বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৮০

🟢

পার্কে বেঞ্চের উপর বসে আছে জারা। চেহারার ভাবভঙ্গি তার বেশ অদ্ভুত। রেগে আছে, নাকি মনমরা হয়ে বসে আছে, নাকি কোন কিছু ভাবছে সেটা তার মুখ ভঙ্গি দেখে বোঝার কোন উপায় নেই। সে নিজেই জানে না এখন তার মন মেজাজ এর অবস্থা ঠিক কেমন।

আশেপাশে অনেক মানুষজনের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। কেউ বন্ধু-বান্ধবদের সাথে এসেছে, তো কেউ আবার প্রেমিক-প্রেমিকার সাথে এসেছে। আবার অনেকে নিজের পরিবারের লোকজনদের সাথে ঘুরতে এসেছে। সবাই হাসি ঠাট্টায় মেতে আছে, গল্পগুজব করছে।

হঠাৎ করে এমন পরিবেশের মাঝে জারার নিজেকে কেমন যেন বেমানান লাগলো। অস্বস্তি হতে শুরু করলো। মনে হলো সবাই অদ্ভুত নজরে ওকে দেখছে। জারা ভাবলো ওর আর এখানে বসে থাকা বোধহয় উচিত হবে না। ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে উঠতে যাবে অমনি পাশে ধপ করে একজন পুরুষ এসে বসলো।

বেঞ্চে বসার সাথে সাথে সে নিজের পিঠটা এলিয়ে দিল। জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে। ঘেমেও গেছে লোকটা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে হাঁপিয়ে গেছে।

অবাক করার বিষয় হলো এই সময়ে এখানে আবিদকে জারা সত্যি আশা করেনি। কেননা আধঘন্টা আগেই তো জারা আবিদের নাম্বারে কল করেছিল। কলটা অবশ্য আবিদ রিসিভ করেনি। করেছিল আবিদের সেক্রেটারি। তখনই জানতে পেরেছিল আবিদ নাকি খুব গুরুত্বপূর্ণ কোন মিটিংয়ে আছে। আজ পর পর নাকি দু তিনটে মিটিং আছে। জারা তখনই বুঝতে পেরেছিল আবিদ আজ আসতে পারবে না।

তবে সেই ব্যস্ত ছেলেটা হঠাৎ করে এখানে কি করে চলে এলো সেটাই জারা বুঝতে পারছে না। বিস্মিত গলায় বলল,

“আপনি এখানে কি করছেন? আপনার তো মিটিং ছিল।”

আবিদ জারার দিকে ঘুরে বসে খানিকটা রাগী গলায় বলল,

“আমার সেক্রেটারি কে আপনি নিজের পরিচয় দেননি কেন?”

একটু থতমত খেল জারা। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বলল,

“কি পরিচয় দিতাম?”

“আমার বউ কিংবা প্রেমিকা বলে পরিচয় দিতে বলছি না। আপনার তো একটা নির্দিষ্ট নাম আছে। ওকে সেই নামটাই যদি বলতেন তাহলে তখনই ফোনটা আমাকে দিত। আমি মিটিংয়ে যাওয়ার আগে ওকে বলেই গিয়েছিলাম যে যদি আপনার নাম্বার থেকে কল আসে তাহলে যেন অবশ্যই সঙ্গে সঙ্গে আমায় ফোনটা দেয়। আর আজকে এটা কোন নতুন নাম্বার থেকে কল করেছেন? অপরিচিত নাম্বার থেকে কল এসেছে সেজন্যই তো ছেলেটা আরো চিনতে পারেনি।”

“আপনি তো ব্যস্ত ছিলেন। তাছাড়া আমার পরিচয় দেওয়ারই বা কি আছে? সবকিছুর আগে কাজ, নিজের ক্যারিয়ার।”

আবিদ জারার কথায় তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলল,

“মোটেই না। বাকিদের কাছে সবার আগে কি জানি না। তবে আমার কাছে আমার কাজ, ক্যারিয়ারের আগেও আপনি।”

আরেক দফা থতমত খেল জারা। আবারো নিজের দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল। আবিদের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। কেন যে আবিদের এই কথাগুলো শুনে জারা একটু হাসতে পারেনা, একটু খুশি হতে পারে না কে জানে! কেন যে সব সময় জারাকে অস্বস্তি ঘিরে ধরে বুঝে উঠতে পারে না আবিদ।

“কল করেছিলেন কেন আমায়?”

“এমনিতেই।”

আবিদ কপাল কুঁচকে বলল,

“সত্যিই এমনিতেই? নাকি কোন কিছু বলার ছিল? মনের কথা বলতেন?”

জারা আলতো হেসে বলল,

“মনে এমন কোন কথা নেই যা এত আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে আপনাকে বলতে হবে।”

আবারো আবিদের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো। নিজ থেকে আর একটা কথাও বলল না।

চারিপাশে এত চেঁচামিচির মাঝে কেবলমাত্র ওদের দুজনের মাঝে নিরবতা বিরাজমান। দু দিক থেকে দুজনেই কিছু না কিছু বলতে চাইছে। চাইছে একটু বাক্যের আদান প্রদান ঘটুক। তবে কেউই কেন যেন কিছু বলতে পারছে না।

অন্তর্মুখী স্বভাবের জারার পক্ষে তো ব্যাপারটা ভীষণই কঠিন। তবে বহির্মুখী স্বভাবের আবিদের পক্ষেও কেন যেন আজকাল ব্যাপারটা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

তবে অবাক করার বিষয় হলো আজ জারাই আগে কথা বলে উঠল।

“যখন দেশে আসি, ভেবেছিলাম এক মাসের বেশি হয়ত থাকা হবে না। কয়েক মাস আগেও ভেবেছিলাম আর বেশিদিন থাকবো না। তবে সেসব ভাবতে ভাবতে প্রায় এক বছর হতে চলল দেশে আসার। শুরুর দিকে দেশটা একদম ভালো লাগতো না, জানেন? এখানকার মানুষজন ভালো লাগতো না, এখানকার নিয়ম কানুন ভালো লাগতো না, এত যানজট, কোলাহল, অপরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট, মানুষজনের নোংরা মন-মানসিকতা সবকিছু আমার মনটাকে একেবারে বিষিয়ে তুলেছিল।”

“এখন কি তবে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন?”

খুব ধীর শোনালো আবিদের কন্ঠটা। জারা একবার ঘাড় কাত করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করে নিল ছেলেটাকে। তারপরে নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,

“বিদেশে একটা জবের জন্য এপ্লাই করেছিলাম। হয়েও গেছে জবটা। নেক্সট মান্থ জয়েনিং। যে জবটা আমি করতে চাইতাম সেটাই পেয়েছি। বলতে পারেন আমার ড্রিম জব। সেলারিও অনেক। একটা ড্রিম লাইফ লিড করতে পারব। মানে যেমনটা আমি সব সময় চেয়েছি, ইন্ডিপেন্ডেন্ট লাইফ।”

আবিদ হাসলো। তবে খুব কষ্টে হাসলো। মৃদু হেসে জারার দিকে তাকিয়ে বলল,

“কংগ্রাচুলেশন। আপনি সত্যিই এগুলো ডিজার্ভ করেন। তা এই দেশটাকে ফেলে, দেশের নোংরা রাস্তাঘাট, নোংরা মানুষগুলোকে ফেলে, আমাকে ফেলে কবে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন?”

জারা খানিকটা অবাক হলো আবিদের কথা শুনে। আবিদের কিছু যায় আসে না ও চলে গেলে? একবার আটকানোর চেষ্টাও করবে না? বিস্মিত গলায় বলল,

“আপনি কিছু বলবেন না? আমাকে আটকানোর চেষ্টা করবেন না?”

“না। আপনার থেকে এক মাস সময় চেয়েছিলাম। আপনি আমাকে তার থেকে অনেক বেশি সময় দিয়েছেন। আমি সবরকম ভাবে আপনাকে আমার ভালোবাসা বোঝানোর চেষ্টা করেছি। আমি সত্যিই জানি না আরো কিভাবে একটা মানুষকে নিজের ভালোবাসার কথা জানাতে হয়। এত চেষ্টা করেও যদি আপনি না বোঝেন আমার ভালোবাসা, তাহলে আমি বলব সেটা আমারই ব্যর্থতা। হয়তো আমার ভালোবাসায় তেমন জোর ছিল না যা আপনার হৃদয়কে গলাতে পারে। হয়তো আমার ভালোবাসায় সেই ব্যাপারটাই কখনো ছিল না যা আপনাকে শুধুমাত্র আমার টানে এই দেশে ফেলে রাখবে। হয়তো আপনার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা পাবার সৌভাগ্য আমার নেই।”

“আমি চলে গেলে আপনার খারাপ লাগবে না? আপনার মনে পড়বে না আমার কথা?”

আবিদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অন্যদিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে বলল,

“মন? সে তো আপনি সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন। সে তো আপনার সঙ্গেই থাকবে। তবে তার আবার আপনার কথা মনে পড়বে কি করে? খারাপ লাগার কথা যদি বলেন সে তো খারাপ লাগবেই। সেসব আপনাকে বললেও আপনি বুঝবেন না, জারা। ভালো তো আমি আপনাকে বাসি। আপনি তো আর বাসেননা। ছেড়ে যাওয়ার কষ্টটাও তাই আমিই বুঝব, আপনি বুঝবেন না। আমি আপনাকে ভালোবেসেছি। যদি আপনাকে পাই তবুও আপনাকে ভালোবাসি, যদি না পাই তবুও আপনাকে ভালোবেসে যাব। আমার থেকে দূরে গিয়ে যদি আপনি ভালো থাকতে পারেন তবে তাই থাকুন।”

জারা হা করে আবিদের মুখের দিকে তাকিয়ে ওর বলা কথাগুলো শুনলো। একটু বিরতি নিয়ে আবিদ নিজেই আবার বলল,

“তবে একটা কথা মনে রাখবেন, যেকোনো সময় আমার জীবনে আসার জন্য আপনার আমন্ত্রণ রইল। আমি অপেক্ষায় থাকবো আপনার। কাছে থেকে যে ভালোবাসা তৈরি হলো না হয়তো দূরে গেলে সেটা তৈরি হবে। যদি কখনো এমনটা হয় কোন কিছু না ভেবে ছুটে চলে আসবেন আমার কাছে। আমি বিনা প্রশ্নে সেদিন সানন্দে আপনাকে গ্রহণ করব। কোন করুণা করে না। ভালোবেসে সম্মানের সাথে গ্রহণ করবো আপনাকে।”

কথাগুলো বলে আবিদ উঠে চলে যেতে ধরলে জারা ওর হাত টেনে ধরল।

“আমার পুরো কথাটা শুনে যান। অনেক বছর পর একটা ভালো বন্ধু পেয়েছিলাম। আপনার সাথে সব কথা বলতে পারতাম। শুনবেন না আমার কথাগুলো?”

অনিচ্ছা সত্ত্বেও আবিদ কে থামতে হলো। নিজেকে স্বাভাবিক করে আবারও বসে পড়ল।

“বলুন।”

কোন অদ্ভুত জগতে ডুবে গেল জারা। এক অদ্ভুত ভাবুক ভঙ্গি ফুটে উঠলো তার চেহারায়।

“যা যা চেয়েছিলাম সব পেয়ে গেলাম আমি। বিদেশে আমার একটা সেটেল্ড লাইফ দেখতে পাচ্ছি। আমি যদি চলে যাই ওখানে আমার কাছে সব থাকবে, সব। শুধুমাত্র একজন ভালো বন্ধু ব্যতীত।”

জারার শেষের বাক্যটা শুনে আবিদ চমকে উঠলো। তবে কিছু বলতে পারল না। একটু বিরতি নিয়ে জারা নিজেই আবার বলল,

“জানেন, নিজের ইচ্ছে মত সবকিছু পাওয়ার পরেও কেন যেন সুখী হতে পারছি না। ভেতর থেকে একটা আনন্দ, তৃপ্তি আসছে না। আমি ভেবেছিলাম চলে যাব। গতকাল রাতে গোছগাছও শুরু করেছিলাম। ব্যাগ গোছানোর সময় মনে হচ্ছিল বোধহয় খুব দামি কিছু ফেলে রেখে যাচ্ছি এদেশে। অনেক খুঁজলাম কি ফেলে রেখে যাচ্ছি। প্রথমে মনে হয়েছিল বোধহয় গহন কে। কিন্তু পরে বুঝলাম না, গহন সেই দামি জিনিসটা না। তারপরে আরো খুঁজলাম। পরে মনে হলো যার সাথে গত কয়েক মাস হলো চলাফেরা করছি, মিশছি, যাকে নতুন করে চিনছি তাকে ফেলে রেখে যাওয়ার সাহস হচ্ছে না। আমার আপনাকে ফেলে রেখে যাওয়ার সাহস হচ্ছেন, আবিদ।”

বিজ্ঞাপন

আরেক দফা চমকে উঠলো আবিদ। জারার বলা কথাগুলো যেন ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না। কম্পিত গলায় বলল,

“কি বললেন? আমাকে ফেলে রেখে যাওয়ার সাহস হচ্ছে না?”

জারা আলতো হেসে বলল,

“হ্যাঁ। হঠাৎ করেই মনে হলো যদি আপনাকে ছেড়ে চলে যাই তাহলে নিজেকে ঠকানো হবে। বরাবর যে জীবন আমি চেয়েছি সেই জীবন এখন আর আমাকে টানছেনা। আমার এখন মনে হচ্ছে নিজেকে একটা সংসারে বাঁধা দরকার। আমার এখন মনে হচ্ছে সর্বক্ষণ আমার পাশে থাকার জন্য একটা মানুষ দরকার। আমার এখন মনে হচ্ছে আমার জীবনে এমন একজনকে দরকার যে প্রয়োজনে যেমন আমায় হাসাতে পারে, ঠিক তেমনি আমার চোখের জল স্বযত্নে মুছে দিতে পারে। যে আমায় আগলে রাখতে পারে। সুখ আমারও প্রাপ্য। সংসার করার ইচ্ছে আমারও আছে। যাকে আমি চেয়েছি তাকে পাইনি তো কি হয়েছে? ভাবলাম যে আমাকে চাইছে তাকে একটা সুযোগ দেই। এবারে না হয় তাকে আমিও ভালোবাসার চেষ্টা করি।”

“মানে কি বলতে চাইছেন আমি আসলে বুঝতে পারছি না। একটু ভালোভাবে বলবেন আমায়? আমি আসলে সত্যি বুঝতে পারছি না আপনার কথার মানে।”

“আমি আর বিদেশ যেতে চাই না, আবিদ। আমি আপনার সাথে একটা ঘর বাঁধতে চাই। এই অপ্রিয় দেশে, অপ্রিয় পরিবেশে হুট করে আমার প্রিয় হয়ে ওঠা আপনার সঙ্গে আমি একটা ঘর বাঁধতে চাই। জীবনে ছুটতে ছুটতে আমি ক্লান্ত। এবার আমার বিশ্রামের জন্য নিজের একটা ঘর প্রয়োজন, নিজের একটা মানুষ প্রয়োজন। আমি আপনার সঙ্গে থাকতে চাই, আবিদ।”

____________

প্রথম সেমিস্টারের আজ শেষ পরীক্ষা ছিল নিধির। আজ সকাল থেকেই শরীরটা প্রচন্ড খারাপ ছিল। অসুস্থ শরীর নিয়েই সবগুলো পরীক্ষা দিয়েছে। তবে আজ যেন অত্যাধিক মাত্রায় শরীর খারাপ হয়ে গেছে।

পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে আর একা একা বাড়ি ফেরার সাহস হলো না। মাথাটা ঘুরছে। যদি আবার কোন বিপদ হয়। এখন তো সাবধানে থাকতে হবে। তার মধ্যে এই ব্যাপারে এখনও গহনকে কিছুই জানানো হয়নি। সেজন্য নিধির আর একা এতটা পথ যাওয়ার সাহস হলো না। শেষে গহন কে কল করে আসতে বলেছে।

নিধির শরীর খারাপের কথা শুনে গহন নিজের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ রেখে ছুটে চলে এসেছে ওকে নিতে। একা একা হাঁটতেও মেয়েটার কষ্ট হচ্ছে। হাঁটছে এক দিকে, যাচ্ছে আরেক দিকে এমন অবস্থা।

নিধিকে সিটে বসিয়ে গহন ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ল। মেয়েটা সিটের সাথে হেলান দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে বসে আছে। গাড়ি চলছে। গহন কিছু জিজ্ঞেসও করছেনা আপাতত। একটু পর নিধি নিজেই গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“প্রতিদিন তো আগে জিজ্ঞেস করেন পরীক্ষা কেমন হয়েছে। আজ জিজ্ঞেস করলেন না যে?”

“যা হওয়ার হয়েছে। এই নিয়ে আমি ভাবার প্রয়োজন মনে করছি না। পরীক্ষা চাইলে আরো হাজারবার দেওয়া যাবে। কিন্তু নিজের শরীরটা আগে। ফেল করলেও আমার কিছু যায় আসে না।”

“আরে আপনার বউ এত খারাপ নাকি পড়াশোনায়? ফেল কেন করব আমি? দেখবেন টপার হব, টপার।”

“তুমি এটা খুব ভালো করেই জানো না যে তুমি ফেল করলেও এই নিয়ে আমি তোমায় কিছু বলবো না। কিন্তু নিজের শরীরটা আগে। নিজের শরীরের দিকে খেয়াল রাখতে হবে তোমায়।”

নিধি কন্ঠে খানিকটা বিরক্তি প্রকাশ করে বলল,

“কিছু হয়নি আমার। ঠিক আছি। শুধু একটু শরীরটা খারাপ এই আর কি।”

“শরীর যখন এতই খারাপ তাহলে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার কি প্রয়োজন ছিল? আর নিজের শরীরের যত্ন নাও না কেন তুমি? সারাদিন শুধু আমার শরীরের পিছনে লেগে থাকলে হবে? তোমার কিছু হয়ে গেলে আমার কি হবে ভেবেছো একবার?”

গহন বেশ রাগী গলায় কথাগুলো বলল। নিধিও পাল্টা খ্যাঁক করে উঠে বলল,

“আমি কি করেছি? সব দোষ তো আপনার। আপনার জন্যই তো অসুস্থ হয়ে গেছি আমি।”

ভ্রুঁ কোঁচকালো গহন। নিজের অপরাধ খুঁজে না পেয়ে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“আমি কি করেছি?”

“যা করার সে তো আপনিই করেছেন। আরে আপনার বউ নিজেই তো এখনও একটা বাচ্চা। আবার আমার ভেতরে আরেকটা বাচ্চা চলে এসেছে, শুধুমাত্র আপনার জন্য। এখন কাকে ছেড়ে কাকে সামলাবো আমি?”

গহন ড্রাইভ করছিল। নিধির এমন কথা শুনে মাঝ রাস্তায় হঠাৎ করে ব্রেক কষলো। ভাগ্যিস নিধি সিটবেল্ট পরা ছিল। নয়তো আঘাত পেত।

“আরে পাগল হলেন নাকি? এভাবে হঠাৎ করে কেউ ব্রেক কষে, তাও আবার মাঝ রাস্তায়?”

গহনের ধ্যান ভাঙল পিছন থেকে আসা গাড়ির হর্ণের শব্দে। বুঝতে পারল এভাবে হঠাৎ করে মাঝ রাস্তায় গাড়িটা থামানো ঠিক হয়নি। তাড়াহুড়ো করে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে কিছুদুর এগিয়ে গিয়ে একটা ফাঁকা জায়গায় গাড়িটা দাঁড় করালো। তারপর নিধির দিকে ঘুরে বসে বলল,

“একটু আগে কি বললে তুমি? আবার বল। আমি ঠিক বুঝতে পারিনি।”

নিধি গা ছাড়া ভঙ্গিতে বলল,

“দ্বিতীয়বার আর বলতে পারব না।”

গহন নিজের দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল অন্য দিকে। তাড়াহুড়ো করে গাড়ির কাচ নামালো। এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে গহনের ভেতরে। একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছে। একবার মনে হচ্ছে গহন ঠিক বুঝেছে। পরক্ষণেই আবার মনে হচ্ছে ভুল বুঝেছে। বারবার এত খুশির খবর গহনের জীবনে আসতে পারে নাকি? এত সুখ গহনের কপালে লেখা থাকতে পারে নাকি?

কথাগুলো মনে হতেই আতঙ্কিত ভাব ফুটে উঠলো গহনের চোখে মুখে। আবারও নিধির দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল,

“আমি কিছু বুঝতে পারছি না নিধি। আমি ঠিক বুঝেছি কিনা জানি না। আমি যেটা বুঝেছি সেটা যদি ঠিক হয় তাহলে….তাহলে আমি কি বলবো জানি না। এত আনন্দ আমার ভাগ্যে ছিল এটা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। আমি কিভাবে বোঝাই তোমাকে যে আমি আসলে…..মানে বুঝতে পারছি না কি বলবো।”

নিধি নিজেই নিজের কপাল চাপড়ালো। বুঝলো এই ছেলেটাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। এত সহজ একটা কথাও আন্দাজ করতে পারছে না। ভয় করছে। আসলে গহনের অতীত এতটাই ভয়াবহ কেটেছে যে নিজের সুখের কথা ছেলেটা কল্পনাই করতে পারে না।

নিধি গহনের দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে গহনের একটা হাত নিয়ে নিজের পেটের উপরে রেখে বলল,

“এই যে দেখুন, এখানে একজন আছে। আপনার আর আমার একটা অংশ। আমাদের নিজের মানুষের খুব অভাব, তাই না গহন? আমরা কেন যেন বারবার জোর করে সবাইকে আপন বানাতে চাই। তবে আমার ভিতর এখন যে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠবে তাকে জোর করে আমাদের আপন বানানোর কোন প্রয়োজন হবে না। সে সত্যি আমাদের আপন। সে আমাদের ভীষণ আপন। আপনার আর আমার অংশ।”

গহন কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে রইল নিধির মুখের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে নিজের হাতটা সরিয়ে নিল। নিধি খেয়াল করল যে গহন যখন নিজের হাতটা সরিয়ে নিল তখন সেই হাতটা কাঁপছিল। কম্পিত গলায় জিজ্ঞেস করলো নিধিকে,

“তুমি…তুমি সত্যি বললে, নিধি?”

“এমন বিষয় নিয়ে কেউ মিথ্যে বলে নাকি পাগল।”

গহন এবার আর কোন উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল নিধির দিকে। তারপরে হঠাৎ করে আবার নিজের দৃষ্টি ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। হঠাৎ করে গহন নিজের সমস্ত শব্দ হারিয়ে ফেলল।

নিজের আনন্দ প্রকাশ করতে গহন বরাবরই ব্যর্থ হয়। কিংবা হয়তো সে পারেই না কিভাবে নিজের আনন্দটা প্রকাশ করতে হয়। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। কত বড় আনন্দের একটা খবর জানালো নিধি, গহন কে। গহন যে ঠিক কতটা খুশি এই সংবাদে সেটা হয়তো বলে বোঝাতে পারবে না। তবুও কেন যেন নিজের স্বভাব ছেড়ে বেরিয়ে এসে নিজের আনন্দটা প্রকাশ করতে পারল না। আনন্দে লাফালাফি করতে পারল না, চেঁচামেচিও করতে পারল না।

শুধু হঠাৎ করে আলতো একটু হাসলো। কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবারও দ্বিতীয় দফা হাসলো। তারপরে ঘুরে তাকালো নিধির দিকে। নিধি খেয়াল করল গহনের চোখের কোণাটা জলে চিক চিক করছে। নিধি দেখতে পেল গহনের ঠোঁটের তৃপ্তির হাসি। গহন যে ঠিক কতটা খুশি সে সব নিধিকে বোঝানোর জন্য আর একটা শব্দ বলারও প্রয়োজন নেই। নিধি তো বোঝে এই মানুষটাকে। এই মানুষটার না বলে কথাগুলোও নিধি ঠিক বুঝে নেয়। এই যেমন এখনও বুঝতে পারল।

“কষ্ট করে আর কিছু বলার চেষ্টা করতে হবে না। আপনার চোখ দেখেই আমি বুঝতে পেরেছি আপনি কতটা খুশি। মনে আছে, বলেছিলাম আপনাকে একটা উপহার দেব? এটাই সেই উপহার। আমি জানি এর থেকে বেশি খুশি আপনি আর কোন উপহার পেলেই হতেন না।”

গহন তৃতীয় দফা আবারও একটু হাসলো। এবারে হাসির সঙ্গে সঙ্গে ওর গাল বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। তা দেখে নিধিরও চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো।

গহন একটু ঝুঁকে গিয়ে আলতো করে নিধির কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল,

“তোমায় ধন্যবাদ দেবো না। আমায় যে উপহারটা দিয়েছো এর জন্য ধন্যবাদ অনেক ছোট একটা শব্দ। তবে আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, তোমাদের কারোর যত্নের কোন অভাব হবে না। তোমাদের কারোর ভালোবাসার কোন কমতি হবে না। সেই সাথে আমাদের দুজনের দুজনকে কথা দিতে হবে নিধি, যেন আমাদের বাচ্চার কখনো মনে না হয় যে আমরা ওকে অবহেলা করছি। ওর যেন কখনো মনে না হয় ওর বাবা-মায়ের ভালোবাসার কমতি রয়েছে। কখনো আমরা ওকে ছেড়ে যাবো না। ওকে আমাদের সবটা দিয়ে আগলে রাখবো। জীবনে আমরা যে কষ্টগুলো অনুভব করেছি সেসব ওর ধারের কাছেও ঘেষতে দেবো না। ওকে খুব যত্নে বড় করব। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ওকে ওর মায়ের ভালোবাসাটা তুমি দিও, নিধি। ওকে এতটা ভালোবেসো যেন কখনো মায়ের ভালোবাসার অভাবে কষ্ট পেতে না হয়, মন খারাপ করে বসে না থাকতে হয়। ওর জীবন যেন কখনো ওর বাবার অতীতের মতন না হয়।”

কথাগুলো বলতেই গহনের গাল বেয়ে আরেক দফা জল গড়িয়ে পড়লো। এ পর্যায়ে নিধিও কেঁদে উঠে উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে বলল,

“হবে না। খুব ভালোবাসবো ওকে আমি। চিন্তা করবেন না আপনি। আপনাকে যেভাবে ভালোবেসে আগলে রেখেছি ওকেও তেমন ভাবেই রাখবো। আপনাদের কাউকেই কখনো কোন কষ্ট পেতে দেব না আমি। কখনোই ভালোবাসার অভাব বোধ করতে দেবো না। সারা জীবন আমি আমার সবটা দিয়ে আপনাদের ভালোবেসে যাব।”

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প