❝কখনো ভালোবাসায় সিক্ত তো কখনো অশ্রুতে❞
কবরীকে তখন আইসিইউতে রাখা হয়েছে। শারীরিক অবস্থা ভীষণই খারাপ। গহনদের হাসপাতালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ভোর হয়ে গেল। হাসপাতালের করিডারে তখনও উদ্বিগ্ন মুখ ভঙ্গিতে পায়চারি করছেন জামিল হোসেন। কিয়ারা বসে কাঁদছে। ওনাদের সান্ত্বনা দেওয়ার মতন কেউ নেই আপাতত। কবরী কে নিয়ে চিন্তা করার জন্যও ওনারা দুজন ব্যতীত আর কেউ নেই।
গাড়ি থেকে নেমে হাসপাতালের তিনতলায় গহন এক প্রকার দৌড়ে এলো। করিডরে জামিল হোসেনকে দেখতেই ওনার দিকে এগিয়ে এসে উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কেমন আছেন উনি এখন? কি হয়েছে?”
জামিল হোসেন আগে কিছুক্ষণ হা করে গহনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। অতঃপর বিমর্ষ গলায় বললেন,
“ভালো নেই কবরী। হেমোরেজিক স্ট্রোক হয়েছে। মস্তিষ্কের ভিতরে রক্তক্ষরণ হয়েছে। আইসিউতে আছে। অবস্থা খুব খারাপ।”
“আরে তো ডাক্তারদেরকে বলুন ট্রিটমেন্ট করতে। কি করলে সুস্থ হবেন সেটা করতে বলুন। দেশে কিছু না হলে বিদেশে নিয়ে যাব। ওনার পাসপোর্ট, ভিসা তো সব রেডি আছে। আমি ব্যবস্থা করছি।”
“সম্ভব হবে না। এখন ওকে নিয়ে যাওয়া খুবই রিস্কি। অপারেশন করতে হবে।”
“তো কিসের জন্য অপেক্ষা করছেন? করতে হবে মানেটা কি? ডাক্তারদেরকে বলুন অপারেশন করতে। কার অনুমতির অপেক্ষায় আছেন? আপনি অনুমতি দিলেই তো হয়ে যায়।”
জামিল হোসেন দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বললেন,
“কবরীর শরীর খুবই দুর্বল। ওর সামগ্রিক শারীরিক সক্ষমতা অপারেশনের জন্য খুব একটা অনুকূলে নেই। এনেস্থেসিয়া থেকে শুরু করে অপারেশনের পুরো ধকল ও নিতে পারবে না হয়তো। ব্যাপারটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এখন ওর শারীরিক অবস্থা ঠিক কার মাঝে আছে জানো? অপারেশন না করলেও সমস্যা। আবার অপারেশনের ধকলটাও নিতে পারবে কিনা সেটাও একটা সমস্যা। যেদিকে যাবো সেদিকেই সমস্যা। কি করব বুঝতে পারছি না। তুমি বলোতো গহন কি করা উচিত? আমি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছি। আমাকে পরামর্শ দেবে তেমন কাউকেও খুঁজে পাচ্ছিনা।”
গহন আর কি পরামর্শ দেবে। ও তো নিজেই দুর্বল হয়ে পড়ল। ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল। ওর পাশের চেয়ারে বসে থেকে তখনও কিয়ারা কাঁদছে। গহন একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো মেয়েটার দিকে। খারাপ লাগল মেয়েটার জন্য। গহনেরই তো কষ্ট হচ্ছে। না জানি এই মেয়েটার আরো কত কষ্ট হচ্ছে!
ও তো মায়ের ভালোবাসা পেয়েছে। এতগুলো বছর মায়ের সাথে থেকেছে। তবে সান্ত্বনা দেওয়ার মতন কোন শব্দ খুঁজে পেল না গহন। কি করে সান্ত্বনা দিতে হয় সেটা ও জানে না।
নিধি গিয়ে গহনের পাশে বসে ওর কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
“চিন্তা করবেন না। ভালো হয়ে যাবেন উনি।”
“আমার জন্য এমন হলো, তাই না নিধি? আমার উচিত হয়নি ওনার সাথে ওভাবে কথা বলা। আমার মাথায় রাখা উচিত ছিল যে উনি অসুস্থ। উনি হয়তো এত ধকল নিতে পারবেন না। আমার বলা কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই ওনার শারীরিক অবস্থা এই পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। আমি ওনাকে মৃ ত্যু পর্যন্ত নিয়ে এলাম।”
নিধি তড়িঘড়ি করে বলল,
“না না। আপনি কিছু করেননি। এটা হওয়ারই ছিল। উনি তো অসুস্থ ছিলেন।”
“কিন্তু এতটা অসুস্থ ছিলেন না। এই পর্যায়ে ওনাকে নিয়ে আসার জন্য আমি দায়ী। আমি বুঝতে পারছি উনি আমার বলা কথাগুলো সহ্য করতে পারেননি। আমি অতিরিক্ত বলে ফেলেছিলাম। যা হওয়ার সে তো হয়েই গিয়েছিল। আমি কেন অভিযোগগুলো করতে গেলাম? কোন কিছু তো বদলালো না। অযথা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এখন যদি ওনার কিছু হয়ে যায়?”
নিধি এবার বলার মতন আর কোন শব্দ খুঁজে পেল না। পাশ থেকে কিয়ারা গহনের কাঁধে হাত রেখে ওকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
“তোমার কোন দোষ নেই, বাইয়া। মম তো এমনিতেই অসুস্থ ছিল। তুমি নিজেকে দোষী বলো না। তাহলে মম আরো কষ্ট পাবে। মম লাভস ইউ আ লট। প্লিজ, ডোন্ট ক্রাই।”
গহন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো মেয়েটার দিকে। কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না। গহনের উচিত ছিলো মেয়েটাকে সান্ত্বনা দেওয়া। অথচ সেই মেয়েটাই গহনকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। কি অদ্ভুত!
___________
টানা দুদিন আইসিইউতে থাকার পরও শারীরিক অবস্থার বিন্দুমাত্র কোন উন্নতি হচ্ছে না কবরীর। বরং ধীরে ধীরে অবনতি হচ্ছে। আজ যেন পরিস্থিতি একেবারেই হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। এক এক করে তার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
কেবিনের বাইরে তখনও ভিড় জমা করে বসে আছে ওনার পরিবারের লোকজন। ডাক্তার, নার্স দৌড়ে আইসিইউতে প্রবেশ করল। ওনার শারীরিক অবস্থা এতটাই খারাপ যে দুইদিনে ডাক্তাররা অপারেশনের সিদ্ধান্তই নিতে পারেননি।
ডাক্তারও হয়তো বুঝতে পারছেন যে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি ওনাদের হাতের বাইরে চলে গেছে। তবুও ওনারা শেষ চেষ্টা করছেন।
একদিকে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গহন। অন্যদিকে জামিল হোসেন। গত দুদিনে তিনি বেশ অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছেন স্ত্রীর এমন অসুস্থতায়। এতদিন তবুও নিজেই নিজেকে সাহস জুগিয়েছেন যে তার স্ত্রীর সুস্থ হয়ে যাবে। তবে এখন আর তিনি নিজেই নিজেকে সাহস যোগাতে পারছেন না।
গহনের সাথে কথা বলতে তার বড্ড ভয় হয়। অস্বস্তিও হয়। কিন্তু তবুও আজ সাহস করলেন। তিনি এগিয়ে গিয়ে গহনের হাত নিজের মুঠোয় নিলেন। মুহূর্তের মাঝে তার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে উঠল। গহন প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জামিল হোসেনের দিকে। কি বলতে চাইছেন উনি সেটা জানতে গহন বেশ আগ্রহী।
“কবরী খুব কষ্ট পাচ্ছে, গহন। আমি জানি ওর নিজেরই আর বেঁচে থাকার কোন ইচ্ছে নেই। ও নিজেই নিজেকে শাস্তি দিতে চাইছে মৃ ত্যু র মাধ্যমে। ও মুক্ত হতে চাইছে ওর অপরাধবোধ থেকে। আমিও এখন তাই চাইছি। ওর কষ্ট আর দেখতে পারছি না আমি। ও বেঁচে থাকলে শান্তি পাবে না। তুমি কি আমার স্ত্রীকে এই অপরাধবোধ থেকে মুক্তি দিতে পারবে, বাবা? তোমার মা হয়তো তোমার কাছে অপরাধী, তোমাদের সবার চোখে অপরাধী। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে আমার স্ত্রী নির্দোষ। আমি দেখেছি আমার স্ত্রীর যন্ত্রণাদায়ক দিনগুলো। ওকে মুক্তি দেবে এই অপরাধবোধ থেকে? একবার একটু মন থেকে বলবে যে ক্ষমা করে দিয়েছো?”
গহনের ঠিক কি বলা উচিত বুঝে উঠতে পারছে না। এই মানুষটির সাথে কথা বলতে কেন যেন ভীষণ অস্বস্তি হয় গহনের।
গহনকে চুপ করে থাকতে দেখে জামিল হোসেন যেন আশাহত হলেন। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে এবারে তিনি ডুকরে কেঁদে উঠলেন। পূর্বের তুলনায় আরো অধিক শক্ত করে গহনের হাতটা ধরে অনুনয়ের সুরে বললেন,
“ক্ষমা করে দাও গহন। একবার মন থেকে বলো যে ক্ষমা করে দিয়েছো। ও একটু শান্তি নিয়ে বিদায় নেক। প্রয়োজন হলে ওর অংশের শাস্তি টুকু তুমি আমায় দিয়ে দিও। যদি তোমার মনে এখনো কোনো কষ্ট, রাগ, অভিমান চাপা থেকে থাকে তবে বরং সেগুলোর শাস্তি তুমি আমায় দিও। যা কথা শোনানোর ইচ্ছে আমায় শুনিও। শুধু কবরীকে ক্ষমা করে দাও। আমি ওকে কথা দিয়েছিলাম যে, আমি ওকে সারা জীবন ভালো রাখবো। কিন্তু এখন আমি সেটা পারছি না।
মৃ ত্যু র আগ মুহূর্তে আমি ওকে শান্তি দিতে পারছি না। এই ব্যাপারটা আমাকে ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে।”
গহন চুপ করে রইলো। জামিল হোসেন এখনো কেঁদেই যাচ্ছেন। কিয়ারা এগিয়ে এসে জামিল হোসেনের কাঁধে হাত রেখে ওনাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল। তারপর ছলছল দৃষ্টিতে গহনের দিকে তাকিয়ে সে নিজেও অনুনয়ের স্বরে বলল,
“বাইয়া প্লিজ, আমার মম কে ক্ষমা করে দাও। মম অনেক কষ্ট পাচ্ছে। তোমার কি একটুও কষ্ট হচ্ছে না? বাইয়া প্লিজ, ক্ষমা করে দাও আমার মম কে।”
দুই বাবা মেয়ে অঝোরে কেঁদে গেল গহনের সামনে দাঁড়িয়ে। গহন উপলব্ধি করতে পারল শুধু কবরী না, এনারা দুজনেও ভীষণ অনুতপ্ত। যদিও এনাদের দোষ নেই। সমস্ত দোষটা কবরীরই। তবুও এরা দুজনে কবরীর দোষটা ভাগ করে নিয়েছে।
জামিল হোসেনের থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে গহন কিয়ারার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“যাও ক্ষমা করে দিলাম। উনি জন্ম দিয়েছেন আমায়, সেই ঋণ তো রয়েই গেছে। মায়ের দুধের ঋণ রয়ে গেছে। আমার জন্য না হলেও উনি কারো জন্য তো ভালো মা ছিলেন। এত ঘৃণা, রাগ আমি মনের মাঝে কারো জন্যই জমা করে রাখতে পারি না। তোমার মা কে ক্ষমা করে দিয়েছি।”
গহন খেয়াল করল কথাটা বলার পরে নিজের ভেতরটা কেমন যেন হালকা হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে বুকের উপর থেকে পাথর নেমে গেল।
গহনের এসব ভাবনার মাঝে কেবিন থেকে বিষন্ন চেহারায় ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। ওনার চোখ মুখের অবস্থা দেখেই যেন উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষ আন্দাজ করতে পারলেন যে উনি কি বলতে চাইছেন। জামিল হোসেন তড়িঘড়ি করে এগিয়ে গেল। উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“কেমন আছে ও? আমার স্ত্রী কেমন আছে? ও সুস্থ হয়ে যাবে তো?”
“উই আর এক্সট্রিমলি সরি। ওনাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।”
জামিল হোসেনের যেন বিশ্বাস হতে চাইল না কথাটা। উনি ধপ করে ফ্লোর এর ওপরে বসে পড়লেন। কিয়ারা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। নিধি এগিয়ে এসে শক্ত করে গহনের হাত চেপে ধরে বলল,
“স্বাভাবিক থাকুন। এটা হওয়ারই ছিল। উনি অসুস্থ ছিলেন। আপনার জন্য কিচ্ছু হয়নি। ওনার কোন ছোটখাটো অসুস্থতা ছিল না। আয়ু শেষ তাই চলে গিয়েছেন। সবাইকেই যেতে হবে। অযথা নিজেকে দোষারোপ করার কোন প্রয়োজন নেই।”
গহন পাল্টা নিধির হাতটা শক্ত করে ধরল। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পাচ্ছে না। নিজেকে দুর্বল প্রমাণ করে জামিল হোসেনের মতনই ফ্লোর এর উপর ধপ করে বসে পড়তে চাইছে না। সেজন্যই নিধির হাতটা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করল। তবে শরীরে বল পাচ্ছে না। দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। দুচোখে খিঁচে বন্ধ করে নিয়ে বলল,
“আমার থেকে ক্ষমা পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন উনি। তবে ওনার পরিকল্পনাই এমন ছিল যে আমার থেকে ক্ষমা নিয়ে চলে যাবেন। আগে জানলে ক্ষমাই করতাম না। অপরাধবোধ নিয়ে থাকতেন, তবুও বেঁচে থাকতেন। ক্ষমা না করার অজুহাতে আরো কিছুদিন মায়ের অস্তিত্ব অনুভব করতাম।”
“এভাবে বলবেন না, গহন। দয়া করে শান্ত থাকুন। নয়ত আপনি অসুস্থ হয়ে যাবেন।”
গহন জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস ফেলে দু চোখ বন্ধ রেখেই আবারও বলল,
“আজ থেকে সত্যি আর আমার মা রইলো না, নিধি। মা মা রা যাওয়ার সংবাদটা শুনতে এতটা যন্ত্রণাদায়ক কেন? আমার এতটা কষ্ট হচ্ছে কেন? উনি অপরাধবোধ থেকে মুক্তি নিয়ে চলে গেলেন নাকি আমাকে অপরাধী বানিয়ে চলে গেলেন? উনি তো মুক্তি পেয়ে গেলেন। তবে আমি কি করে মুক্তি পাব? আমাকে একটা পথ দেখাও নিধি। বারবার উনি আমার জীবনটা কঠিন বানিয়ে চলে কেন যান? আবার একা করে দিয়ে গেলেন আমায়। আমি আবারও নিঃস্ব হয়ে রয়ে গেলাম।”
____________
ঠিক কতগুলো বছর পর কবরীকে আবার নিজের বাপের বাড়িতে আনা হলো তার হিসেব নেই। অবশ্য জীবিত থাকতে তার এখানে আসা হয়নি। এসেছে তার লা শ। এমনই কিছু অপরাধ করেছিলেন তিনি, যার কারণে তার ভাইয়েরা
মৃ ত্যু র আগ অব্দি তাকে ক্ষমা করতে পারেনি। তবে তারা এখন ক্ষমা করেছে কবরী কে। ক্ষমা করেছে কবরীর লা শ টা কে। করুণা করে ক্ষমা করেছে। কিংবা হয়তো বোনের প্রতি হঠাৎ করে ভালোবাসাটা আবার জেগে উঠেছে। তবে আফসোস নিজেদের সেই ভালোবাসা তারা তাদের বোন জীবিত থাকা অবস্থায় দেখাতে পারলেন না।
আসলে মৃ ত্যু বিষয়টায় ভীষণ অদ্ভুত। একজন মানুষের কদর যেন মৃ ত্যু র মাধ্যমে সব থেকে ভালোভাবে বোঝা যায়। এই যেমন এতদিন কবরী বেঁচে ছিল তবে কারোর হয়তো দিনে একবারও তার কথা মনে পড়েনি। কেউ তার সাথে যোগাযোগ করার প্রয়োজন মনে করেনি। তার খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। সেসব যদিও কবরীর নিজের ভুলের কারণে।
তবে আজ তার মৃ ত্যু র মাধ্যমে তার সমস্ত অপরাধের ক্ষমা তিনি পেয়ে গেছেন। সবাই ভুলে গেছে যে তিনি অতীতে কি অপরাধ করেছিলেন। তার পাপের বোঝা ঠিক কতটা ভারী ছিল সেসব আজ কেউ মনে রাখেনি।
সবার চোখে আজ তার জন্য অশ্রু। সবার দুচোখ যেন বলে দিচ্ছে যে কবরী তাদের কাছে ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তারা কতটা ভালোবাসতো কবরীকে। তবে আফসোস একটাই, বেঁচে থাকাকালীন এত ভালোবাসা পাওয়ার বা দেখার সৌভাগ্য হলো না কবরীর।
কবরীর লা শে র সাথে গহন আর নিধিও গ্রামে এসেছে। জুবাইদারা পরে এসেছে। আর কেউ আসেনি। জামিল হোসেনের পরিবারের লোকজন কেউই দেশে নেই। সেই জন্য কবরীর পরিবারের লোকজন মিলেই তার দাফনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
শেষবারের মতন যখন গহন কাফনের কাপড়ে মোড়ানো কবরীর মুখটা দেখেছিল তখন এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিল। যদিও গহন কাঁদেনি। কবরীর মৃ ত্যু র সংবাদ শোনা অব্দি থেকে জানাজা পর্যন্ত একবারের জন্যও কাঁদেনি। বেশ স্বাভাবিক দেখিয়েছে তাকে। মায়ের দাফনের ব্যবস্থা সে নিজেই করছে। তবে যখন বুঝেছিল শেষবারের মতন কবরীর মুখটা দেখছে তখন খুব করে একটু ইচ্ছে হয়েছিল একবার জড়িয়ে ধরার। মনে হচ্ছিল কত কিছু যেন বলার ছিল। মনে হচ্ছিল একবার যদি একটু কবরী হাত বুলিয়ে দিত গহনের মাথায়, তাহলে না জানি কতই শান্তি পেত গহন।
গহনের আরেকটা আফসোস হচ্ছে, কবরীকে তো ক্ষমা করে দিল। তবে এমন সময় এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমা করল যে কবরী এই কথাটা জানতেও পারল না। না জানি কত আফসোস নিয়ে তিনি মা রা গেলেন।
জানাজা শেষে কবরীকে নিয়ে যাওয়া হলো ওনাদের পারিবারিক কবরস্থানে। নিজের মা-বাবার পাশেই জায়গা পেলেন কবরী। কবর দেয়ার সময় জামিল হোসেন ভীষণ কাঁদলেন। কবরে এক মুঠো মাটি দেওয়ার সময় তিনি হু হু করে কাঁদলেন। কেউ কেউ ওনাকে সান্ত্বনা দিল, কেউ কেউ শক্ত হতে বলল।
সে সময় অনেকে আড়চোখে তাকাচ্ছিলেন গহনের দিকে গহনের অভিব্যক্তি বোঝার জন্য। তবে গহন ভীষণ স্বাভাবিক ছিল। চুপচাপ এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। শেষে সে নিজেও তার মায়ের কবরে এক মুঠো মাটি দিল।
কবর দিয়ে এসে গহন আর সেখানে থাকল না। বাকিরা চলে যাওয়ার আগে গহন নিধি কে নিয়ে রওয়ানা হলো। ড্রাইভিং এর দায়িত্বও গহনই নিল।
গহনের হাত তখন স্টিয়ারিংয়ে। নিধি বারবার আড়চোখে তাকাচ্ছে গহনের দিকে। কেন যেন নিধির খুব চিন্তা হচ্ছে। ভীষণ ভয় হচ্ছে গহন কে নিয়ে। মানুষটা না কিছু বলছে, না কাঁদছে। অথচ ভেতরটা যে কষ্টে শেষ হয়ে যাচ্ছে সেটা নিধি খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছে।
স্টিয়ারিং এ থাকা গহনের হাতের উপর নিধি আলতো করে নিজের হাত রেখে বলল,
“এখন তো কেউ নেই আমি ছাড়া। এখন একটু কাঁদুন।”
গহন বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,
“আমাকে দেখে মনে হচ্ছে নাকি যে আমি কাঁদতে চাইছি?”
“হ্যাঁ। আমি জানি আপনি কাঁদতে চাইছেন। তবে কাঁদতে পারছেন না। আবার একটা মিথ্যে অপরাধবোধের বোঝা নিজের মধ্যে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন। বুঝতে পারছেন না কেন আপনি যে, ওনার আয়ু শেষ হয়ে গিয়েছিল সেই জন্য চলে গিয়েছেন। আপনার আমার আয়ু শেষ হলে আমরাও চলে যাব। কারোর মৃ ত্যু র জন্য কেউ দায়ী হতে পারে না, গহন।”
গহন ছোট্ট করে উত্তরে বলল,
“বুঝতে পেরেছি।”
নিধি এবারে ঝাঁঝালো গলায় বলল,
“কচু বুঝেছেন আপনি। এই ছেলে, কাঁদুন বলছি। জোরকরে কাঁদুন দরকার হলে। কাঁদলে মনের মাঝে যে কষ্ট গুলো জমা হয়ে আছে সেগুলো বের হবে। নয়তো অসুস্থ হয়ে পড়বেন আপনি। আজ কয়েক রাত হল ঘুমোন না, ঠিকমতো কিছু খান না, নিজের যত্ন নেন না। কি সমস্যা আপনারও
ম রা র ইচ্ছে হয়েছে? হঠাৎ করে মায়ের ভালোবাসায় এত অন্ধ হয়ে গেলেন যে বউয়ের কথা ভুলে গেলেন? আপনার কিছু হয়ে গেলে আমার কি হবে ভেবেছেন সে কথা একবারও? আপনি না থাকলে আমি কোথায় যাব? আমাকে কে দেখবে?”
অনেকটা সময় পর, বলতে গেলে বেশ কিছুদিন পর নিধি গহনকে একটু হাসতে দেখল। যদিও বুঝতে পারল যে গহন জোর করে হাসলো। কিঞ্চিত একটু হেসে জবাবে বলল,
“যাবো না তো তোমায় ছেড়ে। তোমায় ছেড়ে আমিই বা কোথায় যাব? কার কাছে যাবো? কার কাছেই বা আমার আশ্রয় হবে তুমি ব্যতীত? তুমি আমায় যেভাবে আগলে নিয়েছো কেউ কখনো সেখাবে আগলে নিয়েছে নাকি? তুমি তো আমায় লোভী বানিয়ে দিয়েছো। তোমার থেকে ভালোবাসা পেতে পেতে আমি লোভী হয়ে গিয়েছে। এত সহজে ছেড়ে যাবো না।”
“যাওয়ার কথা কখনো কল্পনাও করবেন না। তাহলে আমি নিজেই মে রে ফেলবো। এখনো কত কিছু করা বাকি আমাদের। আমাদের নতুন বাড়িতে যাওয়া বাকি, আমাকে আমাদের দুজনের একটা আলাদা সংসার গোছানো বাকি, আপনাকে এখনো কত রকম ভাবে ভালোবাসা বাকি, আমার এখনও আপনার থেকে যত্ন নেওয়া বাকি। গোটা জীবনটাই তো পড়ে আছে গহন। দয়া করে এমন কোন অপরাধের বোঝা নিজের কাঁধে বয়ে নিয়ে বেড়াবেন না, যে অপরাধটা আপনি করেননি। আমি জানি উনি আপনার মা ছিলেন। কষ্ট হবে এটা স্বাভাবিক। মনের মাঝে যত অভিমানই থাকুক তাও কষ্ট হবে। কিন্তু দয়া করে এর জন্য নিজেকে আর আমাকে কষ্ট দেবেন না। ভুলে যান এসব। ওনার জন্য দোয়া করুন যেন উনি ভালো থাকেন। আর শুনুন, আবিদ ভাইয়ার বাড়িতে আর যাব না। আমাদের বাড়িই তো ঠিক হয়ে গেছে। আমাদের তো ওখানেই যাওয়ার কথা ছিল। চলুন নতুন বাড়িতে যাই। মনটাও ভালো হবে।”
গহন সঙ্গে সঙ্গে কোন উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে এবারে গহন নিধির হাতের ওপরে নিজের হাত রেখে খানিকটা অনুনয়ের সুরে বলল,
“আমার একটা অন্যায় আবদার রাখবে, নিধি? অনুরোধও বলতে পারো।”
নিধি কপাল কুঁচকে বলল,
“কি? অন্যায় আবদার করার মতন মানুষ তো আপনি নন।”
“তবে আজ যে আবদারটা করবো সেটা অন্যায়ই। আর একটা রাত একটু আমাদের পুরনো বাড়িতে গিয়ে থাকি? আমার পুরনো ঘরটাতে গিয়ে থাকি? আমার, আমার ঘরটার কথা খুব মনে পড়ছে। যদিও আমার সেই দিনগুলোর কথা মনে নেই। তবুও মনে হচ্ছে ওই ঘরে আমি মায়ের সাথে থেকেছি। শুধু আজকের রাতটা একটু ওই ঘরে কাটাই আমরা। কাল সকাল সকাল নতুন বাড়িতে চলে যাব। শুধুমাত্র একটা রাত। আমার খুব মনে পড়ছে আমার বাড়িটার কথা, আমার ঘরটার কথা। আমার জীবনের সমস্ত দুঃখ আমি ওই ঘরটার মাঝে বসে কাটিয়েছে। ঐ ঘরটার সাথে সমস্ত কষ্ট ভাগ করে নিয়েছি। আমার জীবনের শেষ ভয়াবহ দুঃখটাও আমি ওই ঘরে বসেই কাটাতে চাই। আমি সমস্ত দুঃখ ওই পুরনো ঘরটাতে ফেলে রেখে আসতে চাই নিধি। চলো না, শুধু আজ রাতটা ওই ঘরে একটু থাকি!”
এমন করুণ ভাবে গহন আবদারটা করল যে নিধি কোন মতেই আর না করতে পারল না। মুখ দিয়ে একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। কি করুণ আবদার! এই আবদার ফেলা যায় না। সমস্ত কিছু হারিয়ে যে মানুষটা নিজের দুঃখগুলো ভাগ করে নেওয়ার জন্য পুরনো একটা আশ্রয়ে যেতে চাইছে, কি করে সেখানে নিধি বাঁধা দিতে পারে? ভাবল যদি এতে গহনের কষ্ট কমে তবে তাই হোক। আজ রাতটা নাহয় সেই ঘরেই কাটাবে।