বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৭৭

🟢

আজই নতুন বাড়িতে উঠেছে নিধিরা। ফলস্বরূপ বাড়িতে সবজি, মাছ, মাংস কোন কিছুই নেই। সংসারের জন্য নিত্য প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই এখনো নেই। তাই জুবাইদা রাতের রান্না করে জারার হাতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। অবশ্য পাঠিয়ে না দিলেও সমস্যা হতো না। কেননা জারা এসে দেখল আবিদ ওর অনেক আগেই খাবার নিয়ে এসেছে। যদিও ছেলেটা নিজে রান্না করে আনেনি। হোটেল থেকে কিনে এনেছে। তবুও তো এনেছে।

রাতের খাওয়াদাওয়া ওরা চারজন মিলেই সারল। খাওয়াদাওয়া শেষে টুকটাক গল্প গুজব করল। মূলত হাসি ঠাট্টা করার চেষ্টা করল যেন গহনের মনটা ভালো থাকে। শরীর খারাপের অনুভূতি না হয়। এইসব করতে করতেই ঘড়ির কাঁটা গিয়ে রাত দশটায় ঠেকল।

জারা, আবিদ দুজনেই তখন যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাত অনেক হয়ে যাওয়ায় আবিদ নিজ থেকেই জারাকে প্রস্তাব দিয়ে বলল,

“জারা, চলুন আমি আপনাকে নামিয়ে দিয়ে আসি।”

জারা বিলম্ব না করে আবিদের প্রস্তাবটা নাকচ করে দিয়ে বলল,

“ধন্যবাদ। তবে প্রয়োজন নেই। আমি একা চলাফেরা করতে পারি। অভ্যাস আছে আমার।”

আবিদ হার মানল না। ঠোঁটে আলতো হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,

“আরে, সে অভ্যাস আছে ভালো কথা। তাই বলে আমি তো আর আপনাকে একা ছাড়তে পারি না। আমার তো একটা দায়িত্ব আছে তাই না?”

জারা কপাল কুঁচকে আবিদের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আপনার কিসের দায়িত্ব?”

আবিদ প্রতুত্তরে কিছু বলল না। শুধুই ঠোঁট কামড়ে হাসল। জারা ভীষণ বিরক্ত হলো আবিদের এমন হাসিতে। কেননা অকারণে হাসি জারার একদমই অপছন্দ। ফলস্বরুপ বিরক্ত হয়ে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল।

কিছুক্ষণ আপন মনে আবিদ কিসব যেন ভেবে একটু পর আবারও জারাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“চলুন জারা, নামিয়ে দিয়ে আসি আপনাকে।”

জারা এবারে খানিকটা রাগি গলায় বলল,

“বললাম তো প্রয়োজন নেই। আমি একা চলে যেতে পারব। দয়া করে সবসময় আমার পিছু করবেন না। আমার ভালো লাগে না।”

একনাগারে কথাগুলো বলে থামল জারা। আবিদকে কথাগুলো বলা শেষে গহন আর নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোমরা থাকো। আমি আসছি। আর কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে আমাকে জানিও। সকালে আমি খাবার নিয়ে আসব, কেমন?”

কথাটা বলে জারা উঠে চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে গহন ডেকে উঠলো ওর নাম ধরে। জারার পক্ষে গহনের ডাক উপেক্ষা করে চলে যাওয়া সম্ভব না। ফলস্বরূপ থামতেই হলো। আবিদের সাথে যেমন রুষ্ট গলায় কথা বলছিল গহনের সাথে তার ব্যতিক্রম হলো। বেশ শান্ত গলায় বলল,

“হ্যাঁ, বলো গহন।”

“তুমি গাড়ি নিয়ে এসেছ?”

“না। গাড়ি নিয়ে আসিনি আজ।”

“তাহলে এত রাতে একা একা যাবে কী করে? তোমার বাড়ি তো অনেক দূর।”

জারা গহন কে আস্বস্ত করে বলল,

“তুমি চিন্তা করো না। আমি চলে যাব কোনো রকমভাবে। আমাকে কি ছোট বাচ্চা মনে হয় নাকি? আমি একা চলাফেরা করতে পারি গহন। বিদেশেও আমি একাই চলাফেরা করেছি, সে যত রাতই হোক না কেন।”

“হ্যাঁ সে তুমি একা চলাফেরা করতে পারো, করেওছো। কিন্তু তুমি আমাদের দেশে একা চলাফেরা করোনি। এখানকার পরিস্থিতি একটু অন্য রকম। এত রাতে একটা মেয়ের একা চলাফেরা করা নিরাপদ না। আবিদ তো বলছে তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আসবে। ওর সাথে চলে যাও।”

জারা গহনের কথায় তীব্র আপত্তি জানিয়ে শান্ত গলায় বলল,

“না গহন। প্লিজ তুমি আমাকে ওনার সাথে যেতে বলো না। ওনার সাথে আমি গেলে পুরোটা রাস্তা কথা বলতে বলতে আমার মাথা খেয়ে ফেলবে। অতিরিক্ত কথা বলে এই ছেলেটা। আমার ভালো লাগে না ।”

গহন কিছু বলে ওঠার আগেই আবিদ তড়িঘড়ি করে বলে উঠল,

“আচ্ছা ঠিক আছে আমি একটা কথাও বলব না। প্রমিস করছি মুখ দিয়ে একটা শব্দও উচ্চারণ করব না। তবুও চলুন।”

জারা তবুও আপত্তি জানিয়ে বলল,

“না আমি যাব না আপনার সাথে। আমি একা চলে যেতে পারব। আর যদি না যেতে পারছি তাহলে কল করে আম্মুকে বলব যেন গাড়ি নিয়ে এগিয়ে আসে।”

আরও বেশ কিছুক্ষণ এই নিয়ে জারা আর আবিদের মাঝে তর্কাতর্কি চলল। এক পর্যায়ে ওর জোরাজুরিতে জারা বাধ্যই হলো আবিদের প্রস্তাবে রাজি হতে। কেননা ভাবল, আজ খোলাখুলি ভাবে কিছু কথা বলা দরকার আবিদের সাথে।

__________

রাতের রাস্তা হওয়ায় কোনো যানজট নেই। গাড়ির ভিড়ভাট্টাও নেই। খুবই কম। বাড়ি পৌঁছানোর আগেই একটা ফাঁকা জায়গায় রাস্তার ধারে জারা আবিদকে গাড়িটা থামাতে বলল। কোনোরকম কোনো প্রশ্ন না করে আবিদ সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটা থামাল। জারা একটা লম্বা শ্বাস টেনে ধীর গলায় বলল,

“গাড়ি থেকে নামুন।”

“কেন?”

“কিছু কথা আছে আপনার সাথে। নামুন।”

কথাটা বলে জারা নিজের সিট বেল্ট খুলে গাড়ি থেকে নেমে গেল। আবিদও কোনো রকম কোনো প্রশ্ন না করে গাড়ি থেকে নেমে এলো।

পরিবেশটা বেশ নির্জন। আশেপাশে না কোনো বসতি আছে, না কোনো দোকানপাট আছে। মাঝে মাঝে শুধু কয়েকটা গাড়ি ওদের পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে।

আবিদ দু হাত বুকে গুঁজে গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। আবিদ বোধহয় একটু একটু আন্দাজ করতে পারছে যে জারা ওকে কী বলতে পারে। তবে আগবাড়িয়ে কিছু বলল না।

বেশ অনেকটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর যখন জারা কিছু বলল না তখন বাধ্য হয়ে আবিদই বলে উঠল,

“কি যেন বলবেন বলছিলেন? নিঃসংকোচে বলতে পারেন। আমি কিছু মনে করব না।”

জারা মাথা তুলে তাকাল আবিদের দিকে। মনে মনে নিজেকে একটু শক্ত করল। তারপরে বেশ গম্ভীর গলায় বলল,

“সবকিছু জানার পরেও কেন আমার পিছনে পড়ে আছেন? যেখানে আপনি জানেন আমার মনে অন্য একজন আছে, সেখানে কেন আমার মনে নিজের জন্য জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করছেন? এটা কি আদৌ সম্ভব আপনিই বলুন?”

আবিদ স্মিত হেসে বলল,

“মানুষ চাইলে সবই করতে পারে।”

“আমি পারি না।”

“তার কারণ আপনি কখনো চেষ্টাই করেননি। একবার চেষ্টা তো করে দেখুন, নিশ্চয়ই পারবেন।”

জারা একটা শুকনো ঢোক গিলে বলল,

“আমি চেষ্টাও করতে চাই না। সব স্মৃতি ভোলা যায় না, আবিদ। সব মানুষকেও ভোলা যায় না।”

আবিদ বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,

“তো কে ভুলতে বলেছে আপনাকে? পুরোনোকে ভুলতে চান না ঠিক আছে। কিন্তু তার মানে এই না যে নতুনকে জায়গা দিতে পারবেন না।”

“আমি জায়গা দিতে চাই না।”

“কিন্তু আমি জায়গা পেতে চাই। আমি নিজের জন্য জায়গা তৈরি করতে চাই আপনার মনে, জারা। আমি আপনার জন্য আপনার মনের মত হয়ে উঠতে চাই। ঠিক যেমনটা আপনি পছন্দ করেন আমি তেমন হয়ে উঠতে চাই। খুব বেশি কিছু চাইনি আমি আপনার থেকে, জারা। আমি শুধু আপনার জীবনে নিজের জন্য একটু জায়গা চেয়েছি। কখনো আপনার কাছে দাবিও রাখিনি যে আমাকে ভালোবাসুন। ভালো না হয় আমিই বাসলাম। আপনি শুধু একটু জায়গা দিন আমায়।”

জারা বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

“কেন পাগলামি করছেন? নিজের ভালো বোঝার চেষ্টা করুন। আপনি আমার থেকে অনেক ভালো মেয়ে পেয়ে যাবেন।”

এপর্যায়ে আবিদ খানিকটা বিরক্তিকর গলায় বলল,

“এইসব বাজে কথা বাদ দিন। আপনার থেকে ভালো পাবো কি খারাপ পাবো সে কথায় আমি যেতে চাই না। না আপনার থেকে শুনতে চাইছি। আমার একটাই কথা। আমি আপনাকে চাই।”

জারার ধীরে ধীরে রাগ বাড়ছে। ভীষণ রাগ হচ্ছে আবিদের উপর। কেন এই ছেলেটা নিঃস্বার্থভাবে ওকে ভালোবাসবে? কেন কোনো কিছুর দাবি না রেখে ওকে ভালোবাসছে?

জারা জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস ফেলে আবারও আবিদকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আচ্ছা একটা কথা বলুন তো, আপনি আমার সম্বন্ধে কী জানেন? কতটুকু জানেন যে আমাকে ভালোবাসলেন?”

আবিদ বেশ গা ছাড়া ভঙ্গিতে বলল,

“প্রয়োজন নেই অতিরিক্ত কোনো কিছু জানার। যতটুকু জানার ছিল ততটুকু জেনে নিয়েছি। বাকিটা নাহয় বিয়ের পরে জানব।”

জারা অনেক কষ্টে দাঁতে দাঁত চেপে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে বলল,

“বিয়েই কেন করতে চান আমাকে? আমাকে ভালোবাসার কারণটা বলুন?”

আবিদ আলতো হাসল। কয়েক কদম জারার দিকে এগিয়ে এসে দু হাত পকেটে গুঁজে দাঁড়িয়ে আলতো হেসে বলল,

“জানেন তো জারা, আপনি নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে জানেন। এমনকি যাকে আপনি ভালোবাসেন তার ভালোর জন্য নিজের স্বার্থকে বিসর্জন দিতে আপনি দুবার ভাবেন না, নিজের সুখকে বিসর্জন দিতে আপনি দুবার ভাবেন না। এমন একটা মানুষকে কে না চায় বলতে পারেন? আপনি নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে জানেন তাই আমি আপনাকে চাই।”

“আমার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা শুধুমাত্র গহনের জন্য ছিল। আপনার জন্য থাকবে না, কারোর জন্যই থাকবে না। আমার সবটুকু ভালোবাসা শুধু গহনের জন্য ছিল, আবিদ।”

“আর আমার সবটুকু ভালোবাসা আপনার জন্য।”

এ পর্যায়ে জারা ভীষণ বিরক্ত হলো। রাগে খানিকটা চিৎকার করে উঠে বলল,

“মাথা খারাপ হয়ে গেছে আপনার? কেন বুঝতে পারছেন না যে আমার কাছে আপনাকে দেওয়ার মতন বিন্দু পরিমাণ ভালোবাসা অবশিষ্ট নেই? এক জীবনে কয়জনকে ভালোবাসা যায়? গহনকে ভালোবেসেছি আমি। আর নতুন করে কাউকে ভালোবাসা সম্ভব না। এখন যদি আমি আপনার জীবনে যাই আপনাকে ঠকানো হবে আবিদ। আমি কখনো হয়তো মন থেকে আপনাকে ভালোবাসতে পারব না। আমার মন থেকে গহনকে বের করতে পারব না। আমি চাই না আপনাকে ঠকাতে। আপনি খুব ভালো একজন মানুষ সেটা আমি বুঝি। সেই সাথে আপনি আমাকে হয়তো সত্যি ভালোবাসেন সেটাও আমি বুঝি। আর সেই জন্য আমি আপনাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। কারণ আমার মনে হয় আমি আপনার যোগ্য নই। আমি আপনার জীবনে গেলে আপনি ভালো থাকবেন না। আমি প্রত্যেকটা মুহূর্তে আপনাকে ঠকাবো, বোঝার চেষ্টা করুন। আমার হৃদয়টা ভেঙে গেছে আবিদ। এই ভাঙা হৃদয় নিয়ে আপনাকে ভালোবাসবো কী করে বলুন তো?”

বেশ দুঃসাহসিক একটা কাজ করল আবিদ। জারা কে ছোঁয়ার সাহস দেখালো। হ্যাঁ, এই সামান্য পদক্ষেপটুকু দুঃসাহসই বলা যায় জারার ক্ষেত্রে। আলতো করে নিজের হাতটা জারার গালে ঠেকাল। আবিদের খানিকটা স্পর্শ পেতেই জারা খানিকটা কেঁপে উঠল।

বিজ্ঞাপন

“কী করছেন? এটা রাস্তা। হাত সরান।”

আবিদ মোটেও পাত্তা দিল না জারার কথায়। বরং এবার দুহাতের আঁজলে জারার মুখটা নিয়ে কণ্ঠে তীব্র আকুতি প্রকাশ করে বলল,

“আমি আপনার ভাঙা হৃদয়টা জোড়া লাগাতে চাই, জারা। আমি দেখতে চাই একজন ভাঙা হৃদয়ের মানুষের ভালোবাসা কেমন হয়? ভাবুন তো, একটা মানুষ কাউকে কতটা তীব্র ভাবে ভালোবাসলে তার হৃদয়টা ভেঙে যেতে পারে! আমি হয়ত আপনার হৃদয়ের ক্ষত সাড়াতে পারব না। তবে নতুন করে সেখানে আর কখনো রক্তক্ষরণও হতে দেব না। আপনার হৃদয় যে কখনো ভেঙেছিল সেটা আপনি ভুলে যাবেন। আপনি একটু চেষ্টা করুন। দেখুন না কি হয়।”

জারার ভেতরটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। আবিদের চোখে চোখ পড়তেই কেমন যেন গুলিয়ে ফেলল সবটা। বিভ্রান্ত হতে দেখা গেল, অস্থির হয়ে উঠল মেয়েটা।

তাড়াহুড়ো করে নিজের গাল থেকে আবিদের হাতটা সরিয়ে নিয়ে একটু দূরত্বে দাঁড়িয়ে বলল,

“দেখুন, এসব গল্পেই সম্ভব। এসব শুধু কল্পনার রাজ্যে সম্ভব, বাস্তবে সম্ভব না। একসময় গিয়ে আপনি নিজেও ক্লান্ত হয়ে পড়বেন। তখন শুরু হবে আপনার অবহেলা। তাই বলছি, দূরে থাকুন আমার থেকে। এটা আমার আর আপনার দুজনের জন্যই ভালো।”

জারা বেশ শক্তভাবে কথাগুলো বলল আবিদকে। তবে আবিদ তো নাছোড়বান্দা। আজকে যখন একটা সুযোগ পেয়েছে জারাকে বোঝানোর, তাহলে না বুঝিয়ে ছাড়বে না।

দু কদম এগিয়ে গিয়ে দুহাতে জারার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল,

“আপনার থেকে এতটা বোকামি আশা করা যায় না, জারা। যে আপনাকে ভালোবাসতে পারেনি তার জন্য কেন নিজের জীবনটা নষ্ট করবেন? যে আপনাকে ভালোবাসছে তাকে একটা সুযোগ দিন। শুধুমাত্র একটা সুযোগ দিয়ে দেখুন না আমায়, জারা। আমি আপনাকে হতাশ করব না। যদি আমি আপনার দেওয়া একটা সুযোগে আপনার মন জয় করতে না পারি, তো আর কখনো আপনাকে বিরক্ত করব না। কিন্তু শুধুমাত্র একটা সুযোগ দিন আমায়। আমাকে আমার ভালোবাসাটা দেখাতে তো দিন।”

নিষ্পলক দৃষ্টিতে জারা তাকিয়ে রইলো আবিদের মুখের দিকে। আসলে কি বলা উচিত বুঝতে পারছে না। মনে মনে নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করলো,

“আবিদ কে কি একটা সুযোগ দেওয়া উচিত? আমার কি নিজেকে একটা সুযোগ দেওয়া উচিত?”

____________

জারারা চলে যাওয়ার পর নিধি একটু কাজে হাত দিয়েছিল। ঘুমোতে আর যায়নি। কেননা এখন ঘুম ধরবে না। তাই ভাবল ঘরদোর পরিষ্কার করবে, গোছাবে। এত বড় বাড়ি, গোছানো কি চারটিখানি কথা নাকি? যদিও প্রথম দিকে নিধির একটু ভয়ই করছিল ভেবে যে এত বড় বাড়ি ও কী করে একা সামলে রাখবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, খুব একটা কঠিন ব্যাপার না। কেননা গহন মোটেই অগোছালো মানুষ না। বরং নিধিই যা একটু অগোছালো। গহন তো আরও জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখে। বাচ্চা কাচ্চাও নেই, ঝামেলা করার মতন কেউ নেই। জায়গার জিনিস জায়গায় ঠিক থেকে যাবে।

আর এমনিতেও কাজ তো নিধি নিজের শ্বশুরবাড়িতে আগেও করত। সেই হিসেবে এখানে হয়তো কাজের পরিমাণ কমই হবে। আর তারপরেও যদি না হয়, গহনকে বললে ওকে সাহায্য করার জন্য কাউকে ঠিক রেখে দেবে।

এইসব ভাবতে ভাবতেই নিধি কাজে হাত দিল। ব্যাগ ভর্তি জামাকাপড় এনেছে, সেগুলো ভাবল আগে আলমারিতে তুলে রাখবে। গহন তখন চুপচাপ বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে।

কিছুক্ষণ চুপচাপ নিধির কাজকর্ম খেয়াল করল। এক পর্যায়ে গিয়ে একটু বিরক্তই হলো। একা একা কতক্ষণই বা বসে থাকা যায়? নিধি আবার কাজ করতে করতে বকবকও করছে না। নিধির বকবক না শুনলে তো গহনের আজকাল ভালো লাগে না। অভ্যেস হয়ে গেছে। ফলস্বরূপ মৃদু বিরক্তিকর গলায় বলল,

“তুমি কি সারারাত কাজই করবে?”

গহনের কণ্ঠ পেয়ে নিধি ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে ফিরে তাকিয়ে আলতো হেসে বলল,

“কেন? আপনার সমস্যা হচ্ছে?”

“হচ্ছেই তো।”

“কী সমস্যা?”

গহন পিঠ টান করে সোজা হয়ে বসে মৃদু অভিমানী গলায় বলল,

“একা একা কি এভাবে বসে থাকা যায়? সমস্যা হয় তো। একটু তো কথাও বলতে পারো।”

“কাজ করতে করতে কথা বলা যায় নাকি? আগে কাজটা শেষ করি, তারপরে এসে কথা বলছি।”

“এখন কাজ করার দরকারই বা কি? সারা জীবন পড়ে আছে। কাল থেকে করো কাজ। নতুন বাড়ি, সংসার পেয়ে আমাকে ভুলে বসলে নাকি?”

নিধি বুঝল এখন যদি ও নিজের কাজ চলমান রাখে তাহলে গহনের অভিমান আর বিরক্তি দুটোই বাড়বে। আর অযথা গহনকে কষ্ট দিয়ে কাজ করার তো কোনো মানে হয় না। সেজন্য হাতের কাজগুলো অমনি ফেলে রেখে এগিয়ে গিয়ে বিছানায় গহনের সামনে বসে বলল,

“আচ্ছা, করলাম না কাজ। এবার বলুন কী বলবেন? কী এত কথা জমে আছে মনের মাঝে?”

গহন সঙ্গে সঙ্গে কিছু বলল না। নতুন করে কোনো কথাও তুলল না। কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নিধির দিকে। বেশ অনেকটা সময় এভাবে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পরে যখন গহন কিছু বলল না তখন নিধিই বলে উঠলো,

“কী হলো? এই না বলছিলেন যে গল্প করবেন। এখন আবার চুপ করে আছেন কেন? আর আমায় এভাবে দেখার কী আছে? আমার রূপ গজায়নি। যেমন ছিলাম তেমনই আছি। বরং রাত জাগতে জাগতে চেহারার বারোটা বেজে গেছে।”

গহনের ধ্যান ভাঙল। এতক্ষণ বোধহয় কোনো গভীর ভাবনার মাঝে ডুবে ছিল। নিধির কথাটা বোধগম্য হতেই আলতো হাসল। মেয়েটা আসলে অগোছালো, সেই সাথে ছেলেমানুষও। এই যেমন চুলগুলো কেমন অগোছালো করে রেখেছে। বোধহয় বহুদিন হলো আঁচড়ায় না। একটু তেলও দেয় না। কতদিন হলো যে চুলে শ্যাম্পু করে না তারও কোনো হিসেব নেই।

গহন আলতো হাতে নিধির এলোমেলো চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে বলল,

“তুমি যেমনভাবেই থাকো না কেন আমার কাছে তো বেশ সুন্দর লাগে দেখতে। মনে হয় তাকিয়েই থাকি। বুঝি না তুমি কী করে নিজেকে অসুন্দর বলো। আমার তো শুধু নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করে। মনে হয় হাজার বছর ধরে তোমার দিকে তাকিয়ে থাকলেও বোধহয় আমার চোখের পলক পড়বে না।”

নিধির হয়ত লজ্জা পাওয়া উচিত ছিল। গাল দুটো লাল হয়ে ওঠা উচিত ছিল। তবে তেমন কিছুই হলো না। বরং গহনের কথায় প্রেক্ষিতে কণ্ঠে খানিকটা অনিহা প্রকাশ করে বলল,

“ধুর। অযথা এক কথা বললেই হলো? হাজার বছর ধরে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবেন কীভাবে? পলক তো ফেলতেই হবে। চোখ দিয়ে পানি ঝড়বে না হলে। কানা হয়ে যাবেন।”

নিধির এমন কথা শুনে গহন না হেসে পারল না। খানিকটা শব্দ করে হেসে উঠে বিষ্মিত গলায় বলল,

“তুমি লজ্জা পাও না কেন? একটু তো লজ্জা পাওয়া উচিত। না আমি প্রশংসা করলে লজ্জা পাও, না আমি ভালোবাসলে লজ্জা পাও, না আমি কাছে এলে লজ্জা পাও? কখনো তোমাকে লজ্জা পেতে দেখলাম না। মেয়েরা নাকি লজ্জাশীল হয়?”

নিধি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“আমি একটু ব্যতিক্রমধর্মী। বাকি মেয়েদের মতন আমার দ্বারা আসলে ওসব ন্যাকামি হয় না। স্বামী ভালোবাসলে লজ্জা পাওয়ার কি আছে? ভালো তো বাসতেই হবে, তাই না? আমি আপনার বউ। আপনি আমার প্রশংসা করবেন, ভালো বাসবেন, কাছে আসবেন এসব স্বাভাবিক। তাহলে ঢং করে লজ্জা পাওয়ার কি আছে?”

গহন বুঝল এই মেয়েকে অযথা লজ্জা পাওয়ার জ্ঞান দিয়ে লাভ নেই। কেননা এই মেয়ে আসলে লজ্জা পাওয়ার মেয়েই না। ফলস্বরূপ গহন আবারও নিষ্পলক দৃষ্টিতে নিধির দিকে তাকিয়ে রইল। নিধির মুখটা দেখলেই গহন শান্তি পায়। এই কাজটাই গহনকে বেশি আরাম আর স্বস্তি দেয়। তাই এটাই করল।

এক পর্যায়ে গিয়ে নিধিই বিরক্ত উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

“ধুর! বুঝেছি আপনার মনে কোনো কথা নেই। চুপচাপ ঘুমোন তো এখন। আপনার নিয়ম মেনে চলা দরকার। সময় দেখেছেন? এগারোটা বাজে। এখন ঘুমোন। আমি একটু কাজ করে আসছি।”

নিধি উঠে চলে যেতে ধরলে গহন ওর হাত ধরে আবারও পূর্বের জায়গায় বসালো। দ্বিতীয়বারের মতন গহন আবারও আলতো করে নিধির কানের পিঠে ওর এলোমেলো চুলগুলো গুঁজে দিল।

নিধি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,

“আবার কি হলো?”

গহন কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে ধীর গলায় অনুরোধের স্বরে বলল,

“আরেকটু বসো না!”

এত নরম গলার অনুরোধ নিধির ফিরিয়ে দেওয়ার সাধ্য হলো না। তবে এবার একটু চিন্তিত গলায় বলল,

“আপনার শরীর ঠিক নেই। এত রাত পর্যন্ত জেগে থাকা উচিত না। বিশ্রাম প্রয়োজন।”

গহন মৃদু হেসে বলল,

“জানি বিশ্রাম নেওয়া উচিত।”

“জেনেও তাহলে এখনো জেগে আছেন কেন?”

গহন উত্তর দিল না। বরং ধীরে ধীরে কপালটা নিধির কাঁধে ঠেকিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করল। নিধি সঙ্গে সঙ্গে কিছু জিজ্ঞেস করল না। বরং আলতো করে গহনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

“কী হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে? নাকি মন খারাপ? বাড়ির কথা মনে পড়ছে নাকি?”

গহন না বোধক উত্তর জানিয়ে বলল,

“না।”

“তাহলে?”

সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর ভেসে এলো না। বেশ কিছুটা সময় পর গহন বলে উঠল,

“হাসপাতালে শুয়ে একটা কথাই বারবার মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল যদি আর ফিরতে না পারি। মনে হচ্ছিল যদি আর ফেরার সুযোগ না হয়, তবে তোমার সাথে সময়ও কাটাতে পারব না। তোমাকে আর কখনো পাবো না, তোমার হাত ধরতে পারব না, তোমায় জড়িয়ে ধরতে পারব না, দু দন্ড তোমাকে নিজের পাশে বসিয়ে সুখ দুঃখের গল্প করতে পারব না।”

নিধির বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। আতঙ্কিত গলায় বলল,

“চুপ করুন। এই ধরনের কথা আর কখনো বলবেন না। আমার ভালো লাগে না। যা হয়েছে সেগুলো ভুলে যান। সেই কথাগুলো আমি আর কখনো মনে করতে চাই না।”

গহন মাথাটা তুলে নিধির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“ভয় পেয়েছিলে খুব, তাই না?”

নিধি উত্তর দিল না। শুধু মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। যেন গহনের থেকে কিছু লুকোতে চাইছে। গহন আলতো হাতে নিধির থুতনিটা ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে আবারও বলল,

“খুব ভয় পেয়েছিলে, তাই না?”

হঠাৎ করে নিধির কী হলো কে জানে! চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। কণ্ঠটা ভারী হয়ে উঠল ।

“সত্যি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। জীবনে প্রথমবার মনে হচ্ছিল সবথেকে দামি জিনিসটা আমার জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল আমি আমার জীবনের সুখ হারিয়ে ফেলছি, বেঁচে থাকার কারণ হারিয়ে ফেলছি। যখন আপনি চুপচাপ শুয়ে ছিলেন, আমার সাথে কথা বলছিলেন না, তখন বারবার মনে হচ্ছিল কত কিছু যেন বলা বাকি আপনাকে। মনে হচ্ছিল, এই তো সবেমাত্র ক’টা দিন একসঙ্গে কাটালাম। এখনও তো ঠিকঠাকভাবে সুখের মুখটাও দেখার সুযোগ হয়নি।”

নিধির চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। আর কিছু বলতেই পারল না মেয়েটা। কেননা এখন হয়তো কিছু বলতে গেলে আবার ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে দেবে। আর নিধিকে এখন কাঁদতে দেখলে গহন আবার ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠবে। বলা যায় না, যদি আবার শরীর খারাপ করে?

সেই কারণে নিধি চুপ করে রইল। গহন বুঝলো মেয়েটা কেন চুপ করে গেল হঠাৎ করে। অনেক কথা জমে আছে নিধির মনে। তবে এখন সেসব কিছুই বলতে পারছে না। কেননা এখন কথার সাথে কান্নারাও ঠেলে বেরিয়ে আসতে পারে।

গহন আলতো করে নিধির কপালের সাথে নিজের কপাল ঠেকিয়ে পরম আবেশে চোখ দুটো বন্ধ করে বলল,

“অনেকগুলো দিন পর আবার তোমাকে এমনভাবে নিজের পাশে পেলাম। তাই আজ আমার পাশেই থাকো। আর কোনো কাজ করো না, কেমন?”

নিধিও কেন যেন আর আপত্তি করল না। সঙ্গে সঙ্গে গহনের কথায় সায় দিল।

“ঠিক আছে। থাকবো আপনার পাশে। যতক্ষণ আপনার প্রয়োজন, যতদিন আপনার প্রয়োজন থাকব আপনার কাছে।”

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প