নিধিকে এক নজর না দেখা অব্দি গহনের মন শান্ত হয়নি। এমনকি নিজের মেয়ে হওয়ার আনন্দটাও ঠিকভাবে উদযাপন করতে পারেনি। এখন অব্দি মেয়েকে একবার কোলেও নেয়নি। কেননা ডাক্তার নার্স যতই বলুক নিধি ঠিক আছে। তবে গহন যতক্ষণ পর্যন্ত না নিজের চোখে একবার দেখছে ততক্ষণে শান্তি পাচ্ছে না। এই চিন্তায় চিন্তায় সদ্য জন্মানো মেয়ের আনন্দটাও যেন ম্লান হয়ে গেছে।
অবশেষে নিধিকে কেবিনে শিফট করা হলো।
গহন এগিয়ে গেল নিধির দিকে। মেয়েটা তখন কাঁপছে। গহন শক্ত করে ওর হাত চেপে ধরে বলল,
“কি হয়েছে নিধি? কষ্ট হচ্ছে? খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে কি?”
নিধি জানে এই মানুষটাকে যদি এখন বলে যে খুব কষ্ট হচ্ছে তাহলে ছেলেটা পাগলামো শুরু করে দেবে। অস্থির হয়ে উঠবে। শেষে দেখা যাবে নিধির থেকে বেশি গহন অসুস্থ হয়ে পড়বে। তার উপরে গহনের এত চিন্তা করা বারণ। এমনিতেই চোখ তুলে তাকানোর পর খেয়াল করেছে গহন ঘামছে। হয়ত অতিরিক্ত চিন্তায়। নিধি বাড়তি আর কোন চিন্তায় ফেলতে চাইল না। নিজের যতই কষ্ট হোক তবুও ঠোঁটে জোর করে হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“আমি ঠিক আছি। এতোটুকু শরীর খারাপ হবেই। এটা স্বাভাবিক। আপনি চিন্তা করছেন কেন? ঘেমে যাচ্ছেন তো। যান গিয়ে বসুন। একটু বিশ্রাম নিন। আমি ঠিক আছি।”
গহনের বিশ্বাস হলো না নিধির কথাটা। ও তো নিজেও বুঝতে পারছে মেয়েটার কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু কি করবে! গহন যে উপায় হাতরে বেড়াচ্ছে মেয়েটার কষ্ট কমানোর। তবে কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছে না।
কেবিনে তখন গহন আর নীলা আছে। নিধি ইশারায় নীলাকে কাছে ডাকলেন। নীলার কোলে তখন ওদের মেয়ে। নীলা এগিয়ে আসতেই নিধি ধীর গলায় ওনাকে বললেন,
“মা, ওনাকে এক গ্লাস পানি দাও তো। আর দেখো আসার সময় আমি যে ব্যাগ এনেছি তাতে ওনার ওষুধ আছে। ওনাকে জিজ্ঞেস করলে বলে দেবে এখন কোন ওষুধ খেতে হবে।”
গহন খানিকটা বিরক্ত হয়ে বলল,
“এত কথা বলতে হবে না তোমায়। চুপ থাকো। একদিন ওষুধ না খেলে কিছুই হবে না আমার।”
“অনেক কিছুই হবে। আপনি ওষুধ খেয়ে নিন। নয়ত কিন্তু আমি আপনার চিন্তায় আরো অসুস্থ হয়ে যাব।”
নিরুপায় গহন নিধিকে আর চিন্তায় ফেলতে চাইল না। তাড়াহুড়ো করে ওষুধ খেয়ে এসে আবার নিধির পাশে বসল। নিধি ততক্ষণে চোখ দুটো বন্ধ করেছে। পুরো শরীর ব্যথায় টনটন করছে। শরীরের নিম্নভাগে কোন বল শক্তি নেই। হাতে ক্যানোলা করা। সেই হাতটাও ঠিকভাবে নাড়াতে পারছে না। শরীরটাই নাড়ানোর শক্তি নেই।
গহন আলতো করে নিধির মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। নিধি খানিকটা সময় নিয়ে চোখ মেলে তাকাল গহনের দিকে। জিজ্ঞেস করল গহনকে,
“আমাদের মেয়ে কেমন হয়েছে, গহন? দেখেছেন ওকে? আপনি কোলে নিয়েছিলেন? কার মতন হয়েছে দেখতে?”
গহনের এতক্ষণে মনে পড়ল নিজের মেয়েকে ভালো মতো দেখেনি। এখনো কোলেও নেওয়া হয়নি। নার্স যখন এসে বাচ্চাকে দিয়ে যায় তখন গহন সেখানে ছিল না। রিসিপশনে ছিল। নীলা আগে কোলে নিয়েছিলেন। গহন এসে যখন দেখল সেই দৃশ্য শুধু এক নজর মেয়েকে দেখে ওর গালে একটা চুমু খেয়েছিল। তবে কোলে নেওয়া হয়নি। তখন নিধির চিন্তায় ভীষণ ব্যস্ত।
নীলা এগিয়ে এসে নিধিকে বললেন,
“তোর চিন্তা করতে করতেই তো জামাই অসুস্থ হয়ে গিয়েছে। মেয়েটাকে একবারও কোলে নিতে পারেনি এখনো।”
নিধি অভিমানী গলায় বলল,
“আমার মেয়ের প্রতি এত অবহেলা কেন আপনার? এতক্ষন হলো আমার মেয়েটা পৃথিবীতে এসেছে অথচ এখনো তার বাবার কোলের উষ্ণতাই পেল না! একটু বাবার আদর ভালোবাসা পেল না! এটা কিন্তু ঠিক হলো না।”
গহনের চোখে মুখে তীব্র অপরাধবোধ ফুটে বলল। ঠিকই বলেছে নিধি। স্ত্রীর চিন্তায় চিন্তায় গহন বোধহয় মেয়ের সাথে একটু অন্যায় করে ফেলল।
নীলার দিকে হাত বাড়িয়ে মেয়েকে ওর কোলে দেওয়ার জন্য ইশারা করল। গহন তোয়ালেতে মোড়ানো ছোট্ট তুলতুলে শরীরটা কোলে তুলে নিল। নিজের অজান্তেই দু গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। এতক্ষণে গহন মেয়ে হওয়ার আনন্দ উপভোগ করতে পারছে। বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে যখন ওর নিষ্পাপ মুখশ্রীর দিকে তাকালো তখন বুঝতে পারল এতক্ষণ নিজের মেয়ের দিকে মনোযোগ না দিয়ে ঠিক কতটা অন্যায় করেছে। এই কোমল পুতুলটাকে এতক্ষণে গহন একটা বার কোলে নিল না! এত বড় অন্যায় করে ফেলল! আর অন্যায় করা যাবে না এই পুতুলটার সাথে। বরং এতটা সময় ধরে যতটুকু অন্যায় করেছিল তাকে আদর ভালোবাসা দিয়ে সেই সমস্ত অন্যায়ের ছাপ মুছে ফেলবে গহন। আলতো করে শিশুটির কোমল গালে চুমু খেয়ে বলল,
“আমার আম্মা এসেছে আমার ঘরে নিধি। কি ভীষণ তুলতুলে গাল ওর! কি নরম শরীর! কি স্নিগ্ধ চাহনি আমার আম্মার! আমার মা যেন সারাজীবন এমন কোমলই থাকে। নম্রতা রাখলাম আমার মেয়ের নাম। আমার নম্র মা। আমার সোনা মা।”
নিধি খেয়াল করল মুহূর্তের মাঝে ওর সমস্ত কষ্ট যন্ত্রণা যেন কমে গেল। এতক্ষণ কি অসহ্য যন্ত্রণাটাই না হচ্ছিল শরীরে। তবে এই যে গহনের ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি, গহনের দুচোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া আনন্দ অশ্রু। এই সমস্ত কিছু নিধির সব কষ্ট দূর করে দিল। নিধি তো এতোটুকুই চেয়েছিল। চেয়েছিল গহনের মুখে একটু হাসি ফোটাতে। মানুষটার একটা মেয়ের বড্ড শখ। তার যে মা নেই। নিজের মেয়ের মাঝে যে সে তার মাকে খুঁজে পেতে চায়। নিধিও তাই খুব করে চাইছিল যেন ওর কোল আলো করে একটা মেয়ে আসে। গহন যেন একটা মা পায়।
নিধির সেই ইচ্ছে পূরণ করেছেন আল্লাহ। গহনকে খুশি করার ইচ্ছে নিধির পূরণ করেছেন আল্লাহ। নিধি মনে মনে আবারো হাজার কোটি শুকরিয়া জানালো সেই সৃষ্টিকর্তার দরবারে, যিনি নিধির সংসারটা খুশিতে ভরে তুলেছেন।
_____________
হাসপাতালে এক সপ্তাহ থাকার পর নিধি আর নিজের বাচ্চাকে বাড়ি নিয়ে এলো গহন। আজ ওদের সঙ্গে বাড়িতে জারাও এসেছে। নীলা তো ছিলেনই।
সালমা বেগম এখনো একবারের জন্যও নাতনিকে দেখতে আসেননি। তার নিজের মনটা ছটফট করছিল নাতনিকে একবার দেখার জন্য। তবে কি ভেবে যেন তিনি দেখতে আসেননি। হয়ত গহনের বলা সেদিনের কথা গুলোর জন্য। বারবার মনে হচ্ছিল যদি উনি নাতনিকে দেখতে যান গহন চিন্তায় পড়ে যাবে। গহনের মনে হতেই পারে যে উনি হয়ত গহনের মেয়েকে দেখে অভিশাপ দেবেন, বদদোয়া দেবেন, মন থেকে আদর করবেন না।
আর তাছাড়া গহন তো একবারও কল করে ওনাকে নিজের মেয়ে হওয়ার সংবাদটা দেয়নি। একবারও বলেনি যে, মা তোমার নাতনিকে এসে দেখে যাও। কি মিষ্টি হয়েছে জানো মা! একদম আমার মতন। তুমি একবার আসবে না ওকে দেখতে? ওকে কোলে তুলে নেবে না? একটু আদর করবে না, মা?
তবে তেমন কিছুই হয়নি। সেজন্যই তো সালমা বেগমের আর নিজ থেকে দেখতে যাওয়া হয়নি।
সিনথিয়া নাকি একটু পর যাবে। গহনের মেয়ের জন্য তিনি কিছু জামা কাপড় কিনেছেন। ভাবলেন সেগুলো সিনথিয়ার হাতে পাঠাবেন।
নতুন জামা কাপড় গুলো তিনি একটা শপিং ব্যাগের ভেতরে তুললেন। তবে শুধু জামা কাপড় গুলো দিতে তার কেমন যেন লাগলো। মনে হলো উনি তো এই উপহারটা ওনার নাতনিকে দিচ্ছেন। শুধু কি এই জামা কাপড় গুলো দিলে চলে! অন্য কিছু তো দেওয়া লাগতো। কি দেবেন কি দেবেন সেসব ভাবতে ভাবতেই সালমা বেগমের চোখ গেল ওনার গলার সোনার চেইনের দিকে। ওনার নিজের যা গয়নাগাটি ছিল তা সব মেয়ে আর ছেলের বউকে দিয়ে দিয়েছেন। ওনার কাছে আর অল্প কিছুই রয়ে গেছে। তার মাঝে নিজের নাতনিকে দেওয়ার মতন এই সোনার চেইনটাই ওনার ঠিক মনে হলো।
কোন কিছু ভাবনা চিন্তা না করে তিনি গলার চেইনটা খুলে ফেললেন। উনি জানেন না এই পুরনো চেইনটা গহন নিজের মেয়ের গলায় পরাবে কিনা। নিধিও পরাতে দেবে কিনা জানেন না। তবে তাও তিনি একটা ছোট্ট বাক্সে করে সোনার চেইনটা তুলে দিলেন। সিনথিয়া এলে ওর হাতে ব্যাগটা তুলে দিয়ে বললেন,
“শোন, গিয়ে বলবি এগুলো তুই কিনেছিস। আমার নাম বলবি না। যদি নিধি জানতে পারে আমি কিনে দিয়েছি তাহলে ওর বাচ্চাকে নাও পরাতে পারে।”
সালমা বেগমের কথাটা শুনে সিনথিয়া বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে বলল,
“সব সময় ভাবিকে ভুল বুঝোনা তো, মা। সবকিছুর একটা সীমা থাকে। তোমায় দেখে তো মনে হয় তুমি ভালো হওয়ার চেষ্টা করছো। তবুও ভাবির প্রতি হিংসাপ কমে না তোমার।”
সালমা বেগম গম্ভীর গলায় বললেন,
“আমি ওকে দেখে হিংসে করি না। হিংসে করার মতন কিছুই নেই ওর কাছে। ও হিংসে করে আমায়।”
“সবই আছে হিংসে করার মতন। সব থেকে বড় কথা ভাইয়া আছে ভাবির কাছে। একটা সুখের সংসার আছে, সম্মান আছে, ভালোবাসা আছে। যেগুলোর একটাও তোমার কাছে নেই। কিন্তু তাই বলে হিংসে যে করতেই হবে এমনটা না। আর ভাবি যে হিংসে করার মতন মেয়ে না সেটা আমি এই কয়দিন ভাবির সাথে মিশে বুঝেছি। তুমি যতটা ভালোবাসবে সে তোমাকে দ্বিগুণ ভালোবাসা ফেরত দেবে। তুমি তাকে ঘৃণা করেছ। তাই বিনিময়ে দ্বিগুণ ঘৃণা ফেরত পেয়েছ। এতকিছুর পরেও নিজেকে বদলাতে পারলে না তুমি।”
“হয়েছে হয়েছে। এত জ্ঞান দিতে হবে না আমায়। দুদিন হলো পরের মেয়ের সাথে মিশে নিজের মা খারাপ হয়ে গেল। যাইহোক, তুই কি রাতে ফিরবি?”
“না। ইচ্ছে নেই।”
“ঠিক আছে। রাতটুকু থেকে সকালে ফিরিস। তোর খালার বাড়ি যাবো। আমি তো একা যেতে পারবো না।”
“খালার বাড়ি যেতে হবে কেন আবার?”
একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন সালমান বেগম। হতাশ গলায় বললেন,
“সাবিত এর ব্যবহার আর সহ্য হচ্ছে না। হাতে টাকা পয়সা না পেয়ে পাগলের মতন করছে। চাকরি খুঁজতে বললে খোঁজেনা। যেদিন থেকে শুনেছে গহন বাড়িটা আমার নামে করে দিয়েছে এই বাড়ির উপরে নজর পড়েছে। দিন রাত অশান্তি করছে বাড়িটা যেন ওর নামে করে দেই। কিন্তু আমি তো জানি একবার বাড়িটা ওর নামে করে দিলে দুদিনের মাঝে বিক্রি করে দেবে। মাথার উপর যদি ছাদটাও না থাকে তাহলে কি হয়! তাই ভাবছি ক’টা দিন বাড়ি থেকে একটু দূরে থাকবো। দেখি ওর মাথাটা যদি একটু ঠান্ডা হয়।”
“ঠিক আছে। সকালে এসে তোমাকে নিয়ে যাব।”
____________
একটু পরপরই মেয়ে কেঁদে ওঠে। আবার যেই না একটু বাবা কিংবা মায়ের কোলের উষ্ণতা পায় অমনি থেমে যায়। চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ে শান্ত বাচ্চার মতন। তবে একটু পর পর কেঁদে ওঠার কারণে নিধির ঘুমটা বারবার ভেঙে যাচ্ছে। কিন্তু ওর একটু বিশ্রামের ভীষণ প্রয়োজন। শেষে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে গহন নিজে আর ঘুমোলো না। মেয়ে একটু নড়াচড়া করলেই সঙ্গে সঙ্গে ওকে কোলে নিয়ে হাঁটাহাঁটি শুরু করে। তবুও নিধির ঘুম না ভাঙুক।
ঘড়ির কাটায় সময় তখন রাত দেড়টা। হেলান দিয়ে থাকতে থাকতে গহনের চোখটা একটু লেগে গিয়েছিল। হঠাৎ করে নম্রতার নড়াচড়ায় সজাগ হয়ে উঠলো। তাড়াহুড়ো করে মেয়েটাকে কোলে নিল। তবে মেয়েটা এবারে শব্দ করে কেঁদে উঠলো। গহন কোলে নিয়ে ঘরের মাঝে হাঁটাহাঁটি করল। বিভিন্নভাবে মেয়েকে থামানোর চেষ্টা করল। আদর করল, চুমু খেলো। কিন্তু মেয়ের কান্না আর থামেনা। সেই কান্নার আওয়াজে নিধির ঘুমটাও ভেঙ্গে গেল। গহনের সেটা মোটেও পছন্দ হলো না। নিজের ওপরে নিজের রাগ হলো।
“এত চেষ্টা করছি যেন তোমার ঘুম না ভাঙে, তাও ভেঙে গেল। বিশ্বাস করো অনেক চেষ্টা করেছি ওকে থামানোর। থামছেই না। আচ্ছা এক কাজ করি, তুমি ঘুমোও। আমি পাশের ঘরে যাচ্ছি ওকে নিয়ে।”
এই লোকটার এমন পাগলামিতে নিধি হাসবে না কাঁদবে ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা। ছোট বাচ্চা বলে সব সময় কি আর কোন কারণ ছাড়া কাঁদে নাকি! ক্ষুধা লাগলেও তো কাঁদে মাঝে মাঝে। নিধি খুব কষ্টে দুচোখ মেলে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আরে পাগল ওর ক্ষুধা লেগেছে সেজন্য কাঁদছে। আমাকে ডাকবেন তো।”
গহন অবুঝের মতন বলল,
“ক্ষুধা লেগেছে বলে কাঁদছে? একটু আগেই না খাওয়ালে!”
“আরে ও তো ছোট মানুষ। কতটুকুই খায়! ক্ষুধা তো লাগবেই। পাগল কোথাকার দুধ খাওয়াতে হবে ওকে।”
গহন এগিয়ে গিয়ে একহাতে নিধিকে উঠে বসতে সাহায্য করল। তারপর পেছনে বালিশটা ঠিকঠাক করে দিয়ে মেয়েকে কোলে দিল। দুধ খাওয়ানো শেষ হতে না হতেই গহন নিজেই গিয়ে আবার হাত বাড়িয়ে মেয়েকে কোলে নিল। সেই সাথে নিধিকে কড়া গলায় আদেশ করল,
“তুমি ঘুমোও। আমি জেগে আছি।”
কথাটা বলে মেয়েকে নিয়ে আবার ঘরের মাঝে হাঁটাহাঁটি শুরু করল। উদ্দেশ্য ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া। নিধি কিছুক্ষণ মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল গহনের দিকে। আজকাল নিধি পূর্বের থেকেও বেশি অবাক হয় এই মানুষটাকে দেখলে। একটা মানুষ এতটা যত্নশীল কি করে হতে পারে! একজন বাবা, একজন স্বামী কি করে এতটা যত্নশীল হতে পারে! নিজের বউ বাচ্চার কষ্ট যেন তার সহ্যই হয় না। নিজের শরীরের কোন পরোয়া নেই তার। নিজের শরীরের যা ইচ্ছে হয়ে যাক। তার কোন বিশ্রামেরও প্রয়োজন হয় না। তার শরীরে কোন ক্লান্তি নেই। তার শুধু একটাই উদ্দেশ্য তার বউ বাচ্চা যেন ভালো থাকে। তাদের মুখে যেন সবসময় হাসি থাকে।
গহনকে দেখে নিধি বুঝতে পারে পুরুষ মানুষের ভালোবাসা কতটা সুন্দর হতে পারে। নয়তো আগে নিধি ভাবতো পুরুষ মানুষ মানেই স্বার্থপর। এরা ভালো-টালো বাসতে জানে না। তবে গহন প্রতিটা মুহূর্তে নিধির ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করে দেয়। গহন বোঝায় যদি কোন পুরুষ সত্যি ভালোবাসে কাউকে তবে সে নিঃস্বার্থভাবেই ভালোবাসে।
অনেকটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পরেও নিধিকে ঘুমোতে না দেখে গহন খানিকটা রাগ দেখিয়ে বলল,
“ঘুমোতে বললাম তো তোমায় আমি। নিজের শরীরের প্রতি খেয়াল নেই, তাই না? সুস্থ হতে হবে না?”
নিধি আলতো হেসে বলল,
“এত সুন্দর করে বাচ্চা কোলে নেওয়া কোত্থেকে শিখলেন? দু চারটে বিয়ে করেছিলেন নাকি আগে হুম?”
“আরে না না। বাচ্চা কোলে নেওয়া খুব কঠিন নাকি। আমার তো তিনটে ছোট ভাই বোন ছিল। ওদের কত কোলে নিয়েছি।”
“সত্যি বলছেন? আপনার মা ওদেরকে আপনার কোলে দিল? ওরা আপনার কোলে থাকল?”
গহন খানিকটা মলিন হেসে বলল,
“হ্যাঁ থাকতো তো। অনেক কোলে নিয়ে থেকেছি। বিশেষ করে শম্পাকে। ও ছোটবেলায় আমার খুব ভক্ত ছিল, জানো? আমি স্কুল কলেজ থেকে ফেরার পথে ওর জন্য যদি চকলেট না নিয়ে ফিরতাম ও খুব কান্নাকাটি করতো। আমি বাড়িতে না থাকলে ও খুব কান্নাকাটি করত। তারপরে বড় হলো। বোধ বুদ্ধি বাড়ল, স্বার্থে আঘাত লাগল, কু শিক্ষা পেল। ওমনি আমি হয়ে উঠলাম মেয়েটার চক্ষু শূল। সাবিত কে খুব একটা কোলে নেওয়ার সুযোগ পাইনি। মা তো ওকে নিজের কোল ছাড়া করতেনই না। সিনথিয়াকেও মোটামুটি কোলে নিয়ে থাকা হয়েছে। তবে সিনথিয়া হওয়ার পর আমি বেশিরভাগ সময়টা বাড়িতে থাকতাম না। তখন তো আরো ছোট ছিলাম। তাও তো ওদের কোলে নিতে খুব অসুবিধা হতো না। আর সেখানে ও তো আমার নিজের মেয়ে, আমার মা। ওকে কোলে নিতে পারব না!”
“তা অবশ্য ঠিকই বলেছেন। তবে জানেন তো আমার এখন লোভ হচ্ছে। আপনার কোলে উঠতে আমারও ইচ্ছে করছে। আপনাকে একটু জড়িয়ে ধরে ঘুমােতে ইচ্ছে করছে। কি করি বলুন তো?”
গহন কোন উত্তর দিল না। মেয়ে ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। মেয়েকে গহন বিছানার একপাশে শোয়ালো। বালিশ দিয়ে ঘিরে দিল চারপাশটা। নিধিকে মেয়ের পাশে শুইয়ে নিজে নিধির পাশে শুয়ে পড়ল। হাত বাড়িয়ে নিধিকে নিজের কাছে টেনে নিল। নিধি কোনরকম কোন সময় না ব্যয় না করেই জড়িয়ে ধরল গহনকে।
গহনের বুকে মাথাটা রাখতেই নিধি অনুভব করতে পারল অসম্ভব রকমের শান্তি লাগছে। মনে হচ্ছে না জানি কত বছর পর গহনকে একটু কাছে পেলে। ওকে একটু জড়িয়ে ধরার সুযোগ পেল। এই শান্তি তো আর কোন কিছুর মাঝেই নেই। এই মানুষটার গায়ের গন্ধে নিধি যে শান্তিটা পায় পৃথিবীর কোথাও আর সেই শান্তি নেই। মানুষটার যত্ন ভালোবাসার বাইরে আর কোথাও কোন শান্তি নেই নিধির জন্য।
গহন নিধির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“তুমি ঘুমোও। আমি আছি। তোমার পাশেই আছি। মেয়ে জেগে উঠলে আমি ওকে সামলে নেব। তোমার চিন্তা করার কোন প্রয়োজন নেই। তুমি বিশ্রাম করো। তুমি শুধু ভালো থাকো। তোমাদের দুজনের জন্য আমি আছি তো।”
নিধি গহনকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ঠোঁটে স্মিত হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“হুম। জানি তো আপনি আছেন আমাদের দুজনের জন্য। সেজন্যই তো শান্তিতে ঘুমোতে পারছি।”
____________
নম্রতার বয়স আজ বিশ দিন হতে চলল। নীলা চলে গেছেন গতকাল। নিধি এখন অনেকটা সুস্থ। সংসারের কোন কাজই করতে হয় না। শুধু বাচ্চাটাকে একটু সামলাতে হয়। সেখানেও ওকে সাহায্য করার জন্য অবশ্য গহন লোক রেখেছে। সব মিলিয়ে বলতে গেলে নিধির তেমন কোন কাজ নেই।
গহন এখন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসে। সন্ধ্যে সাতটার মাঝে তাকে বাড়িতে পাওয়া যায়। অফিসে যতই গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকুক না কেন তাকে আর অফিসে কেউ রাখতে পারে না। তার একটাই কথা আগে পরিবার। তারপর বাকি সব।
আজ অনেকগুলো দিন পর নিধি একটু রান্না ঘরে ঢুকল। রান্নার জন্য যে মেয়েটাকে রাখা হয়েছে মেয়েটা মোটামুটি ভালোই রান্নাবান্না করে। তবে সমস্যা হচ্ছে তেল মশলা কম দিতে পারে না। নিধি এতবার করে বলেছে যেন একটু তেল ঝাল কম দিয়ে রান্না করে। কিন্তু মেয়েটা পারেনা। তার নাকি এভাবেই রান্না করে অভ্যেস। তার ধারণা রান্নায় তেল মশলা কম দিলে নাকি রান্নার স্বাদ কমে যায়। আর তার মনে ভয় যদি রান্নার স্বাদ ঠিক না হয় তাহলে তো কাজটা চলে যাবে। এই বাড়িতে মাইনে বেশি পায়। ঝামেলা খুব একটা নেই। বাড়ির মালিক দুজনেই ভালো। এত ভালো একটা চাকরি হাতছাড়া করতে চায়না। সেজন্য তিনি রান্নার স্বাদের ব্যাপারে সতর্ক। এদিকে এসব খাবার খেয়ে গহনের অসুবিধা হচ্ছে। তাই নিধিই আজ রান্না করতে গেল। মেয়েটা হাতে হাতে সাহায্য করল নিধি কে।
গহন তখন ঘরে মেয়ের সাথে খেলছে। মেয়ে তার কোন কথা বুঝতে পারে না। সে নিজেই একা একা বকবক করে যায়। কখনো কোলে তুলে আদর করছে। কখনো এটা ওটা খেলনা এনে মেয়েকে দিচ্ছে। তবে মেয়ে খেলনা গুলো ধরতেও পারে না ঠিকঠাক করে।
রান্নাবান্না শেষে নিধি ঘরে আসতে আসতে ন’টা বাজলো। মেয়ে তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। অথচ গহন চুপচাপ পাশে বসে আছে।
“আরে ও তো ঘুমোচ্ছে। এখনো ওর পাশে এভাবে বসে থাকার কি আছে?”
গহন নিধির দিকে তাকিয়ে বলল,
“যদি কোন অসুবিধা হয়। ধরো হঠাৎ করে যদি ঘুম ভেঙে আশেপাশে আমাকে কিংবা তোমাকে না দেখে ভয় পায়! কান্নাকাটি করে!”
নিধি কপাল চাপড়ে বললল,
“আরে পাগল ওর কি এখনো এত বুদ্ধি হয়েছে নাকি? যান আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন। আপনার মেয়ের পাশে আমি আছি। পাগল কোথাকার।”
নিধি এসে যখন নম্রতার পাশে বসল তখন গহন উঠল। হাত মুখ ধুঁয়ে এসে তোয়ালেটা বারান্দার গ্রিলের সাথে মেলে দিয়ে ঘরে আসতেই ফোন বেজে উঠল।
ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল স্ক্রিনে একটা অপরিচিত নাম্বার ভেসে উঠেছে। ভাবনা চিন্তা না করে গহন ফোনটা রিসিভ করল। অপর পাশ থেকে জানতে চাওয়া হলো গহন কিফায়াত কিনা। গহন নিজের পরিচয় জানাতেই বলল থানা থেকে কল করেছে।
ধীরে ধীরে গহনের মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠতে থাকল। কে কল করেছে, কি বলছে কোন কিছুই নিধি শুনতে পেল না। শুধু খেয়াল করল ধীরে ধীরে গহনের অভিব্যক্তির বদল। সেই সাথে ওর চিন্তা বাড়তে লাগল। সবশেষে গহন ‘আসছি’ বলে কল কেটে দিল।
গহন কলটা কেটে দিতেই নিধি উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“কি হয়েছে আপনার? মুখটা এমন দেখাচ্ছে কেন? কোথায় যাবেন আবার এই রাতে?”
“থানা থেকে কল করেছিল। থানায় যেতে হবে।”
নিধি চমকে উঠে বলল,
“কেন? কোন ঝামেলা হয়েছে নাকি?”
“ঋতু নাকি থানায়। ওই নাকি আমার নাম্বারটা দিয়েছে অফিসারকে। আমাদের যেতে বলছে।”
কথাগুলো নিধির মাথার উপর দিয়ে গেল। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ভাবি থানায় কেন? আর আমাদের যেতে বলছে কেন? কি হয়েছে?”
“জানিনা। সেসব ব্যাপারে কিছু বলেনি অফিসার। শুধু তাড়াতাড়ি যেতে বলল আমায়। ঋতু নাকি তোমায় সঙ্গে করে নিয়ে যেতে বলেছে।”
দুজনের কেউই বুঝতে পারল না আসলে ব্যাপারটা কি। কি হলো হঠাৎ করে? ঋতু থানাতেই বা গেল কেন? আবার ওদেরকে ডাকছেই বা কেন? কি হলো কে জানে!