কি ভেবে যেন আজ শম্পা এসেছে হাসপাতালে গহন কে দেখতে। দুদিন হলো গহন হাসপাতালে ভর্তি। এই দুদিনে সে আসেনি। তবে কে জানে আজ কি মনে হলো। কোত্থেকেই বা বিবেকের উদয় হলো যে হঠাৎ করে মনে হলো অসুস্থ গহন কে একবার দেখতে যাওয়া উচিত।
সালমা বেগমের সাথেই হাসপাতালে এসেছে। নিধি তো বাড়িতেই যায়নি। দুদিনে একবারের জন্যও কেউ ওকে জোর করেও বাড়িতে নিয়ে যেতে পারেনি। এক মুহূর্তের জন্যও গহন কে ছেড়ে যায়নি। মূলত ওদের জন্য খাবার নিয়েই সালমা বেগম এসেছিলেন। আজকাল তার মাঝে একটু বিবেকের উদয় ঘটছে। নয়তো কি আর উনি নিধির জন্য খাবার নিয়ে আসেন!
গহনের কেবিনের সামনে আসতেই দেখল ভেতর থেকে পিয়াল বের হচ্ছে। অনেকগুলো দিন পর শম্পা পিয়াল কে দেখল। এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করল শম্পার মাঝে। খানিকটা চমকেও উঠলো। হৃদস্পন্দনের গতিও যেন খানিকটা বাড়লো। আবার খানিকটা মনের মাঝে রাগও তৈরি হলো।
পিয়াল কে দেখে মেয়ে ছুটে গেল পিয়ালের দিকে। মেয়েকে পিয়াল কোলে তুলে নিয়ে আদর করলো। এদিকে ছেলেও বাবাকে দেখে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাবার কোলে আসার জন্য লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে শম্পার কোলেই। পিয়াল মেয়েকে কোল থেকে নামিয়ে এবার ছেলেকে কোলে নিয়ে আদর করলো। তবে শম্পার দিকে না তাকালো, না ওর সাথে কথা বলল।
পিয়াল কে এখানে দেখে পাশ থেকে সালমা বেগম গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“তুমি এখানে কি করছো?”
পিয়াল বেশ স্বাভাবিক গলায় উত্তরে বলল,
“গহন কে দেখতে এসেছিলাম।”
এবারে সদলমা বেগম কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই পাশ থেকে শম্পা বলে উঠলো,
“আমার সাথে যখন সম্পর্ক নেই তাহলে আবার আমার ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক রেখেছো কেন? আমার সূত্রেই তো ভাইয়ার সাথে সম্পর্ক।”
পিয়াল এবারেও স্বাভাবিক গলায় বলল,
“মোটেই না। তোমার সূত্র ধরে আমার গহনের সাথে সম্পর্ক না। গহনের সূত্র ধরে আমার তোমার সাথে সম্পর্ক। আর গহনের সাথে আমার সম্পর্ক আজীবন থাকবে, সে তোমার সাথে সম্পর্ক থাকুক বা না থাকুক। কেননা গহনের মতন মানুষের সাথে সম্পর্ক রাখা মানে জীবনে শান্তি বজায় রাখা। ওর মতন মানুষের সাথে কথা বললেও সব দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যায়। এক আলাদা শান্তি পাওয়া যায়। তাই ওর সাথে আমি সারা জীবন সম্পর্ক রাখবো।”
শম্পা তেলে বেগুনে জ্বলে কিছু বলে উঠতে ধরলে পিয়াল হাত উঠিয়ে ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“তোমার সাথে ঝগড়া করতে আসিনি আমি। সব জায়গায় নিজের ঝগড়ুটে রূপটা বের করা বন্ধ করো। এটা হাসপাতাল। ভদ্র মানুষজনের আনাগোনা এখানে। নিজের অভদ্র সত্তাটা এখানে বের করো না। সিকিউরিটি ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে পারে। সবাই তো আর পিয়াল হয় না যে চুপচাপ তোমার অভদ্রতা সহ্য করবে।”
লজ্জায় অপমানে শম্পার মুখ বন্ধ হয়ে গেল। সালমা বেগমও কেন যেন কথা বাড়াতে চাইলেন না পিয়ালের সাথে। চুপচাপ কেবিনের ভেতরে চলে গেলে। শম্পাও ছেলে মেয়েকে নিয়ে ভেতরে যেতে চাইলে পিয়াল আটকে বলল,
“দেখা করতে যাচ্ছো তো। ওরা আমার কাছে থাকুক। আমি যাওয়ার আগে তোমায় দিয়ে যাবো ওদের।”
কথাটা বলে পিয়াল ছেলে মেয়েকে নিয়ে অন্যদিকে হাঁটা দিল।
শম্পা তো গেল কেবিনের ভিতরে গহনের সাথে দেখা করার জন্য। তবে কেন যেন ঠিক শান্তি পাচ্ছে না। অস্থির অস্থির লাগছে। টুকটাক কিছু কথা বলল গহনের সাথে। তারপর কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো। কেবিন থেকে বেরোতেই দেখল পিয়াল ছেলে মেয়েকে নিয়ে আবার চলে এসেছে। নিয়ে গিয়েছিল দোকানে।অনেক কিছু কিনে দিয়েছে ছেলেমেয়েকে।
শম্পাকে বেরোতে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে ছেলেকে শম্পার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“নাও। আমাকে একটু অফিসে যেতে হবে।”
শম্পার কেন যেন যেতে দিতে ইচ্ছে করছেনা পিয়ালকে। তবে সেটা তো ঠিক ভাবে বলতেও পারবেনা। কন্ঠে একটু গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে বলল,
“ছেলে মেয়েকে নিয়ে যাও তোমার সাথে। তোমার ছেলে মেয়ে তুমি সামলাও। আমি পারবো না ওদেরকে সামলাতে। আমাকে যখন ডিভোর্স দিয়ে দিয়েছো তাহলে নিজের ছেলে মেয়েকে নিজের কাছেই রাখো।”
শম্পার আসল উদ্দেশ্য ছিল পিয়ালকে একটু রাগানোর, একটু ঝগড়া করার। কিংবা এই সামান্য একটা অজুহাত দিয়ে যেন ডিভোর্সের ব্যাপারটা থেমে যায়। কেননা শম্পা জানে পিয়াল ছেলে মেয়ের দায়িত্ব নেবে না। তবে তেমনটা হলো না। বরং পিয়াল স্বাভাবিক গলায় বলল,
“শিওর তুমি? আমার কোন অসুবিধা নেই। তবে ওদের সাথে দেখা করার অজুহাতে আবার তুমি আমার বাড়ি চলে আসবে না তো?”
ভীষণ অপমানিত হলো শম্পা। তাড়াহুড়ো কন্ঠে বলে উঠল,
“তোমার বাড়ি কেন যেতে যাব? আমার বাড়ি নেই নাকি? নিয়ে যাও তোমার ছেলে মেয়েকে। যেদিকে ইচ্ছে চলে যাও। আমার কি?”
পিয়াল আর একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। চুপচাপ ছেলে মেয়ের হাত ধরে হাঁটা দিল। কিছুদূর যাওয়ার পর পিছন থেকে শম্পা চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“আরে দাঁড়াও। কোথায় যাচ্ছ? আক্কেল নেই নাকি তোমার? ছেলে তো ছোট। থাকতে পারবে নাকি আমাকে ছেড়ে? দিয়ে যাও ওকে। আর মেয়ে না থাকলে ছেলে একা একা থাকেনা। দিয়ে যাও দুজনকে।”
থেমে গেল পিয়াল। শম্পা এগিয়ে গিয়ে ছেলেকে পিয়ালের কোল থেকে ছো মেরে নিয়ে বলল,
“ওরা আমার কাছেই থাকবে। যত চেষ্টাই করো না কেন ওদেরকে আমার কাছ থেকে নিতে পারবে না তুমি। আর তালাক দিচ্ছি জন্য ভেবোনা খুব সহজে ছেড়ে দেব। ছেলে মেয়ের খরচ দিতে হবে তোমায়। আমার ভরণপোষণের খরচও তোমায় দিতে হবে সেটা মনে রেখো।”
পিয়াল এবারও বেশ শান্ত গলায় বলল,
“যা ইচ্ছে চেয়ে নাও। আমার শুধু তোমার থেকে তালাক দরকার। আমার মানসিক শান্তি দরকার। আর ছেলে মেয়েকে এখনো তোমার কাছে রাখছি তার কারণ ওরা ছোট। ওদেরকে আর একটু বড় হতে দাও, ওদের বোধ বুদ্ধি একটু হতে দাও তারপর ওদেরকেও নিজের কাছে আনার ব্যবস্থা আমি করব। বাকি রইল তোমার কথা। তো তুমি জা হা ন্না মে যাও। আমার যায় আসেনা।”
কথাটা বলে পিয়াল চলে গেল সেখান থেকে। শম্পা ঠায় দাঁড়িয়ে রইল সেখানে। একটা উত্তরও দিতে পারল না পিয়ালের কথার। তবে কেন যেন পিয়ালের বলা শেষের বাক্যটা শুনে খুব খারাপ লাগলো শম্পার। ও
জা হা ন্না মে গেলেও পিয়ালের যায় আসবে না?
পরক্ষণেই আবার রাগ হলো পিয়ালের প্রতি। মনে হলো পিয়াল বাড়াবাড়ি করছে। শম্পার এত দোষ নেই। কিন্তু পিয়াল একটু বেশি বেশি করছে।
___________
প্রায় এক সপ্তাহ হতে চলল গহন হাসপাতালে ভর্তি। আজ ডিসচার্জ করে দেবে। তবে নিধি ঠিক করেছে গহনকে নিয়ে আর পুরনো বাড়িতে ফিরবে না। কোনমতেই ফিরবে না। সরাসরি গহন কে নিয়ে ওদের নতুন বাড়িতে যাবে।
নিধি গহনের থেকে এই বিষয়ে মোটেও পরামর্শ চায়নি। কিংবা অনুমতিও চায়নি। সরাসরি নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। গহনও আর দ্বিমত করেনি। শুধু কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ও বাড়িতে রয়ে গেছে সেগুলো আনার কথা বলেছিল। গহন কে সেজন্য হাসপাতালে রেখে নিধি এসেছে বাড়িতে।
গহনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল, ওদের জামা কাপড় গুলো নিয়ে নিধি ঘর থেকে বের হতেই সাবিতের মুখোমুখি হল। ওকে দেখেই তো নিধির মাথায় আগুন ধরে গেল। তবে এখন ঝামেলা করার কোন মানসিকতা নেই। তাই চুপচাপ চলে যেতে চাইলো। পিছন থেকে সাবিত কেমন যেন ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলে উঠলো,
“তোমার বর বেঁচে গেছে নাকি ম রে ছে? ম র লে চল্লিশায় বিরিয়ানির আয়োজন করো।”
নিধির পা থেমে গেল। খিঁচে দুচোখ বন্ধ করে কয়েকটা জোরে জোরে শ্বাস ফেলে আগে নিজেকে একটু শান্ত করল। কেননা এখন শান্ত না হলে উপযুক্ত জবাব দিতে পারবে না।
নিজেকে একটু শান্ত করে পিছন ঘুরে সাবিতের দিকে তাকালো। ছেলেটার ঠোঁটে এখনো হাসি ফুটে আছে। এ আসলে মানুষ না পশু নিধি বুঝে উঠতে পারে না। এমন অদ্ভুত প্রাণী জীবনে আর দেখেনি নিধি।
নিধি ঘৃণা ভরা কন্ঠে দাঁত পিষে বলল,
“আর একবার যদি তোর মুখ দিয়ে আমার স্বামীর
ম রা র কথা বেরিয়েছে তবে তোর কলিজা চিবিয়ে খাব কিন্তু আজ আমি। এমনিতেই তোর প্রতি অনেক ক্ষোভ জমে আছে। শুধুমাত্র গহন অসুস্থ বলে সেদিন রাতে তুই বেঁচে গিয়েছিলি। নয়তো তোর ঘুম কি করে বের করতে হয় দেখিয়ে দিতাম। বিশ্বাস কর সেদিন যদি গহনের কিছু হত তবে এতদিনে তোর চল্লিশা খাওয়ার আয়োজন করতে হতো তোর বউ আর মা কে। তোর কপালটা খুব ভালো যে গহন সুস্থ আছে। নয়তো প্রয়োজনে তোকে খু ন করে আমি জেলে যেতাম। তবুও তোকে বাঁচতে দিতাম না।”
নিধির হুমকি গুলোকে সাবিত হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলল,
“গলার জোর খুব বেড়েছে দেখছি। একা একা যে আমার সামনে গলার জোর দেখাচ্ছো, ভয় করছে না? চাইলে কিন্তু আমি এখন অনেক কিছুই করতে পারি। কে বাঁচাবে? হার্ট এ্যাটাক করে হাসপাতালের বেডে পড়ে থাকা তোমার দুর্বল স্বামী?”
নিধি মোটেও ভয় পেল না। ঘাবড়ালোও না। একেই তো বাড়িতে ঋতু, সিনথিয়া, সালমা বেগম সবাই আছে। যতদূর নিধির বিশ্বাস ওরা খারাপ কিছু করতে দেবে না নিধির সাথে। অন্তত সিনথিয়া আর ঋতু কিছু করতে দেবে না। তার ওপর মনের জোর তো আছে। পাল্টা ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বলল,
“আমাকে একবার ছুঁয়ে তো দেখ। তোকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে আমার গহন। গহন এসে তোর ভেতর থেকে কলিজা, ফুসফুস, কিডনি সব টেনে বের করবে। যদি জীবনের মায়া না থেকে থাকে তাহলে আমার গায়ে হাত দিয়ে দেখা। আরে গহনের হাতে মা র খাওয়ার আগে তো তুই আমার হাতে মা র খাবি। আমি হয়তো তোর সাথে পেরে উঠব না। তবে যে যে জায়গায় তোকে জখম করবো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবি না। তোর সারাদিন লকলক করতে থাকা জিভটা টেনে ছিঁড়ে কুচিকুচি করে কাটবো আমি। বিশ্বাস কর একবার যদি তুই আমার দিকে হাত বাড়িয়েছিস গহনের কথা বাদই দিলাম, আমি নিজেই তোর এমন ব্যবস্থা করব যে তোর পুরুষত্বের গরম উড়ে যাবে। ”
সাবিত পাত্তাই দিল না নিধির কথাকে। বরং হো হো করে হেসে উঠলো। নিধির গা পিত্তি জ্বলে গেল ওর নোংরা হাসি দেখে। বুঝল ওকে কিছু বলেই কোন লাভ হবে না।
চুপচাপ সেখান থেকে চলে যেতে চাইল। দরজার কাছাকাছি যেতেই সালমা বেগমের সাথে দেখা হলো। দেখা হলো বলতে সালমা বেগম নিধির সামনে এসে দাঁড়ালেন। অন্যান্য সময় হলে হয়তো একটু ত্যাড়া কথা বলত সালমা বেগমের সাথে নিধি। তবে এখন সালমা বেগমের সাথে ত্যাড়া কথা বলার কোন ইচ্ছে নেই। কেননা গত কয়েকদিন যাবত অনেক সাহায্য করেছেন। বেশ ভালোই খেয়াল রেখেছেন ওদের দুজনের।
“কিছু বলবেন, মা?”
সালমা বেগমের অভিব্যক্তি দেখে বোঝা গেল যে উনি কিছু বলতে চাইছেন। তবে বলতে পারছেন না। নিধি একটু তাড়া দিয়ে বলল,
“কিছু বলার থাকলে তাড়াতাড়ি বলুন। আমাকে যেতে হবে।”
সালমা বেগম বুঝলেন চুপ থেকে লাভ নেই। বরং চুপ থাকলে তারই ক্ষতি। আমতা আমতা করতে করতে বললেন,
“গহনকে নিয়ে তোমাদের নতুন বাড়িতে গিয়ে উঠবে?”
“হ্যাঁ।”
“তুমি একা একা ওর খেয়াল রাখবে কি করে? সামলাতে পারবে সবটা একা একা? তোমার নিজের পড়াশোনা, সংসারের কাজ, গহনের খেয়াল রাখা করতে পারবে তো সবটা? দেখো, একদিক সামলাতে গিয়ে যেন অন্য দিক গুলিয়ে ফেলোনা। গহন কিন্তু এখন অসুস্থ। ওর অনেক যত্নের প্রয়োজন। ঠিক সময় খাবার দাবার, ওষুধ সবকিছু দিতে হবে ওকে।”
নিধি আলতো হেসে বলল,
“চিন্তা করবেন না মা। উনি এই বাড়িতে যতটা যত্নে ছিলেন তার থেকে বেশিই যত্নে রাখবো।”
সালমা বেগম একটু দ্বিধা দ্বন্দ্বের মাঝে পড়লেন যে নিধি ওনাকে খোঁচা দিল কি দিল না। তবে আর কি বলবেন সেটা খুঁজে পেলেন না। নিধিও বুঝল ওনার বোধহয় কথা বলা শেষ। তাই চুপচাপ ওনাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে সালমা বেগম ফের ওকে আটকে বলল,
“এখানে আসা যায় না? কি সমস্যা এই বাড়িতে? আমরা কি থাকছি না? তবে তোমরা কেন থাকতে পারবে না? জানি গহনের কোন সমস্যা নেই। সব সমস্যা তোমার, তাইতো? তোমারও আর কোন সমস্যা হবে না। নিজের মতন করে সংসার করো। আমি মাথা ঘামাবো না। আমার ছেলেমেয়েকে নিয়ে সমস্যা তো। ওরাও কিছু করবে না। আমি সেই দায়িত্ব নিচ্ছি। একা একা এত দূরে গিয়ে কি করবে? গহন ভালো থাকবে না আমাকে ছাড়া। আমাকে একদিন না দেখে ও থাকতে পারবে না। আমি ভালো হই কিংবা খারাপ হই তবুও ওর আমাকে প্রয়োজন, বুঝেছো? তোমাকে ওর না হলেও চলবে। কিন্তু আমাকে না হলে চলবে না। ও আরও অসুস্থ হয়ে যাবে।”
নিধি লম্বা একটা শ্বাস টেনে বলল,
“আপনার যখন ইচ্ছে আসতে পারেন আমার বাড়িতে। আমি কখনোই আপনাকে বাঁধা দেব না কিংবা বেরও করে দিতে চাইব না। এখন আসি। সম্ভব হলে গহনের সুস্থতা কামনা করবেন।”
____________
গহনদের গাড়ি এসে থামল ওদের নতুন বাড়ির সামনে। নিভৃতির নীড়ের সামনে। ওদের গাড়িতে বাদল আর সিনথিয়া ছিল। বাদলই ড্রাইভ করছিল।
গাড়ি থামতেই নিধি গহন কে চুপচাপ বসে থাকতে বলে তারপর নিজে নেমে গিয়ে গহনের পাশের দরজা খুলে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“আমার হাতটা শক্ত করে ধরে আস্তে ধীরে নামুন।”
গহন বাধ্য ছেলের মত নিধির হাতটা ধরে গাড়ি থেকে বের হল। নিধি এবারে শক্ত করে গহনের বাহু আঁকড়ে ধরে বলল,
“এখন আস্তে আস্তে হাঁটুন। বেশি তাড়াহুড়ো করে হাঁটতে যাবেন না, কেমন?”
গহন আলতো হেসে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে। তাড়াহুড়ো করবো না। তুমি এত ব্যস্ত হচ্ছো কেন? আমি ঠিক আছি এখন।”
“আমি জানি আপনি এখন ঠিক আছেন। আর ভবিষ্যতেও ঠিক যেন থাকতে পারেন সেজন্যই এমন করছি। আর আমি আপনাকে নিয়ে ব্যস্ত হব না তো কাকে নিয়ে ব্যস্ত হব? আমার তো একটাই স্বামী। ভালো হোক খারাপ হোক আপনি তো এক পিসই আছেন আমার কাছে।”
গহন ঠিক বুঝতে পারল না যে ও হাসবে কাঁদবে। ভেতরে ভেতরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেই বিরবির করল,
“এখনো ভালো না খারাপ এই দ্বন্দ্ব রয়েই গেল তোমার মনে!”
তবে মুখে আর কিছু বলল না। গাড়ি থেকে ব্যাগগুলো নামিয়ে নিয়ে বাদল আগে আগে ভিতরে চলে গেছে। দরজার কাছে আসতেই নিধি বাড়ির ভেতরে পা রাখতে ধরলে গহন ওকে আটকালো। নিধি গহনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কি হলো?”
নিজের বাহু থেকে নিধির হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে গহন নিধির হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
“তোমার কি সবটা অদ্ভুত লাগছে না, নিধি? কোন পরিস্থিতির মাঝে আমরা এতদিন ছিলাম, আর আজ সেই পরিস্থিতি থেকে আমরা বের হয়ে আসতে পেরেছি। এটা ভাবতেই আমার অদ্ভুত লাগছে। জানো, আমার ভাবতে ভীষণ অবাক লাগছে যে আজ থেকে আমরা একটু শান্তিতে থাকতে পারব। এই বাড়িটায় কখনো কোনো চেঁচামেচি হবে না, অশান্তি হবে না, কেউ কাউকে খোঁচাবে না, কেউ কারো অতীত তুলে খোঁটা দেবে না। না তোমাকে কথা শোনানোর মতন কেউ আছে, না আমাকে কথা শোনানোর মতন কেউ আছে। আমরা আমাদের মতন থাকতে পারবো।”
নিধি আলতো হেসে এক হাতে গহনকে জড়িয়ে ধরে ওর বুকের সাথে নিজের মাথাটা এলিয়ে দিয়ে বলল,
“হ্যাঁ। আমরা একসাথে থাকতে পারবো। আমরা আমাদের মতন থাকবো। কেউ বিরক্ত করবে না। এটা আমাদের সংসার।”
“হ্যাঁ, আমাদের সংসার। চলো এবার ভেতরে যাই।”
কথাটা বলে গহন নিধিকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে পা রাখতে ধরলে পিছন থেকে সিনথিয়া ডেকে উঠলো। মেয়েটা দৌড়ে ওদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
“ওয়েট ওয়েট। আগেই ভিতরে যেও না। এখানে দাঁড়াও। কয়েকটা ছবি তুলে দেই তোমাদের দুজনের। অবশেষে আমাদের মতন আবর্জনাদের পিছনে ফেলে রেখে এসে একটা শান্তিপূর্ণ জায়গায় উঠতে পারছ। স্মৃতি রাখবে না?”
সিনথিয়ার কথাটা শুনে নিধি শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“জীবনে প্রথম একটা ঠিক কথা বললে তুমি। আসলেই ওই বাড়ির সবাই আবর্জনা। যদিও তাদের মধ্যে থেকে তোমাকে এখন তুলে এনে ধুঁয়ে মুছে একটু পরিষ্কার করা গেছে। যাই হোক, আমার ভালো বরের সাথে কয়েকটা ছবি তুলে দাও। সুন্দর করে তুলে দেবে যেন দেখতে ভালো লাগে। তাহলে তুমিও যেন একটা ভালো বর পাও সেই দোয়া করে দেবো।”
সিনথিয়া শুধু আলতো হাসল। গহন নিধি পাশাপাশি দাঁড়ালো। ছবি তুলতে গিয়ে পেছাতে পেছাতে হঠাৎ করেই কারো সাথে একটা ধাক্কা খেল সিনথিয়া। ব্যথায় মৃদু আর্তনাদ করে উঠে পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখল বাদল দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটা চটজলদি ছিটকে দূরে সরে দাঁড়িয়ে অপরাধী গলায় বলল,
“আই এম রিয়েলি সরি ম্যাডাম। আমি খেয়াল করিনি। আমি আসলে বুঝতে পারিনি। আমি আসলে এখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আপনি হঠাৎ করে পিছিয়ে আসছিলেন সেটা আমি খেয়াল করিনি। ট্রাস্ট মি আমি ইচ্ছে করে করিনি।”
যদিও সিনথিয়ার ইচ্ছে ছিল যার সাথে ধাক্কা খেয়েছে তাকে একটু ঝাড়ি দেওয়ার। তবে ছেলেটা এমনভাবে কোন অপরাধ না করেও নিজের অপরাধ স্বীকার করল যে আর কিছু বলতেই পারল না। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“আমি আর কি বলবো আপনাকে। এমনিতেই তো আপনার অবস্থা খারাপ। যাক গে, ক্ষমা করে দিলাম। বড় ভাইয়ার বোন হওয়ার চেষ্টা করছি তো তাই নিজের মাঝে একটু দয়ালু সত্তাটার জন্ম দিচ্ছি।”
বাদল আর কোন উত্তর দিল না। চুপচাপ মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দূর থেকে নিধি চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“আরে ছবি তুলবে কি তুমি? এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারবো না।”
সিনথিয়া তাড়াহুড়ো করে ছবি তোলায় মনোযোগ দিল। ছবি তোলার সময় একেকবার একেক অঙ্গভঙ্গি করে দাঁড়াতে পারে না গহন। তবে নিধি বারে বারে নিজের অঙ্গভঙ্গি বদলাচ্ছে। কখনো গহনের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, তো কখনো সাপের মতন দুহাতে পেঁচিয়ে ধরছে। কখনো বা আবার গহন কে বাধ্য করছে ওকে পেঁচিয়ে ধরতে।
গহনের তো এখন লজ্জা লাগছে। কেননা দূরে দাঁড়ানো সিনথিয়া আর বাদল ঠোঁট টিপে হাসছে। তবে কি আর করার। গহনের বউয়ের বয়স কম, ছোট মানুষ, বুদ্ধিশুদ্ধি কম, লজ্জা শরমও কম। আর এই ছোট মানুষটাকে কষ্ট দিতে পারে না গহন।
তাই বাধ্য হয়ে গহন নিজেই নিজের লজ্জা শরম কে দূরে ঠেলে রেখে চুপচাপ নিধির তালে তাল মেলালো। সবশেষে দুজনের বিশেরও অধিক ছবি ক্যামেরাবন্দি করল সিনথিয়া। বন্দি হলো কিছু স্মৃতি, কিছু সুখের মূহুর্ত। যা আজীবনের জন্য রয়ে গেল ওদের কাছে।