ঘড়িতে সময় তখন সকাল দশটা। ছেলেকে একটু আগে খাইয়ে ঘুমিয়ে দিয়েছে ঋতু। নিজের এখনো খাওয়া হয়নি। আজকাল ঋতুর জীবনের কোন কিছুই যেন আর নিয়ম মাফিক চলে না। ওর খাওয়া-দাওয়া ঠিক মতো হয় না, ঘুমোয় না ঠিক মত। প্রায় সারারাতই জেগে কাটাতে হয়। ছেলেটা সারাদিন ঘুমোয় কিন্তু রাতে বিরক্ত করে। ঋতুও আর তাই ঘুমোতে পারে না।
রান্নাঘরে গিয়ে দেখল খাবার রান্না করাই আছে। একটা প্লেটে ভাত তরকারি নিয়ে ঘরে এসে ছেলের পাশে বসল। যেকোনো সময় আবার ঘুম ভেঙে যেতে পারে ছেলেটার। ঋতুর খাওয়া দাওয়ার মাঝেই সাবিত গোসল করে বেরোল। ঋতু একবার আড়চোখে তাকাল সাবিতার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে আবার নিজের মনোযোগ খাওয়ায় নিবদ্ধ করল। কিছু জিজ্ঞেস করবে না ভাবল। কেননা যাকে জিজ্ঞেস করলে উত্তর পাওয়া যায় তাকে জিজ্ঞেস করা যায়। কিন্তু যে উত্তরই দিতে পছন্দ করে না তাকে জিজ্ঞেস করে লাভ কি!
গপ গপ করে খেয়ে উঠে গিয়ে হাত ধুঁয়ে এলো। ততক্ষণে সাবিত পুরোদমে তৈরি হয়ে গেছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তখন জেল দিয়ে চুল সেট করছে। চুল ঠিক করা হলে হাতে একটা ঘড়ি পরল। তারপরে পারফিউম লাগাল। গুনগুন করে আবার গানও গাইছে। মনে হচ্ছে বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে।
বেড সাইডের উপর থেকে ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে যখন ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে ধরল তখন আর ঋতু কেন যেন চুপ থাকতে পারল না। জিজ্ঞেস করেই ফেলল,
“কোথায় যাচ্ছ?”
সাবিতের স্বাভাবিক গলার উত্তর,
“যেখানে ইচ্ছে যাব। তোমাকে জানিয়ে যেতে হবে নাকি?”
ঋতু তাকাল সাবিতের দিকে। বিছানা থেকে উঠে গিয়ে দাঁড়াল সাবিতের সামনে। অসীম ঘৃণা যেন ধীরে ধীরে ঋতুর হৃদয় থেকে সাবিতের প্রতি ভালোবাসাটা ম্লান করে দিচ্ছে। ঋতুর মনে হয় সে আজকাল আর বোধহয় সাবিতকে ভালোবাসে না আগের মতন। এই যেমন এখন ঘৃণা ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে।
“লজ্জা করে না তোমার? এই মুখ নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াও কি করে? বুক ফুলিয়ে সমাজে চলাফেরা করো কি করে তোমার এই নোংরা চরিত্র নিয়ে? বউয়ের কথা না হয় বাদ দিলাম। বউ তো মানুষ না। জন্ম তো দিয়েছি তোমারই ছেলে, তোমারই র ক্ত। ওর প্রতিও কোন মায়া অনুভব করো না? তার জন্য কি একটুও শোধরানো যায় না?”
চোয়াল শক্ত হয়ে এলো সাবিতের ঋতুর কথাগুলো শুনে। দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,
“বেরোনোর সময় মন মেজাজ খারাপ করবি না। তোর এসব বকবক শোনার মতন মানসিকতায় নেই আমি এখন। সামনে থেকে সরে দাঁড়া। আমার ভালো মেজাজের বারোটা বাজালে কিন্তু তোরও বারোটা বাজিয়ে তারপর বেরোবো বাড়ি থেকে।”
কথাটা বলে সাবিত ঋতুকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে ধরলে ঋতু বাঁধা হয়ে দাঁড়াল। যেতে দিল না। সাবিতের মেজাজটা আরও চটে গেল।
“বাড়াবাড়ি করছিস কিন্তু। আমার রাগ তুলিস না। কি থেকে কি করব নিজেও জানি না।”
“প্রেমিকার কাছে যাচ্ছো? এত শরীরের খিদে কেন তোমার? সারারাত তো বউয়ের ওপর অত্যাচার করো। আবার দিন হলে প্রেমিকাকেও লাগবে! নোংরামি করা ছাড়া জীবনে আর কোনো কাজ নেই, তাই না?”
সাবিত এবারে সত্যি নিজের মেজাজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারাল। শক্ত করে ঋতুর চোয়াল চেপে ধরল। ঋতু ব্যথায় মোটেও কাতরাল না। অথচ সাবিত এত জোরে চোয়াল চেপে ধরেছে যেন মনে হচ্ছে নখগুলো বসে যাবে এখন গালে। অমনি চোয়াল চেপে ধরেই দাঁত পিষে বলল,
“আমার যা ইচ্ছে হবে আমি তাই করবো। তোর পোষালে থাক, না পোষালে ব্যাগ গুছিয়ে বাপের বাড়ি চলে যা। কিন্তু আমাকে জ্ঞান দিতে আসবি না। আর তোর গলার আওয়াজ আর চোখ দুটোই নামিয়ে কথা বলবি আমার সাথে। নয়তো তোর চোখ উপড়ে ফেলতে আর গলা টিপে মা র তে আমার দু মিনিটও সময় লাগবে না। শালী মাথাটা খারাপ করে দিল।”
কথাটা বলে ঋতুকে ছুঁড়ে ফেলল সাবিত। হুমড়ি খেয়ে পড়লো ঋতু। কপালের কোণাটা গিয়ে লাগল খাটের সাথে। এবারেও ব্যথায় একটুও কাতরাল না।
সাবিত ততক্ষণে বেরিয়ে গেছে। ঋতু বুঝতে পারছে আজকাল ওর শরীর ব্যথা খুব কমই অনুভব করতে পারে। সেই সাথে এটাও বুঝল ধীরে ধীরে ঋতুর এই অত্যাচার সহ্য করার ইচ্ছেটাও কমে আসছে।
নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে সাবিত সোজা গেল সালমা বেগমের ঘরে। ছেলেকে ঘরে ঢুকতে দেখলেন সালমা বেগম। শুধু তাকিয়ে রইলেন ফ্যালফ্যাল করে। আগেই নিজে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না ।
“টাকা দাও তো।”
কোনো অনুরোধ না, কোন আকুতি না। এমনও না যে ভীষণ প্রয়োজনে টাকাটা চাইছে। নিতান্তই ফুর্তি করে বেড়াবার জন্য টাকাটা চাইল। তার কন্ঠ শুনে মনে হল আদেশ করছে সালমা বেগমকে।
“টাকা নেই আমার কাছে।”
স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর সালমা বেগমের। তবে সাবিতের ওনার উত্তরটা পছন্দ হলো না। প্রশ্নাত্নক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“টাকা নেই মানে? থাকবে না কেন?”
“থাকবেই বা কি করে টাকা? এই বাড়িতে উপার্জন করার মতন একজন মানুষও আছে? তুমি কি কোন কালে উপার্জন করে আমার কাছে টাকা জমা রেখেছিলে যে এখন চাইছো? এই বয়সে এসে বৃদ্ধা মায়ের থেকে টাকা চাইতে লজ্জা করে না?”
“লজ্জা করার কি আছে? টাকা লাগবে, তাই চাইছি। আমি তো কোন ফকিন্নির ছেলে না যে টাকা কামাই করে তারপরে চলতে হবে। বাপ তো রেখে গেছে সম্পত্তি।”
“বাপের রেখে যাওয়া সম্পত্তি শেষ হলে কি করবে? তোমাদের জন্য বাপ রেখে গেছে শুধু কয়েকটা জমি। সেগুলো বেঁচে কয়দিন চলবে? সেগুলো শেষ হলে কি করবে?”
সাবিত হাত উঠিয়ে সালমা বেগমকে থামিয়ে দিয়ে বিরক্তিকর গলায় বলল,
“এখন এসব কথা শুনতে ভালো লাগছে না। টাকা দাও। গহন দেয় না কিছু? ও তো ভালো টাকা দেয় তোমায়। যখন যা চাও তাই দেয়। তাহলে নাটক করছ কেন?”
সালমা বেগম এবারও যথেষ্ট শান্ত গলায় বললেন,
“গহন আগে দিত। এখন আর দেয় না সে খবর তুমি জানো না? তোমার বাবা তোমাদের নামে তো কিচ্ছু দিয়েই যায়নি। ও দয়া করে যতটুকু দিয়েছে সেই সম্পত্তির দিকে তোমায় নজর আমি দিতে দেব না। পারলে একটা চাকরি খোঁজো। সংসারের কি অবস্থা জানো? এভাবে আর সংসার কতদিন চলবে? তোমার একটা ছেলে আছে। তার ভবিষ্যৎ বলতে তো একটা কথা আছে। বাড়িতে বাজার নেই। আমার ওষুধ নেই। এভাবে আর কতদিন চলা যায়!”
“ধ্যাত বা ল থামো তো। সবাই লাগছে জ্ঞান দিতে। আমার লাগবে টাকা, জ্ঞান দিয়ে পেট ভরাইতে আসছে আমার। ধ্যাত!”
কথাগুলো বলে গটগট পায়ে হেঁটে সাবিত বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। ও যাওয়ার পর সালমা বেগম নিরবে দীর্ঘস্বাস ফেললেন। প্রত্যেকটা মুহূর্তে তিনি তার নিজের সন্তানদের সাথে গহনকে মেলাতে বসেন। কিন্তু কোন মিল খুঁজে পান না। তার প্রত্যেকটা সন্তান অমানুষ। প্রত্যেকটা সন্তানের মাঝে বিন্দুমাত্র কোনো শিক্ষা-দীক্ষা নেই। অন্যদিকে গহনকে যে জন্ম দিয়েছে সেই মা তো রত্নগর্ভা। এমন সন্তান জন্ম দিয়েছেন যাকে নিয়ে সৎ মা হয়েও তার গর্ব হয়।
সালমা বেগমের এসব ভাবনার মাঝে কলিং বেল বেজে উঠল। উনি গহনের ভাবনাতে নিমগ্ন ছিলেন। এর মাঝে কলিং বেল বেজে ওঠায় ওনার কেন যেন মনে হলো গহনই এসেছে বোধহয়। আগে প্রায়ই এমন হতো। উনি যখনই গহনের কথা ভাবতেন ঠিক তখনই কিভাবে যেন গহন চলে আসত।
সালমা বেগম আর সেই অপেক্ষাতে রইলেন না যে কে কখন দরজা খুলে দেবে। উনি নিজেই তাড়াহুড়ো পায়ে বেরিয়ে গেলেন দরজা খুলে দেওয়ার জন্য।
তবে দরজা খুলে সামনে গহনকে পেলেন না। পেলেন বাদলকে। মুহূর্তের মাঝে ওনার হাসি হাসি মুখটা চুপসে গেল। বাদল সালাম দিল ওনাকে। তাতে ধ্যান ভাঙল। সালামের জবাব দিয়ে বললেন,
“হ্যাঁ বলো।”
বাদল হাতে থাকা একটা ব্যাগ সালমা বেগমের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“স্যার এটা আপনার জন্য পাঠিয়েছেন।”
“কি আছে এতে?”
“সেটাতো আমি সঠিক বলতে পারছিনা। স্যারই ভালো জানেন। উনি আমাকে শুধু এই ব্যাগটা হাতে দিয়ে আপনাকে দিয়ে যেতে বলেছিলেন।”
ব্যাগটা হাতে নিলেন সালমা বেগম। চলে গেল বাদল। উনি দরজা বন্ধ করে দিয়ে ঘরে এসে ব্যাগটা খুললেন। ভেতর থেকে আরেকটা ছোট্ট ব্যাগ পেলেন। তার ভেতরে রয়েছে তার প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র।
সালমা বেগমকে বিভিন্ন অসুস্থতার জন্য নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। অথচ আজ এক সপ্তাহ হলো তার ঘরে কোন ওষুধপত্র নেই। তিনি যে কিনবেন সে টাকাও নেই। তার ছেলেমেয়েরাও এতটা যোগ্য না যে তাকে ওষুধ কিনে এনে দেবে। তিনি মিলিয়ে দেখলেন সেই প্রত্যেকটা ওষুধ রয়েছে যেগুলো উনি নিয়মিত খান। প্রত্যেকটা ওষুধ দু পাতা করে কিনে দিয়েছে গহন।
বড় ব্যাগের মাঝে তিনি কিছু খাবার দাবারও পেলেন। খেজুর, কাজু বাদাম, কিসমিস, কাঠবাদাম ইত্যাদি। সেই সাথে আরেকটা কাগজও আছে। কাগজটা একটা ফাইলের ভেতরে তোলা। তিনি খুললেন কাগজটা। দেখে বুঝতে পারলেন কোন কিছুর দলিল । সালমা বেগম পড়লেন সেই দলিলটা। তিনি বুঝতে পারলেন এই বাড়িটা গহন ওনার নামে লিখে দিয়েছে। খুব একটা ভাবান্তর দেখা গেল না ওনার মাঝে। তিনি খুশি হলেন কিনা তাও বোঝা গেল না। কাঁদলেনও না তিনি।
হঠাৎ করেই ওনার ফোনটা বেজে উঠলো। হাতে নিতেই দেখলেন গহন কল করেছে। তাড়াহুড়ো করে রিসিভ করতেই ভেসে এলো গহনের কন্ঠস্বর।
“তোমায় বলেছিলাম শুধুমাত্র তুমি মা বলে তোমার হাজারটা অন্যায় ক্ষমা করে দেওয়া যায়। আমিও দিয়েছি, মা। বিশ্বাস করো আমি তোমার ওপরে রেগে নেই। কোন অভিমানও জমে নেই। তবে ঠিক ভরসা করতে পারি না। আমার খুব ভয় হয় আজকাল। সেজন্য তোমার সাথে আর দেখা করা হয় না। মনে হয় আমায় সুখী দেখে যদি তুমি আবার অভিশাপ দাও, যেমনটা আগে দিতে! মনে হয় তোমার দেওয়া অভিশাপে যদি নিধির বা আমার সন্তানের ক্ষতি হয়ে যায়!”
সালমা বেগম গম্ভীর গলায় বললেন,
“এসব বলার জন্য কল করেছো? একবার তো দেখাও করে যেতে পারতে।”
“বললাম তো সাহস হয় না। যাইহোক, আমি জানি আমার বাবা তোমার জন্য কোন কিছু রেখে না গিয়ে অন্যায় করেছেন। সম্ভব হলে ক্ষমা করে দিও আমার বাবাকে। আমি তো তোমাকে মা বলে ডাকি। তাই তোমার দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারিনা। বাড়িটা আজ থেকে তোমার। আমার কিংবা আমার স্ত্রীর কোন অংশ সেখানে থাকবে না। আমার ঘর থেকে তুমি আমার সমস্ত চিহ্ন মুছে ফেলো। তাহলে হয়তো শান্তি পাবে। প্রত্যেক মাসে তোমার একাউন্টে প্রয়োজনীয় টাকা আমি পাঠিয়ে দেব। তুমি নিজের ওষুধ কিনে খেও। শম্পার ছেলেমেয়েদের খেয়াল রেখো। বাবা মায়ের জেদের কাছে ছেলেমেয়ে দুটো অসহায় হয়ে গেল। ঋতু আর ওর বাচ্চারও খেয়াল রেখো, মা। আর তোমার ছেলেমেদের মানুষ হতে বলো।”
“আবার ক্ষমা করে দিচ্ছো! তোমার ক্ষমার সুযোগই কিন্তু বারবার নেই আমরা। আর ক্ষমা করো না। আমরা মানুষ ভালো নই, বাবা। তোমার ক্ষমার মূল্য দিতে পারব কিনা জানি না।”
নির্জীব গলায় কথাগুলো বললেন সালমা বেগম। ওনার মাঝে অপরাধবোধ কাজ করল কিনা সেটা বলা যায় না। অপর পাশে থাকা গহন মলিন হেসে বলল,
“কঠোর হতে চেয়েও তোমার প্রতি কঠোর হতে পারলাম না, মা। মা ডাকটা ভীষণ ভারী। শুধু ডাকটা মুখে ডাকলেই হয় না। অনেক দায় দায়িত্ব থাকে। তুমি তো জানো আমি নিজের হৃদয় কখনো কঠিন করে তুলতে পারিনি। ভেবেছিলাম তোমাদেরকে খুব কষ্ট দেবো। কিন্তু দিন শেষে পারলাম না। তুমি তো মা। মা কে কি করে কষ্ট দেই! দুদিন পর আল্লাহ চাইলে আমার ঘরেও হয়ত আমার আরেক মা হয়ে আমার মেয়ে আসবে। সেসব ভেবে আর কঠিন হতে পারলাম না। আমি যে নিজেকে পাথর রূপে কখনোই গড়ে তুলতে পারিনি, মা।”
____________
সময় তখন দুপুর দুটো। গহন সেই সকালে বেরিয়ে গেছে অফিসের কাজে। এর মাঝে কমপক্ষে দশ বার কল করে নিধির খোঁজখবর নেওয়া হয়ে গেছে ছেলেটার।
আজ সকাল থেকে নিধির শরীরটা বেশ খারাপ। পা দুটো ফুলে গেছে। হাঁটাচলা করতে কষ্ট হয়। শরীরটা প্রচন্ড ভারী হয়ে উঠেছে। এক সপ্তাহ পর ডেলিভারী ডেট পড়েছে। নিধির মনে এই নিয়ে সে কি আতঙ্ক! যখন তখন শুধু ডুকরে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। গহন কে জড়িয়ে ধরে বসে থাকতে ইচ্ছে করছে। মানুষটাকে ছাড়তে ইচ্ছে করে না।
আজকাল গহনের মুখটা দেখলেই নিধির খুব কান্না পায়। খুব ভয় হয়। মনে হয় এই মানুষটাকে ছেড়ে যাওয়া খুব কষ্টের। আবার মনে হয় এই মানুষটাকে ছেড়ে যদি নিধি চলে যায় তবে মানুষটার কি হবে? ছেলেটাকে কে আগলে রাখবে? কে আদর যত্ন করবে? ছেলেটার মা, বাবা, ভাই, বোন কেউ নেই। নিধিকে ছাড়া পাগল হয়ে যাবে গহন। এসব ভেবেই নিধির খুব কান্না পায়। এই যে এখনো বসে বসে কাঁদছে।
নিধির এসব ভাবনার মাঝেই কলিং বেলের আওয়াজ পেল। বাড়িতে একজন কাজের লোক রেখেছে গহন। তার প্রধান কাজ নিধির প্রয়োজনীয় সমস্ত জিনিস নিধির হাতের কাছে এনে রাখা। সেই সাথে যতক্ষণ গহন বাড়িতে না থাকে ততক্ষণ বাড়িতে থাকা। কেননা নিধিকে একা এই মুহূর্তে রাখতে ইচ্ছে করে না গহনের।
নিধি জানে গহন ব্যতীত আর কেউ আসেনি। তাই তাড়াহুড়ো করে ঠিকঠাক হয়ে বসে চোখের জল মুছল। একটু পর গহন এলো। নিধির মুখের দিকে তাকিয়ে ও যে কাঁদছিল সেটা বুঝতে গহনের এক সেকেন্ড সময়ও লাগলো না। ব্যাগটা রেখে সোফায় নিধির পাশে বসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কাঁদছিলে তুমি?”
নিধি দু দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“না তো।”
“মিথ্যে বলো না। তোমায় বুঝি আমি। কি হয়েছে? কষ্ট হচ্ছে? কিছু লাগবে? পা ব্যথা করছে? দেখি পা দাও। আমি টিপে দিচ্ছি।”
গহন নিধির পা টা তুলে নিতে চাইল। তবে নিধি আপত্তি জানাল। চুপচাপ সোফার উপরে গহনের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। গহন কিছুক্ষণ চুপচাপ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। চুলে বিলি কেটে দিল। যা যা করলে নিধি আরাম পাবে বলে মনে হলো সেই সমস্তটাই করল। এক সময় খেয়াল করল নিধি কাঁদছে। গহনের রাগারাগি করতে ইচ্ছে করল না। ও জানে যে কেন কাঁদছে। তবুও শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে?”
নিধি ক্রন্দনরত গলায় উত্তর দিল,
“আমি বোধহয় আর বেশিদিন বাঁচব না।”
গহন এবারও রাগ করল না। খানিকটা অভিমান জড়ানো গলায় বলল,
“এত তাড়া আমায় ছেড়ে চলে যাওয়ার?”
“যেতে তো চাই না। তবে শরীরের যা অবস্থা! মনে হচ্ছে হাসপাতাল থেকে আপনি শুধু আমাদের বাচ্চা কে নিয়েই ফিরতে পারবেন। আমি হয়ত আপনাদের সঙ্গে ফিরতে পারব না।”
গহন এবারে আলতো হেসে বলল,
“চিন্তা করো না। তোমায় একা আমরা কোথাও যেতে দেব না। তুমি যদি আমাদের ফাঁকি দিয়ে চলে যেতে চাও। তবে আমরা বাপ-মেয়ে তোমার পিছে পিছে গিয়ে তোমায় চমকে দেব। একা ছাড়ব না তোমায়।”
কান্না থেমে গেল নিধির। গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মেয়ে! আপনি কি করে জানলেন আমাদের মেয়ে হবে? ছেলেও তো হতে পারে।”
“হতেই পারে। কিন্তু আমার মনে হয় মেয়ে হবে।”
“এত নিশ্চিত হয়ে কি করে বলছেন?”
“নিশ্চিত হয়ে বলছি না। আমার মনের ইচ্ছের কথা বলছি। সবার সব ইচ্ছে তো অপূর্ণ থাকে না। আমার কত ইচ্ছে অপূর্ণ রয়ে গেছে। কিছু ইচ্ছে তো পূরণও হবে, তাই না? আমার ইচ্ছে আমার একটা মেয়ে হবে। আমার ঘরে আমার মা আসবে। আমার আম্মা।”
“আর যদি ছেলে হয় আপনি খুশি হবেন না?”
“খুশি কেন হবো না? যে আসবে তাতেই আমি খুশি। তোমাদেরকে সুস্থ ভাবে বাড়ি ফিরিয়ে আনতে পারলেই আমি খুশি। তবে ওই যে মনের একটা ইচ্ছে থাকে না? আমার সেই ইচ্ছে হলো আমার ঘরে আমার মা আসবে। ও আমাকে বাবা বলে ডাকবে। আর আমি ওকে আম্মা বলে ডাকব।”
আলতো হাসল গহন। নিধিও পাল্টা আলতো হাসল। হঠাৎ করে খেয়াল করল ওর আর কোন কষ্ট হচ্ছে না। সেটা কি এই মানুষটার কাছে থাকার জন্য? হবে হয়তো।
___________
বিকালের দিকে আজ নীলা এসেছেন বাড়িতে। আজ রাতটা তিনি থাকবেন। আযীয আহমেদকে রেখে তিনি কোথাও একা একদিনের জন্যও থাকতে পারেন না। কেননা আযীয আহমেদ সম্পূর্ণভাবে স্ত্রীর উপরে নির্ভরশীল। ওনাকে একা ফেলে নীলার আসার ব্যাপারে নিধিও আপত্তি করে।
তবে আজ নীলা সেসব বাঁধা মানেননি। গহনের থেকে শুনেছিলেন মেয়েটার শরীর খারাপ, কান্নাকাটি করছে। তাই চলে এসেছেন।
নিধিকে নীলার দায়িত্বে রেখে গহন আবার অফিসে গিয়েছে। সন্ধ্যের দিকে নীলার নাম্বার থেকে কল এলো ওর ফোনে। রিসিভ করতেই অপর পাশ থেকে নীলার আতঙ্কিত কন্ঠস্বর ভেসে এলো,
“নিধি কে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে, বাবা। ও কান্নাকাটি করছে। ব্যথা আর সহ্য করতে পারছে না। আমি কি করবো বুঝতে পারছি না। তুমি তাড়াতাড়ি এসো।”
নিধির চেঁচামেঁচির আওয়াজ ভেসে এলো গহনের কানে। মেয়েটা কাঁদছে। হাউমাউ করে কেঁদেকেটে গহনকে তাড়াতাড়ি আসতে বলছে। গহন ফোনটা কানে ধরে কেবিন থেকে দৌড়ে বেরোতে বেরোতে নীলাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“মা আপনি চিন্তা করবেন না। আপনি শুধু ওকে দশটা মিনিট কষ্ট সহ্য করতে বলুন। আমি আসছি।”