলেন নিজেই নিজের জন্য নাহয় কিছু রান্না করে নেবেন। বিছানা থেকে আস্তে ধীরে উঠে নিজের ঘর থেকে বেড়িয়ে রান্নাঘরের দিকে যেতে ধরলেন। পথিমধ্যে সাবিতের ঘরটা পড়ে। ভেতর থেকে ওনার নাতির কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। চিৎকার করে কাঁদছে ছেলেটা। কে জানে এত কেন কাঁদছে?
ঋতু বোধহয় সামলাতেই পারেনা ঠিক মত ছেলেকে। অবশ্য মেয়েটা কিই বা সামলাতে পারে। না স্বামী সামলাতে পারে, না সন্তান সামলাতে পারে, না সংসার সামলাতে পারে। মনে মনে ভীষণ অসন্তুষ্ট হলে সালমা বেগম ঋতুর প্রতি। যদিও একবার ভাবলেন যে এই বিষয়ে তিনি আপাতত কিছু বলবেন না। তবে না বলে আবার থাকতেও পারলেন না।
দরজাটা খোলাই ছিল। তাই তিনি ভিতরে ঢুকে গেলেন বরাবরের মতন অনুমতি না নিয়েই। ঋতু ছেলেকে খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। তবে ছেলে খাচ্ছে না। সেই নিয়েই কান্নাকাটি চলছে। ঘরে ঢুকেই সালমা বেগম রুষ্ঠ গলায় ঋতুকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“বাচ্চাকাচ্চা তো মানুষ করতে শেখোনি? এভাবে কেউ খাবার খাওয়ায়?”
শাশুড়ির কন্ঠ পেয়ে ঋতু একবার তাকালো সেদিকে। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকল না। দু এক সেকেন্ডের মতন তাকিয়ে থাকার পরে আবার নিজের মনোযোগ ছেলের উপর নিবদ্ধ করে সালমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“অত কিছু তো আমার জানা নেই মা। কি করবো বলুন প্রথম বাচ্চা হয়েছে। এর আগে তো আরো দশ-বারোটা ছেলেমেয়ে ছিল না আমার যে সব নিয়মকানুম একেবারে আমার নখদর্পনে থাকবে।”
“আজকাল খুব চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলতে শিখেছ। খেতে যখন চাইছে না তাহলে এখন খাওয়ানো কি খুব দরকার? একটু ছেলেটাকে নিয়ে উঠে হাঁটো। কান্নাটা থামুক, শান্ত হোক তারপর খাওয়াও। দেখছো জেদ করছে এর মাঝে তোমারও ওকে এখনই খাওয়ানোর জন্য জেদ করার খুব দরকার?”
“গতকাল রাতে থেকে ও ঠিকমতো কিছু খাচ্ছে না। অনেক শান্তভাবে খাওয়ানোর চেষ্টা করেছি মা। ও তো বাচ্চা, নিজের ভালো বোঝে না। কিন্তু আমাকে তো ওর ভালোটা বুঝতে হবে। ও কাঁদলেও ওর পেটে এখন এই খাবারটুকু পড়া দরকার। আসলে আমি বাকি মায়েদের মতন সন্তানদেরকে তাদের নিজেদের ইচ্ছেমতো চলার স্বাধীনতা দিয়ে তাদের নষ্ট করতে চাই না। ওর জন্য আমার যেটা ভালো মনে হবে আমি সেটাই করব। আর ওকেও ওর ভালো মন্দটা আমিই শেখাবো।”
কেন যেন সালমা বেগমের ঋতুর কথাটা পছন্দ হলো না। মনে হলো ঋতু ওনাকে খোঁচা দিয়ে কথাটা বলল। তবে যেহেতু ওনার নিজের শরীরই খারাপ তাই এই নিয়ে তর্ক-বিতর্কে জড়ানোর ইচ্ছে হলো না। ভাবলেন এখানে থেকে লাভ নেই।
ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে ধরেও তিনি আবার থেমে গেলেন। পেছন ফিরে তাকাতেই দেখলেন সাবিত নেই। এত সকালে ছেলেটা গেল কোথায়? এত সকালে তো সাবিতের ঘুম ভাঙ্গে না।
“সাবিত কোথায়?”
“কেন জানেন না আপনি?”
সালমা বেগম বিরক্তিকর গলায় বললেন,
“জানলে কি তোমায় জিজ্ঞেস করতাম?”
ঋতু ব্যঙ্গাত্মক গলায় বললেন,
“তা অবশ্য ঠিক। জানবেনই বা কি করে? আপনার কি সে সময় আছে নাকি নিজের সন্তানদের খোঁজখবর নেওয়ার। এখনো নিশ্চয়ই মনে মনে ছক কষছেন যে কি করে অন্যের সংসারে আগুন লাগানো যায়, তাই না মা?”
সালমা বেগম কটমটে দৃষ্টিতে ঋতুর দিকে তাকালেন। এবারে আর নিজের রাগের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলেন না। যতই শরীর খারাপ হোক, দুর্বল লাগুক না কেন তাই বলে এভাবে অপমান তো আর সহ্য করা যায় না। গর্জে উঠে বললেন,
“মুখ সামলে কথা বলো। তুমি কিন্তু নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছো, ঋতু।”
ঋতু এবারও ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“আমাকে বাদ দিয়ে নিজের ছেলে মেয়েদের দিকে নজর দিন। আপনার ছেলে তো দুদিন হলো বাড়ি ফেরেনা সে খবর আছে? তাকে ফোন দিলে সে ফোন রিসিভ করেনা। ভাবুন তো আপনি কেমন মা যে আপনার ছেলে দুদিন হলো বাড়ি ফেরেনা অথচ আপনি জানেনই না। দুদিন হলো আপনার মুখটা অব্দি দেখেনি সে, আর না আপনার খোঁজ নিয়েছে। অথচ এই ব্যাপারে আপনার কোন ভ্রুক্ষেপই নেই। আপনারা মা ছেলে দুজনেই চমৎকার।”
ঋতুর কথাগুলো শুনে সালমা বেগম চমকে উঠলেন। বিস্মিত গলায় বললেন,
“ও দুদিন হলো বাড়ি ফেরে না! কোথায় গেছে?”
“আপনার ছেলে কি স্ত্রীকে কিছু জানিয়ে যায়? কোন দিন ও আমাকে কোন কিছু জানিয়েছে যে আজ জানাবে? তবে হ্যাঁ আমি আন্দাজ করতে পারছি যে ও কোথায় যেতে পারে।”
সালমা বেগম কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
“কোথায়?”
এ পর্যায়ে ঋতুর গলায় আর কোন ব্যঙ্গ প্রকাশ পেল না। নিস্তেজ চোখ দুটো নিয়ে সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে মলিন হেসে বলল,
“বোধহয় ওর কোন প্রেমিকার সাথে রাত কাটাচ্ছে। বোধ হয় আবার নতুন কারো প্রেমে পড়েছে। সেখানে হয়তো বেশ সুখেই আছে, শান্তিতে আছে। বাড়ি ফিরলে তো বউ বাচ্চার মুখ দেখতে হবে, যেটা ওর ভীষণ অপছন্দের। তাই যেখানে সুখ খুঁজে পেয়েছে সেখানেই আছে।”
সালমা বেগম কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল রইলেন ঋতুর দিকে। একটা শব্দও করলেন না। না বলার মতন কিছু খুঁজে পেলেন। শেষে বাধ্য হয়ে চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হতেই পিছন থেকে ভেসে এলো ঋতুর কণ্ঠস্বর।
“এমন সন্তানকে গলা টিপে মে রে ফেলা উচিত আপনার মা। নয়তো জ বা ই করুন। এ আপনার গর্ভের কলঙ্ক মা। আমাদের সমাজের কলঙ্ক।”
থেমে গেলেন সালমা বেগম। ঘাড় ঘুরিয়ে ঋতুর দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য হেসে বললেন,
“অন্যের সন্তানের বিষয়ে এই কথাগুলো বলা খুব সহজ যে তাকে মে রে ফেলা উচিত। কিন্তু ব্যাপারটা যেদিন তোমার নিজের সন্তানের উপর আসবে সেদিন বুঝবে এটা কতটা কঠিন।”
ঋতু নিজেও পাল্টা তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“এমন দিন মা হিসেবে আমি কখনো আসতেই দেবো না। তার আগেই আমার ছেলেকে
কে টে টুকরো টুকরো করে নদীর জলে ভাসিয়ে দেব। যেদিন বুঝতে পারব ও আমার গর্ভকে কলঙ্কিত করছে, কোন মেয়ের জীবন ধ্বংস করছে। সেদিনই নিজ হাতে ওকে গ লা টি পে শেষ করে ফেলব।”
সালমা বেগম আবারও অদ্ভুত দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন ঋতুর দিকে। তারপর চলে গেলেন সেখান থেকে। ঋতুও আবার নিজের কাজে মনোযোগ দিল।
__________
নিধি তখন গভীর ঘুমে তলিয়ে। তবে হঠাৎ করে কেন যেন ঘুমটা হালকা হয়ে গেল। নিধির মনে হচ্ছে কেউ যেন ইচ্ছাকৃতভাবে ওর ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করছে, বিরক্ত করছে। তবে নিধি ঠিক করেছে এখন উঠবে না। একেই দীর্ঘ একটা পথ জার্নি করে এসেছে। শরীরটা ভীষণই খারাপ। তারওপর আবার এমন ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়ার মাঝে কম্বলের নিচে শুয়ে থাকতে ভীষণ ভালো লাগছে। তবে একপর্যায়ে গিয়ে আর থাকতে পারলো না। কেননা বুঝতে পারছে সঙ্গে যে মানুষটাকে এনেছে তার নিধির ঘুম ঠিক সহ্য হচ্ছে না।
মোচড়ামুচড়ি করতে করতে শেষে নিধি চোখ মেলে তাকিয়ে সামনে গহনের মুখটা দেখতেই খানিকটা চমকে উঠলো। পরক্ষণেই আবার স্বাভাবিক হয়ে মৃদু বিরক্তিকর গলায় বলল,
“আমি তো ঘুমোচ্ছিলাম। আপনি বিরক্ত করছেন কেন আমায়?”
৬-৭ ঘন্টার অধিক সময় ধরে মেয়েটা ঘুমোচ্ছে। হোটেলে এসে গোসল করেই ঘুমিয়ে পড়েছে। কিছু খায়ওনি। গোসলটাও করেছিল গহন জোর করায়। নয়তো অমনি ঘুমিয়ে যেত।
মেয়েটার এলোমেলো চুলগুলো গহন আলতো করে ওর কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে বলল,
“বিরক্ত করছিলাম না তো। শুধুমাত্র মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম।”
নিধি ঘুম জড়ানো গলায় বলল,
“ওটাই তো বিরক্ত করা। আমি আরেকটু ঘুমোতাম। সবেমাত্র ঘুমিয়েছি, এত তাড়াতাড়ি জাগিয়ে দিলেন কেন? আমার শরীর কতটা ক্লান্ত জানেন? আমি এতটা পথ জার্নি কখনো করিনি। আমার মাথা এখনো ঘুরছে। আমার শরীর এখনো কাঁপছে। আমি উঠলেই পড়ে যাব। আমি পারবোই না কিছু করতে। আমাকে ঘুমোতে দিন গহন। নয়তো আপনার বউ পাগল হয়ে যাবে।"
গহন হেসে উঠে বলল,
“আসার পর থেকে তো ঘুমোচ্ছই। সন্ধ্যে হয়ে গেল। একটা দিন তো পার ই হয়ে গেল, ঘুরবে কখন? সবাই ঘুরছে। শুধু আমি এই বাচ্চা মেয়েটাকে সঙ্গে করে এনে বসে বসে তার ঘুম দেখছি, ঘুরতে পারছিনা। সবাই কিন্তু একসঙ্গে ঘোরার কথা ছিল। দেখো তুমি যদি এখন না যাও আমি কিন্তু পরে আলাদা করে আর তোমায় একা একা ঘুরতে নিয়ে যাব না।”
গহনের কথাটা শুনতেই নিধির চোখ থেকে ঘুম ছুটে পালালো। লাফ দিয়ে উঠে বসে তড়িঘড়ি করে বলল,
“আরে না না। এভাবে বলবেন না। একটু নাহয় ঘুমিয়েছি তাই বলে আপনি আমার সাথে এমন করবেন?”
“তো এখন ঘুরতে এসে যদি তুমি শুধু ঘুমোও তাহলে আমি আর কিই বা করবো বলো?”
নিধি মুখ ভেংচিয়ে বলল,
“ঠিক আছে ঠিক আছে। চলুন। ঘুরতে যাব এখন। আমি হাতমুখ ধুঁয়ে আসছি। আচ্ছা আপনার চোখে ঘুম নেই কেন? আপনার শরীরে ক্লান্তি ট্লান্তি নেই, তাই না? ঘুম-টুম ধরে না?”
নিধি গহনকে প্রশ্নগুলো করলো ঠিকই তবে উত্তর জানার অপেক্ষায় রইল না। বরং নিজেই আবার উত্তরে বলল,
“অবশ্য ক্লান্তিই থাকবে কি করে? আসলে তরুণ বয়সে ঘুম বেশি থাকে, ক্লান্তি বেশি থাকে। আপনি তো এখন বুড়োর কাতারে চলে গেছেন। সেজন্য শরীরে শক্তি বেশি। মানে অভ্যাস হয়ে গেছে আর কি। তাই এখন আর ঘুম টুম ধরে না। কিন্তু আমি তো এখনো ছোট মানুষ। সেজন্য শরীরে বড্ড আলসি। যাইহোক আপনাকে এসব বোঝাতে পারব না। আপনি থাকুন। আমি তৈরি হয়ে আসছি।”
কথাটা বলে নিধি বিছানা থেকে নেমে গেলো। গহন হা করে ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল। নিধির কথায় কথায় গহন যে ওর থেকে বয়সে ঠিক কতটা বড় সেটা মনে করিয়ে দেওয়ার স্বভাব আর গেল না। আচ্ছা একটা পাজি মেয়ে।
_________
তিন থেকে চার ঘন্টারও অধিক সময় ঘোরাঘুরি শেষে রাত দশটা নাগাদ আবারও হোটেলে ফিরল নিধিরা। যতটা উৎসাহ নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছিল ঠিক ততটাই নিস্তেজ হয়ে ফিরেছে। মনে হচ্ছে কখন আবার একটু ঘুমোবে। রুম অব্দি আসারও আর তর সইছে না।
ঘরে ঢুকেই নিধি সোজা বিছানায় ধপ করে শুয়ে পড়লো। অমনি গহন মৃদু চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“আরে আরে কি করছো? নষ্ট হয়ে গেল তো সব!”
নিধি ধড়ফড়িয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“কি হয়েছে? কি নষ্ট হয়ে গেল?”
কথাটা বলে নিধি নিজেই আশেপাশে তাকালো। অমনি চোখ-মুখে এক অদ্ভুত বিম্মিত ভাব ফুটে উঠলো। ওদের ঘর আবার এত সুন্দর করে সাজালো কে? কখনই বা সাজালো? বেড়োনোর সময়ও তো এমন ছিল না ঘরটা? পুরো ঘর ফুল, বেলুন, দিয়ে সুন্দর করে সাজানো। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে গোলাপের পাপড়ি আর লাল হার্ট শেপের বেলুন। যেগুলো নিধি এতক্ষণে খেয়াল করলো।
সাজানো ঘরের দিকে তাকিয়ে নিধি বিস্মিত গলায় বলল,
“এসব কে সাজিয়েছে? কখন সাজিয়েছে? কেনই বা সাজিয়েছে?”
গহন এগিয়ে এসে পিছন থেকে দুহাতে নিধির কোমর জড়িয়ে ধরে ওর কাঁধে নিজের থুঁতনি ঠেকিয়ে বলল,
“আমাদের বিয়ের এক বছর পূর্ণ হলো আজ। গোটা একটা বছর আমার মতন অদ্ভুত একটা মানুষের সাথে কাটিয়ে দেওয়ার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। এমন আরো হাজারো বর্ষ পূরণ হোক তোমার আমার একসঙ্গে পথচলার।”
নিধি ফের বিস্মিত গলায় বলল,
“আজ আমাদের বিবাহবার্ষিকী? আর আমার মনে নেই? মানে সত্যি আপনার মায়ের সাথে ঝগড়া করতে করতেই আমার একটা বছর কেটে গেল?”
নিধির কথা শুনে গহন ফিক করে হেসে ফেলল। আলতো করে নিধির গালে একটা চুমু দিয়ে বলল,
“শুধু তো ঝগড়া করে কাটাওনি। আমাকে ভালোবেসেছো, আমার যত্ন করেছো, আগলে রেখেছো, আমাকে একটা নতুন জীবন উপহার দিয়েছো। এক বছর শুনতে হয়ত অনেক কম সময় মনে হচ্ছে, নিধি। তবে তুমি হয়ত জানো না যে এই একটা বছরে আমার বিগত পঁচিশ বছরের সকল আফসোস দূর করে দিয়েছো তুমি। সর্বপরি, তুমি আমাকে বেঁচে থাকার একটা কারণ দিয়েছো। আর সেই কারণটা হলে তুমি।”
নিধির যেন এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না যে ওরা একসঙ্গে একটা বছর কাটিয়ে দিল। এইতো সেদিনই ওদের বিয়ে হলো। তারপর শুরু হলো সাংসারিক ঝামেলা, দুজনের মনোমালিন্য, দূরত্ব। তারপর ধীরে ধীরে যখন দুজন দুজনকে বুঝতে শিখলো তারপর থেকে এক ভিন্ন গল্পের যাত্রা শুরু হলো। একটু একটু করে দুজনের কাছে আসা, একে অপরকে ভালো লাগতে শুরু করা, একে অপরের পাশে দাঁড়ানো। সবশেষে একে অপর কে ভালোবাসা। মাত্র এক বছরে এতকিছু ঘটে গেছে সেসব ভাবতেই নিধি অবাক হচ্ছে।
এদিকে অনেকক্ষণ যাবৎ নিধির চুপ করে থাকাটা গহনের যেন ঠিক হজম হলো না। আগবাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কিছু বলছো না যে? তোমার ভালো লাগেনি এসব?”
ধ্যান ভাঙলো নিধির। তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো,
“না না। পছন্দ হয়েছে তো।”
গহনের ব্যাপারটা ভালো লাগলো না। ভালো লাগলে তো নিধির এতটা নির্লিপ্ত থাকার কথা ছিল না।
নিধিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করাতেই গহন খেয়াল করল নিধির চোখদুটো ছলছল করছে। অমনি গহনের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। গহন তো মেয়েটাকে হাসাতে চেয়েছিল। তাহলে কাঁদছে কেন? গহন কি নিজের অজান্তে কোনো ভুল করে বসলো তাহলে?
ব্যতিব্যস্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে, নিধি? কাঁদছো কেন? আমি কি আমার অজান্তে কোনোভাবে তোমায় কষ্ট দিয়ে ফেললাম? তোমার এসব ভালো লাগেনি? আচ্ছা ঠিক আছে আমায় বলো কি করলে তোমার ভালো লাগবে আমি তেমনটাই করবো?”
নিধি শুধু হা করে তাকিয়ে থাকলো গহনের দিকে। যে মেয়েটা একসময় সামান্য সুখও পেত না আজ কেউ একজন তাকে মন মতো সবকিছু এনে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। অদ্ভুত, তাই না?
হেসে ফেলল নিধি। নিধি কে হাসতে দেখে গহন ভ্যাবাচ্যাকা খেল। আসলে কি করবে বা বলবে বুঝতে পারছে না।
নিধি গহনের গালে আলতো করে নিজের হাত রাখল। না চাইতেও মেয়েটা কেঁদে ফেলল। আবার ঠোঁটে হাসিও লেপ্টে আছে। গহন কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই নিধি নিজ থেকেই বলে উঠলো,
“খুব পছন্দ হয়েছ। কিন্তু জানেন, আমি ভীষণ অবাক হয়েছি। আমি প্রতি নিয়ত অবাক হই। আমি অবাক হই আমার সৌভাগ্যের কথা ভেবে। ভাবুন তো, যেই বিয়েটা আমি অমতে করেছিলাম, যেই সম্পর্কটাকে আমি নিজের জীবনের সবথেকে বড় বাঁধা মনে করতাম, যেই মানুষটাকে প্রচন্ড অপছন্দ ছিল আমার আজ সেসবই আমার সুখের কারণ। আমি তো চেয়েও কখনো প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো পাইনি আমার বাবার অসুস্থতার পর থেকে। সেখানে আপনার কাছে তো কিছু চাইতেও হয় না। আমার মতন সাধারণ একটা মেয়েকে তো আপনি একটা স্বপ্নের জীবন উপহার দিয়েছেন, গহন। গল্পের রাজকুমাররা নাকি বাস্তবে আসেনা। কিন্তু আপনি তো আমার জীবনে এসেছেন। আমি রাজকুমারী নই গহন। তবে আমার স্বপ্নের রাজকুমার কে পেয়ে গেছি, যে আমার সব স্বপ্ন, শখ পূরণ করে দেয়।”
এতক্ষণে গহন শান্তি পেল। যাক, নিধি তবে কষ্টে কাঁদছে না। ও আনন্দে কাঁদছে। কিন্তু গহন যে তাও নিধির চোখে পানি দেখতে ইচ্ছুক নয়।
স্বযত্নে নিধির চোখের পানি মুখে দিয়ে বলল,
“সারাজীবন এভাবেই তোমার সব শখ পূরণ করব আমি। তুমি আমাকে যা দিয়েছো তার বিপরীতে গোটা পৃথিবী তোমার পায়ের কাছে এনে দিলেও কম হয়ে যাবে।”
প্রত্যুত্তরে নিধি শুধু হালকা হাসল। গহনও আলতো হেসে বলল,
“আচ্ছা অনেক কান্নাকাটি হয়েছে। এদিকে এসো। এখনও তো উপহারটাই দেওয়া হলো না তোমায়।”
কথাটা বলে গহন নিধিকে বিছানার ওপর বসালো। নিজে গিয়ে ব্যাগ থেকে একটা বক্স বের করে এনে হাঁটু গেড়ে নিধির পায়ের কাছে বসে পড়লো। নিধির এক পা নিজের হাঁটুর ওপর তুলে নিয়ে স্বযত্নে একটা নুপুর পরিয়ে দিল। আলতো করে সেখানে নিজের ঠোঁটও ছোঁয়ালো। তারপর দ্বিতীয় পায়েও নুপুর পরিয়ে দিয়ে সেখানেও আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
“আমাদের বাড়িতে যখন তুমি ছোটাছুটি করে কাজ করবে তখন তোমার পায়ের নুপুরের শব্দে আমি বুঝতে পারব যে তুমি আমার কাছেই আছো। সবসময় তোমায় আমি নিজের কাছাকাছি অনুভব করতে চাই। সেজন্য এই উপহার দিলাম। পছন্দ হয়েছে?”
নিধি কোনোরকম কোনো সময় ব্যয় না করে বলল,
“খুব পছন্দ হয়েছে। তবে আপনাকেও আমার কিছু দেওয়া উচিত ছিল।”
“তোমার থেকে বড় কোনো উপহার আমার জন্য হতে পারেনা নিধি। তুমি, তোমার ভালোবাসাই আমার জন্য সবথেকে বড় উপহার।”
নিধি একটু ভাবনা চিন্তা করে বলল,
“তা অবশ্য ঠিক বলেছেন। তবে আমিও উপহার দেব আপনাকে। খুব বড় কিছু উপহার দেব। আমাকে পেয়ে যতটা খুশি হয়েছেন সেই উপহার পেয়েও ততটাই খুশি হবেন। তবে এখনই দিতে পারছি না। আর কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে পারবেন তো?”
গহন মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে বলল,
“হুম পারব। তুমি বললে সারাজীবন অপেক্ষা করতে প্রস্তুত আমি।”