বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৮৬

🟢

“শম্পা!”

ডাকটা কানে যেতেই শম্পা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। পিয়াল না? হ্যাঁ পিয়ালই তো।

শম্পাকে নিজের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে পিয়াল ভাবল বোধহয় চিনতে পারেনি। তাই ভাবল নিজের পরিচয়টা দেবে।

“আমি পিয়াল। চিনতে পারছো না?”

শম্পা গম্ভীর গলায় উত্তরে বলল,

“না চিনতে পারার কি আছে। যাই হোক, ডাকলে কেন?”

“অনেকদিন পর দেখলাম। তাই ভাবলাম কথা বলি।”

শম্পা ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,

“এত বছর পর কথা বলার ইচ্ছে হলো! কিন্তু কেন ইচ্ছে হলো? আমার সঙ্গে যেন কথা বলতে না হয়, যেন আমার মুখও দেখতে না হয় সে ব্যবস্থা তো নিজেই করেছিলে।”

পিয়ালের কেন যেন আজ কোন ধরনের কোন বাক-বিতন্ডায় জড়ানোর ইচ্ছে হচ্ছে না। সত্যি অনেক বছর পরে পিয়াল আবার শম্পাকে দেখল। ছেলে মেয়ে প্রায়ই ওর কাছে আসে। বলা যায় মাসের অর্ধেক দিন পিয়ালের কাছে থাকে তো অর্ধেক দিন থাকে শম্পার কাছে। পিয়াল যখন ওদেরকে আনতে যায় তখন ঘরের ভেতরে ঢোকে না। শম্পাও বাইরে বেরোয় না। তাই দেখাও হয় না। আবার পিয়াল যখন রাখতে আসে তখনো দেখা হয় না। এই করে করে আজ অনেকগুলো বছর কেটে গেছে কেউ কারো মুখ দেখেনি।

শম্পার চেহারায় বয়স্কের ছাপ পড়ে গেছে। মেয়েটাকে দেখতে যতটা বয়স্ক মনে হচ্ছে ততটা বয়স এখনো হয়নি। গায়ের রং কালো হয়ে গেছে। চেহারাটা মলিন লাগছে দেখতে। পরনে কি সাধারন একটা সালোয়ার কামিজ। অথচ পিয়াল জানে শম্পা এত সাধারণ জামা কাপড় পছন্দ করে না। শম্পার একটু দামি জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরতে ভালো লাগে। বাইরে বের হলে সাজগোজ করা ছাড়া বের হতো না। অথচ এখন বোধহয় ঠোঁটে ভ্যাসলিন অব্দি লাগাইনি। না চাইতেও পিয়ালের খারাপ লাগল কেন যেন ওকে দেখে।

এদিকে অনেকটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পরেও পিয়ালের থেকে কোন উত্তর না পেয়ে শম্পা এবারে খানিকটা বিরক্তিকর গলায় বলল,

“কোন দরকারী কথা আছে কি? না থাকলে আমি চলে যাব।”

“অযথা চাকরি করছো কেন? আমিতো যথেষ্ট টাকা পাঠাই। স্বাচ্ছন্দে চলে যাওয়ার কথা।”

“বাড়িতে বসে সময় কাটে না।”

“বিয়ে করতে পারতে। জীবনটা নতুন করে শুরু করতে পারতে। আমি এডজাস্ট করে থাকতে পারিনি, হয়ত অন্য কেউ পারত।”

শম্পা অদ্ভুত দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল পিয়ালের দিকে। হঠাৎ করেই আবার দুচোখে ক্রোধ ভর করল। পিয়াল কে খানিকটা খোঁচা দিয়েই বলল,

“সবাই তোমার মতন স্বার্থপর হয় না। আমি আমার ছেলে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বিয়ে করতে পারিনি। সবথেকে বড় কথা আমার চরিত্র তোমার মতন নোংরা না।”

“আমার চরিত্র নোংরা! সংসার তো অনেকগুলো বছরই করেছো। তারপরও তুমি বলবে আমার চরিত্র নোংরা?”

শম্পা জোর গলায় বলল,

“হ্যাঁ তুমি চরিত্রহীন। যখন তোমার বিয়ের খবর শুনলাম তখন বুঝতে পারলাম কেন আমাকে ডিভোর্স দেওয়ার জন্য এত তাড়াহুড়ো লাগিয়েছিলে। পরকীয়ায় জড়িয়েছিলে, তাই না? আমি নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি পরকীয়ায় জড়িয়েছিলে বলেই আমাকে ডিভোর্স দিয়েছিলে। ডিভোর্সের কারণ হিসেবে আমার যে দোষ গুলো দেখিয়েছিল আগে তো সেগুলো তোমার চোখে পড়ত না। হঠাৎ করে চোখে পড়ল। আর এমন ভাবেই চোখে পড়ল যে সরাসরি ডিভোর্স দিতে হলো। আমি এতটা বোকা নই পিয়াল।”

পিয়াল কেন যেন রেগে গেল না। হাসল খানিকটা। ওকে হাসতে দেখে শম্পা কপাল কোঁচকাল। কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই পিয়াল নিজ থেকেই বলে উঠল,

“ঠিকই বলেছো, তুমি বোকা না। তুমি ভীতু। নিজের দোষ স্বীকার করার সৎ সাহস নেই। আমি পরকীয়ায় জড়িয়েছিলাম কি ছিলাম না সে বিষয় নিয়ে আমি কিচ্ছু বলব না। কারণ আমি খুব ভালো করে জানি তুমি নিজেই জানো আমার মতন মানুষ পরকীয়ায় জড়াবে কিনা। তবে একটা কথা বলি, দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য আমার কোন আফসোস নেই। ভাগ্যিস আমি তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলাম। আমি মানসিকভাবে যেভাবে ভেঙে পড়েছিলাম, যতটা বিষন্নতায় ডুবে গিয়েছিলাম আমার দিন যাপন করা খুব কঠিন হয়ে পড়ত। আলহামদুলিল্লাহ আমি একজন ভালো জীবনসঙ্গী পেয়েছি এবারে। যে আমাকে বোঝে। যে আমার পরিবারকে বোঝে। যার সত্যি সংসার করার ইচ্ছে আছে।”

কেন যেন পিয়ালের মুখ থেকে এই কথাগুলো শম্পা সহ্য করতে পারল না। পিয়াল সুখে সংসার করছে, পিয়ালের দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রশংসা এসব সহ্য হলো না। খেঁকিয়ে উঠে বলল,

“থাক। আর বলতে হবে না। তোমার বউয়ের প্রশংসা শোনা বাদেও আমার অনেক কাজ আছে। তুমি পরকীয়ায় জড়িয়েছিলে। এটাই সত্যি।”

পিয়াল এবারও আলতো হেসে বলল,

“মায়া হয় তোমার জন্য আমার। মাঝে এত বছর কেটে গেল তবুও তুমি একটু বদলাতে পারলে না নিজেকে। পুরুষ মানুষ দ্বিতীয় বিয়ে করলেই বুঝি পরকীয়া হয়ে যায়! পুরুষ মানুষ স্ত্রীকে তালাক দিলেই তার কারণ পরকীয়া হয়ে যায়! সবার ক্ষেত্রে এই কারণটা সঠিক হয় না। কিছু কিছু মানুষ নিজের মানসিক শান্তির জন্যও তালাক দেয়। ভালো থেকো। আসছি।”

কথাটা বলে পিয়াল চলে গেল সেখান থেকে। শম্পা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল পিয়ালের যাওয়ার পথে। একটু পরে যখন ওর সামনে দিয়ে পিয়াল নিজের গাড়িটা নিয়ে চলে গেলে তখন ধ্যান ভাঙল।

শম্পা নিজেও খুব ভালো করেই জানে এই কথাটা যে ওদের ডিভোর্সের কারণটা পিয়ালের পরকীয়া ছিল না। শম্পা বুঝতে পারে ওর আচরণগুলো পিয়ালের সহ্যের সীমার বাইরে চলে গেছিল। তবে নিজের ভুলগুলো স্বীকার করার সৎ সাহস শম্পার না কখনো ছিল, না আজ আছে, না কখনো হবে। সেজন্যই নিজে নিজের মনকে সান্ত্বনা দিয়ে বারবার নিজেকে বোঝায় যে, পিয়াল পরকীয়ায় জড়িয়েছিল বলে ওকে তালাক দিয়েছে। শম্পার কোন দোষ ছিল না সংসার ভাঙ্গার পেছনে।

_________

নম্রতা আর সালার দুজনেই সালমা বেগমের ভীষণ প্রিয়। এরও কারণ আছে। এই দুজনের মাঝে তিনি গহনের ছাপ দেখতে পান। দুজনেই ওনাকে ভীষণ ভালোবাসে, সম্মান করে। তবে সামির আর সিমিকে তিনি খুব একটা পছন্দ করেন না। কারণ ওদের মাঝে তিনি নিধির বৈশিষ্ট্য বেশি দেখতে পান। যেমন চঞ্চল তেমনই দুষ্টু। সালমা বেগমের সাথে সম্পর্কও খুব একটা ভালো না।

দুই নাতি-নাতনিকে দেখে উনি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। অসুস্থ শরীরটা ওনার চাঙ্গা হয়ে উঠলো যেন। নাতি নাতনির জন্য অনেক কিছু রান্না করে রেখেছিলেন। সেগুলো ওদের সামনে রেখে আবার রান্না ঘরে গেলেন কি যেন আনতে।

নম্রতা নারিকেলের নাড়ু ভীষণ পছন্দ করে। সেই কথা খেয়াল রেখে সালমা বেগম নাড়ু বানিয়েছেন। নম্রতা নাড়ু তুলে মুখে দিতে ধরলে গহন ওর হাত ধরে আটকাল। নম্রতা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ওর আব্বুর মুখের দিকে জানার জন্য যে কেন ওকে আটকাল। গহন আবদারের কন্ঠে মেয়ে কে বলল,

“মা, আব্বুকে আগে খাইয়ে দেবে না! আব্বুরও তো ভীষণ পছন্দ নাড়ু। আগে আব্বুকে একটু খাইয়ে দাও।”

গহনের করা আবদারে নম্রতা ভীষণ খুশি হলো। গহনকে খাইয়ে দিল। বেশ খানিকটা সময় পর গহন যখন বুঝল ওর কোন সমস্যা হচ্ছে না অর্থাৎ খাবার ঠিক আছে তখন নম্রতাকে খেতে বলল। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আবার নিজের জায়গায় বসল গহন। পাশ থেকে নিধি ধীর গলায় বলে উঠল,

“এমন কেউ করে! মা যদি দেখতেন কষ্ট পেতেন তো। সময় যেমন পাল্টায় ঠিক তেমনি মানুষও পাল্টায়, গহন।”

“কিন্তু যে অবিশ্বাস একবার তৈরি হয় তা সারা জীবন থেকে যায়। আর মানুষ কি সত্যি বদলায়?”

“অনেকেই বদলায়। আপনি দেখেন না মা নম্রতা কে কতটা ভালোবাসে। আর তাছাড়া সালারও তো খাচ্ছে। ওর জন্যও তো মা আলাদা করে বানিয়েছে ওর পছন্দের খাবার।”

“ও সাবিতের র ক্ত। কিন্তু বাকি তিনজন যে আমার

র ক্ত, নিধি। আর ভয় যে আমার এখানেই।”

আড়াল থেকে পুরো বিষয়টা দেখলেন সালমা বেগম। তিনি আন্দাজ করতে পারলেন গহন কেন আটকেছিল নম্রতাকে। তবে তিনি কষ্ট পেলেন না। আজকাল এসব সয়ে গেছে। তিনি বুঝতে পেরেছেন অতীতে যে পাপ করেছেন তার বোঝা তাকে আ মৃ ত্যু টানতে হবে।

একটা চেয়ার টেনে সেখানে বসে সালার কে নিজের কাছে টেনে নিলেন। সালার দেখতে একদম সাবিতের মতন হয়েছে। ওর মুখের দিকে তাকালে তিনি যেন সাবিত কে দেখতে পান। খুঁজে পান তার মৃ ত ছেলেকে। মুহূর্তের মাঝে সালমা বেগমের চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। আদর করলেন সালারের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে।

অফিসের একটা দরকারি কল আসায় গহন সেখান থেকে উঠে গেছে। সিনথিয়া পাশের ঘরে গেছে ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়ার জন্য। সেখানে তখন কেবল বাচ্চারা আর নিধি রয়েছে।

সালারকে আদর করা শেষে সালমা বেগম খানিকটা গম্ভীর গলায় নিধিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“আমার নাতির খেয়াল রাখো তো? নাকি শুধু নিজের ছেলে মেয়েদের পেছনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে থাকো?”

নিধি রাগ করল না। অবাকও হলো না। কেননা ওনার সাথে দেখা হলেই নিধিকে এগুলো জিজ্ঞেস করেন। ইশারায় সালার কে দেখিয়ে বলল,

“আপনার নাতিকেই জিজ্ঞেস করুন না যে ওর আম্মু ওর সাথে কেমন ব্যবহার করে।”

“সে তো গহনকেও কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতো আমি ওকে ভালোবাসি, ওর সাথে ভালো ব্যবহার করি। কিন্তু সত্যিটা তো আলাদা ছিল।”

“আমি তো সালমা নই, তাই না মা? অবশ্য আমি আপনার কাছে আপনার নিজের থেকেও বেশি নিকৃষ্ট। একটা জিনিস কি ভেবে দেখেছেন?”

“কি?”

নিধি হালকা হেসে বলল,

“আমি আর আপনি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকেও আলাদা। আপনাকে মানুষ করতে হয়েছে সতীনের ছেলেকে। যার ভালো থাকার ওপর আপনার সংসার টেকা নির্ভর করেছে। যার যত্ন নেওয়ার জন্যই আপনাকে আনা হয়েছিল। বলতে পারেন সেই ছেলের ভালো থাকা না থাকার সাথে আপনার সবকিছু জড়িয়ে ছিল। তবুও আপনি তার যত্ন করেননি। অথচ আপনার নাতির দায়িত্ব নেওয়া বা না নেওয়ার সাথে আমার ভালো থাকা খারাপ থাকার কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু তবুও ও আমার প্রাণ। ও যখন আমায় আম্মু বলে ডাকে আমার প্রাণটা জুড়িয়ে যায়। আমার নম্রতার আগে ওর মুখে আমি আম্মু ডাক শুনেছি। হয়তো সেজন্য ওকে একটু বেশি ভালোবাসি। আপনি আপনার বাকি তিন ছেলেমেয়েকে প্রাণ ভরে ভালোবাসা দিলেও গহনকে কিচ্ছু দেননি। অথচ আমি আমার তিন ছেলে মেয়ের থেকে কোনো অজানা কারণে সালার কে বেশি ভালোবাসি। পরিস্থিতি একই। কিন্তু আমরা দুটো মানুষ ভিন্ন।”

“ঘুরেফিরে আজও আবার আমাকে নিকৃষ্টই প্রমাণ করতে চাইছো, তাই তো?”

নিধি দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“না মা। আপনার সাথে সমস্ত রাগ, ক্ষোভের লেনাদেনা অনেক বছর আগেই শেষ করে ফেলেছি আমি আমার দিক থেকে। আপনাকে নিকৃষ্ট প্রমাণ করার ইচ্ছে কখনোই আমার ছিল না। আমি শুধু আপনাকে এতোটুকু বোঝাতে চাইলাম আপনি এক সময় গহনকে যতটা কঠিন পরিস্থিতির মাঝে রেখেছিলেন। আজ আপনার জীবন, আপনার ছেলে মেয়েদের জীবন, তাদেরও ছেলেমেয়েদের জীবন তার থেকে অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে। এই সবটাই বোধহয় আপনারই কর্মফল। এই সবটাই বোধহয় আপনার শিক্ষার ফল। কিন্তু তবুও আপনি এখনো নিজের অপরাধ স্বীকার করতে চান না। আমাদের সামনে না হলেও একান্তে নিজের কাছে নিজে স্বীকার করুন। দেখবেন শান্তি পাবেন। বোঝাটা হালকা হবে।”

সালমা বেগমের ভেতরটা কেমন যেন নড়েচড়ে উঠল। আর কিছু বলতেও পারলেন না নিধিকে। তার আগেই সেখানে গহন এসে তাড়া দিল। যেতে হবে ওদের এখন।

আজকাল আর গহন খুব একটা বেশি কথা বলে না সালমা বেগমের সাথে। আগের মতন সম্পর্কও নেই ওদের। তবে সম্মান যে করে না এমনটা না। ছেলে হিসেবে, সালমা বেগমকে মা বলে ডাকার জন্য যতটা দায়িত্ব রয়েছে সব পালন করে। মাসে মাসে ঠিক সময় মত ওনার খরচ পাঠিয়ে দেয়। শম্পাকেও বলেছিল যে যদি চাকরি করার হয় তাহলে গহনের অফিসেই চাকরি করুক। তবে শম্পা তাতে নারাজ। গহনের অনুগ্রহ গ্রহণ করতে সে রাজি নয়।

যাওয়ার আগে গহন সালমা বেগমের দিকে এগিয়ে গেল। আসার পরে জিজ্ঞেস করা হয়নি ওনাকে কেমন আছেন। এখন জিজ্ঞেস করল গহন,

“শরীর ভালো আছে, মা?”

সময়টা যদি কয়েক বছর আগে হতো তবে সালমা বেগম হয়ত অভিমান করে উল্টোপাল্টা কথা বলতেন। তবে আজ খুশি হলেন। দেরিতে হলেও জিজ্ঞেস তো করেছে।

“ভালো আছি বাবা।”

“সারাদিন একা বাড়িতে কি করো? কতবার করে বলি আমার সাথে চলো। একবারে না থাকলে ঘুরে তো আসতে পারো। চলো আজ। ওখানে থাকলে ভালো লাগবে। একা একা থেকেই এত অসুস্থ হয়ে পড়ছো তুমি।”

বিজ্ঞাপন

সালমা বেগম আজও রাজি হলেন না। মলিন হেসে বললেন,

“আমার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য শান্তির খোঁজে তোমরা যেখানে গিয়ে উঠেছিলে সেখানে যদি গিয়ে আবার আমিই ঘর বাঁধি তাহলে তো তোমাদের শান্তি রইল না। ওই বাড়িতে আমার কোন জায়গা নেই। ওই বাড়িতে আমার কোন ছোঁয়া নেই, কোন কর্তৃত্ব নেই, আমার কোন মূল্য নেই। ওই সংসারটাও আমার না। আর যার সংসার তার সংসারে গিয়ে আমার থাকার কোন ইচ্ছে নেই।”

নিধি আর গহন দুজনেই একযোগে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। একদিনই সালমা বেগম গিয়েছিল ওদের বাড়িতে। তাও একরাশ কষ্ট নিয়ে ফিরে আসতে হয়েছিল গহনের অবিশ্বাসের জন্য। তারপর থেকে আর কখনো ঐ বাড়িতে পা রাখেননি।

কেউ আর জোর করল না ওনাকে। বিদায় নিয়ে চলে গেল। সালমা বেগম তাকিয়ে রইলেন ওদের যাওয়ার পথে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন খা খা করে উঠল। একবার ভাবলেন তিনি গহনদের সাথে যাবেন। কিন্তু পরক্ষণেই যখন মনে পড়ল ওই সংসারটা নিধির, ওই বাড়িটা নিধির, ওই বাড়ির সব কিছু নিধির গোছানো ঠিক তখনই ওনার যাওয়ার ইচ্ছেটাও ম রে গেল। কেননা এত বছরেও তিনি নিধিকে কিঞ্চিত পরিমাণ ভালোবাসতে পারেননি। বরং তিনি আজও নিজের দুর্ভাগ্যের জন্য, তার শূন্য বাড়ির জন্য, গহনের তার প্রতি তৈরি হওয়া বিতৃষ্ণার জন্য নিধিকেই দায়ী করেন। আর আ মৃ ত্যু তাই করে যাবেন।

__________

“এত দেরি হলো কেন? আর ফোন বন্ধ থাকে কেন আপনার? জানেন না আমি চিন্তা করি?”

বাইরে হঠাৎ করেই তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এর মাঝে গহন হালকা ভিজেই এসেছে। কিভাবে ভিজল তা এখনো বলেনি। নিধি তখন ওকে চেয়ারে বসিয়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে গহনের মাথা মুছে দিচ্ছে আর বকছে। গহন দু হাতে নিধির কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের মাথা নিধির গায়ের সাথে এলিয়ে দিয়ে বলল,

“ফোনে চার্জ শেষ হয়ে গিয়েছিল, খেয়ালই করা হয়নি।”

“তা কেন খেয়াল করবেন। সারাদিন তো শুধু কাজ আর কাজ। ল্যাপটপের ভেতর থেকে আপনাকে বিয়ের দশ বছরেও টেনে বের করতে পারলাম না আমি। তাড়াতাড়ি জামা কাপড় বদলান। জ্বর এসে যাবে না হলে।”

কোন আপত্তি জানাল না গহন। ঘরে এসে দেখল চার ছেলে মেয়ে ওদের বিছানাতেই ঘুমিয়েছে।

“বজ্রপাত হচ্ছিল বলে ভয় পাচ্ছিল। সেজন্য এখানে ঘুমিয়েছে।”

গহন তোয়ালেটা হাতে তুলে নিয়ে বলল,

“সালার তো ভয় পায় না।”

“হ্যাঁ ও ভয় পায় না। কিন্তু তিনজনকে এখানে ঘুমোতে দিলাম ওকে আবার একা ওর ঘরে রাখতে মন সায় দিল না। সেজন্য ওকেও আজ এখানেই ঘুমোতে বলেছি। ওকে একা রাখতে ভালো লাগে না আমার।”

গহন আর কিছু বলল না। আলতো হেসে ওয়াশরুমে গেল।

ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে ঘরে নিধিকে পেল না। বারান্দায় উঁকি দিতেই দেখল সেখানে গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। গহন গিয়ে পিছন থেকে দুই হাতে কোমর জড়িয়ে ধরে ওর কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে বলল,

“কি হয়েছে?”

“কিছু হয়নি। এমনিতেই বৃষ্টি দেখছে।”

“শরীর খারাপ না তো?”

“না, খারাপ না। তবে একটু ক্লান্ত আর কি।”

গহনকে হঠাৎ করে উদ্বিগ্ন হতে দেখা গেল। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিধিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল,

“ক্লান্ত তো আর এমনি এমনি লাগবে না। শরীর খারাপ, তাই না? তুমি অসুস্থ অথচ আমাকে জানাওনি কেন? আর আমিও বুঝলাম না। আমি কি তোমাকে আর গুরুত্ব দিচ্ছি না আগের মতন? আমি কি কাজ, বাচ্চাদের উপর নজর দিতে গিয়ে তোমার দিকে খেয়াল রাখছি না, নিধি?”

নিধি হেসে ফেলল গহনের এমন পাগলামো দেখে। আলতো করে গহনের গালে হাত রেখে বলল,

“আপনি আমার খেয়াল রাখেন না, আমাকে গুরুত্ব দেন না এই কথা আপনি নিজে বললেও আমি বিশ্বাস করব না, গহন। সংসারের কাজ করতে হয়, চারটে বাচ্চা মানুষ করতে হয়। ক্লান্ত একটু হবই। যতই সাহায্যের জন্য মানুষ থাকুক না কেন তবুও আমার বাচ্চাদের দেখাশোনা তো আমাকেই করতে হবে।”

“সংসার সামলাতে গিয়ে বোধহয় তোমার স্বপ্ন পূরণ হলো না, তাই না? তোমার তো চাকরী করার ইচ্ছে ছিল। পড়াশোনা সেজন্যই শেষ করলে। তোমার বাইরে থেকে পড়ার ইচ্ছে ছিল। চেয়েছিলাম তোমাকে পড়াবো। কিন্তু বাচ্চাদের জন্য সেটাও আর হলো না। তোমাকে আমি নিজের একটা আলাদা পরিচয় বানাতে দিলাম না, তাই না? আমি তোমাকে সংসারের জালে বেঁধে ফেললাম। আমিও বাকিদের মতনই স্ত্রীকে বোধ হয় স্বাধীনতা দিতে পারলাম না!”

গহন প্রায়ই এই কথাগুলো বলে। আর সে সময় তার চোখে মুখে কি তীব্র অপরাধবোধ ফুটে ওঠে সেটা বলে বোঝানোর মতন না। তবে নিধির কাছে একটা কথাও সত্যি বলে মনে হয় না। তবে গহন কে সেভাবে কখনো বোঝানো হয়নি। ভাবল আজ একটু ভালোমতো বোঝাবে। গহনকে জড়িয়ে ধরে ওর বুকে নিজের মাথা রেখে বলল,

“আপনি আমাকে যা দিয়েছেন তা কোন স্বামীই হয়ত তার স্ত্রীকে দিতে পারেনি কখনো। জানেন, একটা মেয়ের পক্ষে সংসার সামলে, বাচ্চাকাচ্চা সামলে আবার চাকরি করা কতটা কষ্টের! জানেন, অধিকাংশ মেয়ে এত কষ্টের পরেও চাকরি করতে চায় কারণ তার স্বামী নামক মানুষটার থেকে হাত পেতে টাকা চাইতে আত্মসম্মানে লাগে। এক টাকা চাইলেও তার জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হয়। মেয়েরা এত কষ্টের পরেও চাকরি করে নিজের, নিজের বাবা-মার স্বপ্ন পূরণ করার জন্য, নিজের ইচ্ছেগুলো পূরণ করার জন্য। কিন্তু আমার তো এসব কোন কিছুর জন্যই চাকরি করার প্রয়োজন হয়নি। আমি না চাইতেই আপনি আমার সব ইচ্ছে পূরণ করে দিয়েছেন। বিশ্বাস করুন, যদি আপনার মতন স্বামী প্রত্যেকটা মেয়ে পায়। তবে হয়ত কেউ আর এত কষ্ট করে বাইরে চাকরি করতে যেত না। অধিকাংশ মেয়ে মন দিয়ে তাদের প্রিয় সংসার করত। প্রত্যেকটা মেয়ের দায়িত্ব যদি তাদের স্বামীরা ঠিকভাবে পালন করত তবে অনেক মেয়েই বাইরে এই নোংরা সমাজের মাঝে নিজেকে বের করতে চাইত না।”

গহন সন্দেহী গলায় বলল,

“সত্যি! সত্যি আমি তোমাকে বাধা দিইনি তো?”

নিধি জোর গলায় বলল,

“কখনোই না। আমার জন্য আপনি হলেন একটা খোলা আকাশ। যেখানে আমি ডানা মেলে নিজের খেয়ালখুশি মত উড়তে পেরেছি। আমি চাকরি করার জন্য মরিয়া ছিলাম আমার বাবা-মার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য। আমার মনে হতো আমি নিজে যদি উপার্জন না করি আমার স্বপ্ন কেউ পূরণ করবে না। কিন্তু আপনি তো আমার সেই সব ধারণা ভুল প্রমাণ করে দিয়েছেন।”

“সত্যি?”

“হ্যাঁ সত্যি। আমার মন ভোলানোর জন্য আপনার অফিসে একটা চাকরি দিয়েছেন। অথচ কোন কাজ না করেই মাসে মাসে বেতন আমি ঠিকই পেয়ে যাই। এটা তো আপনার ভালোবাসা, গহন। যেই সম্মান রক্ষার জন্য আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাইতাম তার থেকেও অনেক বেশি সম্মান আপনি আমায় এমনিতেই দিয়েছেন। আপনি আপনার স্ত্রীকে দিয়ে কোন কষ্ট করাতে চান না। অথচ তার স্বপ্নগুলো নিজে কষ্ট করে ঠিক পূরণ করে দেন।”

থামল নিধি। একটু বিরতি নিয়ে গহনকে আরো খানিকটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,

“আপনি কতটা ভালো মানুষ সেটা হয়ত আপনি বুঝতে পারেন না। আমিও হয়ত আপনাকে বোঝাতে পারব না। আপনি হলেন স্বপ্নের মতন। সেই স্বপ্নে কোন বাঁধা থাকে না, কোন দুঃখ কষ্ট থাকে না। আপনি হলেন ম্যাজিশিয়ান। যে তার জাদুতে আমার পুরো জীবনটাই বদলে দিয়েছে।”

শেষের দিকে নিধির গলাটা ধরে এলো। গহন সেটা বুঝতে পারল। মেয়েটাকে নিজের থেকে ছাড়াতেই দেখল চোখ দুটো জলে টইটুম্বুর হয়ে উঠেছে। এবারে গহন হাসল মেয়েটার পাগলামি দেখে। মেয়েটা শুধু গহন কে বলে ম্যাজিশিয়ান। অথচ সে নিজে কত বড় ম্যাজিশিয়ান সেটা কি জানে! গহন নিধির জীবন কতটা বদলে দিতে পেরেছে সেটা জানে না। তবে নিধি গহনের গোটা জীবনটাই বদলে দিয়েছে। তবে আপাতত আর এই সমীকরণে গেল না গহন। বাইরের ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। এই বৃষ্টির মাঝে একটু ভিজলে হয়ত মনটা শান্ত হবে।

“চলো না নিধি বৃষ্টিতে একটু ভিজি। অনেকদিন হলো ভেজা হয় না।”

নিধি ভাবুক ভঙ্গিতে বলল,

“যাব? কিন্তু বাচ্চারা যে নিচে একা। যদি উঠে আবার কান্নাকাটি করে।”

“খুব বেশিক্ষণ লাগবে না। পাঁচ মিনিট ভিজেই চলে আসব। কাঁদবেনা ওরা।”

আর কিছু ভাবার প্রয়োজন মনে করল না নিধি। রাজি হয়ে গেল। গহন ওকে আগে আগে যেতে বলে বলল যে ও এক মিনিটে আসছে। কেন বলল নিধি জানে না। চলে গেল ছাদে।

ছাদে গিয়ে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়াতেই মুহূর্তের মাঝে পুরো শরীর ভিজে গেল নিধির। কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে গহন এলো। বৃষ্টির তেজ এতটাই বেশি যে আস্তে ধীরে কথা বললে হয়তো শুনতেই পাবে না গহন। সেজন্য নিধি একটু জোরেই বলল,

“কি করছিলেন নিচে?”

গহনের দুহাত তখন পিছনে। নিধির মনে হলো কিছু লুকোনোর চেষ্টা করছে ওর থেকে। কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কি লুকোচ্ছেন? দেখান দেখান।”

আসলে গহন লুকোনোর চেষ্টা করছে না। হঠাৎ করে দেখিয়ে চমকে দেওয়ার ইচ্ছে ছিল। নিধি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে দেখার জন্য যে গহন কি এনেছে। একগুচ্ছ কদম ফুল এগিয়ে দিল গহন। যা দেখতেই নিধির ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো।

“কদম ফুল! কোথা থেকে পেলেন?”

“আসার সময় রাস্তায় দেখলাম কয়েকজন ছেলে পেলের হাতে। ওদের থেকে নিয়েছি।”

“আর এই ফুল নিতে গিয়েই আপনি ভিজে গেছিলেন, তাই না?”

গহন এক হাতে মাথা চুলকে উপর-নিচ শুধু মাথা নাড়ালো। এই কথাটা ভয়ে আগে বলতে পারেনি। এখন ভাবল নির্ঘাত নিধি বকবে। তবে নিধি বকল না। বরং ফিক করে হেসে ফেলে বলল,

“চার বাচ্চার বাবা হয়েও এখনো প্রেম প্রেম ভাবটা আপনায় যায়নি। তা হঠাৎ এই ফুল দেওয়ার কারণ?”

“ফুল দেওয়ার জন্য কোন কারণ লাগে নাকি তাও আবার নিজের প্রিয় মানুষকে! যে আমার জীবনটা ফুলের মতন সুন্দর করে তুলেছে তাকে ফুল দেওয়ার জন্য কোন কারণের প্রয়োজন হয় না।”

“তবুও একটা কারণ বলুন। ভালো লাগবে আমার।”

“বলতেই হবে কারণ?”

“হ্যাঁ বলতেই হবে।”

বৃষ্টির বেগ ততক্ষণে আরো বেড়েছে। গহন এগিয়ে এসে নিধির ভেজা কপালে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে কদম ফুলগুলো নিধির দিকে বাড়িয়ে বিয়ে বলল,

❝একগুচ্ছ কদম হাতে, ভিজতে চাই তোমার সাথে❞

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প