হাসপাতালের রিসিপশনে তখন জারা পেমেন্ট করছে। হন্তদন্ত পায়ে সেখানে প্রবেশ করল আবিদ। গহনকে যে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে সেটাই সে জানতেও পারত না, যদি না সকালে গহনের সাথে দেখা করার জন্য ওর অফিসে যাওয়ার পর সেখানে বাদলের সাথে দেখা হতো।
রিসিপশনে জারা কে দেখে আবিদ সেদিকে এগিয়ে গিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল,
“জারা, গহন কোথায়? কেমন আছে এখন?”
পরিচিত একটা কণ্ঠস্বর পেয়ে জারা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই রিসিপশনে বসে থাকা মেয়েটা বলে উঠলো,
“ম্যাম, এখানে তো দুই হাজার টাকা কম আছে।”
প্রথম দফায় জারা খানিকটা চমকে উঠলো। পরক্ষণেই আবার নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে অপরাধী গলায় বলল,
“ওহ্! আই এম রিয়েলি সরি। আমি দিচ্ছি।”
কথাটা বলে জারা ব্যাগ থেকে চারটে এক হাজার টাকার নোট বের করে মেয়েটার দিকে বাড়িয়ে দিল। মেয়েটা জোরপূর্বক ঠোঁটে হাসি বজায় রাখার চেষ্টা করে বলল,
“ম্যাম, দুই হাজার চেয়েছি। এখানে চার হাজার আছে।”
জারা কি বুঝল কে জানে। ব্যাগের ভেতর থেকে আরেকটা এক হাজার টাকার নোট বের করে সবগুলো নোট মেয়েটার দিকে বাড়িয়ে দিল। মেয়েটা আসলে এবার কি বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। হা করে তাকিয়ে রইল।
আবিদ বুঝতে পারল জারার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। জারার হাত থেকে টাকাগুলো নিয়ে দুটো এক হাজার টাকার নোট রিসিপশনের মেয়েটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে জারা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“মাথা গেছে নাকি আপনার? পিএইচডি করা একটা মেয়ে সামান্য দুই হাজার টাকার হিসাব ভুল করছে কেন? কি যে করেন না।”
কথাটা একটু জোরে জোরেই রিসিপশনের মেয়েটাকে শুনিয়ে বলল আবিদ। যেন মেয়েটা আবার জারা কে মূর্খ না ভেবে বসে। তবে জারা কিছু বলল না। রিসিপশনে সব কাজবাজ শেষে গহনের কেবিনের দিকে হাঁটা ধরল।
আবিদ বুঝল জারার সাথে এখন বেশি কথা বলা যাবে না। সেজন্য চুপচাপ ওর পিছনে হাঁটা দিল।
গহনের কেবিনের সামনে তখন নিধি, জুবাইদা, জান্নাত, সিনথিয়া আর সালমা বেগম বসে আছেন। গহনের অবস্থা এখন আগের থেকে একটু ভালো। এখন তেমন একটা ঝুঁকি নেই। তবে দেখা করতে পারেনি বাড়ির লোকজন ওর সাথে।
আবিদ কে সেই অবধি নিয়ে এসে জারা চলে গেল সেখান থেকে। আবিদ কিছুক্ষণ থাকলো সেখানে। গহনের শরীরের অবস্থা সম্বন্ধে ডাক্তারের সাথেও কথা বলল। প্রায় আধ ঘন্টা মতন থাকার পর অফিস থেকে একটা জরুরী কল আসায় বেরিয়ে যেতেই হলো আবিদকে।
নিচে নামতে নামতে জারাকে খুঁজল। তবে কোথাও দেখতে পেল না। ফোন বের করে একবার জারার নাম্বারে কল করতে গেল। তখনই মনে পড়ল জারা তো ওর নাম্বারটা ব্লক করে রেখেছে। যোগাযোগ করবেই বা কি করে?
একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলল আবিদ। যে যে জায়গা থেকে ব্লক করা সম্ভব সেই সমস্ত জায়গা থেকে আবিদ কে ব্লক করে রেখেছে মেয়েটা। ফলস্বরূপ আবির যোগাযোগ করার মতন কোনো রাস্তাই খুঁজে পেল না।
তবে কেন যেন জারার সাথে একবার দেখা না করে আবিদের যেতে মন সায় দিলো না। মেয়েটার মন খারাপ ছিল। একটু যদি কথা বলে যেতে পারত ভালো লাগতো। অবশেষে খুজতে খুঁজতে জারা কে পেল আবিদ। বাইরে একটা বেঞ্চের ওপর একাই চুপচাপ বসে আছে। পিছন থেকে দেখেই আবিদ চিনতে পারল।
হঠাৎ করে পাশে কেউ ধপ করে বসে পড়ায় জারা খানিকটা চমকালো। ঘাড় কাত করে তাকিয়ে যখন আবিদকে দেখল আবার খুব তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক হয়ে গেল। তবে কিছু বলল না। কয়েক সেকেন্ডের মতন চুপচাপ বসে থাকার পর আবিদ নিজ থেকেই বলে উঠলো,
“আজ আমাকে দেখে বিরক্ত হলেন না যে? ঝগড়াও ও করলেন না।”
জারা কোন উত্তর দিল না। চুপ করে রইল। কিছুক্ষণ জারার উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে আবিদ ফের বলে উঠলো,
“মন খারাপ? কষ্ট হচ্ছে গহনের জন্য?”
“কষ্ট হওয়া স্বাভাবিক নয় কি?”
“হ্যাঁ, অবশ্যই স্বাভাবিক। এমনিতেই তাই জিজ্ঞেস করলাম। আপনার তো আরো বেশি কষ্ট হওয়ার কথা। তবে আপনাকে দেখে সেটা বোঝা যাচ্ছে না। ওদিকে ভাবি তো কান্নাকাটি করে অবস্থা খারাপ করে ফেলেছে। আপনার থেকে ভাবির কষ্ট বোধহয় বেশি হচ্ছে।”
জারা চোখে মুখে খানিকটা বিরক্তিভাব ফুটিয়ে তুলে আবিদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“অদ্ভুত তো! নিধির সাথে তুলনা করছেন কেন? ওর কষ্ট আলাদা। সবার থেকে বেশি কষ্ট নিশ্চয়ই ওরই হচ্ছে। কিন্তু তার মানে এটা না যে ওর কষ্টের সাথে অন্যের কষ্ট কে তুলনা করতে হবে। নিধি গহনের স্ত্রী, বুঝতে পেরেছেন? ওর কষ্ট সব থেকে বেশি। সবার থেকে আলাদা। ওর জায়গা গহনের জীবনে সবার থেকে আলাদা। ও গহনের সবথেকে বেশি আপন।”
“আপনিও তো ওর আপন। কিন্তু আপনি কাঁদছেন না বলে আপনার কষ্টটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।”
জারা কন্ঠে খানিকটা রাগ প্রকাশ করে বলল,
“উদ্দেশ্য কি আপনার বলুন তো? কি চাইছেন আপনি? বারবার কেন আমায় বিরক্ত করতে চলে আসেন? একটু একা থাকতে দিন না আমায়।”
কথাটা বলে জারা সেখান থেকে উঠে চলে যেতে ধরলে আবিদ খুব সাহস করে পিছন থেকে ওর হাত টেনে ধরল। জারা বিস্মিত দৃষ্টিতে আবিদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“হাত টেনে ধরছেন কেন? নিজের ভদ্রতা বজায় রাখুন। হাত ছাড়ুন আমার।”
আবিদ মোটেই হাত ছাড়লো না। বরং একটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে জারা কে আবার নিজের জায়গায় বসিয়ে বলল,
“আমি চাইছি আপনি একটু কাঁদুন। এত যখন কষ্ট হচ্ছে তাহলে কাঁদছেন না কেন? একটু কেঁদে মনের কষ্ট, রাগ গুলো বের করুন। নয়তো মনের মাঝে যে পরিমাণ মেঘ জমেছে একবার যদি বজ্র বৃষ্টি শুরু হয় আপনাকে কিন্তু কেউ বাঁচাতে পারবে না। গহনের জন্য আপনার কতটা কষ্ট হচ্ছে আন্দাজ করতে পারছি। কষ্ট মনের মাঝে চেপে রেখেই কিন্তু গহনের আজ এই অবস্থা। তাই বলছি, একটু কাঁদুন।”
কেন যেন জারা আরেকটু ঝিমিয়ে গেল। অন্যমনস্ক হয়ে বলল,
“আমার ব্যক্তিত্বের সাথে অন্যের স্বামীর জন্য কাঁদা শোভা পায় না। আমার নিজেরই নিজেকে অপমান করা মনে হয়। নিজের চরিত্রের উপর নিজেই আঙুল তুলে ফেলি।”
“অন্যের স্বামীর জন্য কে কাঁদতে বলেছে? গহন তো আপনার মামাতো ভাই। তো সেই মামাতো ভাইয়ের জন্য কাঁদুন।”
“বুঝে ফেলবে সবাই। মামাতো ভাইয়ের জন্য কাঁদা আর এমন কারো জন্য কাঁদা যাকে নিজের সবটা দিয়ে ভালোবেসেছি, এই দুইয়ের মাঝে অনেক পার্থক্য আছে। আমি কাঁদলে সেই পার্থক্য অনায়াসে যে কেউ ধরে ফেলতে পারবে। যেটা আমি চাইনা। অন্যের স্বামীর জন্য কাঁদতে চাই না আমি।”
আবিদ বেশ গা ছাড়া ভঙ্গিতে বলল,
“তবে না হয় নিজের ভালোবাসার মানুষটার জন্যই কাঁদুন। একটু কেঁদে নিন জারা। হালকা লাগবে। জানি আপনার ভালোবাসার মূল্য আপনি পাননি। তাই বলে যে আপনিও আপনার ভালোবাসার মূল্য দেবেন না এমনটা হতে পারে না। একটু কেঁদেই দেখুন। ভালো লাগবে। এখানে তো আশেপাশে পরিচিত কেউ নেই। কেউ দেখবেও না আপনার কান্না। কেউ জানবেও না যে আপনি কেঁদেছেন। মাঝে মাঝে তো দুঃখ রাখার জায়গা এই বিশাল আকাশও পায় না। আর সেখানে আপনি আপনার এই ক্ষুদ্র হৃদয়ের ওপর এত চাপ কেন দিচ্ছেন? এই অসহ্য যন্ত্রণা থেকে নিজেকে মুক্তি দিন এবার।”
হঠাৎ করে জারার কি হলো কে জানে। সামান্য একটু প্রশ্রয় পেয়ে শব্দ করে কেঁদে উঠলো। হঠাৎ করে এভাবে শব্দ করে কেঁদে ওঠায় আবিদ নিজেই যেন হকচকালো। জারা কে এভাবে হাউমাউ করে কাঁদতে দেখে আবিদ নিজেই যেন অবাক না হয়ে পারল না। কত কষ্ট জমে আছে মেয়েটার মনে!
এদিকে আশেপাশ দিয়ে যাওয়া অনেক মানুষই আড়চোখে ওদের দিকে তাকাচ্ছে। কৌতুহলী দৃষ্টি তাদের। আবিদের নিজেরই একটু অস্বস্তি হচ্ছে। কে জানে কে কি ভাবলো।
গরম লাগার কারণে গায়ের কোটটা অনেকক্ষণ আগেই খুলে হাতে রেখেছিল আবিদ। সেই কোটটা জারার মাথার উপর রাখলো। মূলত ওর মুখটা ঢেকে দিল। যেন কেউ বুঝতে না পারে যে জারা কাঁদছে।
জারা মোটেই বাধা দিল না আবিদ কে। বরং ওর যেন কাঁদতে আরো সুবিধা হলো। ফলস্বরুপ কান্নার বেগ আরো বাড়লো।
মেয়েটা যে ঠিক কতটা সময় এভাবে কেঁদে গেল তার কোন হিসেব নেই। আবিদও চুপচাপ বসে রইল। ভুলে গেল গুরুত্বপূর্ণ কাজ, ভুলে গেল সমস্ত ব্যস্ততা। শুধু মনে হলো এখন এই মেয়েটার পাশে একটু থাকা দরকার।
___________
সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেছে তবুও এখনো কারো পেটে কিছু পরেনি। নিধি তো মূর্তির মতন চুপচাপ বসে আছে। এখনও কাঁদছে। যদিও ডাক্তার বলেছে এখন ভয়ের কিছু নেই। তবুও নিধির ভয় হচ্ছে।
বারবার শুধু চোখের সামনে গতকাল রাতে গহনের কাতরানোর দৃশ্যটা ভেসে উঠছে। গহন যখন ব্যাথায় ছটফট করছিল সেই দৃশ্যটা বারবার ভেসে উঠছে। আর বুকটা মোচড় দিয়ে উঠছে। মনে হচ্ছে না জানি কতই কষ্ট হচ্ছিল গহনের তখন। কিন্তু নিধি কিছুই করতে পারেনি। গহনের কষ্ট একটুও কমাতে পারেনি।
এমন সময় নার্স এসে জানালো যে বাড়ির লোকজন দেখা করতে পারবে গহনের সাথে। সঙ্গে সঙ্গে বসা থেকে সালমা বেগম আর নিধি একযোগে উঠে দাঁড়ালো। তবে এত মানুষ একসঙ্গে যেতে পারবে না। এক এক করে দেখা করতে যেতে হল। এবং নার্স জানালো রোগী নাকি নিজের ওয়াইফের সাথে আগে দেখা করতে চেয়েছে।
নার্সের মুখ থেকে কথাটা শুনে সালমা বেগম আবার নিজের জায়গায় বসে পড়লেন। নিধি কোন দিকে তাকানোর মতো অবস্থাতেও নেই। দৌড়ে গহনের কেবিনে ঢুকে গেল।
গহন তখন চোখ দুটো চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। দূর থেকে গহনের চেহারাটা দেখে নিধির মনে হলো ওর শরীরটা না জানি কত ক্লান্ত। এই কয় ঘন্টার ব্যবধানে চোখ মুখ যেন শুকিয়ে গেছে। চেহারায় একটা অসুস্থতার ছাপ বসে গেছে।
ইতোমধ্যে নিধির দুচোখ জলে ভরে উঠেছে। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল গহনের দিকে। ধীরে ধীরে নিধির কান্নার বেগ বাড়ছে। এক পর্যায়ে ফোঁপানোর শব্দ পেয়ে গহন চোখ মেলে তাকালো। নিধিকে নিজের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঠোঁটে আলতো হাসি ফুটে উঠলো।
নিধি জানে গহনের এখন যেন হাসতেও ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। তবুও নিধি যেন ভয় না পায় সে জন্য জোর করে হাসছে। এখানেও ছেলেটা অন্যের কথা ভাবছে, নিজের কথা ভাবছে না। নিজের সুবিধা অসুবিধা ভাবছে না।
গহন ক্রন্দনরত নিধির মুখের দিকে তাকিয়ে আলতো হেসে বলল,
“দেখেছো, বলেছিলাম না ছেড়ে যাবো না? আমার কথা রেখেছি। আমি যাইনি তোমায় ছেড়ে। তোমার ভালোবাসার লোভে যেতে পারলাম না। আবার ফিরে এসেছি। তোমার ভালোবাসার লোভে ফিরে এসেছি।”
নিধি এবারে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। গহন মোটেই অবাক হলো না। একটু অস্থিরও হতে দেখা গেল না। নিধি এভাবে কাঁদবে এটাই স্বাভাবিক।
গহন নিজের কাঁপা কাঁপা হাতটা তুলে নিধির দিকে বাড়িয়ে বলল,
“একবার আমার হাতটা ধরো না! তুমি হাত ধরলে ভরসা পাই। তুমি হাত ধরলে বেঁচে থাকার ইচ্ছে জাগে। একবার ধরো না আমার হাতটা নিধি!”
নিধির কান্নার বেগ আরো বাড়লো। চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“ধরবো না। আমি আপনার হাত একটুও ধরবো না। আপনাকে আর কখনো ভালোও বাসবো না, জড়িয়েও ধরবো না। আপনি…আপনি খুব খারাপ। আপনি আমার কথা একটুও ভাবেননা। আপনি স্বার্থপরের মতন চলে যেতে চেয়েছিলেন আমাকে একা ফেলে। আমাকে এত স্বপ্ন দেখিয়ে সেই একটা স্বপ্নও পূরণ না করে আপনি চলে যেতে চেয়েছিলেন। আপনি খুব খারাপ। আপনি আমায় একটুও ভালোবাসেন না। আপনার জীবনে আমার কোন গুরুত্বই নেই। যদি আপনার জীবনে আমার কোন গুরুত্ব থেকে থাকত, আপনি যদি আমায় সত্যিই ভালোবেসে থাকতেন তাহলে আমার কথা ভাবতেন। এভাবে অসুস্থ হয়ে পড়তেন না আজেবাজে চিন্তা করে। কিন্তু আপনার জীবনে আমার কোন গুরুত্বই নেই। আপনি সবসময় শুধু অন্যদের কথা ভাবেন। না আপনি নিজের কথা ভাবেন, না আপনি আমার কথা ভাবেন। আপনি খুব খারাপ। আপনার সাথে আমি আর কখনো কথা বলবো না।”
গহন চুপচাপ নিধির করা অভিযোগগুলো শুনে গেল। নিধির অভিযোগ করা শেষ হতেই বলল,
“তোমার সব অভিযোগ মাথা পেতে নিলাম। একবার সুস্থ হতে দাও। তোমার একটা অভিযোগও আর রাখব না। এবার থেকে শুধু আমার আর তোমার কথা ভাববো।”
“লাগবেনা আমার কথা ভাবা। আমি কে হই আপনার যে আমার কথা ভাববেন? আমি তো কেউ না। আমি তো পর। আমি তো আপনার জীবনে কয়েক দিন হলো এসেছি। আমার আর কি গুরুত্ব আছে? আমার কি হলো না হলো তাতে আপনার কি যায় আসে? স্বার্থপরের মতন তো চলে যেতে বসেছিলেন। অসভ্য লোক একটা। আপনার জীবনে বউয়ের কোনো গুরুত্ব আছে নাকি? মা মা করে জীবনটা শেষ করে দিলেন। অথচ আপনাকে সব থেকে বেশি ভালোবাসি আমি। সেই আমার কথা আপনি ভাবেননি। আপনি একটা চরম পর্যায়ের স্বার্থপর লোক। আপনার সাথে আমি কথাই বলবো না কখনো। আপনার সাথে আমি আপনার বাড়িতেও যাব না। আপনি যান আপনার বাড়ি। আমি আপনার হাত ধরবো না, আপনাকে ভালোও বাসবো না, জড়িয়েও ধরবো না।”
“খুব বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছি, তাই না?”
নিধি সঙ্গে সঙ্গে কোন উত্তর দিতে পারল না। একটু বিরতি নিয়ে বলল,
“আপনি জানেন কালকে আপনাকে ওই অবস্থায় দেখে আমার কত কষ্ট হচ্ছিলো? আমি কত চিন্তায় আছি জানেন? কাল থেকে আমি কান্না থামাতে পারিনি। আমার শুধু মনে হচ্ছিল আমার সব শেষ হয়ে গেল। আমার শুধু মনে হচ্ছিল আমি আপনাকে আর পাবোনা। আপনাকে হারিয়ে ফেললাম আমি। স্বপ্ন ভাঙার যন্ত্রণা আপনি বোঝেন? কাছের মানুষ হারানোর বেদনা আপনি বোঝেন? বোঝেন না। যদি বুঝতেন তাহলে আমাকে এই কষ্ট গুলো আপনি দিতেন না। আপনি খুব খারাপ, গহন। আমি আপনার সাথে আর কখনো কথা বলবো না। আমি আপনাকে আর কখনো ভালোবাসবো না।”
কথাগুলো বলে নিধি আবারও কাঁদলো। বাচ্চাদের মতন ঠোঁট উল্টালো। অসহায়ের মতন কাঁদলো। গহনের এবারে সত্যি অপরাধবোধ কাজ করল। মেয়েটাকে এতটা কষ্ট দেওয়া উচিত হয়নি। যাদের কাছে গহনের কখনো মূল্য ছিল না, যারা গহন কে ভালোই বাসতে পারেনি তাদের জন্য এই মেয়েটাকে এত কষ্ট দিয়ে ঠিক করেনি।
কিছুটা সময় কাঁদতে দিল আগে মেয়েটাকে। তারপরে গহন একটু উঠে বসার চেষ্টা করতে ধরলে নিধি ধমকে উঠে বলল,
“আবার উঠে বসছেন কেন? শুয়ে থাকতে কি সমস্যা?”
গহন আর ওঠার চেষ্টা করল না। শুয়ে থেকেই নিধিকে বলল,
“জানো নিধি, গতকাল যখন বুকে প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছিল বারবার শুধু একটা কথাই মনে হচ্ছিল। আমার কিছু হয়ে গেলে তোমার কি হবে? মনে হচ্ছিল তোমাকে কে দেখবে? তোমার পাগলামি কে সহ্য করবে? তোমার এত বকবক কে শুনবে? বারবার মনে হচ্ছিল তোমার অযথা রাগ কে সহ্য করবে? তোমার যত্ন কে করবে? অযত্নে তো তুমি ভালো থাকবে না। তারপর থেকে যতক্ষণ জ্ঞানে ছিলাম বারবার শুধু আল্লাহকে ডেকেছি আর বলেছি যেন শুধু তোমার জন্য আমার জীবনটা ভিক্ষে দিয়ে যান। আল্লাহ রেখেছেন আমার কথা। আর কষ্ট পেও না। আর কেঁদো না। আমাকে একবার জড়িয়ে ধরো না কাছে এসে! আমাকে হারিয়ে ফেলার ভয় তোমাকে কতটা তাড়া করেছিল জানিনা। তবে তোমার সঙ্গ হারিয়ে ফেলার ভয় আমাকে খুব তাড়া করেছিল। একবার একটু জড়িয়ে ধরো না আমায়, নিধি! তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই। আমাকে আরেকবার আপন করে নাও। একটু ভালোবেসে আমার বুকের অসহ্য যন্ত্রণাটা কমিয়ে দাও।”
এমন করুণ আবদারের পর নিধি কি আর অভিমান করে থাকতে পারে গহনের উপর? কক্ষনো না। মেয়েটা তো অভিমান থেকে কথাগুলো বলছিল। নয়তো গহন কে একটু জড়িয়ে ধরার ইচ্ছে তো কখন থেকে মনের মাঝে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। ছুটে গিয়ে দুহাতে গহনের গলা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল,
“আর কখনো যদি আমাকে এমন কষ্ট দিতে চান তাহলে আমি সত্যি আর কোনদিন কথা বলবো না আপনার সাথে। আমাকে যদি আর কখনো এমন ভয় দেখিয়েছেন না, দেখবেন আমি সত্যি হারিয়ে যাব। আপনার থেকে অনেক দূরে চলে যাবো। যত দূরে চলে গেলে আপনি আর কখনো আমায় খুঁজে পাবেন না।”
এতক্ষণে যেন গহন শান্তি পেল। মেয়েটা রাগ করুক, অভিমান করুক, ত্যাড়া কথা শোনাক তবুও যেন এই মেয়েটার বুকের মাঝে আশ্রয় পেলে গহন একটু শান্তি পায়। কতক্ষণ পরে না জানি আবার শান্তি পেল। আলতো করে নিধির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“আর কষ্ট দেবো না তোমায়। অনেক কষ্ট দিয়েছি। আমার জঘন্য অতীত কে আর আমাদের বর্তমান নষ্ট করতে দেব না। এবার আমাদের একটা শান্তির সংসার হবে দেখো। যে সংসারে থাকবে শুধু তুমি, আমি আর আমাদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।”