বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৭১

🟢

রাতে গহনরা আবিদের বাড়িতে ছিল। আপন বলতে গহনের এক আবিদই আছে। কবরীরা থাকতে পারে সেই সন্দেহে আর জুবাইদার বাড়িতে আসা হয়নি।

তবে সকাল সকাল জুবাইদার কল গেছিল গহনের কাছে। সালমা বেগম ওনার বাড়িতে চলে এসেছেন। বলছেন জুবাইদা নাকি গহন কে লুকিয়ে রেখেছে। কিংবা এও হতে পারে যে জুবাইদা গহনকে ওর মায়ের সাথে দূরে কোথাও পাঠিয়ে দিয়েছে।

শেষে বাধ্য হয়ে গহনকে আবার আসতে হলো জুবাইদার বাড়ি।

কলিংবেল বাজতেই সালমা বেগম লাফ দিয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। হঠাৎ করে তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন,

“গহন এসেছে।”

জুবাইদা কোন উত্তর দিলেন না ওনার কথার। জান্নাত কে ইশারা করলেন গিয়ে দরজা খুলে দেওয়ার জন্য। সালমা বেগমের আন্দাজ ভুল না। গহনই এসেছে।

গতকাল রাতে সালমা বেগম কি কি ঘটিয়েছেন সেই সব ভুলে গেলেন। এমন ভাব দেখালেন যেন পরিস্থিতি খুবই স্বাভাবিক। গহনের উনি অবধি হেঁটে আসা পর্যন্ত ওনার তর আর সইলো না। নিজেই এগিয়ে গেলেন গহন এর দিকে। গহনের গালে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদূরে গলায় বললেন,

“সারারাত তুমি কোথায় ছিলে, বাবা? আমি কত চিন্তায় ছিলাম জানো? আমি সারারাত ঘুমোতে পারিনি তোমার চিন্তায়। খালি মনে হচ্ছিল আমার ছেলেটা না জানি কোথায় আছে।”

গহন সালমা বেগমের হাতটা সরিয়ে দিয়ে যথাসম্ভব শান্ত গলায় বলল,

“কেন বেরিয়ে এসেছিলাম সে কথা কি ভুলে গেছো? তোমাদের কারো সাথে কোন ধরনের যোগাযোগ রাখবো না বলেই কিন্তু আমি বেরিয়ে এসেছিলাম। সকাল হতে না হতেই আবার আমার জন্য এত ব্যস্ত হয়ে পড়ার মানেটা কি?”

সালমা বেগম কিছুক্ষণ আগে হা করে তাকিয়ে থাকলেন গহনে মুখের দিকে। তারপরে হঠাৎ করে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। ভ্যাবাচ্যাকা খেলো গহন। নিধি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ওনার নাটক দেখছে। ওদের আরেকটু অবাক করে দিয়ে সালমা বেগম দুহাতে গহনকে জড়িয়ে ধরে ক্রন্দনরত গলায় বললেন,

“আমার ভুল হয়ে গেছে, বাবা। আমায় ক্ষমা করে দাও। আমি আর কখনো এমন করবো না। তুমি ফিরে চলো আমার সাথে। তুমি আমার সাথে থাকবে। এই মেয়ে যেখানে ইচ্ছে সেখানে যাক। তুমি কেন ওর কথা শুনে আমাদের ছেড়ে চলে আসবে? আমি তো তোমার মা, আমি তোমায় ভালোবাসি। তুমি ছেলে হয়ে মাকে ছেড়ে চলে যাবে? আমি তোমায় কথা দিচ্ছি আমি আর কখনো এমন করবো না। তুমি ফিরে চলো।”

উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষ হতবাক হয়ে গেল সালমা বেগমের এই রুপটা দেখে। গিরগিটিও বোধহয় এত তাড়াতাড়ি রং বদলায় না ঠিক যতটা তাড়াতাড়ি সালমা বেগম নিজের রং বদলায়।

গহন কি বলবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। তবে গহন এতোটুকু তো নিশ্চিত যে ওই বাড়িতে আর ফিরে যাবে না। গহন জানে এই সবই সাময়িক সময়ের অনুশোচনা। এমন বহুবার হয়েছে।

সালমা বেগমকে ছাড়াতে চাইলো গহন নিজের থেকে। আর ঠিক তখনই ওর কানে ভেসে এলো একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর।

এক মেয়েলী কন্ঠস্বর জুবাইদাকে ওনার নাম ধরে ডাকলেন। কেন যেন গহনের কন্ঠটা চিনতে ভুল হলো না। আবার নিশ্চিতও হতে পারল না। ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকালো। গহনের সন্দেহ ভুল না তাহলে। কবরীই আর জামিল হোসেন দাঁড়িয়ে আছে।

বাড়ির পরিস্থিতিটা যে খুব একটা সুবিধার না সেটা কবরী বুঝতে পারলেন। আসলে ওনারা এসেছিলেন জুবাইদার থেকে বিদায় নিতে। আজ রাতের ফ্লাইটেই ওনারা আবার চলে যাচ্ছেন। সেজন্য মূলত দেখা করতে এসেছিলেন।

কবরীর, সালমা বেগম কে কখনো দেখার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। তবে সালমা বেগমের চিনতে ভুল হলো না কবরীকে। দেখেছিলেন তিনি কবরীর ছবি।

কবরীকে ভিতরে আসতে দেখে সালমা বেগম শক্ত করে খামচে ধরলেন গহনের বাহু।

জুবাইদা এগিয়ে এসে ওনাদের জিজ্ঞেস করল,

“তোমরা এখন এখানে?”

“আসলে চলে যাচ্ছিলাম তো। তাই ভাবলাম তোমার সঙ্গে একবার দেখা করেই যাই। ভালোই হলো এসে। গহনের সাথেও শেষবারের মতন দেখা হয়ে গেল।”

কথাটা বলে কবরী গহনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“গহন, ভালো আছো বাবা?”

গহন কোন উত্তর দেওয়ার আগেই সালমা বেগম বলে উঠলেন,

“নিশ্চয় ভালো আছে। কেন ভালো থাকবে না? গহন ওর মায়ের সাথে থাকে। আর মায়ের সাথে থাকলে কোন সন্তানই খারাপ থাকতে পারে না। আর আমার ছেলের খোঁজ বাইরের মানুষের নেওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। গহন, চলো এখান থেকে। আমরা থাকবো না। আমরা বাড়ি ফিরে যাব।”

সালমা বেগম গহন কে টেনে নিজের সাথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। তবে গহন গেল না। গম্ভীর গলায় বলল,

“আমি কিংবা নিধি, কেউই আর ওই বাড়িতে ফিরে যাবো না, মা। তুমি ফিরে যাও। প্রয়োজনে আমি তোমাকে ও বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েও আসতে পারি। কিন্তু আমরা যাব না।”

গহনের মুখ থেকে মা ডাকটা শুনে এতক্ষণে কবরী বুঝতে পারলেন যে এই মহিলাটা আসলে কে। বড্ড আফসোস হলো কবরীর।

গহন ওনার পেটের সন্তান। অথচ ওনাকে মা বলে ডাকে না। সৎ মা কে মা বলে ডাকে। উনি ভাবলেন তাহলে না জানি কতই ভালোবাসা দিয়েছেন সালমা বেগম গহন কে!

এদিকে গহনের কথা মানলেন না সালমা বেগম। জেদ দেখিয়ে বললেন,

“তুমি আমার সাথেই ফিরবে। আমি তোমাকে এখানে রেখে কোথাও যাবো না। আমি তোমাকে এখানে রেখে যাবো আর এই মহিলা তোমাকে দুর্বল বানিয়ে দেবে? আমার এত বছরের কষ্ট সব বিফলে যাবে? আমার এত বছরের আদর ভালোবাসা তোমার নিজের মায়ের ভালোবাসার কাছে চাপা পড়ে যাবে এটা আমি হতে দেব না।”

শুরু থেকেই নিধি চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। কেননা জানে ও কথা বললে সালমা বেগম আরো বেশি রেগে যায়। আর নিধি চাইছিল শান্তি পূর্ণ ভাবে সবটা করতে। তবে এবারে আর চুপ থাকা গেল না। রাগান্বিত গলায় বলে উঠলো,

“ওনার মায়ের ভালোবাসায় গলে যাওয়ার হলে গতকালই উনি গলে যেতে পারতেন। কথা বোঝেন না কেন আপনি যে আমরা শুধুমাত্র ওনার সাথে দেখা করার জন্য এসেছিলাম? সারা জীবন ওনার সাথে থেকে যাওয়ার জন্য আসিনি। দয়া করে ছেড়ে দিন গহনের পিছু। একটু বাঁচতে দিন শান্তি মতো ওনাকে।”

সালমা বেগম নিধিকে পাত্তাই দিলেন না। উনি বারংবার গহনকে জোড়াজুড়ি করলেন। গহনের হাত ধরে টানাটানি করলেন।

কবরীর কেন যেন ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত লাগছে। সালমা বেগম সম্বন্ধে উনি কারো কাছ থেকে কিছুই শোনেননি কখনো। কি ভেবে যেন কবরী চুপ থাকতে পারলেন না। সালমা বেগমকে বলে উঠলেন,

“আপনি এমন করছেন কেন গহনের সাথে? ও তো ছোট বাচ্চা না। তাছাড়া আমি আজ চলেই যাচ্ছি। এখানে থেকে আপনার ছেলের উপর অধিকার ফলাতে আসিনি আমি।”

সালমা বেগমের এতক্ষণে জমে থাকা সমস্ত রাগ এবারে কবরীর উপরে পড়লো। গহন কে ছেড়ে কবরীর দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে হিংস্র গলায় চিৎকার করে উঠে বললেন,

“কেড়ে নিবি না তাহলে এসেছিস কেন? সঙ্গে করে যখন তোর নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে নেই তাহলে আমার ছেলেকে পর বানিয়ে দিয়ে গেলি কেন? তোর যখন ইচ্ছে হবে তুই ওকে ছেড়ে রেখে যাবি, আমি ওকে আদর যত্ন দিয়ে পালব। আর দুদিন পর ফিরে এসে তুই আবার ওকে পর বানিয়ে দিবি? তুই একেবারে ম রে তারপর ফিরলি না কেন দেশে? কেন তোর এই মুখটা দেখিয়ে গহন কে পর বানিয়ে দিলি?”

উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষ হকচকালো। গহন তাড়াহুড়ো করে সালমা বেগমের দুই বাহু ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করিয়ে শাসিয়ে বলল,

“মা, চুপ করো। উনি অসুস্থ। আর ওনার কোন প্রভাব আমার ওপরে পড়েনি। তুমি আমাকে হারিয়েছো তোমার দোষে।”

সালমা বেগম এক ঝটকায় নিজের বাহু থেকে গহনের হাতটা সরিয়ে দিয়ে বললেন,

বিজ্ঞাপন

“সব দোষ আমার? সবসময় শুধু দোষ আমিই করি তাই না? তোমার মা, বউ, বাপ, দাদী কেউ কোন দোষ করে না। তোমার জন্য আমার জীবন শেষ হয়েছে। তোমার জন্য আমি আমার জীবনে সুখ-শান্তি সবকিছু ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছি। না স্বামীর ভালোবাসা পেয়েছি, না শ্বশুর বাড়ির লোকজনের ভালোবাসা পেয়েছি, আর না একটা সংসার হাতে পেয়েছি। সতীনের ছেলেকে মানুষ করেছি আমি। এর জন্য হলেও তো কৃতজ্ঞতা থাকা দরকার তোমাদের। আমি যদি মানুষ না করতাম কি হত তোমার একবার ভেবে দেখেছো? আমার সুখ শান্তি সব খেয়ে নিয়েছ। তারপরও কোন কৃতজ্ঞতা বোধ নেই? আজ নাড়ির টান দেখাচ্ছ আমায়? আর নিধি, এই দুদিনের মেয়ের জন্য আমাকে রেখে বাড়ি ছাড়লে তুমি? এই দুদিনের মেয়ের জন্য আমাকে কথা শোনাচ্ছো? কিচ্ছু থাকবে না তোমার আমি বলে দিলাম। তোমার ঘরবাড়ি, বউ, সংসার, মা কিচ্ছু থাকবে না। তোমাকে ঘুরেফিরে আমার কাছেই আসতে হবে। শুধুমাত্র আমার অনুগ্রহে থাকতে হবে তোমায়। তুমি শুধু আমার ভালোবাসাই পাবে।”

বরাবর গহন যা করে এখনো তাই করল। হজম করে নিল সালমা বেগমের বলা কথাগুলো। গহনের জন্য উনি যা যা হারিয়েছেন সেসব তো বলবেনই। সেই সাথে গহন এটাও খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে যে নিধিকে এবার আটকানো মুশকিল হয়ে যাবে। সে জন্য ওকে কিছু বলার সুযোগই দিতেই চাইলো না। তার আগেই নিধির হাত ধরে বলল,

“চলো।”

গহন কথাটা বলে নিধিকে টেনে নিয়ে যেতে ধরেছিল। তবে সালমা বেগম যেতে দেবেন না। গহনের হাত টেনে ধরে সমানে সেই একই কথাগুলো বলে যাচ্ছেন। গহন কিভাবে ওনার জীবন শেষ করেছে, উনি গহনের জন্য কি কি করেছেন, কতটা অনুগ্রহ করেছেন সেসবই বললেন।

উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষ বিস্ময়ে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছে।

গহন একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি। এমনকি নিধিও শুধু হা করে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ করেই গহনের দৃষ্টি গেল কবরীর উপরে। যিনি ছল ছল চোখে তাকিয়ে আছেন গহনের দিকে।

গহন অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কবরীর দিকে। ছেলের সেই অসহায় দৃষ্টি কবরীকে খুব ভালোভাবে জানান দিল যে ওনার অন্যায়ের ভারটা ঠিক কতটা ছিল। ঠিক কোন পরিস্থিতির মাঝে গহন ছিল, কোথায় গহন কে ফেলে রেখে গিয়েছিলেন সেটা যেন আজ প্রথম তিনি এতটা গভীর ভাবে আন্দাজ করতে পারলেন।

ক্রন্দনরত গলায় গহন কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“এই পরিস্থিতির মাঝে ফেলে রেখে গিয়েছিলাম তোমাকে আমি? ওনার সাথে এত বছর ধরে আছো তুমি, যে কথায় কথায় তোমাকে খোঁটা দেয়? তুমি কি করে এত বছর থাকলে? কেন ওনার সাথে থাকলে, বাবা? উনি তো মানসিকভাবে অসুস্থ।”

বেশ অনেকটা সময় ধরে চুপ ছিল গহন। এতক্ষণ তো নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছিল কবরীর দিকে। কবরীর প্রশ্নগুলো শুনে গহনের ভেতরে জমে থাকা সব রাগ, অভিমান, দুঃখ, কষ্ট যেন বেড়িয়ে আসতে চাইলো।

সালমা বেগমকে ঠেলে নিজের সামনে থেকে সরিয়ে দিল। কবরীর দিকে এগিয়ে এসে ওনার চোখে চোখ রেখে বলল,

“এতোটুকু দেখেই আৎকে উঠলেন? পাঁচটা মিনিটে আপনি বুঝে গেলেন উনি মানসিকভাবে অসুস্থ। তাহলে ভাবুন তো আজ পঁচিশ বছর ধরে কার সঙ্গে দিন কাটাচ্ছি আমি? ভেবে দেখুন তো এর জন্য কে দায়ী?”

কবরী ক্রন্দনরত গলায় বললেন,

“আমি এসব জানতাম না। আমি তো জানতাম উনি ভীষণ ভালো। তোমার যত্ন করে, ভালোবাসে। তোমার বাবা আমাকে তেমনই বলেছিল। এমনকি ওনার সাথেও আমার কথা হয়েছিল। উনি বলেছিলেন যে তোমাকে কতটা ভালোবাসে। বিশ্বাস করো, আমি সেজন্য ভেবেছিলাম তুমি ভালো আছো। আমি নিশ্চিন্তে ছিলাম যে আমার সাথে থাকলে তুমি যতটা ভালো থাকতে ওদের সাথে থেকে তার থেকেও অনেক বেশি ভালো আছো।”

হঠাৎ করে গহনের কি হলো কে জানে। শান্ত মানুষটা ভয়ানক রুপ ধারণ করলো। রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। চিৎকার করে উঠে বলল,

“ওনারা বলল আর আপনি বিশ্বাস করে নিলেন? মা হয়ে একবারও খোঁজ নেওয়ার কোন দায়বদ্ধতা ছিল না আপনার? আপনি আমাকে কোথায় ফেলে রেখে গিয়েছিলেন জানেন? একটা জা হা ন্না মে। আপনারা সবাই মিলে আমার জীবনটা জা হা ন্না ম বানিয়েছেন। প্রথমে আপনি আমায় জন্ম দিয়ে ছেড়ে চলে গেলেন। তার প্রত্যক্ষ কারণ আমার বাবা হলেও কোনো না কোনোভাবে আমিও জড়িয়ে ছিলাম। তারপরে আমার বাবা এনাকে নিয়ে এলো। উনি ওনার জীবন নষ্টের জন্য আমাকেই দায়ী করেন। আপনি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। আর এনার সাথে থাকতে থাকতে আমার বাবার অতিরিক্ত ভালোবাসা দেখাতে গিয়ে এনার চোখের বি ষে পরিণত হলাম।”

“তাই বলে এমন আচরণ করবে? উনি তোমার জন্য যা করেছেন সেগুলো নিয়ে খোঁটা দেবে?”

গহন নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

“বেশ করেছে খোঁটা দিয়ে। আপনার সমস্যা আমায় সামান্য খোঁটা দেওয়া নিয়ে। আমার সাথে উনি আরো কি কি করেছে শুনবেন? আমার শৈশব, কৈশোর, যৌবন সবকিছু কিভাবে শুধুমাত্র আপনার ছেড়ে যাওয়ার জন্য নষ্ট হয়েছে শুনবেন?”

কবরী হা করে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। গহন নিজেই একটা লম্বা শ্বাস টেনে বলল,

“শুনুন, ছোটবেলায় ওনার হাতে ঠিক কতবার চ ড় খেয়েছি আমি নিজেও তার হিসাব জানি না। আমাকে কয় বেলা উনি না খাইয়ে রেখেছেন জানেন? আমার যে মাছ খেতে অসুবিধা হতো সেটা নিশ্চয়ই মনে আছে? আমার পছন্দ না বলে তিনবেলা মাছ দিয়ে খেতে দিত। কতবার যে মাছের কাটা গলায় ফুটেছে তার হিসেব নেই। মাংস রান্না হলেও উনি আমাকে মাছ দিয়ে খেতে দিতেন। আমার খাবারে বি ষও মিশিয়েছিলেন উনি।”

গহনের শেষের বাক্যটা শুনতেই কবরী চমকে উঠে বললেন,

“বি ষ মিশিয়ে ছিল মানে? কি বলতে চাইছো?”

“যা শুনেছেন সেটাই বলতে চেয়েছি। আপনি চলে যাওয়ার দু বছরের মাথায় যখন দাদি মা রা গেল, তারপরে আমার জীবনটা আরো বিষাক্ত হয়ে উঠেছিল। বাবা ব্যবসার কাজে বাড়িতে থাকতে পারতেন না। আমার খাওয়া দাওয়ার সমস্যা তখন আরো বাড়লো। দু-তিন দিনের বাসি খাবার পর্যন্ত উনি আমাকে দিয়েছেন। দিন রাত উঠতে বসতে খোঁটা তো দিতেনই। কতই বা বয়স আমার তখন বলুন তো? ঝড় বৃষ্টির রাতে ভয়ে চুপসে নিজের ঘরে শুয়ে থাকতাম। উনি একটু আমার ঘরে আসতেন না। নিজের ঘরেও যেতে দিতেন না। বাবা থাকলে বাবা আগলে নিত। কত ভয়ংকর রাত আমাকে একা একা কাটাতে হয়েছে জানেন? আমার মা ছিল না আমার পাশে তখন। একদিন খেলার ছলে হঠাৎ করে ওনার ছেলে আঘাত পেয়েছিল। সেই অপরাধে সারারাত উনি আমাকে বাড়ির বাইরে দাঁড় করে রেখেছিল। পা ব্যথা ধরে গিয়েছিল। ঠান্ডায় জমে যাচ্ছিলাম। মশা কামড়াচ্ছিল। কিন্তু আমি চিৎকার করিনি। কেন করব? বাচ্চাদেরকে সব ধরনের বিপদ থেকে মায়েরা আগলে রাখে। আর আমার তো মা নেই। আমি ঝাল খেতে পারি না বলে তরকারিতে সবসময় বেশি করে ঝাল দিতেন। আমার পেট জ্বলত। আমি কাঁদতাম। সেগুলো দেখে উনি হাসতেন। উনি পরের দিন আরো বেশি করে ঝাল দিতেন তরকারিতে। উনি কখনো আমার প্লেটে ভাত বেড়ে দেননি। আমাকে পাশে বসিয়ে খাওয়াননি। স্কুল কলেজে কত না খেয়ে গেছি, অফিসেও না খেয়ে গিয়েছি উনি খোঁজ নেননি। আমি কতবার আমার মৃ ত্যু কামনা করেছি সেইসব জানেন না আপনি।”

কবরী হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল

“আমি এসব কিছু জানতাম না।”

গহনের কন্ঠটা এতক্ষণে অনেকটাই দুর্বল হয়ে এসেছে। এবারে ওর চোখ দুটোও ছলছল করে উঠলো। গহন আজ আবারও দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি হারিয়ে ফেলল। হঠাৎ করে দুই হাঁটু ভেঙে বসে পড়লো। উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষ হা করে গহনের দিকে তাকিয়ে আছে। গহন এবারে কেন যেন নিজেকে সামলাতেই পারল না। পাথরের মত শক্ত মানুষটাও আজ দুর্বল হয়ে পড়ল। কেঁদে উঠে বলল,

“কি করে জানতে? আমার খোঁজ নেওয়ার সময় ছিল নাকি তোমার কাছে? জানো, তুমি চলে যাওয়ার পর সবাই আমাকে দেখে বলতো আমার মা আমাকে ছেড়ে পালিয়ে গেছে। চলে গেছে আমায় ছেড়ে। বলতো, ওই ছেলেটার মা নেই। স্কুল কলেজে যে কোন অনুষ্ঠানে সবার সঙ্গে তাদের মায়েরা থাকতো। আর আমি একটা কোনার দিকে চুপচাপ একটা চেয়ারে বসে থাকতাম। আর আমার সৎ মা নিজের ছেলে মেয়েদের নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিতেন যে ওনার তিন ছেলে মেয়ে। কিন্তু আমার কোন পরিচয় ছিল না। আমার কোন মা ছিল না। আমি অসুস্থ হলে তুমি চলে যাওয়ার পর কেউ আর যত্ন করেনি। উনি একটু ভালোবাসেননি, ওষুধ খাওয়াননি, মাথায় হাত বুলিয়ে দেননি। সারাক্ষণ ওনার সেই একই কথা শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত। সারাটা জীবন আমার এটা শুনতেই পেরিয়ে গেল যে আমি ওনার জীবন নষ্টের জন্য দায়ী। আমার জন্য উনি কখনো সুখী হতে পারেননি। জানো মা, আজ কয়েক বছর হলো উনি আমার মৃ ত্যু কামনা বন্ধ করে দিয়েছেন। নয়তো আগে ছোটখাটো যে কোন কথাতেই বলতো তুই ম রি স না কেন। তোর মায়ের সাথে তুই চলে গেলি না কেন। হয় তুই ম র নয়ত আমাকে মে রে ফেল। আমি বাবার কাছে অভিযোগ নিয়ে কখনো যেতে পারিনি। কারণ জানতাম, তাহলে ওনার অত্যাচার আরো বাড়বে। আমি তোমাকে খুঁজতাম, মা। কিন্তু কই তুমি তো ছিলে না। ভয় পেয়ে কান্না করে আমি আমার মায়ের কোলে লুকোতে চাইতাম। কিন্তু আমি তোমায় পাইনি। সত্যিই আমি ওনার জীবন নষ্টের জন্য দায়ী। যেখানে আমার নিজের মা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, আমার নিজের মায়ের কাছে আমি বেশি হয়ে গিয়েছিলাম সেখানে সৎ মায়ের থেকে কি আশা করব বলো?”

উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষের চোখে জল। গহন যেন আবার সেই ছোট্ট বাচ্চা হয়ে গেছে। আপনি থেকে ডাকটা তুমি তে চলে এসেছে। ঝোকের বশেই মা করে ডাকছে।

নিধি এগিয়ে এসে হাঁটু গেড়ে বসে গহনের কাঁধে হাত রেখে বলল,

“কাঁদবেন না এভাবে। চলুন। থাকব না এখানে।”

গহন এবারে ইশারায় নিধিকে দেখিয়ে কবরী কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“শুধুমাত্র এই মেয়েটা, এই একটা মেয়ে আমায় নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছে। তুমি কোন পরিস্থিতির অজুহাত দাও মা? যেই পরিস্থিতির অজুহাতই দাও না কেন, আমাকে ছেড়ে যাওয়া কি খুবই দরকার ছিল? আমাকে নিয়ে যেতে পারতে না? একবার নিধিকে জিজ্ঞেস করে দেখো তো কোন কোন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গেছে। তবুও ও আমাকে ছাড়েনি। তুমি আমাকে আর একটু বড় হওয়ার সময় দিতে। আমি তো তোমার পাশে দাঁড়াতাম। তা না করে তুমি চলে গেলে। আমার জীবনটা শেষ করে দিয়ে গেলে। বাঁচার ইচ্ছে হারিয়ে ফেলেছি আমি, হাসতে ভুলে গিয়েছি। আমি শুধু একটা কথাই বুঝে উঠতে পারিনি তোমার মায়া হলো না কেন আমার জন্য? আমাকে তো কুড়িয়ে আনোনি। আমি তো তোমার গর্ভের সন্তান। অত মানুষের ভিড়ে একলা ফেলে চলে গেলে? আমার হাতটা ছাড়তে কি তোমার একটুও হাত কাঁপেনি? তোমার বুক কাঁপেনি, মা? তুমি গেলে তো গেলে আমার খোঁজও নিলে না। আমি তো তোমার জীবনেরই একটা অভিশাপ। তাহলে সৎ মায়ের কি দোষ দেব। বরং যথেষ্ট করেছেন আমার জন্য। অনেক ঋণ আমার ওনার প্রতি। আর তোমার প্রতি আমার একটাই ঋণ যে, তুমি আমায় জন্ম দিয়েছিলে। তবে সেই জন্ম দেওয়াটা আমার কাছে অভিশাপ। আচ্ছা মা, যখন ছেড়ে চলেই গিয়েছিলে তাহলে যাওয়ার আগে আমাকে মে রে ফেললে না কেন? আমার জীবনটা ধ্বংস করলে কেন?”

কবরী নিজেও ছেলের সামনে বসে পড়লেন। ক্রন্দনরত গলায় বললেন,

“তোমার সাথে এত কিছু হয়েছে আমি জানতাম না। আমার অন্যায়ের বোঝা অনেক আমি জানি। তবে আমি তোমার খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমি চলে যাওয়ার কয়েক মাস পর তোমার বাবার কাছে ফোন করেছিলাম তোমার খোঁজ নেওয়ার জন্য। ততদিনে তোমার বাবা দ্বিতীয় বিয়েও করে নিয়েছিলেন। বিদেশে আমি নিজে সেটেল হওয়ার পর যোগাযোগ করেছিলাম। তখন আমার ওনার থেকে তোমাকে চাওয়ার মত মুখ ছিল না। কেননা আমি তোমার সাথে যে অন্যায়টা করেছিলাম তারপর তোমার দায়িত্ব আমাকে না দিতে চাওয়াই স্বাভাবিক। আমি অনেকবার খোঁজ নিয়েছি। প্রত্যেকবারই তোমার বাবা বলেছে তুমি ভালো আছো। আমি তোমার সাথে কথা বলতে চাইলে বলত, তুমি আমার সাথে কথা বলতে চাও না। আমি বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছি। কেননা আমার কাছে আর কোন উপায় ছিল না। আমি জোর করতে পারছিলাম না। আমার অপরাধ আমাকে বাঁধা দিচ্ছিল। আমার মনে হচ্ছিল আমি সত্যি তোমাকে আমার কাছে রাখার উপযোগী নই। সেজন্য আমি তোমাকে কখনো আমার কাছে আনতে চাইনি। যদিও আমি জানি এটাও আমার অপরাধ। তবে তোমার বাবা, তোমার সৎ মায়ের সাথেও আমার কথা হয়েছিল। আমি জানতাম তুমি ভালো আছো।”

“ফুপির সাথে তো যোগাযোগ ছিল।”

“সে তো এক বছর ধরে। কত কষ্ট করে জুবাইদার সাথে আমি যোগাযোগ করেছি সেটা তোমায় বোঝাতে পারবো না। তোমার সৎ মার ব্যাপারে কোন কথাই হয়নি। আমি তো শুধু তোমার সাথে কি করে যোগাযোগ করতে পারি সেই নিয়ে ওর সাথে কথা বলেছি।”

গহন একটু থামলো। মাথা তুলে জামিল হোসেনের দিকে তাকিয়ে ওনাকে দেখিয়ে বলল,

“আমার থেকে তুমি এই মানুষটাকে বেশি ভালোবাসতে তাই না? ওনার জন্য আমাকে ছেড়ে গিয়েছিলে?”

কবরী গহনের কথায় তীব্র বিরোধিতা জানিয়ে বললেন,

“না বাবা না। ওর জন্য ছেড়ে যাইনি। দ্বিতীয় সংসার করব বলে আমি ছেড়ে যাইনি। আমি চলে গিয়েছিলাম তার কারণ আমি থাকতে পারছিলাম না ওই সংসারে। আমার নিজের পরিচয় বানাতে চাইছিলাম। আমি স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাইছিলাম। ওই সংসার থেকে বেড়িয়ে আবার বিয়ে করা সহজ ছিল না। আমি মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। দ্বিতীয় বিয়ে তো আমি অনেক পরে করেছি। তোমায় ছেড়ে চলে আসার দীর্ঘ দশ বছর পর আমি আবার একটা নতুন সম্পর্কে জড়িয়েছি।”

গহন কবরীর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে হুহু করে কেঁদে উঠে বলল,

“তাহলে আমায় কেন নিয়ে গেলে না তুমি, মা? কেন আমাকে এই পরিবেশের মাঝে রেখে গেলে? উনি আমার জীবনটা শেষ করে দিয়েছেন। তুমি আমার জীবনটা শেষ করে দিয়েছ। তোমরা সবাই আমার জীবনটা শেষ করে দিয়েছো। তোমরা কেউ কেন আমায় একটু ভালোবাসতে পারলে না? কেন তোমরা সবাই নিজেদের বাকি সন্তানদেরকে ভালোবাসলে কিন্তু আমায় বাসলে না? শুধু আমিই বেশি হয়ে গেছিলাম তোমাদের সবার কাছে? আমি….আমি তো তোমায় খুব ভালোবাসতাম, মা। আমিতো জানতাম তুমিও আমায় খুব ভালোবাসতে। তাহলে চলে গেলে কেন? আমিই কেন বেশি হই তোমাদের সবার কাছে?”

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প