বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৬৮

🟢

নিধি তখন সিনথিয়ার জন্য প্লেটে খাবার বাড়ছে। সকাল থেকে মেয়েটা কিছুই মুখে তোলেনি। ওর মা বোন কারোরই কোন হুশ নেই। নিজেদের শিক্ষার উপর ওনাদের কোন অনুশোচনা নেই। সব দোষ শুধু সিনথিয়ার। অথচ প্রশ্রয় যে ওনারাই দিয়েছে সেদিকে খেয়াল নেই।

নিধির খাবার বাড়ার মাঝে সেখানে ঋতু এলো। নিধি আড়চোখে খেয়াল করল ঋতু কে। কোন নির্দিষ্ট কাজ করছে না ঋতু। এমনি এদিক থেকে ওদিক যাচ্ছে। নিধির মনে হলো ঋতু আসলে ওর সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে। তবে নিধি খুব একটা পাত্তা দিল না। তরকারি গরম করে প্লেটে ভাত বেড়ে তরকারি তুলতে ধরলে তখন গিয়ে ঋতু নিজ থেকেই কথা বলল।

“সিনথিয়ার জন্য নিয়ে যাচ্ছো?”

নিধি ছোট্ট করে উত্তরে বলল,

“হুম।”

ঋতু আলতো হেসে বলল,

“সত্যিই তুমি খুব ভালো নিধি। সবার খেয়াল রাখো। সবার ভালো ভাবো।”

নিধি ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,

“সেজন্য সব থেকে বেশি বাঁশও খাই। সবার ভালো ভাবতে গিয়ে চারিদিকটা বি ষা ক্ত সাপে ভরে উঠেছে। আমায় ছোবল দেওয়ার জন্য সবাই একেবারে মুখিয়ে আছে।”

কথাগুলো বলে নিধি এবারে ঋতুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“যাদের কথা বললাম তাদের মাঝে তুমি আছো কিনা সেটাই ভাবছো, তাই না? নিশ্চিন্তে থাকো। তুমি অবশ্যই তাদের মাঝে আছো।”

কথাটা বলে নিধি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যেতে ধরলে পিছন থেকে ঋতু অসহায় গলায় বলে উঠল,

“আমি নিরুপায় ছিলাম, নিধি। হাসপাতালে তো তোমায় বলেছিলাম আমার অসহায়ত্বের কথা। বিশ্বাস করো, তোমার থেকে আমি সত্যিই সাহায্য চেয়েছিলাম। কিন্তু সেগুলো সাবিতের মা শুনে ফেলেছিলেন। উনি গিয়ে ওনার ছেলেকে বলেছিলেন। আর ওনার ছেলে আমাকে শাসিয়ে ছিল। আমার গায়ে হাত তুলেছিল, হুমকিও দিয়েছিল। আমি কি করতাম বলো? আমি তো জানি তুমি কতটা ভালো। তোমাকে বিশ্বাসে করি সেজন্যই তো হাসপাতালে আমার ছেলের দায়িত্ব তোমায় দিয়ে গিয়েছিলাম।”

অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিধি থামল। আবারও পিছন ফিরে ঋতুর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

“ঠ্যালায় পড়েছিলে তাই নিধির কথা মনে হয়েছিল। যদি ঠ্যালায় না পড়তে, তাহলে কখনোই মনে হতো না। আসলে তোমার সাথে কথা বলার ইচ্ছেই আমার নেই। তোমার মতন মেয়েদের আমি ঠিক সহ্য করতে পারি না। মানে বাঁচি বা ম রি, স্বামী ভালো হোক কিংবা লম্পট হোক, একটা কেন দশটা বিয়ে করুক তাও আমাকে ওই সংসারে থাকতেই হবে। এই ধরনের মানসিকতার মেয়েদের আমি ঘৃণা করি। তাদেরকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। আর যারা একই মুখে দুই কথা বলে তাদেরকে তো আরও বেশি ঘৃণা করি। আর এই সব বৈশিষ্ট্য তোমার মাঝে আছে। তাই তোমাকেও প্রচন্ড ঘৃণা করি। নিধির ভালোবাসা তো দেখেছো। কিন্তু ঘৃণা দেখোনি। এবারে দেখবে।”

ঋতু পূর্বের মতনই অসহায় গলায় বলল,

“তুমিও আমায় বুঝলে না নিধি!”

নিধি বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,

“না গো। সবাই কে বোঝার ঠ্যাকা নিয়ে বসে নেই আমি। আমি সব কিছু সহ্য করলেও আমার সংসারে অশান্তি সহ্য করব না। তোমার জন্য গহনের চোখে ছোট হয়েছি আমি। তোমার জন্য গহন কে কষ্ট দিয়েছি, গহন কে অপমানিত হতে হয়েছে সবার সামনে। তুমি আমায় বুঝবে না, তাহলে আমি তোমায় বুঝবো কেন? এত ভালো নিধি না। আর এমনিতেও আমি তোমায় বুঝে তোমার কোন উপকার করতেই পারবো না। কারণ তুমি নিজেই নিজের ভালো চাও না। ভালো চাইলে ওই জংলি কুকুরটার সাথে সংসার করতে না। ও যেমন, তুমিও তেমন। দুজনেই সমান। ও তোমাকে নাচাতে চায়, আর তুমি নাচতে চাও। থাকো একসাথে তোমরা। সারা জীবন এমন কা ম ড়া কা ম ড়ি ই করো।”

কথাগুলো বলে নিধি হনহন করে হেঁটে চলে গেল সেখান থেকে। ঋতুর বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। আসলে নিধির থেকে এই ব্যবহারটা ওর প্রাপ্য ছিল। মেয়েটা যথেষ্ট ভালো ব্যবহার করেছে এতদিন ঋতুর সাথে। যথেষ্ট বুঝেছে। ওকে সাহায্যও করতে চেয়েছে। কিন্তু ঋতু নিজের অপরাধে নিধির সহানুভূতি হারিয়েছে, বিশ্বাস হারিয়েছে। এখন ঘৃণা তো সহ্য করতেই হবে।

___________

মাঝে বেশ কয়েকটা দিন কেটে গেছে। গহন আর সালমা বেগম গিয়েছিলেন রবিনের বাড়িতে ওনাদের সাথে বসে সবটা মিটমাট করে নেওয়ার জন্য। তবে ওনারা তো বিয়ের পুরো ব্যাপারটাই অস্বীকার করেছেন। রবিনের বাবা-মা সম্পূর্ণ বিষয়টাই জানেন এখন। যদিও বিয়েটা ওনাদের না জানিয়ে হয়েছিল। তবে তাও মানতে নারাজ।

অবশ্য পরে তারা সিনথিয়ার পারিবারিক সচ্ছলতার কথা শুনে বিয়েতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু বেঁকে বসেছে রবিন। ও কোনমতেই মেনে নেবে না সিনথিয়া কে। আগে যে ওদের বিয়ে হয়েছিল সেই বিষয়টাও পুরোপুরিভাবে অস্বীকার করছে।

অবশ্য পরে রবিন নিজের মিথ্যাটাকে টিকিয়ে রাখতে পারেনি। ক্ষমতার দিক থেকে তো আর গহনের সাথে পেরে উঠবে না। টাকা আর ক্ষমতা থাকলে অনেক কিছুই করা যায়। থানায় তুলে এনে আচ্ছা মতো ধোলাই দেওয়ার পর রবিন স্বীকার করেছিল বিয়ের কথাটা। তবে তারপরেও সিনথিয়ার সাথে সংসার করতে অস্বীকার করেছে। শেষে কাবিনের কাগজপত্র, প্রমাণাদি সবই পাওয়া গেছে রবিনের কাছ থেকে।

শেষমেশ ঘটনাটা এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে, না রবিন সিনথিয়ার সাথে সংসার করতে চায়, না গহনরা কেউ মেয়েকে ওই বাড়িতে পাঠাবে। শেষমেশ ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বাকি রইল সিনথিয়া। ওর আর নিজের মতামত বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই। মেয়েটা একেবারে শান্ত হয়ে গেছে। ডিভোর্স পেপারে সাইন করার সময় কেঁদেছিল খুব। অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল রবিনের দিকে। কত তাড়াতাড়ি বদলে যায় মানুষ। এই তো, কয়েকদিন আগে অব্দিও এই ছেলেটা কত ভালোবাসত সিনথিয়া কে। সিনথিয়ার পরিবার মানছে না শুনে নিজেই আগে বিয়ের কথাটা তুলেছিল। সিনথিয়া কে বলেছিল ওর দায়িত্ব নেবে। একটা সাজানো-গোছানো সংসারের স্বপ্ন দেখিয়েছিল।

অথচ আজ সেই মানুষটা নিমিষের মাঝে বদলে গেছে। এখন আর তার চোখে সিনথিয়া নিজের জন্য একটুও ভালোবাসা দেখতে পায়না। বরং দেখতে পায় রাগ আর বিরক্তি ভাব। আসলে রবিনের চোখে কখনো ভালোবাসা ছিলই না। সিনথিয়াই ভুল বুঝেছিল। ফলস্বরূপ আজ এর শাস্তিও ওকেই পেতে হচ্ছে।

___________

রাতে অফিস থেকে ফিরে হাতমুখ ধুঁয়ে গহন গেল সিনথিয়ার ঘরে। রবিনের বাড়ির দূরত্ব ওদের বাড়ি থেকে বেশিদূর না। ছেলেটাকে থানায় নিয়ে যাওয়ার পরে এলাকায় সবটা জানাজানি হয়েছে। জানাজানির কাজটা করেছে রবিনের পরিবার। তারা অপবাদ দিয়েছে যে সিনথিয়া নাকি তাদের ভোলাভালা ছেলেটাকে ফুসলিয়ে বিয়ে করেছে। এখন আবার ওর পরিবার ক্ষমতা দেখিয়ে তাদের হেনস্তা করছে।

এই নিয়ে বেশ সম্মানহানী হয়েছে গহনদের। ঠিক-ভুল বিচার করার সময় তো আর এলাকার লোকেদের নেই। সমালোচনা করার মতন একটা বিষয় পেলেই হলো। তাদের চোখে সেজন্য দোষী একমাত্র সিনথিয়া। কেননা দিনশেষে এই নোংরা সমাজ আর সমাজের মানুষগুলোর চোখে মেয়েরাই দোষী।

এসব কারণেই সিনথিয়া আরো বেশি ভেঙে পড়েছে। মেয়েটা আজকাল নিজের ঘর থেকে বের হয় না। খেতেও আসে না। খাবার ঘরে দিয়ে আসা হয়। তবে সেই খাবারটাও ঠিক মত খায় না। কেউ একটু কথাও বলে না সিনথিয়ার সাথে।

গহন ঘরে গিয়ে দেখল বেড সাইডের উপর খাবার সমেত প্লেট এখনো অমনি পড়ে আছে। গহনের আর বুঝতে বাকি রইলো না যে সারাদিন সিনথিয়া কিছু খায়নি।

গহনের উপস্থিতি তখনও টের পায়নি সিনথিয়া। ঘুমোচ্ছে বোধহয়। গহন একবার ভাবল ডাকবে, কি ডাকবে না। পরক্ষণে মনে হলো রাতে খেতে তো হবে।

সিনথিার মাথার পাশে বসলো গহন। আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে একবার ডাকলো ওর নাম ধরে।

একবার ডাকতেই সিনথিয়া চোখ মেলে তাকালো। গহনকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসলো।

“কিছু বলবে ভাইয়া?”

সিনথিয়ার কন্ঠস্বরটা ভীষণ দুর্বল শোনালো। মেয়েটার চোখ মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে শরীরটা কি পরিমান দুর্বল। গহনের খারাপ লাগে সিনথিয়া কে দেখে। কষ্ট হয়। যতই হোক গহন তো ভালোবাসে। জানে অন্যায় করেছে। কিন্তু তবু নিজের বোনের এই দুর্দশায় ভীষণ কষ্ট হয় গহনের।

আলতো করে আবারো সিনথিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

“নিধি বলল তুমি নাকি খাওনি এখনো। খেতে হবে তো।”

“ক্ষুধা লাগলে খেয়ে নেব। তুমি খেয়ে নাও।”

“রাত দশটা বাজে। আরো কখন খাবে? চলো, খেয়ে এসে তারপর ঘুমিয়ো।”

সিনথিয়া আপত্তি জানিয়ে বলল,

“না ভাইয়া। ইচ্ছে করছে না। তুমি যাও।”

গহন এবার একটু জোর দেখিয়েই বলল,

“বলেছি না খেতে আসতে। চলো।”

কথাটা বলে গহন উঠে দাঁড়ালো। হাত বাড়াল সিনথিয়ার জন্য। অনিচ্ছা সত্ত্বেও কেন যেন সিনথিয়া না করতে পারল না। গহনের সাথে চলে এলো খাবার খেতে।

বাড়ির কারোরই তখনও রাতের খাবার পেটে যায়নি। খাবার টেবিলের কাছে আসতেই গহন দেখল বাকিরা সবাই এসে বসেছে। গহন জানে সিনথিয়ার জন্য আপাতত এই বাড়ির পরিবেশটা ঠিক কতটা ভয়ানক। সেজন্য নিজেই সিনথিয়ার হাত ধরে ওকে নিয়ে এসে নিজের পাশের চেয়ারটায় বসালো। সিনথিয়া কে দেখার সাথে সাথে ওর মা-বোন সবাই অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। সিনথিয়া খেয়াল করল ব্যাপারটা। তবে কিছু বলল না। চুপচাপ বসে রইল। তবে চুপচাপ বসতে পারল না সাবিত। খেঁকিয়ে উঠে গহনকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ওকে কেন নিয়ে এসেছ এখানে?”

গহন কপাল কুঁচকে সাবিতের দিকে তাকিয়ে বলল,

বিজ্ঞাপন

“তোমার কি সমস্যা হচ্ছে?”

“অবশ্যই সমস্যা হচ্ছে। আমার ওর মুখ দেখলে সমস্যা হচ্ছে। ওকে ঘরে রেখে এসো। ঘর থেকে বেরোনোর মতন পরিস্থিতি ও রাখেনি। ওর মুখ দেখলেই মাথায়

র ক্ত উঠে যাচ্ছে আমার।”

গহনকে কথাগুলো বলে সাবিত সরাসরি সিনথিয়া কে উদ্দেশ্য করে ঘৃণা ভরা গলায় বলল,

“এই, তুই ঘরে যা তো। তোর জন্য পাড়ায় মুখ দেখাতে পারছিনা। বন্ধুদের সামনে যেতে পারছি না। আত্মীয়দের মুখ দেখাতে পারছি না। তোকে তো নিজের বোন বলে পরিচয় দিতেই লজ্জা করছে।”

মুহূর্তের মাঝে সিনথিয়ার দুচোখ ছাপিয়ে জল বেরিয়ে এলো। উঠে চলে যেতে ধরলে গহন ওর হাত টেনে ধরলো। ইশারায় সিনথিয়াকে চুপ করতে বলে সাবিতের দিকে রাগান্বিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,

“আয়নায় গিয়ে একবার নিজের মুখটা দেখো। ও তবুও অবৈধ কোন সম্পর্কে জড়ায়নি। বিয়ে করেছিল। আর লজ্জাজনক ব্যাপার কিন্তু তুমিও কম ঘটাওনি। শুধু সেটা প্রকাশ হয়নি বলে তোমার গলার জোর বেড়েছে।”

গহন কথাটা বলতেই সাবিত নিজের জায়গা থেকে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে যেই না কিছু বলতে যাবে তার আগেই গহন আঙুল উঁচিয়ে সাবিত কে শাসিয়ে বলল,

“গলা নামিয়ে কথা বলবে। এই বাড়িতে মানুষ থাকে। এটা চিড়িয়াখানা পাওনি যে, দিন নেই রাত নেই পশুর মতন গর্জন করবে। সিনথিয়া এই বাড়ির মেয়ে, আমার বোন। ওর যেখানে ইচ্ছে, যখন ইচ্ছে যাবে। আর যদি তোমার ওকে বোন বলে পরিচয় দিতে এত লজ্জা করে তাহলে পরিচয় দিতে হবে না।”

“এখনো ওকে এত প্রশ্রয় দিচ্ছো? আসলে তুমি কি চাইছো বলোতো, ও প্রশ্রয় পেয়ে আবার অন্যায় করুক, তাই না?”

“আমি যা চাই সেই অনুযায়ী যদি ও চলে তাহলে কখনো কোন অন্যায় করবে না। যাই হোক, তোমার মুখে এত কথা মানায় না। চুপচাপ খেতে বসো। যদি অসুবিধা হয় তাহলে চলে যেতে পারো। অনেকদিন আগেই কিন্তু বলেছিলাম দরজা খোলা আছে। যার যেদিকে দুচোখ যায় সে দিকে চলে যেতে পারে।”

সাবিতের সাথে যোগ দিল এবারে শম্পা। রুষ্ট গলায় গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“সব সময় কিন্তু তোমার এক বাড়ির গরম আর সহ্য হয় না। আমাদের অংশ আমাদের দিয়ে দাও। চলে যাব। তোমার বাড়িতে থাকবো না। আর এখন সিনথিয়ার ওপর দরদ উতলে পড়ছে কেন? এমন ভাব দেখাচ্ছো যেন আমাদের থেকে বেশি ভালোবাসো। আর সিনথিয়া তোকে বলছি, হুট করে সৎ ভাইকে আবার আপন ভাবতে গেলি কেন? বুঝতে পারছিস না ও তোর খারাপ চায় জন্যই তোকে প্রশ্রয় দিচ্ছে? আমরা ভালো চাই জন্যই এই ঘটনাটা ঘটার পর তোর ওপরে রাগ দেখাচ্ছি।”

সিনথিয়া শম্পার দিকে শান্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

“কে আপন কে পর বুঝে গেছি, আপু। আমার জীবনের সবথেকে কঠিন মুহূর্তে যদি আমার পাশে থাকতে না পারলে তাহলে আর কিসের নিজের বোন। চিন্তা করো না, উপলব্ধি একদিন তোমারও হবে। আমারও উপলব্ধি হয়েছে, তবে দেরিতে। তোমারও হবে, হয়তো আরো দেরিতে। বুঝতে পারবে একদিন অকারণে কাকে এত অপমান করেছো। নিজের ভাই হয়ে বলছে বোনকে দেখে লজ্জা লাগে। অথচ বোনের এই বিপদে একটা দিনও সেই নিজের ভাই এসে পাশে দাঁড়ালো না। একটু কাঁধে হাত রেখে ভরসা দিল না। আবার আমায় শেখাতে এসেছ সৎ ভাই? বড় ভাইয়ার মতন যদি একটা সৎ ভাইও থাকে না জীবনে, তাহলে আর কিছুর প্রয়োজন হয় না। তোমাদের মতন স্বার্থপর নিজের ভাই বোনের থেকে হাজারগুন ভালো আছে।”

কথাগুলো বলে গহনের হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে সিনথিয়া নিজের ঘরে চলে গেল। সিনথিয়া সেখান থেকে চলে যেতেই গহন এবারে শম্পা আর সাবিত দুজনকে উদ্দেশ্য করেই শাসিয়ে বলল,

“তোমাদের দুজনকে বলছি, অনেক সহ্য করে নিলাম তোমাদের কে। আসলে আমার ধৈর্য অনেক কমে গেছে আজকাল। তাই আর তোমাদের সহ্য করতে পারছিনা। যার যার ব্যবস্থা করে নাও। দুজনকে এক মাস সময় দিলাম। যার যার পরিবার নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে। আর বাকি রইল সম্পত্তি। যে সামান্য অংশ রয়েছে তোমাদের দুজনের, সেটা দিয়ে দেব। সেগুলো শেষ হলে তোমরা কি করো সেটা আমি দেখতে চাই। তোমাদের দুজনের বাড়াবাড়ি আগে কমাতে হবে। তোমাদের মতন অকৃতজ্ঞ, বেইমানদের সাথে আর থাকবো না। তোমাদের কে বোঝানো প্রয়োজন যে, গহন তোমাদের জন্য কি কি করেছে এবং এখনও কি কি করছে। যখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হবে তখন বুঝবে, এতদিন গহন কত কঠিন বিপদের সামনে ঢাল হয়ে তোমাদের আড়াল করে দাঁড়িয়েছিল।”

_____________

হঠাৎ করে নিধিকে চমকে দিয়ে আজ বাড়িতে এলেন জুবাইদা। দরজা সালমা বেগমই খুলে দিয়েছিলেন। এমন সময় ননদকে দেখে ভীষণ চমকেছিলেন তিনি। জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে ছিল হঠাৎ করে তার আসার কারণ। তবে জুবাইদা ঠিক পাত্তা দেয়নি ওনাকে। ঠিকঠাকভাবে একবার ওনার মুখের দিকে তাকায়ওনি। দরজা খোলার সাথে সাথে ওনাকে পাশ কেটে সরাসরি নিধির ঘরে গিয়ে ঠাস করে দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

কিছুক্ষণ দরজার সামনে পায়চারি করলেন সালমা বেগম। আড়ি পেতে ভেতরে ওদের মাঝে কি কথা হচ্ছে সেসব শোনারও চেষ্টা করলেন। তবে তিনি সফল হলেন না।

খুব বেশিক্ষণ জুবাইদা থাকলেন না। এক ঘন্টার মতন থাকলেন। যতটুকু সময় থাকলেন নিধির ঘরে দরজা বন্ধ করে দিয়েই থাকলেন।

নিধির সাথে কথাবার্তা শেষে জুবাইদা এবারে বাড়ি যাওয়ার জন্য উদ্দ্যত হলেন। নিধির ঘর থেকে বেড়িয়ে দরজার কাছাকাছি আসতেই জুবাইদা অনুরোধের স্বরে নিধিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“তুমি একটু গহনকে বুঝিয়ো, নিধি। পরশু ভাবিরা দেশে আসবে। বেশিদিন থাকবে না। কারণ চিকিৎসা চলছে ভাবির। যে করেই হোক একবার ওকে দেখা করাতে নিয়ে এসো।”

নিধি কাচুমাচু করে বলল,

“আসলে ফুপি, উনিতো পরিষ্কার করে কিছুই বলেন না। আর আমি ওনাকে জোর করতে চাই না। আমি চাইনা এমন কিছু করতে যাতে উনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমি কথা বলবো ওনার সাথে। দেখি উনি কি চান।”

নিধি কথাটা বলতেই জুবাইদা ওর হাত দুটো ধরে অনুনয়ের সাথে বলল,

“এভাবে বললে হবে না নিধি। আমি জানি তুমিই পারবে গহন কে রাজি করাতে। ও এখন তোমার কথা শোনে। আর কারো কথা শুনবে না। দুধ কলা দিয়ে পোষা কালসাপদের যদি ও ক্ষমা করতে পারে তাহলে নিজের মা কে, কেন পারবেনা? আর ক্ষমা না করলো। একবার গিয়ে অন্তত দেখা করে আসতেই হবে। আমি জানি নয়তো ও নিজেই পরে অপরাধবোধে ভুগবে। যে করেই হোক তোমায় ওকে রাজি করাতেই হবে। আমায় কথা দাও তুমি ওকে রাজি করাবে?”

জুবাইদার অতিরিক্ত জোরাজুরিতে এক পর্যায়ে গিয়ে নিধি বাধ্য হয়ে রাজি হলো। ওনাকে আশ্বস্ত করে বলল

“আচ্ছা ঠিক আছে ফুপি। কথা দিলাম আপনাকে। গহন যাবে ওর মায়ের সাথে দেখা করতে। দু'চারটে যাই হোক ভালোভাবে কথাও বলবে। কিভাবে ওনাকে রাজি করাতে হবে সেটা আমি দেখে নেব।”

এতক্ষণে গিয়ে আশ্বস্ত হলেন জুবাইদা। খুশি হয়ে নিধিকে একবার জড়িয়েও ধরলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদরও করলেন।

জুবাইদা সেখান থেকে চলে যেতেই দরজা লাগিয়ে নিধি যেই না পিছনে ঘুরলো অমনি দেখল অগ্নিদৃষ্টিতে সালমা বেগম তাকিয়ে আছে ওর দিকে।

নিধি ভুত দেখার মতন চমকে ছিটকে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। বুকে হাত রেখে আতঙ্কিত গলায় বলল,

“ধুর! পা গ ল নাকি আপনি? আমাকে খু ন করার ইচ্ছে থাকলে সরাসরি বলে দিন। ভুতে আমার এমনিতেই ভয় বেশি। তার উপর আবার এসব ভুতুড়ে আচরণ করেন কেন? ধুরু। সরুন তো।”

কথাটা বলে নিধি ওনাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে ধরলে সালমা বেগম শক্ত করে নিধির কব্জি চেপে ধরে বললেন,

“ষড়যন্ত্র করছো? জুবাইদার সাথে মিলে ষড়যন্ত্র করছো? আমার সতীনকে আবার এই বাড়িতে আনার পরিকল্পনা করছো?”

নিধি ব্যথায় মৃদু আর্তনাদ করে উঠে বলল,

“আরে হাত ছাড়ুন। লাগছে তো আমার।”

সালমা বেগম আরো শক্ত করে ওর হাত চেপে ধরে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললেন,

“শেষ করে ফেলব কিন্তু তোমায়। তোমাকে বারবার করে বলেছিলাম আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিও না। আর তুমি আজ সব সীমা অতিক্রম করে গিয়ে গহন কে আবার ওর মায়ের সাথে মেলাতে চাইছো? এত বড় দুঃসাহস তোমার? যদি গহনের মায়ের পা এই বাড়িতে পড়েছে, তাহলে আমার যে ভয়ানক রূপটা তুমি এখনো দেখোনি সেটা কিন্তু দেখবে এবারে।”

নিধি এবারে এক ঝটকায় সালমা বেগমের থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে পাল্টা রাগান্বিত গলায় বলল,

“অর্ধেক কথা শুনে চেঁচান কেন? আমরা কি একবারও বলেছি যে গহনের মাকে এই বাড়িতে আনবো? মানুষটা অসুস্থ। তাই গহন ওনার সাথে দেখা করতে যাবে। এতে আপনার কি? সবকিছুর মধ্যে সবসময় আপনার এই লম্বা ঠ্যাং ঢোকাতেই হবে?”

সালমা বেগম নিধির দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে দাঁত কিড়মিড়িয়ে শাসিয়ে বললেন,

“গহন ওর মায়ের সাথে দেখা করবে না, বুঝতে পেরেছো তুমি? ও, ওর মাকে ঘৃণা করে। আমি আরো বিষিয়ে তুলেছি ওর মন। ওকে বুঝিয়েছি আমি ছাড়া ওর কেউ নেই। আমি ওর নিজের মা বা সৎ মা যেই হই না কেন ওকে শুধু আমিই ভালোবাসি। ও শুনবে না তোমার কথা। ও আমাকে অনেক আগে ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিল, ও কক্ষনো ওর মায়ের সাথে দেখা করবে না। ও রাখবে আমার কথা।”

নিধি ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,

“আপনাকে ছুঁয়ে যখন প্রতিজ্ঞা করেছে তাহলে সেই প্রতিজ্ঞা আমি ভাঙাবোই। আর এতদিন তো শুধু পরিকল্পনা করছিলাম যে গহনের সাথে গহনের মায়ের দেখা করাবো। তবে এবার বলছি, ওর মা এই বাড়িতেও আসবে। আমি তো ওনার ছেলের বউ। ছেলের বউয়ের হাতের রান্না খেতে আসবেন।”

সালমা বেগম জোর গলায় বললেন

“আসবে না। গহন পা-ও রাখতে দেবে না ওকে এই বাড়িতে। তোমার এই বিষয়ে কোন আন্দাজ নেই যে গহনের মায়ের প্রতি ঠিক কতটা ঘৃণা জমে আছে ওর মনে। আমি ওকে ঘৃণা করতে শিখিয়েছি। আমি ওকে বুঝিয়েছি ওর দুর্ভাগ্যের জন্য ওর মা দায়ী। ও সেসব একটা কথাও ভোলেনি। ও আমাকে কষ্ট দেবে না। ও নিজের মাকে ছাড়বে, তবুও আমাকে ছাড়বে না। মিলিয়ে নিও তুমি আমার কথা। আমি ওকে দয়া করে যতটুকু মায়ের ভালোবাসা দিয়েছি ততটুকুই ওর জন্য যথেষ্ট। বরং বেশি। এর বেশি ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার ওর নেই। পাবে না ও মায়ের ভালোবাসা। আমি ওকে পেতে দেবো না। আমি যা দিয়েছি ততটুকুই ওর জন্য যথেষ্ট। বুঝতে পেরেছ তুমি?”

নিধিরও যেন এবার জেদ উঠে গেল। মনে মনে নিজেই ঠিক করল সালমা বেগমকে এবার আগে দেখাবে গহন ঠিক কতটা ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য। মায়ের ভালোবাসা তো পাবেই গহন। তাও সালমা বেগমের সামনেই পাবে। ওর দিকে তুলে রাখা সালমা বেগমের আঙ্গুলটা নামিয়ে দিয়ে বলল,

“আমি নিজের কাছে একটা প্রতিজ্ঞা করলাম আজ। গহন ওর মায়ের ভালোবাসা পাবেই পাবে। আপনি শুধু দেখুন, সামনে আমি কি কি করি। আপনার তেজ বের করেই ছাড়বো। আজ নিধি আপনাকে কথা দিচ্ছে, আপনার কোমরের হাড় ভেঙে আপনাকে বিছানায় শুইয়ে না দেওয়া পর্যন্ত নিধি থামবে না। আগে উচিত শিক্ষা দেব আপনাকে, তারপরে থামবো। আপনার মতন পা গ লে র একটা উচিত শিক্ষা হওয়া দরকার।”

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প