বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৭০

🟢

গহন সরাসরি ওয়াশরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়ে আগে চোখে মুখে পানি দিল। পকেট থেকে রুমালটা বের করে মুখ মুছে নিল। কানে ভেসে এলো দরজার বাইরে থেকে নিধির উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর।

“গহন, ঠিক আছেন আপনি? দরজা বন্ধ করেছেন কেন? শুনতে পাচ্ছেন গহন?”

গহন জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস টেনে আগে নিজেকে স্বাভাবিক করল। তারপরে গিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এলো ওয়াশরুম থেকে। নিধি ফের উদ্বিগ্ন গলায় একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করল।

গহন স্বাভাবিক গলায় বলল,

“আমি ঠিক আছি। এত চিন্তা করো কেন?”

“আমার তো আরো দশ-বারোটা স্বামী আছে যে একটা ম র লে বাকিদেরকে দিয়ে কাজ চলবে। আমার কাছে তো এই একটাই ভাঙাচোরা মাল আছে। চলুন তো এখান থেকে। থাকবো না এখানে। আমি তো ভেবেছিলাম আপনার মায়ের সাথে একটু সামনাসামনি কথা বললে আপনার ভেতরে জমে থাকা কষ্টগুলো বেড়িয়ে আসবে। আপনার ভালো লাগবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ভুল ভেবেছিলাম। অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেদের ম র তে হবে। এখন চলুন। চলে যাব।”

নিধি গহনের থেকে কোন কিছু শুনতেও আর রাজি না। নিজের বলা কথাগুলো শেষ হতেই গহনের হাত ধরে টেনে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে ধরল। দরজার কাছাকাছি যেতেই সামনে এসে কবরী দাঁড়ালেন।

নিধি আর গহন দুজনেই কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠলো। ওদেরকে কেঁপে উঠতে দেখে কোন কারণ ছাড়া কবরী নিজেও একটু কেঁপে উঠলেন। পরক্ষণেই আবার জোরপূর্বক মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে বললেন,

“ভয় পেয়ে গিয়েছিলে নাকি তোমরা?”

গহন তো কোন উত্তর দেবেনা নিধি সেটা খুব ভালো করেই জানে। তাই নিধিই খানিকটা গম্ভীর গলায় বলল,

“না, ভয় পাইনি। যাইহোক আন্টি, আমরা চলে যাচ্ছি। আপনি ভালো থাকবেন। এখানে আর থাকা সম্ভব না।”

নিধি কথাটা বলতেই কবরী এবার তাকালেন গহনের দিকে। গহন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে নেই। কেমন যেন করছে। গহনের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে কবরী নিধিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“মা, তোমার যদি আপত্তি না থাকে একটু গহনের সাথে একা কথা বলতে পারি আমি?”

কবরী কথাটা বলতেই গহন শক্ত করে নিধির হাতটা খামচে ধরল। নিধি বুঝলো যে গহন ওকে ছাড়বে না। নিধি কবরীকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,

“আসলে বুঝতেই তো পারছেন গহনের অস্বস্তি হচ্ছে। আর উনি কথাও বাড়াতে চান না। আমার মনে হয় আপনাদের সাক্ষাৎ এতটুকুর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকা ভালো।”

কবরী তড়িৎ গতিতে অনুনয়ের স্বরে বলল,

“এভাবে বলো না। কিছু তো বলতেই পারলাম না এখনও। কত কথা বাকি আছে।”

“কিন্তু উনি যে শুনতে চাইছেন না। গহন, আপনি কি কথা বলতে চান? চাইলে বলতে পারেন।”

কবরী তাকিয়ে রইলেন গহনের উত্তর জানার জন্য। গহন একটু সময় নিয়ে বলল,

“হুম বলতে চাই। তবে তুমি এখানেই থাকো।”

কবরীর ঠোঁটে আলতো হাসি ফুটে উঠলো। নিধি গেল না ঘর থেকে। শুধু একটু দুরে গিয়ে দাঁড়ালো।

এদিকে কবরী গহনের সাথে কথা বলার জন্য এসেছিলেন ঠিকই। তবে এখন কেন যেন বলার মতন কিছু খুঁজে পাচ্ছেন না। কি দিয়ে শুরু করবেন, কিভাবে কি বলবেন সেসব বুঝে উঠতে পারছেন না। ওনার এসব ভাবনার মাঝেই গহনই আগে বলে উঠলো,

“শরীর কেমন আছে আপনার?”

গহন প্রশ্নটা করতেই কবরী চমকে উঠলেন। ব্যাপারটা ওনার কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। একইভাবে নিধিও চমকালো। সেই সাথে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাসও ফেলল। যাক, ছেলেটার মুখে তাও কথা ফুটেছে।

এদিকে ছেলের মুখ থেকে এই প্রশ্নটা শুনে মুহূর্তের মাঝে কবরীর চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো। তবে তিনি বুঝতে দিতে চাইলেন না সেসব। নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বললেন,

“ভালো আছি, বাবা। তুমি ভালো আছো?”

গহন এবারও বেশ স্বাভাবিক গলায় উত্তরে বলল,

“জ্বী,ভালো আছি।”

আবারো চুপ করে গেল দুজনে। গহনের কাছে বোধহয় জিজ্ঞেস করার মতন এই একটা প্রশ্নই ছিল। কবরী আবারো অপেক্ষা করলেন যে গহন হয়তো কিছু জিজ্ঞেস করবে। তবে না। ওনার সেই অপেক্ষা ফুরোলো না। শেষে অধৈর্য হয়ে বাধ্য হয় নিজেই বলে উঠলেন,

“আমার উপরে তোমার অনেক অভিযোগ জমা হয়ে আছে, তাই না?”

নিধি ভেবেছিল এই প্রশ্নের উত্তরটা দিতে বোধহয় গহনের খুব অসুবিধা হবে। তবে তেমন কিছুই হলো না। ছেলেটা হঠাৎ করে যে কি করে নিজেকে এতটা সামলে নিল কে জানে। কবরীর এই জটিল প্রশ্নের উত্তরটাও স্বাভাবিক গলায় দিল।

“না। কোন অভিযোগ নেই।”

কবরী প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“সত্যি নেই? নাকি অভিমানে, অভিযোগের কথাটা বলতে পারছো না?”

গহন দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“না। সত্যিই নেই। না অভিমান আছে, না অভিযোগ আছে। ঘটনাটা তো আর এক-দুদিনে কিংবা এক-দু বছরের পুরনো না। পঁচিশ বছর পুরনো। সেই স্মৃতিগুলোর ওপরে ধুলো জমে গেছে। এখন আর তেমন একটা কষ্ট হয় না। সেজন্য অভিমান আর অভিযোগ সবই নিঃশেষ হয়ে গেছে।”

এতক্ষণ নিজের ধরে রাখা কান্নাটা এবারে আর সামলাতে পারলেন না কবরী। ডুকরে কেঁদে উঠে অপরাধী গলায় বললেন,

“আমায় ক্ষমা করে দিও, বাবা। আমি জানি আমার মতন স্বার্থপর মা এই পৃথিবীতে আর একটাও নেই। এই পৃথিবীর সব থেকে জঘন্য মা আমি। নিজের স্বার্থের জন্য যে নিজের সন্তানকে ছেড়ে যেতে পারে সে মানুষই না। তুমি পারলে আমায় ক্ষমা করে দিও।”

“কেন ক্ষমা চাইছেন আপনি? আমি বললাম তো কোন অভিযোগ নেই আমার। আর তাছাড়া আপনি ছেড়ে চলে যাওয়ায় আমার তেমন কোন ক্ষতিও হয়নি। আমি দিব্যি বেঁচে আছি। অনেক বড় হয়ে গেছি। নিজেকে অপরাধী ভাবার দরকার নেই। আমরা প্রত্যেকে নিজেদের জীবনে সুখে থাকতে চাই। সেই অধিকার আমাদের সবার আছে। ওই সংসারে আপনার মর্যাদা কেউ দিতে পারেনি। তাই আপনি চলে এসেছিলেন।”

কবরী ক্রন্দনরত গলায় বললেন,

“তোমায় নিয়ে আসা উচিত ছিল। জানো, তখন আর আমার কোন ধরনের ঝামেলায় জড়ানোর বিন্দুমাত্র শক্তি ছিল না। মনে হয়েছিল তুমি তোমার বাবার সাথে অনেক ভালো থাকবে। আমার সাথে থাকলে যতটা ভালো থাকতে তার থেকেও ভালো থাকবে। কেননা ওই বাড়িতে তোমার যত্ন, ভালোবাসার কোন অভাব হবে না। সবাই তোমার কদর করবে।”

“কিন্তু আমার মা ছিল না।”

কবরী আরেকদফা ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন,

“আমায় ক্ষমা করে দাও, বাবা। আমি যদি তোমাকে আমার সঙ্গে নিয়ে আসতাম তোমার বাবা একটা তুমুল অশান্তি বাঁধিয়ে দিত। আমার মাঝে সেসব অশান্তি সহ্য করার ক্ষমতা আর ছিল না। আমি তোমাকে বোঝাতে পারবো না ওই বাড়িতে আমি কোন পরিস্থিতিতে ছিলাম। যদিও আমি জানি এগুলোর কোনটাই আমার অপরাধের বোঝা কম করেনা।”

গহন এবারে আলতো হেসে বলল,

“অপরাধের বোঝা ঝেড়ে ফেলুন। যার জন্য কষ্ট পাচ্ছিলেন তার কোন অভিযোগ নেই আপনার প্রতি। আপনার ইচ্ছে ছিল আমার সাথে দেখা করার, আমার সাথে কথা বলার সেজন্য এসেছি। আমি শুধু আমার দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে চেয়েছিলাম। আমার মনে হয় সেটা আমি করতে পেরেছি। ভালো থাকবেন। নিজের খেয়াল রাখবেন। নিজের মেয়ে আর স্বামীর জন্য হলেও নিজের খেয়াল রাখবেন। আমি তো অনেকদিন আগেই পর হয়ে গিয়েছি। অযথা আর আমার কথা ভেবে কষ্ট পেয়ে নিজের শরীর খারাপ করবেন না। নিজের বর্তমানকে নিয়ে বাঁচুন। ঠিক পচিঁশ বছর আগে যেভাবে আমাকে একা ফেলে রেখে এসেছিলেন, আজ আবারও সেভাবে ফেলে রেখে চলে যান। আপনিও ভালো থাকুন। আমাকেও ভালো থাকতে দিন।”

কথাটা বলে গহন শান্ত দৃষ্টিতে নিধির দিকে তাকিয়ে বলল,

“নিধি, চলো।”

কথাটা বলে গহন আগে আগে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। কবরী আটকাতেও পারলেন না ছেলেকে। নিধির বড্ড আফসোস হলো কবরীর জন্য। একটু সুখের আশায় উনি ঠিক ভুল বিচার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। বড্ড বেশি স্বার্থপর হয়ে উঠেছিলেন। ভুল বললেও ভুল হবে। পাপ করেছিলেন নিজের ছেলেকে ছেড়ে গিয়ে।

নিধি কবরীর দিকে এগিয়ে এসে বলল,

“কষ্ট হচ্ছে, তাই না? কষ্ট গহনেরও খুব হয়েছে, এখনো হচ্ছে। জানেন তো, উনি মানুষটা খুবই ভালো। আপনি অসুস্থ বলে আর কোন অভিযোগ করলেন না। কিন্তু ওনার মনে অনেক কষ্ট জমা হয়ে আছে। ওনার সবথেকে বড় অভিমান হলো যে আপনি যদি নাই ফিরতেন তাহলে ওনাকে আশ্বাস দিয়ে কেন গিয়েছিলেন যে ফিরবেন।”

কবরী আরেক দফা কেঁদে উঠে বলল,

“আমার এই পাপের কি শাস্তি হতে পারে আমায় বলে দাও? যা শাস্তি দেবে আমি মাথা পেতে নেব। কিন্তু ওর চোখে ঘৃণা দেখতে পাচ্ছি না। আমার ছেলে আমাকে আপনি আপনি বলে ডাকছে। একবার মা বলেও ডাকল না। তোমার থেকে, বাকিদের থেকে আমায় জানতে হচ্ছে আমার ছেলের স্বভাব কেমন। আজ আমার অসুস্থতার দিনে আমার ছেলে আমার জন্য চিন্তা না করে আমায় করুণা করছে। ও ক্ষমা করে দিয়ে আমায় পাপের বোঝা থেকে মুক্ত করতে চাইছে। ইশ! কি ভয়ংকর পাপই না করেছিলাম আমি। যার শাস্তি ইহকালেই পেয়ে গেলাম।”

_________

গহনদের বাড়ি ফিরতে ফিরতে বেশ ভালোই রাত হলো। আজও সঙ্গে করে চাবি নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছিল। ফলস্বরূপ বাধ্য হয়ে কলিং বেলই বাজাতে হলো। কলিং বেল বাজানোর সাথে সাথে দরজাটা খুলে গেল। দরজাটা খুলে দিলেন সালমা বেগম। মনে হলো উনি বোধহয় দরজার কাছেই দাঁড়িয়েছিলেন। ঠিক এতটাই তাড়াতাড়ি খুলে দিয়েছেন দরজাটা।

গহন সরাসরি নিজের ঘরের দিকে যেতে ধরলে পিছন থেকে সালমা বেগম গম্ভীর গলায় ওকে ডেকে উঠলেন একবার।

দাঁড়ালো গহন। কিছু জিজ্ঞেস করল না। শুধু সালমা বেগম কেন ডাকলো সেটা শোনার জন্য ওনার দিকে তাকিয়ে রইল। সালমা বেগম কিছুক্ষণ নিষ্পলক দৃষ্টিতে গহনের দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলেন,

“তোমার নিজের মায়ের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলে?”

প্রশ্নটা শুনতেই গহন বুঝতে পারল আরেক দফা অশান্তি হবে এখানে। অনুরোধের স্বরে সালমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“দয়া করে এসব কথা এখন তুলোনা মা। আমি ভীষণ ক্লান্ত।”

“ওর সাথে দেখা করতে ক্লান্ত হলে না, আমার সঙ্গে কথা বলতেই ক্লান্ত হয়ে পড়লে? সামান্য একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছি। হ্যাঁ কিংবা না তে তো উত্তর দিয়ে চলে যেতে পারতে। তা না করে আমাকে নিজের ক্লান্ত হওয়ার গল্প শোনাচ্ছো?”

“গল্প না মা, বাস্তবতা শোনাচ্ছি তোমাকে। হ্যাঁ দেখা করেছি ওনার সাথে। উনি অসুস্থ, আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছিলেন তাই আমার ওনার সাথে দেখা করতে যাওয়াটা কর্তব্য বলে মনে হয়েছে তাই গিয়েছিলাম। আর কিছু?”

বিজ্ঞাপন

“আমার থেকে তো একবার অনুমতি নিলে না? তুমি আমাকে ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিলে।”

গহন নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

“কারোর জীবনের থেকে বেশি সেই প্রতিজ্ঞাটা দামী নয় আমার কাছে। একজন মৃ ত্যু পথযাত্রী মানুষ তার জীবনের শেষ ইচ্ছেটা ব্যক্ত করেছে। সেখানে কোন জনমে কাকে ছুঁয়ে কি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম সেসব মনে রাখার প্রয়োজন মনে করিনি আমি। উনি যে অন্যায়ই করুক না কেন জন্ম দিয়েছেন আমায়। সেই ঋণ আমার চিরজীবন থেকে যাবে।”

গহনের কথাগুলো শুনে সালমা বেগম তাচ্ছিল্য হেসে বললেন,

“বাহ্! সেই মায়ের প্রতি ঋণের কথা বলছ যে তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। যার তোমার কথা মনে পড়ল আজ পঁচিশ বছর পরে। অথচ যেই মা আজ পঁচিশ বছর ধরে তোমায় আগলে রেখেছে তার প্রতি কোনো ঋণ নেই তোমার?”

গহন নিজেও পাল্টা তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

“পঁচিশটা বছর ধরে তো আমিও তোমায় আগলে রেখেছি। তোমাকে কোন কোন পরিস্থিতি থেকে বাঁচিয়েছি, তোমার জন্য আমি কোন কোন পরিস্থিতি সহ্য করেছি সেগুলো নিয়ে তো তোমারও ঋণ থাকা উচিত ছিল। আর আমি তোমার প্রতি কতটা ঋণী সেটা সবসময়ই প্রকাশ করি।”

সালমা বেগম অবিশ্বাস্য গলায় বললেন,

“এক দিনে এত পরিবর্তন? আজ প্রমাণ পেলাম রক্ত সত্যি কথা বলে। নাড়ির টান থেকেই যায়। তুমি আমায় প্রশ্ন করতে না কেন আমি আমার নিজের ছেলেমেয়েদেরকে বেশি ভালোবাসি? আমি বলেছিলাম নাড়ির টান। ঠিক যেমন তুমি আজ প্রমাণ করে দিলে আমি তোমার সৎ মা হয়ে তোমায় যতই ভালোবাসা দেই না কেন। কিন্তু যখনই প্রশ্নটা তোমার নাড়ির ওপর চলে আসবে তখনই তুমি তোমার সকল কৃতজ্ঞতা ভুলে যাবে।”

গহন বিরক্তিকর দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সালমা বেগমের দিকে। কিছু বলল না। কিছু বলার ইচ্ছেও হচ্ছে না। আবার গহন খুব ভালো করে জানে এখন যেতেও পারবে না এখান থেকে। সালমা বেগম পিছন পিছন চলে আসবেন।

শেষে নিধি বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো,

“দয়া করে চুপ করবেন আপনি। আপনার মাথার তার আসলেই কাঁটা। লাঠি ঝাটা মে রে হুঁশ পাননি, আবার বলছেন আগলে রেখেছেন? কচু রেখেছেন আপনি। যান তো গিয়ে ঘুমোন। সব বিষয়ে এত নাক গলানো ভালো না।”

সালমা বেগম পাত্তাই দিলেন না নিধি কে। নিধি যে ওনাকে এতগুলো অপমানজনক কথা বলল তার প্রেক্ষিতে একটা টু শব্দও করলেন না। এগিয়ে গেলেন গহন এর দিকে।এর মধ্যে ওনার দুচোখ জলে ভরে উঠেছে। ছলছল দৃষ্টিতে গহনের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“তোমার জন্য আমি কি কি ত্যাগ করেছি ভুলে গেলে? কোন কোন পরিস্থিতির মাঝে দিয়ে আমাকে কাটাতে হয়েছে ভুলে গেলে? শুধুমাত্র তোমার কারণে কখনো স্বামীর ভালোবাসা পাইনি, কখনো সংসারে নিজের কর্তৃত্ব ফলাতে পারিনি। আমার প্রথম সন্তানকে হারিয়েছি। তোমার জন্য খেতে পারিনি, ঘুমোতে পারিনি। তোমার জন্য অজস্র আঘাত পেয়েছি। যার দাগ এখনো আমার শরীরে রয়ে গেছে। আর তুমি কিনা আজ আমাকে তার জন্য তুচ্ছ করছো যে, মাঝ রাস্তায় তোমায় ছেড়ে চলে গিয়েছিল? কেন চলে গিয়েছিল ভুলে গেলে? নিজের প্রেমিকের সাথে চলে গিয়েছিল। ওই চরিত্রহীন মেয়ের জন্য তুমি আমাকে পর বানিয়ে দিলে। ওই ন ষ্টা, বে হা য়া বে শ্যার জন্য……...।”

সালমা বেগম শেষের শব্দগুলো উচ্চারণ করতেই মুহূর্তের মাঝে গহনের অভিব্যক্তি বদলালো। নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টা করে বলল,

“উনি কার সাথে গিয়েছিলেন সেটা কিন্তু আমরা কেউই এখনও নিশ্চিত ভাবে জানিনা। আর না জেনে উনি কেন, কারো সম্বন্ধেই এই বাজে শব্দগুলো উচ্চারণ করবে না। আজ তুমি যা বললে এগুলো আর দ্বিতীয় দিন বলবে না।”

সালমা বেগম জোর গলায় বললেন,

“একশো বার বলব। আগে এই মেয়ে তোমাকে কেড়ে নিলো আমার থেকে। এখন আবার ওই মহিলা চলে এসেছে পুরোপুরি তোমাকে কেড়ে নেওয়ার জন্য। আর আমি চুপ থাকব? ছেড়ে কথা বলব? একশো বার বলবো ও চরিত্রহীন। চরিত্রহীন না হলে আবারও বিয়ে করত না।”

সালমা বেগমের শেষোক্ত বাক্যটা শুনে গহন কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

“তুমি কিভাবে জানলে যে উনি আবার বিয়ে করেছেন?”

“জানি আমি। অনেক বছর আগে থেকেই জানি। ঢং করার জন্য তোমার বাবার কাছে, তোমার খোঁজ নেওয়ার নাম করে কল করত। তোমার বাবার থেকেই জেনেছিলাম। ও যদি এতই ধোঁয়া তুলসি পাতা হতো তাহলে বিয়ে করত না। আর তুমি ওর দোষ দেখতে পাচ্ছ না কেন? ভুলে গেলে ও কি করেছিল?”

গহন গম্ভীর গলায় বলল,

“ভুলে যাইনি আমি। ভুলে গেলে ওনার সাথেই থাকতাম। ওনাকে একা ফেলে আসতাম না। বিয়ে তো আমার বাবাও করেছিল। আর উনি তো সারাজীবন একা থাকার জন্য চলে যাননি। ওনার বিবেক ওনাকে যা করতে বলেছে সেটাই করেছেন। তাই বলে তুমি কিংবা আমি কারোরই ওনাকে এই ধরনের বাজে কথা বলার অধিকার নেই।”

সালমা বেগম চেঁচিয়ে উঠে বললেন,

“বলব আমি। বারবার বলব। ও চরিত্রহীন, নষ্টা, বেহায়া, বে শ্যা। শরীর বিক্রি করে খাওয়া বে শ্যা ও। নয়ত এমনি এমনি ও বড়লোক কে বিয়ে করতে পারত না। ও

বে শ্যা, বে শ্যা, বে…..।”

গহনও এবারে চিৎকার করে উঠে বলল,

“নিষেধ করেছি না এগুলো বলতে? উনি যেমনই হয়ে থাকুক না কেন উনি আমার মা, উনি একজন মেয়ে। আমার সামনে তুমি আমার মা কে ছোট করতে পারো না। আমি ছেলে হয়ে ওনার বিরুদ্ধে এত বড় একটা জঘন্য অপবাদ সহ্য করব না। খবরদার আর একটা বাজে শব্দ উচ্চারণ করবে না তুমি।”

সালমা বেগম এবারে শব্দ করে কেঁদে উঠে বললেন,

“ও যদি মা হয়ে থাকে তাহলে আমি কে? এতদিন যে তোমায় মানুষ করলাম তাহলে আমি কে? আমি এই বাড়ির কাজের লোক নাকি শুধুমাত্র তোমার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী?”

“আমার জীবনে তোমার জায়গা কি সেটা তুমি খুব ভালো করেই জানো। তবে তোমার নোংরা মন মানসিকতার জন্য নিজের জায়গা নষ্ট করে ফেলছো। আজ যদি উনি তোমার ব্যাপারে একটা বাজে শব্দ বলতেন আমি তাকেও ছেড়ে দিতাম না। কিন্তু দোষটা করলে তুমি।”

নিধি বুঝল ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। এতক্ষণ তো সালমা বেগমকে নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল হয়ে পড়ছিল। তবে নিধির এখন মনে হচ্ছে গহনকে নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল হয়ে যাবে। তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে গিয়ে গহনের বাহু টেনে ধরে বলল,

“চুপ করুন। ঘরে যান আপনি। আমি কথা বলছি ওনার সাথে।”

কথাটা বলে নিধি গহনকে ঠেলেই পাঠিয়ে দিতে ধরলো ওর ঘরের দিকে। সালমা বেগম গহনের হাত টেনে ধরলেন। অস্থির হয়ে উঠেছেন তিনি। উদভ্রান্তের মতন আচরণ করছেন। গহনকে উদ্দেশ্য করে আদেশের সুরে বললেন,

“তুমি ওই মহিলার সাথে দেখা করতে আর যাবে না। ওর সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করবে। ওকে মা বলে ডাকবে না। মা হিসেবে স্বীকৃতি দেবে না। তোমার মা শুধুমাত্র আমি।”

গহন এক ঝটকায় সালমা বেগমের থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,

“আমার জীবনটা অতিষ্ঠ করে তুলেছ তুমি। আর দুটো দিন সহ্য করে নাও। মা ছেলের সম্পর্কই শেষ করব আগে। কারোর ছেলেই থাকবো না। কোন মাকেই রাখবো না। উনি তো ছিলেনই না কখনো, এবারে তোমাকেও রাখব না। এই মা-ছেলের সম্পর্কটাই যেন আমার জীবনের অভিশাপ। কাউকে প্রয়োজন নেই আমার। শুধু নিধি থাকলেই হবে। ভুলে যাবো তোমাদের সবাইকে। নিধিকে নিয়ে দূরে গিয়ে একটা আলাদা সংসার করবো। তোমাদের ভালোবাসা নামক বি ষ আর সহ্য হচ্ছে না আমার। আমাদের জন্য যে আলাদা বাড়ি বানিয়েছি সেখানে গিয়ে থাকব।”

সালমা বেগম প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

“আলাদা বাড়ি বানিয়েছো মানে? চলে যাবে তুমি আমায় ছেড়ে, তাও তোমার বউয়ের জন্য?”

“হ্যাঁ চলে যাব। অনেক অশান্তি সহ্য করেছি, আর করব না। নিধি কে নিয়ে আমাদের বাড়ি চলে যাব।”

সালমা বেগম হঠাৎ করেই কেমন যেন শান্ত হয়ে গেলেন। দৃষ্টি গিয়ে পড়ল এবার ওনার নিধির দিকে। গহনের অবশ্য সেখানে আর দাঁড়ানোর ইচ্ছে হলো না। নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াতে নিয়ে হঠাৎ করে কানে নিধির আর্তনাদে ভেসে এলো। পিছন ফিরে তাকাতেই দেখল সালমা বেগম দুই হাতে নিধির গলা টিপে ধরেছে।

থেমে গেল গহন। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিল।

বাড়িতে তখন কেবল উপস্থিত সিনথিয়া আর ঋতু। শম্পা নেই। অনেকক্ষণ থেকেই যদিও ওদের কানে এসব চেঁচামেচির আওয়াজ যাচ্ছে। তবে এসব নিত্যাদিনের ব্যাপার। সেজন্য খুব একটা বেশি পাত্তা দেয়নি। তবে চেঁচামেচির আওয়াজটা যখন একেবারে বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেল তখন সিনথিয়া বেরিয়ে এসেছিল ঘর থেকে।

সালমা বেগম কে এভাবে নিধির গলা টিপে ধরতে দেখে সিনথিয়া চিৎকার করে উঠলো। সেই চিৎকারে গহনের ধ্যান ভাঙল। তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে এসে সালমা বেগমের থেকে নিধিকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো গহন। তবে সফল হতে পারছে না। উনি যেন নিজের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে গলাটা টিপে ধরেছেন। কোন অলৌকিক শক্তি যেন ভর করেছে ওনার শরীরে।

সালমা বেগম দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললেন,

“আমার ছেলেকে কেড়ে নিবি? ওকে নিয়ে আলাদা সংসার করবি? যেই শান্তি কখনো আমি পাইনি, সেটা তোকেও পেতে দেব না। শেষ করে ফেলব তোকে।”

এদিকে নিধির অবস্থা খারাপ। প্রাণ যায় যায় দশা। চোখ দুটো মার্বেলের আকার ধারণ করেছে। মুখ ফ্যাকাসে হয়ে উঠল। অবশেষে সিনথিয়া আর গহন মিলে চেষ্টা করে সালমা বেগমের থেকে নিধিকে ছাড়াতে পারল। নিধির ততক্ষণে অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। কাশি উঠে গেছে। গহন ওকে আগলে ধরে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“ঠিক আছো তুমি? এই নিধি, কথা বল।”

নিধি কথাই বলতে পারছে না। গলায় হাত দিয়ে এখনো কাঁশছে। এদিকে সিনথিয়ার একার পক্ষে সালমা বেগমকে আটকে রাখা খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কিছুটা সময় পর সিনথিয়ার বাঁধন কাটিয়ে সালমা বেগম আবারও তেড়ে এলেন নিধির দিকে ওর গলা টিপে ধরার জন্য।

তবে এবারে আর নিধি অব্দি পৌঁছাতে পারলেন না। ওনাকে আটকালো গহন। নিধির কাছ থেকে সরাতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে একটা ধাক্কা দিল গহন ওনাকে। উনি হুমরি খেয়ে গিয়ে পড়লেন মেঝের ওপর।

এবারে যেন ওনার ধ্যান ভাঙলো। কোন একটা ঘোরের মাঝে ছিলেন। যখন মনে হলো যে গহন ওনাকে ধাক্কা মারল তখন আবারও একটা অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করল ওনার মাঝে। ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে ওনার খুব কষ্ট হলো যে গহন ওনাকে ধাক্কা মারলো।

এসব ভাবনার মাঝে ওনার কানে গহনের হিংস্র কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

“আর একবার যদি তুমি আমার স্ত্রীর দিকে এগিয়ে এসেছে আমি কিন্তু ভুলে যাব যে কোনো এক কালে তোমাকে মা বলে ডেকেছি। এই মুহূর্তে পুলিশ ডেকে তোমার নামে কেস করে দেব। তোমার দুঃসাহস হয় কি করে আমার স্ত্রীর গায়ে হাত তোলার?”

নিধি ততক্ষণে অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে। তবে ভয় পেয়েছে। গহন কে থামানোর চেষ্টা করে বলল,

“চুপ করুন গহন। উনি আবার পাগলামো করতে পারেন।”

“আরেকবার আসতে তো দাও ওনাকে। এবার তো আমাকে পার করে তুমি অব্দি পৌঁছাতে হবে। আগে বল তুমি ঠিক আছো? বেশি ব্যথা পেয়েছো? ডাক্তারের কাছে যাই চলো।”

“না। ডাক্তারের কাছে যেতে হবে না। কিন্তু এখানে থাকবো না। অন্য কোথাও চলুন।”

“থাকবো না তো এখানে। আর একটা রাতও এই বাড়িতে থাকবো না। অমানুষ পশুদের সাথে আর থাকবো না। এই অসুস্থ মানুষটার সাথে আর থাকবো না। আসলে ভুলটা আমারই হয়েছে। আমার বোঝা উচিত ছিল যে উনি একজন খু নি। আমাকে খু ন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সফল হতে পারেননি। আমি ভেবেছিলাম হয়তো ঝোঁকের মাথায় সেসব করেছিলেন। তবে এখন বুঝতে পারছি ভুল ভেবেছিলাম আমি।”

“আর কথা বাড়াবেন না। চলুন এখান থেকে।”

নিধির কথায় সম্মতি জানালো গহন। চলে যেতে ধরেও থেমে গেল। পিছন ফিরে মেঝের উপরে পড়ে থাকা সালমা বেগম কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আজ তুমি যা করলে তার হিসেব তোমাকে দিতেই হবে। আমার স্ত্রীর গায়ে হাত তুললে তো, ওকে কষ্ট দিলে। এর হিসেব তো আমি নিয়েই ছাড়বো। এর থেকে দ্বিগুণ কষ্ট তোমাদের সবাইকে যদি না দিয়েছি, তবে আমার নাম গহন কিফায়াত না।”

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প