“সকাল থেকে কোথায় ছিলি? ফোন দিলে ফোন ধরিস না কেন? আর সামনে তোর বিয়ে। চেহারার কি অবস্থা করেছিস?”
সালমা বেগম একনাগারে সিনথিয়া কে প্রশ্নগুলো করে গেলেন। তবে সিনথিয়া নিরুদ্বেগ। চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থেকে শুনে গেল সালমা বেগমের কথাগুলো। কোন উত্তর দেয়ার প্রয়োজন মনে করল না।
এদিকে মেয়ের থেকে কোনো জবাব না পেয়ে সালমা বেগম এবারে রাগী গলায় বললেন,
“কথা কানে যায় না তোর? বিয়ের আগে কি ঢং শুরু করেছিস? তোর এসব নাটক কিন্তু আমার সামনে চলবে না।”
এবারে সিনথিয়া মাথা তুলে তাকালো সালমা বেগমের দিকে। কন্ঠ ভীষণ শান্ত। তবে সেই শান্ত কণ্ঠে একটা অদ্ভুত জোর প্রয়োগ করে বলল,
“বিয়ে করব না বলেছি তো তোমাকে। আমার জীবনের সিদ্ধান্ত আমি নেব। বুঝতে পেরেছো?”
সিনথিয়া কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে সালমা বেগম ওর দিকে তেড়ে এসে কষিয়ে একটা চড় মারলেন। রাগে হিশহিশিয়ে বললেন,
“তোর জীবনের সিদ্ধান্ত আমি নেব, বুঝতে পেরেছিস? ওই বেকার, চোর, বাটপারকে বিয়ে করবি আর আমি মেনে নেব ভাবলি কি করে? শোন সিনথিয়া, আমাকে খারাপ হতে বাধ্য করিস না।”
সালমা বেগমের কথাটা শুনে সিনথিয়া ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“বাধ্য করার কি আছে? তুমি তো খারাপই। তুমি খারাপ, আমি খারাপ, সবাই খারাপ।”
“হ্যাঁ, আমি খারাপ। কিন্তু কতটা খারাপ হতে পারি সেটা তুই জানিস না। এখন অবধি আমার খারাপ রূপ দেখিসনি তুই।”
সিনথিয়া গা ছাড়া ভঙ্গিতে বলল,
“দেখিয়ে দাও। কিন্তু বিয়ে আমি করব না।”
কথাটা বলে সিনথিয়া ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সালমা বেগম শুধু অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের যাওয়ার পথে। সবার গায়ে বোধহয় নিধির হাওয়া লাগছে। সেজন্য আজকাল কেউই আর ওনার কথায় পাত্তা দিচ্ছে না। এমনকি ওনার নিজের ছেলে মেয়েও না।
____________
“আবিদের বাড়ি থেকে জারার জন্য সম্বন্ধ এসেছে। কিন্তু ওই মেয়ে তো বিয়ের নামই শুনতে পাচ্ছে না। যখন শুনলো আবিদের বাড়ি থেকে সম্বন্ধ এসেছে তখন তো আরও তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেছে। তুই একটু বোঝা না ওকে গহন।”
জুবাইদার কথাটা শুনে গহন বেশ চিন্তার মাঝে পড়ল। সম্বন্ধ পাঠাবে এটা গহন জানে। গহনকে জানিয়েই করেছে আবিদ কাজটা। গহন তো আন্দাজ করতে পারছে যে জারা কেন বিয়ের নাম শুনতে পারে না। আবার কোন মুখ নিয়ে জারাকে বোঝাতে যাবে? এটাতো আঘাত করে আবার মলম লাগাতে যাওয়ার মতন ব্যাপার হয়ে গেল।
গহনের এসব ভাবনার মাঝেই জুবাইদা আবারো বলে উঠলেন,
“তুই কথা না বললে নিধিকে নিয়ে একটু বাড়িতে আসিস। ও বোঝালে হয়তো বুঝবে।”
এবারে কথাটা ঠিক আছে। এটাই ঠিক হবে। নিধি বোঝালে ভালো হবে। জুবাইদার কথা সায় জানিয়ে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে। আমি নিধিকে পাঠিয়ে দেব। এখন রাখছি।”
কথাটা বলে গহন ফোনটা রাখতে ধরলে জুবাইদা ওকে থামতে বললেন। একটু সময় নিয়ে আমতা আমতা করে বললেন,
“ভাবি অসুস্থ, এই কথা জানার পরে তোর প্রতিক্রিয়াটা আমি জানতে চাই?”
একটু নড়েচড়ে উঠলো গহন। নিজের ভেতরে তৈরি হওয়া অস্থিরতা বুঝতে দিতে চাইলো না জুবাইদাকে। ফলস্বরুপ স্বাভাবিক গলায় বলার চেষ্টা করল,
“একজন অসুস্থ মানুষের জন্য যা করা উচিত তাই করেছি। দোয়া করি উনি সুস্থ হয়ে যাক তাড়াতাড়ি।”
“সামনের মাসে দেশে আসবে। ভাবি বাপের বাড়িতে যাবে, ওদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য। একবার দেখা করিস।”
“সময় হবে না।”
“সময় বের করতে হবে, বুঝতে পেরেছিস? এটা আমার অনুরোধ বা আদেশ যাই বলিস না কেন তোকে রাখতে হবে। আমি তো বলছি না গিয়ে গলা জড়িয়ে ধরতে। অপরাধ তো তোর সৎ মাও কম করেনি, তাই না? তাও তো এখনো ওনার সাথে এক ছাদের নিচে থাকছিস। মা, মা বলে ডাকিস। ভালোবাসিস, সম্মান করিস। তাহলে তোর নিজের মায়ের বেলায় একটু ছাড় দিতে পারবি না কেন? আমি তোকে বলছি গহন এখনো সময় আছে। একবার চেষ্টা করে দেখ। নয়তো যখন সেই মানুষটা পৃথিবীতে থাকবে না তখন কিন্তু আফসোস হবে।”
গহন কোন উত্তর দিল না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন জুবাইদা। একটু বিরতি নিয়ে আরেকটা প্রশ্ন করতে মন চাইলো তার গহন কে। ইচ্ছেটা দাবিয়ে রাখতে না পেরে প্রশ্নটা করেই ফেললেন।
“আচ্ছা গহন, আমি যদি তোর থেকে কখনো কিছু চাইতাম তুই কি আমায় ফিরিয়ে দিতি? ধর আমি তোকে এমন কিছু করতে বললাম, যেটা তোকে নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে করতে হতো। কিন্তু আমি খুব শান্তি পেতাম তুই সেটা করলে। তাহলে কি তুই সেই কাজটা করতি?”
গহন অনুনয়ের স্বরে বলল,
“দয়া কর ফুপি। ওনার সাথে সম্পর্কটা ঠিক করে নিতে বলো না। আমি পারবো না। আমার কষ্ট হবে।”
“ভাবির কথা বলছি না। আমি অন্য প্রসঙ্গে বলছি। ধর তোর কোন ক্ষতি হতো না আমার কথাটা মেনে নিলে। সাময়িক সময়ের জন্য হয়তো তোর আপত্তি থাকত। কিন্তু ধীরে ধীরে হয়তো আমার সেই সিদ্ধান্তটা তোর ভালো লাগতো। বল না, আমি যদি তোর দু হাত ধরে অনুরোধ করে কিছু চাইতাম তুই আমায় ফিরিয়ে দিতি?”
গহন একটা লম্বা শ্বাস টেনে বলল,
“হয়তো পারতাম না। তোমায় খালি হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার সাধ্য আমার নেই। সেটা তুমিও খুব ভালো করেই জানো।”
গহনের উত্তরটা শুনে জুবাইদা খিঁচে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেললেন। খুব আফসোস হলো ওনার মেয়ের জন্য। মনে হলো কেন যে জারা ঠিক সময় ওনাকে বলেনি এই কথাটা। অবশ্য আফসোস করেও আর কি হবে! যা ভাগ্যে ছিল না তা নিয়ে আফসোস করে কি হবে?
__________
“রোজ রোজ অফিসে না এসে বাড়ি চলে গেলেই তো পারো। আমি বাধ্য হয়ে অফিসে থাকি। আর তুমি স্বেচ্ছায় চলে আসো। কি যে করো না। আসলে বয়স কম তো, সেজন্য শরীরের আরাম বোঝে না।”
চেয়ারের সাথে এলিয়ে দেওয়া মাথাটা তুলে সোজা হয়ে বসে নিধি গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“বাড়িতে তো আমার স্বামী নেই। অফিসে এলে তাও স্বামীর সাথে দুটো কথা বলতে পারি, চোখের দেখা দেখতে পারি, ইচ্ছে হলে দুটো চুমুও খেতে পারি। বাড়িতে গেলে তো আর এসব হবে না।”
“বাকি সব হলেও অফিসে চুমু খাওয়া হবে না। যাইহোক। এদিকে এসো তো চেয়ারটা নিয়ে। ল্যাপটপ চালানো শেখাই। টুকটাক কিছু কাজ শেখো। ছোট ছোট দায়িত্ব নাও। তাহলে ধীরে ধীরে এমনিতেই সবটা শিখে যাবে।”
গহন কথাটা বলতেই নিধি ওর দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে বলল,
“স্বামীর কোল থাকতে চেয়ারে বসতে যাব কেন?”
গহন জানে এই মেয়েটা কে এখন প্রশ্রয় দিলে আরো আজেবাজে কথা বলবে। কাজে মনোযোগ দেবে না। সেজন্য নিধির কথায় একটু হাসলোও না। বরং গম্ভীর গলায় বলল,
"আজেবাজে কথা না বলে কাছে এসো।"
"কাছে এলে নিজেকে সামলাতে পারবেন তো? অনুভুতিরা কিন্তু অবাধ্য হয়ে উঠবে, স্থান-কাল ভুলে অসভ্য হয়ে উঠতে চাইবে আপনার হৃদয়।"
গহন বুঝলো গম্ভীর থেকে মেয়েটাকে শায়েস্তা করা যাবে না। ফলস্বরূপ নিজেও নিধির দিকে ঝুঁকে এসে হাস্কি গলায় বলল,
"এত উস্কানি দেওয়া ভালো না, ম্যাডাম। আমার অসভ্যতামি কোন পর্যায় পর্যন্ত যেতে পারে তোমার কিন্তু ধারনা নেই। যদি সামলাতে পারো তবেই উস্কানি দাও। নয়ত সাবধান হয়ে যাও।"
থতমত খেলো নিধি। সত্যি সাবধান হয়ে গেল। ঠিকঠাক হয়ে বসে গম্ভীর গলায় বলল,
“খালি আজেবাজে কথা। কাজের সময় এত উল্টোপাল্টা কথা আমার ভালো লাগেনা। দাঁড়ান, কাছে আসছি। কাজ শেখান আমায়।”
নিধি চেয়ার নিয়ে গিয়ে গহনের পাশে বসলো। গহন যেই না একটু ল্যাপটপ চালানো শেখাতে যাবে ওমনি নিধির ফোনটা বেজে উঠলো। বিরক্ত হয়ে ব্যাগের ভেতর থেকে ফোনটা বের করতেই দেখল নীলা কল করেছে।
সঙ্গে সঙ্গে নিধির অভিব্যক্তি গম্ভীর হয়ে উঠল। একবার ভাবল রিসিভ করবে না ফোনটা। পরক্ষণেই আবার ভাবল যদি কোন বিপদ হয়ে থাকে। একটু ভাব নিয়ে না হয় কথা বলবে। কিন্তু কথা বলা উচিত।
নিধি কথা বলল নীলার সাথে। জরুরি কোন কথা না। এমনি খোঁজখবর নিলেন তিনি মেয়ের। নিধি খুব বেশিক্ষণ কথা বলল না ওনার সাথে। ওই দেড় থেকে দু মিনিট মতন কথা বলে তারপরে ব্যস্ততা দেখিয়ে ফোনটা কেটে দিল।
ফোনটা কেটে গহনের দিকে তাকাতেই গহনকে কেমন যেন অন্যমনস্ক দেখালো। নিধি হালকা করে গহনের বাহু ধরে ঝাঁকিয়ে বলল,
“কি ভাবছেন?”
ধ্যান ভাঙলাে গহনের। পরক্ষণে আবারো অন্যমনস্ক হয়ে বলল,
“তোমার কাছে তো তোমার মা আছে। সে নিজ থেকে তোমার খোঁজ খবর নিতে চাইছে। তবে তার প্রতি এত কঠোরতা কেন দেখাচ্ছো? আছে জন্যই কি মূল্য বুঝছো না?”
“উঁহু। আমি মূল্য বুঝি। মা-বাবার মূল্য আমি খুব ভালোভাবে বুঝি। তবে যে আমার সাথে অন্যায় করবে সে আমার কাছে অপরাধীই। সে মা হোক, বাবা হোক কিংবা স্বামী।”
“ক্ষমা কি করা যায় না? মা বাবা তো আমাদের অনেক অপরাধ ক্ষমা করে দেয় তাই না? ছোটবেলায় কত বিরক্ত করি তাদের, মাঝে মাঝে তাদের দুর্ভাগ্যের কারণ হয়ে দাঁড়াই। কিন্তু তবুও তো তারা আমাদের ভালোবাসে, ক্ষমা করে দেয়। তাহলে আমাদেরও কি মা-বাবাকে ক্ষমা করে দেওয়া উচিত?”
গহনের শেষোক্ত বাক্যটা শুনে নিধি ভ্রুঁ কোঁচকালো। গহন কে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল,
“আমার দিকে তাকান। দেখা করতে চান আপনার মায়ের সাথে? ক্ষমা করে দিতে চান?”
থতমত খেল গহন। অন্যদিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে বলল,
“আমি আমার মায়ের কথা বলিনি তো। তোমার মায়ের কথা বলছিলাম।”
গহনের অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখা মুখটা নিধি আবারও নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বলল,
“শুনুন, অন্যের কথা ভেবে অনেক কষ্ট দিয়েছেন নিজেকে। এবার একটু নিজের মনের কথা শুনুন। ন্যায়-অন্যায় ভুলে যান। কে কি অপরাধ করেছে সেটাও ভুলে গিয়ে শুধু নিজেকে জিজ্ঞেস করুন যে, আপনি দেখা করতে চান কিনা আপনার মায়ের সাথে?”
একটু নরম হলো গহন। পাল্টা নিধিকে জিজ্ঞেস করল,
“তোমার কি মনে হয় দেখা করা উচিত?”
“আপনি যা চাইবেন আমি তাতেই আপনার পাশে থাকবো। আমি শুধু চাই আপনি ভালো থাকুন। আমি চাই না ভবিষ্যতে গিয়ে কখনো আপনি নিজেকে অপরাধী ভাবুন। আমি তো ওই ভদ্রলোক কে নিষেধ করেছিলাম তার কারণ আপনি চাইছিলেন না। আপনি চাইলে ঠিক আছে, দেখা করতে যাব। কি এমন ব্যাপার। আপনার সৎ মায়ের সাথে যদি একই ছাদের নিচে থাকতে পারি। ওনার সাথে গিয়ে একবার দেখা করে আসতে পারবো না?”
গহন অস্থির হয়ে উঠলো। নিজে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারল না। আবারো নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল
“তুমি বলো কি করা উচিত? তুমি যা বলবে তাই করবো। আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না, নিধি।”
“ঘৃণা করেন আপনার মা কে?”
নিধির প্রশ্নটা শুনে হঠাৎ করেই গহন আবার কেমন যেন শান্ত হয়ে গেল। গহনের থেকে কোন উত্তর না পেয়ে নিধি আবারো সেই একই প্রশ্নটা করল গহন কে। এবারে গহন উত্তর দিল। নিধির দিকে তাকিয়ে নির্জীব গলায় বলল,
“ঘৃণা করি না। যতই হোক মা তো। ঘৃণা কি করে করি? সৎ মা এত কষ্ট দিল, আজ অব্দি তো তাকেই কখনো ঘৃণা করতে পারলাম না। আর সেখানে উনি তো আমার জন্মদাত্রী। তবে খুব কষ্ট জমা হয়ে আছে মনের মাঝে। অভিমান! অনেক অভিমান জমে আছে। ভুলতে পারিনা সেসব। শুধু মনে হয় শেষবার আম্মু কথা দিয়ে গিয়েছিল যে ফিরবে। কিন্তু আর ফিরলো না কেন? ওই মিথ্যে আশ্বাসটা আমি ভুলতে পারিনা। আমি তো অপেক্ষায় ছিলাম।”
“ওনার অসুস্থতার কথা শুনে খারাপ লেগেছে?”
“ভীষণ। মানে ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত না যে, মা ম রে যাবে? কতই বা বয়স ওনার। তাও আবার এমন কঠিন একটা রোগ ধরল। আমার সাথে না থাকুক, তবুও বেঁচে থাকুক তাই না? মা রা যাওয়ার কি দরকার? উনি যেই সুখের আশায় চলে গিয়েছিলেন সেই সুখটা ঠিক করে তো ভোগই করতে পারলেন না। কয় বছরই বা হয়েছে? এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন মানতে খুব কষ্ট হবে নিধি।”
শেষের দিকে গহনের গলাটা ধরে এলো। নিধির বুঝতে আর বাকি রইলো না যে গহনের মন আসলে কি চাইছে। শুধু কিছু অভিমান গহনকে বাধা দিচ্ছে। পুরনো সেই ক্ষতগুলো বারবার ওদের মা ছেলের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
_____________
হঠাৎ করেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজে গহন দুদিনের জন্য শহরের বাইরে গেল। গহন নিজেও জানতো না যে এভাবে হঠাৎ করে ওকে যেতে হবে কোন আগাম প্রস্তুতি ছাড়াই। নিধির মনটাও তাই আজ ভীষণ খারাপ।
বাড়িটাও কেমন যেন হয়ে গেছে। আগে তো তাও ঝগড়াঝাঁটি হতো, ভালো লাগতো। সারাক্ষণ বাড়ির পরিবেশটা মেতে থাকতো। একটা টানটান উত্তেজনা ভাব থাকত। কিন্তু এখন তো আর তাও হয়না। নিধির সবথেকে বড় প্রতিপক্ষ সালমা বেগমই তো শান্ত হয়ে গেছেন। নিধি তো ওনাকে বোঝাতে পারেনা যে, ওনার এই শান্ত রূপটা নিধির সহ্য হয় না। কষ্ট হয় ওনার সাথে ঝগড়া করতে না পারলে। নিধির বুকে ব্যথা হয়। কিন্তু উনি তো আর নিধিকে ভালোবাসেন না যে নিধির কষ্টগুলো বুঝবেন।
এদিকে সালমা বেগম তখন নিজের ঘরে মন ম রা হয়ে বসে আছেন। শরীরটা ভীষণ খারাপ। ভীষণ ঠান্ডা লেগেছে, জ্বর এসেছে, নিঃশ্বাস নিতেও হালকা একটু কষ্ট হচ্ছে। গহন বাড়িতে না থাকার কারণে মনটা ওনারও খারাপ। যদিও আজকাল আর গহনের সাথে তেমন একটা কথাবার্তা হয় না। দেখা সাক্ষাতও খুব কমই হয়। তাও গহন বাড়ি থাকলে ভালো লাগে। গহনকে ছাড়া থাকতে পারেন না তিনি।
সালমা বেগম তখন বিশ্রাম নিচ্ছেন। এরই মাঝে ঘরে সাবিত এলো।
“পাঁচ হাজার টাকা দাও তো।”
সাবিতের কন্ঠটা কানে যেতেই সালমা বেগম চোখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে ছেলের দিকে তাকালেন। নিজেই কষ্ট করে উঠে বসে দুর্বল কণ্ঠে সাবিত কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“কেন?”
এত জবাবদিহি করতে সাবিতের ভীষণ বিরক্ত লাগে। বিরক্তিকর গলাতেই বলল,
“দিতে বলেছি, দাও। কেন, কি করব এসব শুনে তুমি কি করবে? বুঝবে না তুমি ওসব।”
“কিভাবে বোঝালে বুঝবো সেভাবেই বোঝাও। আর তাছাড়া আমার কাছে এত টাকা নেই। আমার কাছে এখন কোন টাকাই নেই। আমি তো নিজেই গহনের থেকে টাকা নেই। আর এখন ও বাড়িতে নেই।"
সালমা বেগমের কথাগুলো শুনতেই সাবিতের মাথাটা এবারে গরম হয়ে গেল। হিংস্র গলায় বলল,
“আরো সবকিছু ওর কাছে দিয়ে রাখো। আর দুদিন পরপর ফকিন্নির মতন হাত পেতে টাকা চাও। শোনো, আমি ওর কাছে ভিক্ষে চাইতে পারবো না। তুমি না হয় ফকিন্নি ঘর থেকে এসেছিল সেজন্য তোমার ভিক্ষে চাওয়ার স্বভাব আছে। কিন্তু আমি ফকিন্নির ঘরের ছেলে না। আমার নিজের অংশ চাই।”
ছেলের থেকে অপমানজনক কথা শুনে সালমা বেগম খুবই কষ্ট পেলেন। ঠিক কতটা আঘাত পেলেন সেটা বলে বোঝাতে পারবেন না। তবে কষ্ট পেলেও তিনি কাঁদলেন না। বরং আলতো হেসে সাবিতের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“যে অপমানটা তুমি আমায় করলে, যদি আজ এখানে গহন থাকতো তবে তুমি ওর থেকে আর একটা টাকাও পেতে না। তোমার এই অপমানের উপযুক্ত জবাব দিয়ে দিত। তুমি আমার পেটের ছেলে হয়ে আমায় যে সম্মান দিতে জানো না, ও আমার সতীনের ছেলে হয়ে সেই সম্মান দেয়।”
সাবিত খেঁকিয়ে উঠে বলল,
“তো ওর থেকেই গিয়ে সম্মান নাও। আমার এত সম্মান দেওয়ার ঠ্যাকা পড়েনি। আমার টাকা চাই বুঝতে পেরেছো? টাকা লাগবে। টাকা দেবে তো সম্মান পাবে। দেবে না তো কিচ্ছু পাবে না।”
“তার মানে এখন মা ডাকটাও কি টাকা দিয়ে কিনে নিতে হবে?”
সাবিত নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
“হ্যাঁ তাই। বললাম তো টাকা দেবে তো সব পাবে। টাকা দেবে না তো কোন বা লও পাবে না। আমার অংশ আমার চাই। ওই কু ত্তা র বাচ্চাকে বলে দিও আমি টাকার জন্য ওর গোলামী করবো না। ওর সামনে গিয়ে লেজ নাড়াবো না। আমার অংশ যেন ভালো মানুষের বাচ্চার মতন চুপচাপ দিয়ে দেয়। আর যদি ভালো মত না দেয় তবে ওই বা ই ন চো দে র থেকে কি করে টাকা বের করে নিতে হয় সেটা আমার খুব ভালো করে জানা আছে।”
কথাগুলো বলে সাবিত বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। অবাক করার বিষয় হলো সালমা বেগম এখনও কাঁদছেন না। ছেলে তাকে নোংরা নোংরা কথা শুনিয়ে গেল, কত কঠিন বাক্য বলে গেল। কিন্তু তারপরও তিনি কাঁদছেন না।
আসলে সালমা বেগমের বাকি ছেলেমেয়ে ওনাকে অবহেলা করলে ওনার খুব একটা কষ্ট হয় না। তিনি হয়তো নিজেও এই ব্যাপারটা খুব ভালো করেই জানেন যে উনি ওনার ছেলে মেয়েদেরকে এমন শিক্ষা দিয়েছেন যে শিক্ষার মাঝে মা কে সম্মান করার বিষয়টা উল্লেখই নেই।
কিন্তু গহনের শিক্ষা আলাদা। গহন সম্মান করতে জানে, ভালোবাসতে জানে। সে জন্যই তো গহনের থেকে কিঞ্চিত পরিমাণ অসম্মান পেলেও কষ্টে বুক ফেটে কান্না আসে।