“আমি বিয়ে করতে চাই না, আম্মু। আমার পক্ষে বিয়ে করা সম্ভব না।”
জারার কথার প্রেক্ষিতে জুবাইদা গম্ভীর গলায় বললেন,
“কত বছর ধরে তোমার মুখ থেকে এই একই কথাটা শুনছি আমি, সে হিসেব কি তোমার আছে? আবিদ ভালো ছেলে। তোমায় পছন্দ করে। কত ভালো একটা সম্বন্ধ এসেছে। আর তোমার বিয়ে করবো না এই এক কথা শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত। আরো কবে করবে বিয়ে?”
জারা একটা লম্বা শ্বাস টেনে বলল,
“কখনোই না। বিয়েই তো একজন মানুষের জীবনের সবকিছু হতে পারে না, তাই না? আবিদ ভালো না খারাপ আমি জানি না। আমি একাই বেশ ভালো আছি। ছেলেদের আমি খুব ভালো করে চিনি। শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কথা তো মুখে আনতেও ভয় হয়। এসব ঝামেলায় আমি নেই।”
“সবাই এক হয় না। তুমি গহন কে দেখছো না, কিভাবে নিধির পাশে থাকছে?”
“সমস্যা তো ওখানেই মা। নিধির পাশে গহন আছে। আমার পাশে তো থাকবে না। গহনের মতন কেউ হতে পারবে না। গহন একজনই ছিল। আর কোন গহন কে পাওয়া যাবে না। তাই আমার বিয়ে করার ইচ্ছেও নেই।”
মেয়ের কথাটা কেমন যেন অদ্ভুত লাগলো জুবাইদার কাছে। হঠাৎ করে গহনের মতন কেউ নেই জন্য বিয়ে করবেনা এই সিদ্ধান্তে অটল হয়ে পড়লো কেন জারা? উনিও গহনের উপমা দিয়েছিলেন। কিন্তু জারার উপমা দেওয়াটা কেমন অদ্ভুত লাগলো না?
এগিয়ে গিয়ে জারার বাহু ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করিয়ে বললেন,
“আমার দিকে তাকাও তো। কেন বিয়ে করবে না? আগে তো তুমি এমন ছিলে না। ভয়ে পালানোর মেয়ে তো তুমি ছিলে না। তোমাকে তো আমি এভাবে বড় করিনি। কি হয়েছে মা বলো আমায়? বিয়ে শব্দটাকে এত ঘৃণা করছো কেন? বিয়ে সবাইকেই করতে হয়। জীবনসঙ্গী সবারই প্রয়োজন হয়, যে তোমার সুখে-দুঃখে, বিপদে আপদে পাশে থাকবে।”
জারা চুপচাপ মনোযোগ দিয়ে শুনে গেল জুবাইদার বলা কথাগুলো। তারপর হঠাৎ করে জুবাইদা কে জড়িয়ে ধরলো।
আরেক দফা চমকালেন জুবাইদা। মেয়ে তো কখনো এমন করে না। হঠাৎ করে এভাবে ওনাকে জড়িয়ে ধরাটা যেন ঠিক লাগলো না। মনে হলো মেয়ে ওনার খুব অসহায়। একটু যেন স্নেহের প্রয়োজন। মেয়েকে আগলে নিলেন তিনি। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদূরে গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“এমন কি কিছু হয়েছে মা, যা আমি জানিনা? আমাকে কি বলা যায় না?”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও জারার গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল,
“আমি এগোতে পারছি না, মা। চেয়েও এগোতে পারছিনা। মনের মাঝে যে কষ্টগুলো লুকিয়ে রেখেছি সেগুলো কাউকে বলতেও পারছিনা। এমন একটা জায়গায় আটকে গেছি যে নিজেকে আর সেখান থেকে বের করতে পারছি না। আমি ভুলতে পারছিনা ওকে। ও ভালো আছে, সংসার করছে, আমি খুব খুশি। আমি চাই ও ভালো থাকুক। কিন্তু নিজেকে সামলাতে পারছি না। আমার খুব কষ্ট হয়, মা।”
জুবাইদার বুকটা ধ্বক করে উঠলো। তিনি বুঝতে পারছেন না যে তিনি যা আন্দাজ করছেন সেটাই ঠিক কিনা। কিন্তু যদি সেটা ঠিক হয়ে থাকে তবে তিনি এতদিন সেটা আন্দাজ করতে পারলেন না কেন?
জারা কে নিজের থেকে ছাড়িয়ে ওর মুখের দিকে তাকাতেই দেখলেন মেয়ে অঝোরে কাঁদছে। উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“কাঁদছো কেন? আর কার কথা বলছো?”
জারা নিজের কান্না আটকানোর চেষ্টা করে দু দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“কারো কথা বলছি না।”
কথাটা বলে জারা সেখান থেকে চলে যেতে ধরলে জুবাইদা ওর হাত টেনে ধরে বললেন,
“আমি যাকে সন্দেহ করছি তার কথা বলছো না তো?”
জারা চমকে উঠলো। জুবাইদার দিকে তাকাতেই বুঝলো উনি ঠিকই সন্দেহ করেছেন। জারার মনে হলো কথাটা আর লুকিয়ে লাভ নেই। এমনিতেও তো এখন আর কিছু করা সম্ভব না। মনটা একটু হালকা করা দরকার।
ধপ করে বিছানার উপর বসে পড়লো। দু হাতে চোখের জল মুছে নিয়ে বলল,
“আমার কোন অভিযোগ নেই গহনের প্রতি, মা। ও আমাকে না কখনো আশ্বাস দিয়েছে, আর না আমি বলতে পারব ও আমায় ঠকিয়েছে। আমি কেমন ভাবে যেন ওর ওপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলাম। আমি পাগলের মতন ওকে….....”
কথাটা সম্পূর্ণ করার আগে থামলো জারা। কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ করেই আবারো কেঁদে উঠে বলল,
“ভালোবাসতাম । এখনও বাসি। গহনের নিষেধ করা সত্ত্বেও আমি ভালোবাসি ওকে। কিভাবে যেন হয়ে গেছিল সবটা। ওকে বলেও ছিলাম। কিন্তু রাজি হয়নি। জানো মা, ও আমায় অপমান করেনি। খুব সুন্দর ভাবে বুঝিয়েছিল। তারপরে ও এগিয়ে গেছে জীবনে। কিন্তু আমি আর পারলাম না।”
মেয়ের কথাটা শুনে জুবাইদা নিজেও ধপ করে বসে পড়লেন। বিস্মিত গলায় বললেন,
“কবে হলো এসব? আমায় জানাওনি কেন? আমি কথা বলতাম গহনের সাথে। আমি তো নিজেই এই কথাটা ভেবেছিলাম একসময়। কিন্তু পরবর্তীতে তোমাদের দুজনের মাঝে শুধু স্বাভাবিক বন্ধুত্বের সম্পর্ক দেখে আমি আর এগোইনি। কেন সময় থাকতে আমায় বলোনি? আমি জানি, আমি গহন কে বললে ও আমায় খালি হাতে ফিরিয়ে দিত না।”
জারা অশ্রুসিক্ত নয়নে জুবাইদার দিকে তাকিয়ে বলল,
“সেজন্যই বলিনি। ভয় ছিল মনের মাঝে। গহন তো ওর মাকেও ভীষণ ভালোবাসে। একবার ভাবতাম যে হয়তো তুমি বললে ও রাজি হয়ে যাবে। কিন্তু সেটা তো আমায় ভালোবেসে গ্রহণ করা হতো না, মা। বাধ্য হয়ে গ্রহন করতো। আবার মনে হতো যদি ওর মায়ের কথা রাখতে গিয়ে তোমার কথা ফিরিয়ে দেয়। যদি ও তোমার কথা শুনেও আমাকে গ্রহণ না করে তাহলে তো তোমার মনে ওর জন্য একটা খারাপ ধারণা তৈরি হয়ে যাবে। তুমি গহনকে আর আগের মতন ভালোবাসতে পারবেনা, ওকে স্নেহ করবে না। কিন্তু আমি তো এমনটা চাইনি, মা। আমি সব সময় চেয়েছি গহন যেন ভালোবাসা পায়। ও যেন ভালো থাকে। আমি চাইনি মা, গহন আর তোমার সম্পর্কটা খারাপ হয়ে যাক। আমি চাইনি কখনো ও অশান্তিতে থাকুক। ও খারাপ থাকুক সেটা আমি চাইনি। তাই বলাও হয়নি।”
কথাগুলো বলে জারা আরো বেশ অনেকটা সময় নিয়ে কাঁদলো। জুবাইদা সান্ত্বনা দিলেন না মেয়েকে। তিনি অবাক হচ্ছেন এটা ভেবে যে কতবড় একটা ত্যাগ করেছে জারা গহনের ভালোর কথা ভেবে।
জুবাইদার এসব ভাবনার মাঝেই জারা নিজের কান্না থামিয়ে ওনার দিকে ঘুরে বসে অনুরোধের স্বরে বলল,
“এই কথাগুলো তুমি কাউকে বলো না, মা। গহন বা নিধির কানে যেন ভুলেও এই কথাগুলো না যায়। ওরা দুজনেই জানে আমি জীবনে এগিয়ে গিয়েছি। আমি চাই না আমার জন্য ওদের সম্পর্কে কোন ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হোক। ওরা ভালো থাকুক আমি সেটাই চাই। গহন ভালো আছে এটাই আমার জন্য যথেষ্ট। আমার সাথে না হোক, নিধির সাথে ভালো আছে এই যথেষ্ট। আমি আসলে ওর যোগ্য নই। নিধি গহনের ভালোর জন্য যা কিছু মানিয়ে নিয়েছে, আমি হয়ত পারতাম না সেগুলো করতে। নিধিই গহনের জন্য সঠিক। আমি গহন এর যোগ্য ছিলাম না তাই ওকে পাইনি।"
“এজন্যই কি দেড় বছর নিজেকে ঘর বন্দী করে রেখেছিলে? সবকিছু থেকে দূরে সরে ছিলে এই কারণেই? আর আমাকে মিথ্যে অজুহাত দেখিয়েছো?”
জারার বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। বিষন্ন গলায় বলল,
“হ্যাঁ। গহন লন্ডন থেকে চলে আসার পরেই এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা আমায় ঘিরে ধরেছিল। ও আসার আগে আমি ওকে আমার মনের কথা জানিয়েছিলাম। আর ওর রাজি না হওয়ার প্রভাবটা বেশি পড়েছিল আমার ওপরে। সবকিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলাম। বন্ধুবান্ধব, আড্ডা, ঘোরাফেরা, পড়াশুনা সবকিছু থেকে। তবে আমি এখন ঠিক আছি।”
জুবাইদা কাতর দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তবে কিছু আর বললেন না। জারা শুধু মুখেই বলছে ও ঠিক আছে। কিন্তু ওর মনের অবস্থা তো ওর কান্না দেখেই আন্দাজ করে ফেলেছেন জুবাইদা।
________
গহন আর আজ নিধিকে ভার্সিটি থেকে আনতে যেতে পারেনি। গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল। যদিও ড্রাইভারকে বলেছিল নিধিকে বাড়িতে রেখে আসতে। তবে নিধি বাড়ি যায়নি। সরাসরি গহনের অফিসে এসেছে।
একদিন এসেই গহনের কেবিন চিনে গেছে। সেজন্য আজ কাউকে জিজ্ঞেস করতে হলো না। সোজা গেল গহনের কেবিনের দিকে। মেয়েটা যেন স্বাভাবিক ভাবে হাঁটতে পারে না। হাতে থাকা ব্যাগটা নিয়ে হেলিয়ে দুলিয়ে লাফাতে লাফাতে যাচ্ছে। যেহেতু কেবেনটা নিধির স্বামীর, তাই অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না ভেতরে প্রবেশ করার জন্য। কেবিনের দরজাটা খুলেই গহনের নাম ধরে চেঁচিয়ে উঠলো ওকে চমকে দেওয়ার জন্য।
কেবিনে তখন আরো কয়েকজন ছিল, যাদের সাথে গহন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিল। এর মাঝে চিৎকারের আওয়াজটা ভেসে আসতেই সবাই একযোগে দরজার দিকে তাকালো। ওনারা যেমন নিধিকে দেখে চমকেছেন ঠিক তেমনি নিধিও কেবিনের মাঝে এতগুলো অপরিচিত মানুষকে দেখে ভীষণ চমকালো৷
তাড়াহুড়ো করে ঠিকঠাক হয়ে দাঁড়ালো। চোখে মুখে একটা তীব্র অস্বস্তি ফুটে উঠেছে। গহন কিছুক্ষণ বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নিধির দিকে। তারপরে যখন ধ্যান ভাঙল চমকে জায়গা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“তুমি এখানে কেন? ড্রাইভারকে তো বলেছিলাম বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসতে।”
নিধি আসলে কি বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। মানুষগুলো কেমন যেন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। এভাবে তাকিয়ে থাকার কি আছে বুঝতে পারছে না নিধি। চেনেনা নাকি নিধি কে? লোকগুলোর উঠে চলে যাওয়া উচিত ছিল। দেখছে বসের বউ এসেছে। তাও কোন সভ্যতা নেই।
নিধির এসব ভাবনার মাঝেই ওর কানে গহনের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য করে গহন বলল,
“এই নিয়ে পরে আলোচনা করবো আপনাদের সাথে। এখন আসুন।”
ভদ্রলোকেরা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন। ওনাদের এগিয়ে আসতে দেখে নিধি দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়ালো।
কেবিনটা ফাঁকা হতেই নিধি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। এগিয়ে এসে ব্যাগটা ডেস্কের ওপরে ছুঁড়ে ফেলে চেয়ারে হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে বসে বলল,
“এতক্ষণে শান্তি পেলাম। আপনার কর্মচারীদের কোন ভদ্রতা নেই। একটু কথাও বলল না আমার সাথে। কেমন আছি সেসব জিজ্ঞেসও করল না। এদের বেতন কেটে নেবেন অভদ্রতার জন্য।”
গহন পানির গ্লাসটা নিধির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“বসের বউ জানে জন্য ভয়ে চোখ তুলে তাকায়নি অব্দি। কেমন আছো সেটা জিজ্ঞেস করা তো অনেক দূরের কথা। অতিরিক্ত সম্মান করেছে তোমায়, বুঝলে?”
নিধি ঢক ঢক করে পুরো গ্লাসের পানিটা শেষ করে দিয়ে বলল,
“আপাতত এত সম্মান আমার লাগবে না। খাবার দিন। ভয়ংকর ক্ষুধা লেগেছে। দুই-তিন প্লেট কাচ্চি আনানোর ব্যবস্থা করুন।”
“এই গরমের দিনে এত তেল মশলা দেওয়া খাবার, খাওয়া উচিত হবে না। স্যুপ আনাই?”
নিধি নাক সিটকে বলল,
“এসব অখাদ্য আমি খাই না। মাংস খাব। ওসব শাকসবজি দেওয়া স্যুপ খেতে আসিনি এখানে।”
“তো চিকেন সুপ খাও?”
নিধি এবারে বিরক্তিকর গলায় বলল
“এত কিপটামি করছেন কেন? কাচ্চি আনানোর ব্যবস্থা করুন। নয়তো কিন্তু অফিসে আ গু ন লাগিয়ে দিয়ে চলে যাব।”
স্বাস্থ্য সচেতনতার কথা এই মেয়ের সামনে টিকবে না। সেজন্য আর কিছু বলল না গহন। বাধ্য হয়ে যেটা খেতে চেয়েছে সেটাই আনানোর ব্যবস্থা করল।
নিধি তখনও চেয়ারে হাত পা ছড়িয়ে বসে আছে। এর মাঝে দরজায় কেউ নক করলো। শব্দটা কানে আসতেই নিধি লাফ দিয়ে উঠে ঠিকঠাক হয়ে বসলো। নিধি ঠিকঠাক হয়ে বসতেই গহন ভিতর আসার জন্য অনুমতি দিল। গহনের সেক্রেটারি বাদল এসেছে। নিধিকে দেখে আগে সালাম দিল। তারপরে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“স্যার, একজন দেখা করতে এসেছে আপনার সাথে।”
“অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে? আমাকে তো তুমি জানাওনি? সিডিউল চেক করোনি আজকের?”
“আসলে স্যার ওনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেই। কিন্তু তারপরও আমার মনে হয় ওনার সাথে দেখা করাটা জরুরী। মানে দেখা করলে ভালো হয় আর কি।”
“এখন সম্ভব না। গিয়ে বল ব্যস্ত আছি। অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে যেন কাল আসে।”
বাদল চেয়েও যেতে পারলো না। আরেকবার মিনমিনে গলায় বলল,
“স্যার, আসলে ওনাকে এভাবে ফিরিয়ে দেওয়াটা ঠিক হবে না। অনেক নামকরা ব্যবসায়ী। জামিল হোসেন। আপনি চেনেন বোধহয়। আসলে আমি বলেছিলাম যে ম্যাডাম এসেছে, আপনি ব্যস্ত আছেন। সেটা শুনে তো উনি আপনাদের দুজনের সাথেই দেখা করতে চেয়েছেন। একবার দেখা করুন। ভবিষ্যতে ফেবার পাওয়া যাবে।”
বাদলের মুখ থেকে কথাটা শুনে দুজনের কপালেই গাঢ় ভাঁজ সৃষ্টি হলো। গহন কিছু বলে ওঠার আগে নিধি আগবাড়িয়ে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে ভাইয়া, পাঠিয়ে দিন তো ওনাকে। দেখি আবার কোন জন্মে ওনাকে আত্মীয় বানিয়েছিলাম। আমাকে যেহেতু চেনেন তাহলে কাছেরই কেউ হবেন। হয়ত নামটা বদলে ফেলেছেন সেজন্য চিনতে পারছিনা।”
নিধির থেকে অনুমতি পেয়েও বাদল যেতে পারলো না। অনুমতির জন্য গহনের দিকে তাকিয়ে রইলো। গহন ইশারায় অনুমতি দিতেই বাদল বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে।
_________
লোকটার বেশ ভালোই বয়স হয়েছে। ওই বলা যায় বাবার বয়সী। তাকে সালাম দিল নিধি। গহনও সালাম দিল। ভদ্রলোক সালামের জবাব দিয়ে গহনের দিকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন। গহন পাল্টা নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়ে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“আপনার নাম শুনেছি আমি। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে তো আপনাকে চিনি না। আপনি আমায়, আমার ওয়াইফ কে কিভাবে চিনলেন?”
জামিল হোসেন কিঞ্চিত অস্বস্তি জড়ানো গলায় বলল,
“আসলে তোমার সাথে আমার একটা সম্পর্ক আছে। তবে সম্পর্কটা স্বাভাবিক না। সেজন্য আমার পরিচয় দিতে একটু অস্বস্তি হচ্ছে।”
গহন কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কিসের সম্পর্ক?”
জামিল হোসেন পূর্বের মতনই অস্বস্তি জড়ানো গলায় বললেন,
“আমি কবরীর হাজবেন্ড। আশা করছি এবার বুঝতে পারছ কেন বলেছিলাম আমাদের সম্পর্কটা স্বাভাবিক না।”
জামিল হোসেনের পরিচয়টা পেতেই গহনের মুখটা চুপসে গেল। পাশে দাঁড়ানো নিধি চমকে উঠে বলল,
“আপনি কেন এখানে এসেছেন? গহনের সাথে আপনার কি দরকার?”
জামিল হোসেন নিধির প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে গহনের দিকে দৃষ্টিপাত করে বললেন,
“আমি জানি আমাকে তোমার পছন্দ হবে না, গহন। কিন্তু তারপরও একটু কি কথা বলার সময় হবে? খুব বেশিক্ষণ সময় নেব না।”
“আমার মা আপনার জন্য চলে গিয়েছিল, তাই না? সেদিন শপিংমলে একটা কল আসার পর আম্মু চলে গিয়েছিল। আপনি কল করেছিলেন? আপনি আমার মা কে আমার থেকে কেড়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, তাই না?”
গহনের প্রশ্নগুলো শুনে জামিল হোসেন তুমুল অশ্বস্তির মাঝে পড়লেন। তিনি শুধু আমতা আমতা করলেন। কোন উত্তর দিতে পারলেন না। তবে চুপ থাকলেও তো হবে না। কথা বলতেই তো এসেছেন গহনের সাথে।
“দেখো বাবা, আমি চাইলেও সেই পরিস্থিতি গুলোর ব্যাখ্যা তোমায় ঠিক ভাবে দিতে পারব না। আবার আমি দিলেও তোমার বিশ্বাস হবে কিনা সেখানেও একটা প্রশ্ন রয়েই যায়। তাই আমি তোমায় বলছি, পুরনো কথাগুলো ভুলে এখন যা বলতে এসেছি সেটা একটু শোনো।”
পুরনো কথাগুলো মনে পড়লেই গহনের শরীরটা কেমন যেন খারাপ হয়ে যায়। ভীষণ দুর্বল অনুভব করে। এই যেমন এখন দাঁড়িয়ে থাকতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। চেয়ারের হাতলটা শক্ত করে ধরে খুব কষ্টে দাঁড়িয়ে থাকল। গম্ভীর গলায় বলল,
“আমি অতীত কিংবা বর্তমান কোন বিষয় নিয়েই আপনার সাথে কথা বলতে চাইছি না। আপনাকে অসম্মান করারও কোন ইচ্ছে আমার নেই। আমার মনে হয় আপনার এখন এখান থেকে চলে যাওয়াটাই ভালো হবে।”
“তোমার মা খুব অসুস্থ, গহন। ক্যান্সারের লাস্ট স্টেজে আছেন। কেমো থেরাপি চলছে। হায়াত তো আল্লার হাতে। কিন্তু ডাক্তার বলেছেন খুব বেশিদিন বাঁচবে না।”
গহন চমকে উঠে জামিল হোসেনের দিকে তাকিয়ে মৃদু কম্পিত গলায় বলল,
“বাঁচবে না?”
“মৃ ত্যু তো সবার জন্য অনিবার্য। কিন্তু কবরীর শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। তোমার প্রতি করা অন্যায়ের অনুশোচনায় দিন দিন যেন আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছে। সেই অপরাধবোধ ওকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। জানিনা কতদিন আর আমার সঙ্গে থাকবে। ওর সব আবদারই আমি পূরণ করেছি। শেষ আমার থেকে একটা জিনিস চেয়েছে। তোমার সাথে একটু একটাবার দেখা করতে চায়। একটু কথা বলতে চায়। নিজের অপরাধের জন্য ক্ষমা চাইতে চায়। সেই জন্যই আজ তোমার কাছে আসা। আজ সকালের ফ্লাইটেই দেশে এসেছি আমি।”
গহন কোন উত্তর দিল না। নিধি গহনের দিকে তাকালো। গহনের চোখ মুখের অবস্থা দেখেই বুঝতে পারছে যে গহনের সমস্যা হচ্ছে এই কথাগুলো শুনে। গহনের অস্বস্তি হচ্ছে। একটা অস্থিরতা কাজ করছে। একহাতে চেয়ার শক্ত করে খামচে ধরেছে। অন্য হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটার চোখ মুখের রং কেমন যেন বদলে গেছে।
নিধি এগিয়ে গিয়ে গহনের বাহু ধরে বলল,
“কি হয়েছে আপনার? এমন করছেন কেন? শরীর খারাপ লাগছে? দেখি, এদিকে আসুন তো আমার সাথে। বসুন।”
নিধি গহন কে চেয়ারে বসালো। পানির গ্লাসটাও এগিয়ে দিল। কিন্তু গহন খেলো না পানিটা। গহন চেয়ারের সাথে মাথাটা এলিয়ে দিল। নিধি বুঝলো যদি এই বিষয় নিয়ে আরো আলোচনা হয় তাহলে গহনের শরীরটা আরো বেশি খারাপ করবে।
জামিল হোসেনের দিকে এগিয়ে এসে বলল,
“দেখুন, গহন পুরনো কথাগুলো সহ্য করতে পারে না। পুরনো বিষয়গুলো ওর কাছে একটা ট্রমার মতন। অসুস্থ হয়ে পড়ে। আমি অনুরোধ করছি আপনাকে, দয়া করে ওনাকে আর এই কথাগুলো বলবেন না।”
জামিল হোসেন এবারে নিধিকে উদ্দেশ্য করে অনুরোধের স্বরে বললেন,
“প্লিজ মা, তুমি একটু বোঝাও না গহনকে! ওর মা ভীষণই অসুস্থ। বিছানা থেকে উঠতে পারেনা। সারাদিন শুধু গহনের কথা বলে। ওর সাথে একটা বার দেখা করতে চায়। একজন মৃ ত্যু পথযাত্রী মানুষের শেষ একটা আবদার পূরণ করবে না তোমরা?”
নিধি আগে জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। তারপরে আবারো জামিল হোসেনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আর উনি যে গহন কে মৃ ত্যু র দ্বারে রেখে চলে গিয়েছিলেন? উনি তো একবারও ভাবেননি ওনার ছেলের কথা। হ্যাঁ, আপনারা হয়তো এখন বলতেই পারেন যে পুরনো কথা আমি কেন তুলছি। তার কারণ গহন এখনো সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। কি ক্ষতি হতো বলুন তো গহন কে নিয়ে গেলে? গহনের শৈশব তো একটা বিভীষিকার মতন কেটেছে। সৎ মায়ের সঙ্গ কতটা ভয়ানক হতে পারে সেটা কি আপনাদের দুজনের আন্দাজে ছিল না? আপনার কথা বাদ দিলাম। কিন্তু ওনার নিজের মা কি করে চলে যেতে পারলেন? গহন নিজের বাড়িতে কি পরিবেশের মাঝে দিন কাটিয়েছে জানেন আপনারা?”
কথাগুলো বলতে বলতে শেষের দিকে নিধি একটু উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল। কণ্ঠস্বর একটু জোরেই হলো। জামিল হোসেন তবুও রেগে গেলেন না। ফের নিধি কে বোঝানোর চেষ্টা করে বললেন,
“কবরী ওর অপরাধ অনুধাবন করতে পারছে জন্যই তো আজ আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আমি ওদের সম্পর্কটা একেবারে স্বাভাবিক করতে বলছিনা। সাধারন মা ছেলের মতন একসঙ্গে থাকতেও বলছিনা। আমি শুধু তোমাদের কাছে এতটুকু অনুরোধ করছি যে, একটা বার যেন গহন ওর মায়ের সাথে দেখা করে শুধু কথা বলে। আমি কি খুব বেশি কিছু আবদার করে ফেলেছি, তুমি বলো?”
জামিল হোসেনের প্রশ্নের উত্তরটা নিধি এবারে দেওয়ার আগে গহন বলে উঠল,
“অন্যায় আবদার করে ফেলেছেন। খুব বেশি কিছু না, আপনি অসম্ভব কিছু আবদার করে ফেলেছেন।”
কন্ঠটা পেতেই নিধি ঘাড় কাত করে পেছনে তাকালো। গহন উঠে এসে জামিল হোসেন কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপনার স্ত্রীকে বলবেন, যে গহন ওনার ছেলে ছিল সেই গহন মা রা গেছে। যেদিন উনি ওনার ছেলেকে ছেড়ে চলে গিয়েছেন সেই দিনই ওনার ছেলে মা রা গেছে। মা কে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে না পারা থেকে পঁচিশটা বছর মাকে ছাড়া কাটিয়ে দেওয়ার যাত্রাটা মোটেই সহজ ছিল না আমার জন্য। যেই ছেলের সঙ্গে উনি দেখা করার জন্য ছটফট করছেন, সেই ছেলে তার মায়ের চেহারাটা অবধি ভুলে গেছে।”
জামিল হোসেন আবারো কিছু বলে উঠতে ধরলে গহন ওনাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“দয়া করুন। ছেড়ে দিন আমাকে। যা ভুলে আমি সামনে এগোনোর চেষ্টা করছি আমাকে সেটা ভুলতে দিন। আমি চাইনা ওনার কিছু হোক। উনি বেঁচে থাকুক। যে সুখের আশায় উনি আমাকে মাঝ সমুদ্রে একা ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলেন ওনার সেই সুখ চিরস্থায়ী হোক। তবে দয়া করে আমাকে টানবেন না। আমিও তো মানুষ। আর কষ্টের ভার বইতে পারবো না। ঘরেও একজন মা কে রেখে এসেছি। যে দিন রাত কষ্ট দিয়েই যায়। এর মাঝে আবার আপনি এই অনুরোধ নিয়ে চলে এসেছেন।সবার এত অনুরোধ রাখতে গিয়ে আমি মানুষটা নিজেই নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। এবারে মুক্তি দিন আমায়।”