সকালে চোখ মেলে তাকাতেই নিধি নিজেকে গহনের উন্মুক্ত বুকের উপরে আবিষ্কার করলো। আবহাওয়া আজ বেশ ঠান্ডা। ভোরের দিকে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। কিন্তু নিধি বুঝল না এই ঠান্ডা আবহাওয়ায় গহন এমন টি-শার্ট খুলে ঘুমিয়েছে কেন।
পরমুহূর্তেই নিজের দিকে তাকাতেই দেখল গহনের টি-শার্ট নিধির পরনে। সঙ্গে সঙ্গে রাতের মুহূর্ত গুলো মনে পড়তেই লজ্জায় মিইয়ে গেল নিধি। কি করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। রাতে তো এত লজ্জা লাগেনি। তখন তো তাও গহন জেগেছিল। এখন তো গহন ঘুমােচ্ছে, সকাল হয়ে গেছে। তাহলে এখন যে এত লজ্জা কেন লাগছে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না নিধি।
তবে আর যাই করুক না কেন এখন আর নিধি অন্তত গহন কে এভাবে জড়িয়ে ধরে ঘুমোতে পারবে না। আর এক মুহূর্ত শুয়ে থাকতে পারবে না।
উঠতে ধরে খেয়াল করল গহন এক হাতে নিধির কোমর পেঁচিয়ে ধরে আছে। নিধি খুব সাবধানতার সাথে গহনের হাতটা সরালো। নিধি খুব সাবধানতার সাথে কাজটা করেছিল, যার ফলে বিশ্বাস ছিল গহনের ঘুম ভাঙবেনা। কিন্তু নিধির বিশ্বাসটা ভুল প্রমাণিত হলো।
যেই না উঠে চলে যেতে ধরলো অমনি পিছন থেকে গহন ওর হাত টেনে ধরল। সঙ্গে সঙ্গে নিধি খিঁচে চোখ দুটো বন্ধ করে নিল। পিছন থেকে গহন ঘুম জড়ানো গলায় বলল,
“কোথায় যাচ্ছো?”
নিধি পিছন ফিরে না তাকিয়ে উত্তরে বলল,
“ফ্রেশ হতে যাচ্ছি।”
“একা একাই?”
এবারে আর নিধি গহন এর দিকে না তাকিয়ে উত্তরটা দিতে পারল না। কপাল কুঁচকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে বলল,
“ফ্রেশ হতে আবার ক’জনে একসাথে যায়?”
গহন একটা হ্যাচকা টান দিয়ে নিধিকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বলল,
“দুজনে মিলে ফ্রেশ হতে হয়। চলো, তুমি আর আমি একসঙ্গে গিয়ে ফ্রেশ হই।”
নিধি তড়িৎ গতিতে বলে উঠলো,
“কক্ষনো না। নির্লজ্জ চরিত্রহীন ছেলে, ছাড়ুন আমায়।”
“আচ্ছা ঠিক আছে ছেড়ে দেব। তবে আমার টি শার্ট দিয়ে যাও।”
“আরে তো দিচ্ছি আপনার টি-শার্ট। আমার কি নিজের জামা-কাপড় নেই নাকি?”
গহন ছেড়ে দিল নিধিকে। নিধি সোজা হয়ে উঠে বসে সত্যি টি-শার্টটা খুলতে ধরল। একটু তুলতেই আবার থেমে গেল। মনে পড়ে গেল ওর নিজের জামা তো ওর গায়ে নেই।
চোখ বড় বড় করে গহনের দিকে তাকাতেই দেখল ছেলেটা ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে তুলে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। নিধির যেমন লজ্জা হলো ঠিক তেমনি নিজের প্রতি রাগও হলো। তবে সম্পূর্ণ রাগটা গিয়ে পড়ল গহনের উপর। একটা ঝাড়ি দিয়ে বলল,
“ছিঃ। আপনি অত্যন্ত নির্লজ্জ স্বভাবের একটা ছেলে।”
“তোমার সঙ্গ পেয়েই এমন হয়ে গিয়েছি। নয়ত আগে আমি ভালোই ছিলাম। অফিসে, আমার বাড়ির লোকদের জিজ্ঞেস করে দেখো। সবাই একবাক্যে বলবে, গহনের মতন ভদ্র ছেলে কেউ দেখেনি।”
নিধি তর্ক করতে ধরেও আবার থেমে গেল। গহন বাড়ির কথাটা তুলতেই নিধির সিনথিয়ার কথা মনে পড়লো। গুরুতর ভঙ্গিতে গহন কে বলল,
“শুনুন, একটা কথা বলার ছিল।”
গহন আগ্রহী গলায় বলল,
“হ্যাঁ, বলো।”
সিনথিয়ার ব্যাপারটা নিধি, গহন কে জানালো। সেই সাথে বলল যেন সিনথিয়ার সাথে কথা বলে। সবটা শুনে গহনও আশ্বস্ত করল নিধি কে যে, ও কথা বলবে সিনথিয়ার সাথে।
___________
বউয়ের ডাকে সাড়া দিয়ে যে কি বিপদে পড়েছে গহন তা বলে বোঝাতে পারবে না। কাজ শেষ না করেই তো চলে এসেছিল। বাদলকে রেখে এসেছে যদিও। ছেলেটা এখন সমানে কল করে গহনের থেকে এটা শুনতে চাইছে, ওটা শুনতে চাইছে।
এদিকে নিধি স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে যে গহন আর যেতে পারবে না। এদিকে বেচারা গহন বউয়ের আবদার ফেলে যেতেও পারছে না। আসলে বেশি ভালোবাসলে যা হয়। না শান্তিতে থাকতে পারছে, না বউয়ের আবদার ফেলতে পারছে। প্রশ্রয় দিয়ে দিয়ে মেয়েটাকে একেবারে মাথায় তুলেছে। এখন সংসার, কাজের জায়গা সব এক করে ফেলছে। যে কোনদিন এই মেয়ে গহনের ব্যবসায় লাল বাত্তি জ্বালাবে।
গহন তখন ল্যাপটপে বসে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে। ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করছে। দুপুরে খাওয়ার সময় অব্দি পায়নি। গহনের এই ব্যস্ততার মাঝেই হঠাৎ করে ওর কানে একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
“ভাইয়া!”
কন্ঠটা যে সিনথিয়ার সেটা গহনের চিনতে এক মুহূর্তও দেরি হলো না। সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে দরজার দিকে তাকাতেই দেখল স্বয়ং সিনথিয়া দাঁড়িয়ে আছে। বিধ্বস্ত তার চেহারা। চোখ মুখ কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে আছে। উসকো খুসকো চুল। পায়ে ঘরে পরার চটি স্যান্ডেল। পরনে একটা সাধারণ সালোয়ার কামিজ। মনে হয় বাড়িতে যেরকম ছিল সেভাবেই চলে এসেছে। দু চোখ এখনো যেন ভেজা। নিষ্প্রাণ দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে কত অসহায়ত্ব জমা হয়ে আছে সেই চোখ দুটোর মাঝে।
গহন চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বিস্মিত গলায় বলল,
“সিনথিয়া! তুমি এখন এখানে?”
সিনথিয়া ভিতরে এলো। এগিয়ে এসে ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লো। গহনের কেন যেন বিষয়টা ঠিক লাগছে না। একেই তো সিনথিয়া অফিসে আসেনা। তার উপরে আবার যদি আসেও এভাবে তো আসার কথা না।
গহন তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে গিয়ে সিনথিয়ার পাশে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদূরে গলায় বলল,
“সিনথিয়া, কি হয়েছে? বাড়িতে কিছু হয়েছে? মা বকেছে?”
সিনথিয়া কোন উত্তর দিল না। একটু বিরতি নিয়ে গহনই আবার জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা, পরীক্ষা নিয়ে চিন্তায় আছো? এত ভাবতে হবে না। তুমি যেখানে পড়তে চেয়েছো আমি তোমাকে সেখানেই পড়াবো। শুধু টেনেটুনে একটু কষ্ট করে পাসটা করো। আমি আছি তো। যত টাকাই লাগুক আমি পড়াবো তোমায়।”
সিনথিয়া কিছুক্ষণ গহনের দিকে তাকিয়ে রইল। সিনথিয়ার সেই চোখ দুটো অনেক কিছু বোঝাতে চাইছে গহনকে। কিন্তু ঠিক বোঝাতে পারছে না। গহন আবারও যেই না কিছু বলে উঠতে যাবে তার আগেই সিনথিয়া কেঁদে উঠলো। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল গহন। ব্যতিব্যস্ত গলায় বলল,
“কি হলো কাঁদছো কেন?”
সিনথিয়া কোন উত্তর দিতে পারল না। ক্রমাগত কেঁদেই গেল। মাঝে গহন বেশ আরো অনেকবার জিজ্ঞেস করল যে কি হয়েছে, কেন কাঁদছে। কিন্তু সিনথিয়া একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না। একটু থামল গহন। সময় দিল সিনথিয়া কে।
বেশ অনেকটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর যখন সিনথিয়ার কান্নার বেগটা একটু কমে এলো তখন গহন সযত্নে সিনথিয়ার চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,
“কি হয়েছে? আমায় বলো।”
সিনথিয়ার কমে যাওয়া কান্নার বেগটা আবারো বাড়লো। দুহাতে গহনের হাতটা খামচে ধরে ক্রন্দনরত গলায় বলল,
“আমি অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি, ভাইয়া। আমি সত্যি বুঝতে পারছি না আমি কি করে এতটা বোকামি করে ফেললাম। আমি খুব বড় ভুল করে ফেলেছি।”
গহনের চিন্তা এবারে আরও বাড়লো। সিনথিয়ার চোখ মুখের অবস্থা দেখে ব্যাপারটা খুবই গুরুতর মনে হচ্ছে। তার উপরে আবার নিজ থেকে স্বীকার করছে যে ভুল করেছে। ঠিক কত বড় ভুল করলে যে সিনথিয়া নিজের দোষ নিজেই স্বীকার করতে পারে সেটা ভেবেই গহনের শরীর শিউরে উঠছে। তবে রাগারাগি করল না। এখন রাগারাগি করলে সিনথিয়া কিছু বলতে চাইবে না। শান্ত গলাতেই বলল,
“যদি কোন ভুল করে থাকো তার সমাধানও নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু কি করেছ সেটা আমায় বলো আগে?”
সিনথিয়া আবারও সেই একই কথার পুনরাবৃত্তি করল,
“আমি ভুল করে ফেলেছি, ভাইয়া। অনেক বড় ভুল করেছি। তোমরা শুনলে কেউ আমাকে ক্ষমা করবে না। মা শুনলে মে রে ফেলবে আমায়। তোমরা আমার জন্য কাউকে মুখ দেখাতে পারবে না। আমি নিজের জীবনটা তো শেষ করেই দিয়েছি। সেই সাথে তোমাদের সবার সম্মানও শেষ করে দিয়েছি।”
কথাটা বলে সিনথিয়া আরেক দফা কান্নায় ভেঙে পড়ল। গহন এবারে একহাতে সিনথিয়াকে আগলে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ফের আদূরে গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কেউ কিছু বলবে না। মা কিচ্ছু বলবে না আমি তোমায় কথা দিচ্ছি। তার আগে আমায় বল কি করেছ?”
কথাটা বলে গহন সিনথিয়াকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে আবারও ওর চোখের জল মুছে দিল। সিনথিয়া হেঁচকি তুলতে তুলতে কম্পিত গলায় বলল,
“মা যার সাথে বিয়ে ঠিক করেছিল আমি তাকে বিয়ে করতে চাই না। আমি মাকে বলেছিলাম যে আমি একজনকে পছন্দ করি। কিন্তু মা রাজি হয়নি। পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছিল বিয়ে দেবে না ওর সাথে। অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছি মা কে। মা রাজি হয়নি। কিন্তু আমি ওকে হারাতে পারতাম না। আমি ওকে খুব ভালোবাসতাম। সেজন্য…....।”
“সেজন্য কি করেছো?”
“বববিয়ে করে নিয়েছিলাম। আমরা একমাস আগেই বিয়ে করে নিয়েছিলাম।”
গহন চমকে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“বিয়ে করেছ?”
সিনথিয়া উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোধক উত্তর জানাতেই গহন আরেক দফা চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“মাথা ঠিক আছে তোমার? কি বলছ বুঝতে পারছ? দেখো সিনথিয়া, এগুলো কিন্তু মজা করার বিষয় না। তোমার কোন আন্দাজ আছে যে, তুমি কি বলছো আমায়?”
সিনথিয়া অসহায় দৃষ্টিতে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কি করতাম? মা শুনছিল না আমার কথা। সেজন্য বিয়ে করে নিয়েছি।”
“আমাকে একবার জানাতে পারতে। আমি মায়ের সাথে কথা বলতাম। তাই বলে কাউকে না জানিয়ে বিয়ে করে ফেললে? একা একা এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতন বয়স হয়েছে বলে তোমার মনে হয়?”
সিনথিয়া নাক টানতে টানতে বলল,
“বলেছিলাম মা কে যে আমি তোমায় বলে দেব। কিন্তু বলতে দেয়নি। শাসিয়েছিল যেন তোমায় না বলি।”
গহন এবার রাগান্বিত গলায় বলল,
“মায়ের ভয়ে আমায় কিছু জানাতে পারোনি। অথচ গিয়ে বিয়ে করে নিয়েছ।”
কথাটা বলে গহন আবারও ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল। কিছুক্ষণ আগে নিজেকে সময় দিল শান্ত হওয়ার জন্য। তারপরে জোরে জোরে কয়েকটা নিঃশ্বাস ছেড়ে আবার সিনথিয়ার দিকে তাকাল। দেখল মেয়েটা এখনো কাঁদছে। গহন নিজেকে একটু সামলে নিয়ে আবারও শান্ত গলায় বলল,
“কাকে বিয়ে করেছ? ছেলের নাম কি? কোথায় থাকে? কি করে? ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড কি? পরিচয় হলো কি করে তোমার সাথে?”
“আমার বান্ধবীর ভাই। মাঝে মাঝে তো ওদের বাড়িতে যেতাম। তখনই পরিচয় হয়েছিল। ফোনে কথা হতো।”
“ওর পরিবার জানত তোমাদের বিয়ের সম্পর্কে?”
“ওর বোন জানত শুধু। আর ওর কয়েকটা বন্ধু জানত। তারা বিয়েতে সাক্ষী ছিল।”
“মানে ছেলের বাবা মা জানে না?”
“এখন জানে। কিন্তু…...”
“কিন্তু কি?”
“ওরা মেনে নিচ্ছে না।”
গহন উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল,
“আর ছেলে? ছেলেটা কি বলছে? ও ঠিক আছে তো?”
সিনথিয়া এবারে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল,
“ও অস্বীকার করছে, ভাইয়া। ও পুরো বদলে গেছে। বলছে আমাদের নাকি কখনো বিয়েই হয়নি। আমার কাছে কোনো প্রমাণও নেই। সব সাক্ষী ওই জোগাড় করছিল। ওরাও অস্বীকার করছে। ওর বোন, মানে আমার বান্ধবীও বলছে আমাদের নাকি কখনো বিয়েই হয়নি। আমি নাকি ওর ভাই কে ফাঁসিয়েছি।”
গহন নিজেই নিজের মাথার চুল খামচে ধরল। সিনথিয়া কে বলছিল যে ভুল করলে সমাধান আছে। কিন্তু গহন তো এর কোন সমাধান দেখতে পাচ্ছে না।
_________
সালমা বেগম তেড়ে এসে সিনথিয়ার গালে ঠাস করে একটা চড় মা র লে ন। গহন সিনথিয়ার থেকে দূরে বিছানার ওপরে বসে ছিল। সেই জন্য সালমা বেগমের অতর্কিত আক্রমণটা আটকাতে পারেনি। সালমা বেগম চ ড়টা মা রা র সাথে সাথে গহন উঠে এগিয়ে গেল ওনাকে থামানোর জন্য। ততক্ষণে সালমা বেগম মেয়ের চুলের মুঠি ধরে ফেলেছেন।
গহন ছাড়ানোর চেষ্টা করেও পারছেনা ছাড়াতে। ঘরে আরও অনেকে উপস্থিত আছে। বিছানার ওপরে শম্পা বসে আছে ছেলেকে কোলে নিয়ে। সে মোটেও সালমা বেগমকে আটকালো না। বরং সিনথিয়া কে আচ্ছা মত মা রা র জন্য বলল।
এক পাশে নিধি আর ঋতু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। ওরা দুজনে চুপচাপ নাটক দেখে যাচ্ছে। আটকানোর ইচ্ছে নেই। মোটকথা সিনথিয়া কে বাঁচানোর চেষ্টা একমাত্র গহনই করছে। তবে ঠিক সফল হতে পারছে না।
ব্যথায় আর্তনাদ করল সিনথিয়া। কিন্তু তবুও সালমা বেগম ছাড়লেন না। আরও শক্ত করে চুলের মুঠি খামচে ধরে হিংস্র গলায় বললেন,
“বারবার করে নিষেধ করেছিলাম ওই ফকিন্নির সাথে যোগাযোগ রাখবি না, যোগাযোগ রাখবি না। আমার কথা তো শুনলিই না। আবার সোজা বিয়ে করে নিলি? এত সাহস বেড়ে গেছে তোর? তোকে তো আজকে আমি মে রে ই ফেলব। তোর বিয়েও করতে হবেনা, সংসারও করতে হবে না। তোকে বাঁচতেই হবে না।”
সিনথিয়া আবারো আর্তনাদ করে ছেড়ে দিতে বলল। তবে সালমা বেগম কিছু শোনার মানসিকতায় নেই। অবশেষে বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টার পর গহন সালমা বেগমের থেকে সিনথিয়া কে ছাড়াতে সক্ষম হল। ওকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে রাগান্বিত গলায় সালমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এসব কোন ধরনের আচরণ হচ্ছে, মা? এখন কি মা রা মা রি র সময় বলে তোমার মনে হয়? ওর গায়ে হাত তুললে সব ঠিক হয়ে যাবে?”
“না মা র লে ও শোধরাবে না। ওকে আড়াল করার চেষ্টা করো না। ওকে একমাত্র আমি সোজা করতে পারব।”
গহন ফের রাগান্বিত গলায় বলল,
“যখন জানো কেবলমাত্র তুমি ওকে সোজা করতে পারবে, তাহলে সময় থাকতে করোনি কেন? আজ যখন সবকিছু হাতের বাইরে বেরিয়ে গেছে তখন তোমার মনে হয়েছে ওকে সোজা করা দরকার? এই ব্যাপারটা কি একদিনে ঘটে গেছে? একদিনে কি বিয়ে পর্যন্ত চলে গেছে ওরা দুজনে?”
সালমা বেগম সিনথিয়ার দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললেন,
“এক বছর ধরে এইসব চলছে। ওই যে পেয়েছে হাতে একটা ফোন। দিন-রাত লেগে থাকে।”
“বাহ চমৎকার। ও এক বছর ধরে সম্পর্কে জড়িয়েছে আর এক বছর ধরে তুমি নাটকটা চুপচাপ দেখে যাচ্ছ। তুমি জানো যত নষ্টের মূল ওই ফোন। তারপরেও একবার ওর থেকে ফোনটা কেড়ে নাওনি। আমাকে একবারও জানাওনি যে ব্যাপারটা কতটা গুরুতর পর্যায় গিয়ে পৌঁছেছে। তাহলে আজ কেন ওকে দোষারোপ করতে এসেছ? মা হয়ে তোমার যা দায়িত্ব ছিল সেটা কি পালন করতে পেরেছ বলে তোমার মনে হয়? তোমার কি উচিত ছিল না তোমার মেয়ে কি করছে সেই দিকে খেয়াল রাখা?”
সালমা বেগম বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে গহনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তুমি আমায় দোষারোপ করছ কেন? তোমার কি মনে হয় আমি ওকে বলেছি লুকিয়ে বিয়ে করে রাখতে? নাকি আমি ওকে সম্পর্কে জড়াতে বলেছি?
“তা নিশ্চয়ই বলনি। তবে ওর কি করা উচিত, কি করা উচিত না সেই সম্পর্ক ওকে কখনো সঠিক শিক্ষাও দাওনি। দিন নেই, রাত নেই যখন তখন বন্ধুর বাড়ি যাবে বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। তুমি একবারও ওকে শাসন করেছো? আজ এই বান্ধবীর জন্মদিন, কাল ওই বান্ধবীর জন্মদিন, আজ এখানে ট্যুরে যাচ্ছে, কাল ওখানে যাচ্ছে কখনো বাধা দিয়েছ ওকে? কার সাথে যাচ্ছে সেই বিষয়গুলো খোঁজ নিয়েছো? আমি জিজ্ঞেস করলে ত্যাড়াব্যাকা উত্তর দিয়েছো। এমন একটা ভাব দেখিয়েছে যে আমি ওর সৎ ভাই, আমার এসব জানার কোন অধিকার নেই। আজ তো মেয়েরা অধঃপতন হবেই। সময় থাকতে শাসন না করলে তো মেয়ে হাত থেকে বেরিয়ে যাবেই।”
“তুমি আমায় দোষারোপ করছো?”
সালমা বেগম বিস্মিত গলায় প্রশ্নটা করলেন। গহন অকপটে বলে দিল,
“হ্যাঁ। আসলে দোষটা সিনথিয়ার না। দোষটা তোমার শিক্ষার। তুমি আশেপাশের দিকে নজর দিতে গিয়ে কখনো নিজের ছেলে মেয়েদের দিকে নজরই দাওনি। ফলস্বরূপ তিনটেই অমানুষ হয়েছে। একজন নিজের সংসার ভেঙে বসে আছে, আরেকজন ঘরে বউ রেখে প্রেমিকার সাথে গিয়ে আনন্দ করছে, তো আরেকজন লুকিয়ে বিয়ে করে রেখেছে। এগুলোর একটাকেও মানুষ বলে মনে হয় তোমার?”
হঠাৎ করে গহনের মুখ থেকে এমন চমৎকার কথাবার্তা শুনে নিধি আবেগে বিবেক হারিয়ে ফেলল। পরিবেশ পরিস্থিতি সব কিছু ভুলে বসে উচ্ছ্বসিত গলায় চেঁচিয়ে উঠে গহনকে বাহবা দিয়ে বলল,
“সাব্বাস গহন। একেবারে মোক্ষম জায়গায় আঘাতটা করেছেন। চালিয়ে যান।”
গহন কে বাহবা দেওয়ার জন্য নিধি একটা শিষও বাজাতে ধরেছিল। তবে তার আগেই সালমা বেগম অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাতেই থেমে গেল। সঙ্গে সঙ্গে হুঁশে ফিরলো নিধি। বুঝতে পারল কোথায় কি বলে ফেলেছে। যদিও অপরাধবোধ কাজ করলো না। কিন্তু একটু অস্বস্তি হলো। ফলস্বরূপ থেমে গেল।
সালমা বেগম নিধির উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে গহনের দিকে তাকিয়ে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললেন,
“আজকাল যেন তোমার স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে সব বিষয়ে আমায় দোষারোপ করা। খুব আনন্দ পাও আমাকে দোষারোপ করে, তাই না? নাকি নিজের স্ত্রীকে আনন্দ দাও?”
“সব কথার মাঝে নিধিকে টানবে না, মা। তোমার সব বিষয়ে সব সময় নিধিকে টেনে আনা স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যের মেয়ের দিকে নজর না দিয়ে নিজের মেয়ের দিকে নজর দাও। যদি নিজের ছেলে মেয়ের দিকে নজর দিতে একেকটা অন্তত মানুষ হত।”
অনেক কষ্টে সালমা বেগম গহনের কথাগুলো হজম করলেন। কেননা এখন এ ছাড়া আর ওনার কাছে কোন উপায় নেই। এই বিপদ থেকে বের হওয়ার জন্য গহনের সাহায্য প্রয়োজন। আর যদি উনি বাড়াবাড়ি করেন তাহলে গহন হাত গুটিয়ে নিতে পারে। যেটা ওনার জন্য মোটেই মঙ্গলজনক হবে না। সেজন্য তিনি গহনের কথাগুলো হজম করে নিয়ে একটা লম্বা শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে বললেন,
“ঠিক আছে। এসব কথা আপাতত বাদ দেই। এই জংলিকে নিয়ে কি করবো সেটা বল? আমি বলি কি বিয়ের তারিখ এগিয়ে আনি। বিয়ে দিয়ে দেই।”
গহন অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সত্যি তোমার কাছে এখন এটাই সমাধান মনে হচ্ছে? তোমার মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, মা।”
“সেটা শুধু ও জানে আর ছেলেটা জানে। তাও তো অস্বীকার করছে। বাকি তো কেউ জানে না। আর কারো জানার প্রয়োজনও নেই। যা হয়েছে সব ভুলে যাও। চুপি চুপি বিয়ে দিয়ে দেই। কেউ কিছু জানতে পারবে না।”
গহন রাগান্বিত গলায় বলে উঠলো,
“পাগলামির একটা সীমা থাকে, মা। প্রমাণ থাকুক বা না থাকুক সিনথিয়া তো বলছে যে কবুল বলে বিয়ে করেছে। এখন এক স্বামী থাকতে আরেক স্বামীকে গ্রহণ করবে কি করে? বোধ বুদ্ধি কি হারিয়ে গেল তোমার?”
সালমা বেগম নিজেও পাল্টা রাগান্বিত গলায় বললেন,
“তাহলে কি করতে বলছ আমায়? ফকিন্নির ঘরে মেয়েকে দিয়ে আসব?”
এতক্ষণ চুপচাপ গহন এর পিছনে গুটিশুটি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সিনথিয়া। সালমা বেগমের শেষ বাক্যটা শুনে কম্পিত গলায় গহন কে বলে উঠলো,
“রবিন মোটেও গরীব না, ভাইয়া। ওর বাবার ব্যবসা আছে। ও, ওর বাবার ব্যবসাতে যোগ দিয়েছে। ওরা ফকিন্নি না।”
মেয়ের মুখ থেকে কথাটা শুনতেই সালমা বেগম ওর দিকে তেড়ে যেতে ধরলেন। গহন ওনাকে বাধা দিয়ে চোখ রাঙিয়ে ইশারায় থামাতে বলল। তারপরে সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ফকির হোক বা বড়লোক হোক সেটা আসল ব্যাপার না। কিন্তু ছেলে তো বিয়েটাকে অস্বীকার করছে। কোন প্রমাণও তো রাখোনি। কাবিনের কাগজপত্র কার কাছে?”
সিনথিয়া মিনমিনে গলায় বলল,
“সব ব্যবস্থা তো ওই করেছিল। আমি তো কিছু জানি না। আমার কাছে তো কোন কাগজপত্র নেই।”
“বাহ খুব ভালো করেছো। তোমার বুদ্ধির প্রশংসা না করে তো থাকা যায় না। মা কে তো আটকাচ্ছি তোমাকে যেন না মা রে। তবে বিশ্বাস করো আমার নিজের ইচ্ছে করছে থা প ড়ি য়ে তোমার গাল লাল করে দিতে। এমন অসভ্য যে কি করে তৈরি হলে ভাবতেই পারছি না। বিয়ের ছবি তো অন্তত আছে?”
সিনথিয়া দু দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“না নেই। মা তো প্রায়ই আমার ফোন চেক করে। সেই ভয়ে আমার ফোনে একটা ছবিও তুলিনি।”
গহন এবারে আর বলার মতন কোন শব্দই খুঁজে পেল না। শুধু অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সিনথিয়ার দিকে। খারাপ করে দিল এরা গহনের মাথা। না নিজেরা শান্তি মত বাঁচবে, না গহন কে শান্তিতে বাঁচতে দেবে। গহনের তো নিজেকেই এখন থা প ড়া তে ইচ্ছে করছে। কেন যে নিজেকে এদের থেকে দূরে রাখতে পারে না কে জানে?