বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৩৯

🟢

সকালের নাস্তা শেষ করে ঘরে এসে ওষুধ খাচ্ছেন সালমা বেগম। এমন সময় গহন এলো। ওনার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ভিতরে আসার জন্য অনুমতি চাইলো। প্রত্যেকদিন গহন কে দেখে যেমন সালমা বেগমের ঠোঁটে হাসি ফুটে ওঠে আজ তেমন হলো না। একবার মাথা তুলে তাকালো দরজার দিকে। তাকিয়ে গহনকে দেখে আবারও নিজের মাথাটা নামিয়ে নিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,

“এসো।”

সালমা বেগমের গম্ভীর কণ্ঠের মানেটা গহন খুব ভালোভাবেই বুঝলো। কিন্তু ও যে বুঝতে পেরেছে সেটা সালমা বেগম কে বুঝতে দিতে চাইলো না। ঘরের ভিতরে আসতে আসতে সালমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ওষুধ নিয়ম করে খাচ্ছো তো মা? শরীর ভালো আছে?”

সালমা বেগম গম্ভীর গলায় বললেন,

“বয়স তো অনেক হয়েছে বাবা। এখন শরীর আর কদিনই বা ভালো থাকবে। আর কতদিন বাঁচবো তারই নেই ঠিক। শরীর খারাপ থাকলেও এখন অবাক হওয়ার কিছু নেই। আর আমার দেখাশোনা করার জন্য তো কেউ নেই। ছেলেদের বিয়ে করিয়ে ছেলের বউদের ঘরে আনলাম। তারা নিজেরা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আমাকেই তো নিয়ম মেনে ওষুধ খেতে হবে।”

“কেন তোমাকে তো ওষুধ ঋতু দিত। আর ঋতু তো বেশ দায়িত্ববান।”

“এখন কি ঋতু আমার সেবা করার মতন অবস্থায় আছে বলে তোমার মনে হয়? ও নিজেই তো অসুস্থ থাকে।”

“তাহলে নিধি কে বলতে পারতে। ওকে বললেও দিয়ে দিত।”

সালমা বেগম তাচ্ছিল্য গলায় বললেন,

“থাক লাগবে না। তোমার বউকে দিয়ে সবকিছু জোর করে করাতে পারবো না। তোমার বউ তো কথা শুনিয়েই ফুরসত পায়না। আমার উপরে যে রাগ জমে আছে তোমার বউয়ের, বলা যায় না ভুলভাল ওষুধ খাইয়ে দিতে পারে।”

“কি যা তা বলছো মা। নিধি এমন না। আচ্ছা ঠিক আছে তোমায় বলতে হবে না। আমি ওকে বলে দেবো।”

এই নিয়ে আর কোন কথা বললেন না সালমা বেগম। গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

“কি বলতে এসেছিলে? কোথাও বেরোচ্ছো নাকি?”

“হ্যাঁ মা। নিধিকে নিয়ে মামা বাড়ি যাচ্ছি।”

সবেমাত্র পানির গ্লাসটার দিকে হাত বাড়িয়েছিলেন সালমা বেগম। গহনের কথাটা শুনে ওনার সেই হাতটা থেমে গেল। গহনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

“কোথায় যাচ্ছো?”

“মামা বাড়ি।”

“কেন?”

“এমনি মা ঘুরতে যাচ্ছি। অনেকদিন হলো তো যাওয়া হয় না।”

সালমা বেগম গম্ভীর গলায় বললেন,

“কি এমন আছে ওখানে যে যেতেই হবে? কি প্রয়োজন তোমার ওখানে যাওয়ার? ওদের খোঁজখবর নেওয়ার হলে কি ফোনে নিতে পারো না? তোমার নানিও তো নেই। আদর যত্ন করার মতন কেউ আছে নাকি আর ওখানে তোমার।”

গহন স্মিত হেসে বলল,

“আমার আদর যত্ন করার মতন তো কোথাও কেউ নেই মা। ওখানে গেলে একটু শান্তি পাই। আর মামা-মামি আমায় যথেষ্ট ভালোবাসেন।”

গহনের কথায় ভীষণ অসন্তুষ্ট হলেন সালমা বেগম। পানির গ্লাসের দিকে হাত বাড়িয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,

“ও তার মানে নিজের সিদ্ধান্তটা আমাকে জানাতে এসেছো। অনুমতি নিতে আসোনি। তবে যাও। যখন সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছো, তৈরিও হয়ে গেছ তাহলে আমি অনুমতি দিলেই কি আর নিষেধ করলেই কি। তা আগে যে বললে তোমার স্ত্রীকে আমার ওষুধের দায়িত্ব দেবে। তুমি তো ওই মেয়েকেও সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছো।”

“তো কার ভরসায় ওকে আমি রেখে যাবো মা? আর তাছাড়া আমাদের বিয়ের পর থেকে নিধি এই বাড়ির মাঝে বন্দী হয়ে আছে। একবার ঘুরতে যাওয়ার কথা হয়েছিল কিন্তু সে নিয়ে যে অশান্তি হলো। ও তো একটা মানুষ মা। ওর ও তো শখ, আহ্লাদ বলতে কিছু আছে। বয়স কম। আর কত বাড়ির ভেতরে আটকে থাকে। আমারই তো দম বন্ধ হয়ে আসে। আর সেখানে ও সারাদিনে বাড়িতে চার দেয়ালের মাঝে শুধু কাজই করে যাচ্ছে।”

সালমা ওষুধটা খাওয়া শেষে হাতে থাকা গ্লাসটা বেড সাইটের ওপর শব্দ করে রেখে মৃদু রাগী গলায় বললেন,

“প্রত্যেকটা বাড়ির বউকে এই কাজগুলোই করতে হয়। তোমার স্ত্রীর জন্য এই কাজগুলো নতুন না। প্রত্যেকটা মেয়েকেই চার দেয়ালের মাঝে বন্দী থেকে সারাদিন সংসারের কাজ করতে হয়, শ্বশুর বাড়ির মানুষের তেঁতো কথা হজম করতে হয়। তোমার স্ত্রী তাহলে পারবে না কেন? ওর বেলায় কেন এই নিয়মগুলো বদলে যাবে? অন্যান্য বাড়ির বউরা যা পারে তোমার স্ত্রী সেসব পারবে না কেন?”

গহন সাবলীল গলায় উত্তরে বলল,

“কারণ তাদের স্বামী গহন না। তারা কেউ গহনের স্ত্রী না। আমি চাইনা আমার স্ত্রীর জীবন শুধুমাত্র বাড়ির চার দেয়ালের মাঝে বন্দী অবস্থায় কাটুক। আমি চাইনা আমার স্ত্রীর জীবন শুধুমাত্র সংসারের কাজ করে কাটুক কিংবা শ্বশুরবাড়ির লোকজনের তেঁতো কথা শুনে কেটে যাক। যাইহোক এখন আসছি মা। দেরী হয়ে যাচ্ছে। কোন কিছুর প্রয়োজন হলে বাদলকে কল করো। নিজের খেয়াল রেখো।”

কথাটা বলে গহন বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। সালমা বেগম রাগে হিশহিশ করছেন। ছেলেকে তো তিনি আর কোনমতেই সামলাতে পারছেন না। ছেলে তো তার কোন কথাই শুনছে না। কোন বিষয়ে অনুমতিও নিচ্ছে না।

________

গহনের কথা অনুযায় নিধি শাড়ি পড়েছে। আলমারি থেকে বেছে বেছে একটা লাল রঙের তসোড় সিল্ক শাড়ি পরেছে। কপালে একটা কালো টিপ পরেছে, চোখে মোটা করে কাজল লাগিয়েছে, চুলগুলো খোলা রেখেছে, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিকও লাগিয়েছে।

মুখে একবার পাউডার লাগিয়েছিল নিধি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে কেমন যেন কালো কালো লাগছে দেখতে। একটু কম লাগিয়েছে বোধহয় পাউডারটা। যদিও নিধির গায়ের রং ফর্সা। কিন্তু নিধির মনে হচ্ছে ওকে কম সুন্দর লাগছে দেখতে। আর কম সুন্দর লাগলে গহন প্রশংসা করবে কি করে। সেজন্য গালে আরেকটু পাউডার লাগাতে চাইলো। নিধির গালে পাউডার লাগানোর মাঝেই গহন ঘরে এলো। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে নিধিকে তাড়া দিয়ে বলল,

“হলো তোমার? সাজতে বলেছিলাম ঠিকই। তাই বলে বিয়ের সাজ সাজতে বলিনি।”

তাড়াহুড়ো করে মুখে পাউডারটা লাগাতে লাগাতে নিধি বলল,

“হয়েছে।”

ঘরের ভেতর ঢুকতে ধরে নিধিকে দেখে থমকে গেল গহন। সামনের দিকে আর পা বাড়াতে পারল না।

লাল রঙে কি অদ্ভুত সুন্দর লাগছে মেয়েটাকে দেখতে। যেন মনে হচ্ছে কোন চিত্রকরের সবথেকে যত্নে আঁকা কোন ছবির দিকে তাকিয়ে আছে গহন। মনে হচ্ছে এই পৃথিবীর সবথেকে সুন্দরী, আকর্ষণীয় রমণী গহনের ঘরে। কিংবা ভোরের শিশির ভেজানো সবথেকে তাজা মিষ্টি কোন ফুল। যেই ফুল গহন কে মোহিত করছে। গহন কে মাতাল করার জন্য যেন অদ্ভুত এক ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে। নিধির এই রূপ যেন গহনের চোখে ঘোর লাগিয়ে দিল।

এই নেশার ঘোর কখন কাটবে, আদৌ কাটবে কিনা গহন তা জানে না। গহন চাইছে যেন এই নেশার ঘোর না কাটে। গহন চাইছে যেন ওর চোখের পলক না পরে। অতটুকু সময়ের জন্যও এই সৌন্দর্যকে চোখের আড়াল করতে চায় না গহন। এ এমন এক অতুলনীয় সৌন্দর্য যার দিকে শত বছর নিষ্পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা যাবে। এই সৌন্দর্য যে কেবল মুগ্ধতাই ছড়াতে জানে। যে মুগ্ধতার শুরু আছে, কিন্তু কোন শেষ নেই।

গহন হা করে তাকিয়ে আছে। গহনের এমন অদ্ভুত অভিব্যক্তি দেখে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেল নিধি। এমন মূর্তির মতন দাঁড়িয়ে আছে কেন গহন দরজার কাছে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না।

একবার ডাকলো গহনের নাম ধরে নিধি।

“গহন!”

গহন কোন সারা শব্দ করল না। নিধি যে ডেকেছে সেই ডাকটা আদৌও ওর কেনে পৌঁছেছে কিনা সন্দেহ। এখনো একটা ঘোরের মাঝে আছে গহন। গহনের থেকে কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে ওর নিধি গহনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে উঠলো,

“কথা বলছেন না কেন? আর এরকম মূর্তির মতন দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”

এবারও গহনের থেকে কোন সাড়াশব্দ পেল না নিধি। এবার প্রচন্ড বিরক্ত হলো। গহনের একেবারে কাছাকাছি গিয়ে বেশ জোরেই ওর বাহুতে একটা কিল বসালো। সঙ্গে সঙ্গে গহনের ধ্যান ভাঙলো। ধ্যান ভাঙ্গার সঙ্গে সঙ্গে নিধি কে নিজের এত কাছাকাছি দেখে একটু থতমত খেয়ে বলল,

“কিছু বলছিলে তুমি?”

“সেই কখন থেকে যে ডাকছি আপনাকে কথা বলছেন না কেন? আর এমন সটান দাঁড়িয়েই বা আছেন কেন?”

গহন হালকা তুতলিয়ে বলল,

“না এমনি। কিছু হয়নি। তুমি কি বলছিলে আরেকবার বলো। আমি ঠিক শুনতে পাইনি।”

বিজ্ঞাপন

আগের কোনো কথায় আর গেল না নিধি। নিধির সাজগোজ ততক্ষণে শেষ। চুলটা আরেকবার হাত দিয়ে ঠিকঠাক করে নিয়ে ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলে গহনকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমাকে ভালো করে দেখে একটু প্রশংসা করুন তো। এমনভাবে প্রশংসা করবেন যেন আমার শাড়ি পরার আগ্রহ আরও দশ গুণ বেড়ে যায়। আপনার প্রশংসা শুনে যেন মনে হয় যে আপনি আমার ভালো স্বামী। বুঝতে পেরেছেন? একদম মন খুলে প্রশংসা করবেন। কোন কিপ্টেমি করবেন না।”

গহন ছোট্ট করে বলল,

“সুন্দর লাগছে।”

“শুধু সুন্দর লাগছে? আর কিছু না?”

“আর কি বলবো? সুন্দর লাগছে তাই সুন্দর লাগছে বললাম।”

নিধি রাগান্বিত গলায় বলল,

“আপনি আসলেই একটা বজ্জাত। আপনি একটা বুড়ো। সেই জন্যই তো আপনার মুখ দিয়ে শুধু সুন্দর লাগছে বের হয়। কত কষ্ট করে আমি সাজলাম আর আপনি কিনা শুধুমাত্র দুটো শব্দ দিয়ে আমার প্রশংসা করলেন। আমি নিশ্চিত আপনি আমাকে ভালোভাবে দেখেনওনি। একবারও তাকাননি পর্যন্ত আমার দিকে। কেন সাজলাম আমি? কার জন্য আমি সাজলাম? কার জন্য এত কষ্ট করলাম? তুই তো ভুলে গিয়েছিলিস নিধি যে তোর স্বামী ভালো না। এমন খারাপ স্বামীর জন্য এত কষ্ট করা ঠিক না। এই শাড়ি আমি আর পরেই থাকবো না।”

কথাটা বলে নিধি আগে কিছুক্ষণ কপাল চাপড়ালো। তারপরে শাড়িটা খুলতে যেতে ধরলে গহন ওর হাত টেনে ধরে বলল,

“আরে কোথায় যাচ্ছো? সুন্দর লাগছে বললাম তো।”

নিধি গহনের থেকে হাতে ছাড়ানোর চেষ্টা করে মুখ গোমড়া করে বলল,

“লাগবে না আমার আপনার প্রশংসা। আপনার প্রশংসা আপনি নিজের পকেটে রাখুন। একটু ভালো করে দেখে না, প্রশংসা করে না আবার আবদার করে শাড়ি পরো, কাজল পরো, টিপ পরো। ঘোড়ার ডিম পরবো আমি।”

কথাটা বলে নিধি আবারো চলে যেতে ধরলে গহন আবারও ওর হাত টেনে ধরল। নিধির হাতটা টেনে ধরে গহন নিজেই নিধির দিকে দু কদম এগিয়ে গেল। গহন কে এভাবে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে নিধি খেঁকিয়ে উঠে বলল,

“কি হয়েছে? আবার এগিয়ে আসছেন কেন?”

গহন নিধির এই প্রশ্নের কোন উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ পলকহীন দৃষ্টিতে আবারো তাকিয়ে রইল নিধির দিকে। তারপরে নিধির কানের দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে বলল,

“একজন মানুষকে খুঁটিয়ে দেখার জন্য কতটা সময় নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকা প্রয়োজন বলে তুমি মনে করো?”

গহন এভাবে ঝুঁকে আসায় নিধি একটু ঘাবড়ে গেছে। তবে তারপরও নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল,

“সেই মানুষটাকে খুঁটিয়ে দেখার জন্য যতটা সময়ের প্রয়োজন, ততটা সময়েরই প্রয়োজন। যার যার ব্রেনের ওপর নির্ভর করে সময়টা।”

“আমার তো তোমাকে খুঁটিয়ে দেখার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা তাকিয়ে থাকার প্রয়োজন নেই। তোমাকে এক নজর দেখেই সমস্ত কিছু আমি মুখস্থ করে ফেলেছি। এই যেমন তুমি লাল রঙের শাড়ি পরেছো। আমার কথা মতো চোখে মোটা করে কাজল লাগিয়েছো। ঠোঁটে হালকা লিপস্টিকও লাগিয়েছো। তবে কি রং সেটা বলতে পারলাম না। আমি নামটা জানি না। হাতের নখে এখনো মেহেদি লাগানো আছে। বাম হাতে একটা আংটি পরেছো। যেটা আমি তোমাকে দিয়েছিলাম। কানে একটা সোনার ঝুমকো পরেছো। গলায় একটা সিম্পল সোনার মালাও পরেছো। তোমার এক পায়ে নুপুর, আরেক পায়ে নেই। আমার বলা অনুযায়ী চুলগুলো খোলা রেখেছো। আর..…।”

“আর কি?”

গহন এবারে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। এক হাতে নিধির থুতনিটা ধরে ওর কপালের টিপটা ঠিক করে পরিয়ে দিতে দিতে বলল,

“টিপটা বাঁকা করে পরেছো। ঠিক করে দিলাম আমি।”

নিধির রাগটা একটু কমেছে। কেননা গহন সবকিছু একেবারে ঠিকঠাক বলেছে। তার মানে লোকটা সত্যিই নিধিকে খেয়াল করেছে। তার মানে তখন ওভাবে হা করে তাকিয়ে নিধিকেই দেখছিলো। তবে এখনো নিধি পরিপূর্ণভাবে সন্তুষ্ট হতে পারলো না। মুখটা একটু গোমড়া করে বলল,

“ঠিক আছে ঠিক আছে। সেসব না হয় বুঝলাম কিন্তু আমার প্রশংসা কে করবে? আমি কি কি পরেছি এগুলো বলতে পারাকে নিশ্চয় আপনি প্রশংসা বলবেন না?”

নিধির চোখের সামনে উড়তে থাকা চুলগুলো গহন আলগোছে ওর কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে বলল,

“আমার হৃদয়ে তাণ্ডব চালানাে তোমার এই ভয়াবহ রূপটা দেখে নিজেই নিজেকে বিপদ সংকেত দেখিয়েছি। যেন কোথাও তুমুল ঝড় উঠতে চলেছে। হয়তো সেটা আমার হৃদয়ে অথবা তোমার হৃদয়ে। কিংবা দুজনের হৃদয়েই। এই ঝড় কখনো না থামুক। তোমার ভয়াবহ রূপটা আমার সারা জীবন মনে থাকুক। মনে থাকুক আমার শান্ত হৃদয়ে প্রথম বারের জন্য কোন রমণী এমন ভয়ঙ্কর ঝড় তুলেছিল যা কেউ থামাতে পারেনি। এমনকি আমি নিজেও না।"

________

প্রায় দু'ঘণ্টা যাবত গাড়ি চলছে তো চলছেই। থামাথামির কোন নাম নিচ্ছে না। এখন বেশ ফাঁকা একটা রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলছে। দুধারে শুধু গাছপালা আর ধান ক্ষেত। দূর দূরান্তে কিছু ছোট ছোট বাড়ি ঘর দেখা যাচ্ছে। মানুষজনের উপস্থিত খুবই কম। নিধি বিরক্তিকর গলায় গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আরো কতদূর আপনার মামার বাড়ি? দেশের বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন নাকি!”

“এইতো আর একটু।”

“এই একটু বলতে বলতে দু'ঘণ্টা সময় লাগিয়েছেন। এখন আপনার এই একটু মানে ঠিক কত সময় আমাকে পরিষ্কার করে বলুন।”

“আর দশ মিনিটের মত লাগবে। গ্রামে ঢুকে পড়েছি তো।”

নিধি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,

“যাক বাঁচলাম।”

কথাটা বলে নিধি আবারো জানালা দিয়ে বাইরে দৃষ্টিপাত করলো। হঠাৎ করেই একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে পড়ে গেল নিধির। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তো জিজ্ঞেস করার কথা ছিল গহন কে। তবে গহনের মুখ থেকে প্রশংসা শুনে তো সব ভুলেই বসে ছিল। এতটাই হাওয়ায় উড়ছিল যে আর কোন কিছু জিজ্ঞেস করার কথা মনেই ছিল না। গুরুতর ভঙ্গিতে গহনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“আচ্ছা, আপনি যে আপনার মা কে বলতে গিয়েছিলেন আমাদের এখানে আসার কথা। তো আপনার মা কিছু বলল না? আপনাকে একটুও কথা শোনালো না? আমার নামে একটু নিন্দেও করলো না?”

গহন সচরাচর মিথ্যে বলে না। মিথ্যে বলার স্বভাবটা নেই। আর বললেও ধরা পড়ে যায়। পছন্দই না মিথ্যে বলা। তবে এখন মনে হলো নিধিকে মিথ্যে বলাটাই ঠিক হবে। দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“না, কিছু বলেনি। অনুমতি দিয়েছে। বলেছে যেন ভালোভাবে ঘুরে আসি তোমায় নিয়ে।”

“অসম্ভব। আপনি ডাহা মিথ্যে কথা বলছেন। দেখুন, এই কথাটা যদি আপনার মা স্বয়ং আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমাকে সরাসরি বলে তাও তো আমি বিশ্বাস করব না। উনি আমাকে বলবেন যেন ভালোভাবে আমি ঘুরে আসি এটা অসম্ভব। যদি উনি বলতেন যে যেন যাওয়ার পথে কিংবা আসার পথে এক্সিডেন্ট হয়ে আমি মা'রা যাই তাহলে বিশ্বাস করতাম।”

গহন কিঞ্চিৎ বিরক্তিকর গলায় বলল,

“আহ! এসব কি ধরনের কথা। এত ম'রা'র কথা বের হয় কেন তোমার মুখ দিয়ে? বয়স কত তোমার যে এখনই ম'রা'র এত শখ? সবেমাত্র জীবনটা শুরু করেছো। এর মাঝে ম'রা'র এত ইচ্ছে কেন?”

নিধি একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলল,

“এই বিশ বছরের জীবনে যা যা দেখতে হয়েছে, যে যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে, যে যে মানুষকে সহ্য করতে হয়েছে তাতে স্বাভাবিকভাবে কারোরি আর বাঁচার ইচ্ছে থাকবে না। মানে আমার অবস্থাটা কি বলুন তো। আমাকে একটা জা'হা'ন্না'ম থেকে তুলে এনে আরেকটা জা'হা'ন্না'মে ফেলা হয়েছে। শুধু মানুষ গুলোই আলাদা। না হলে পরিস্থিতি একই আছে।”

“একটুও আলাদা না দুইবাড়ির পরিস্থিতি? সম্পূর্ণ এক?”

নিধি আলতো হেসে বলল,

“হ্যাঁ সম্পূর্ণ এক। ওই বাড়িতে আমাকে কেউ সহ্য করতে পারত না, এই বাড়িতেও আমাকে কেউ সহ্য করতে পারে না। ওই বাড়ি থেকেও সবাই আমাকে তাড়ানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল, এই বাড়ি থেকেও সবাই আমাকে তাড়ানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। ওই বাড়িতেও দিনরাত আমাকে কাজ করতে হতো, এখানেও তাই করতে হয়। ওই বাড়িতে আমি আমার ইচ্ছামত কিছু খেতে পারতাম না, কোথাও যেতে পারতাম না, ঘুমোতে পারতাম না। এখানেও সেই একই অবস্থা। আবার ওই বাড়িতে আমাকে ভালোবাসার মতন হাতেগোনা কয়েকজন মানুষ ছিল। আমার বাবা, মা, ভাই, আর দাদি। এই বাড়িতে শুধু আপনি আছেন। তবে সত্যি ভালোবাসেন কিনা জানিনা।”

“বলিনি আমি ভালোবাসি কিনা?”

“অনেকেই তো বলে ভালোবাসি। কিন্তু ক'জনই বা ভালোবাসতে পারে বলুন। সে তো মুখে আপনার মা বোনও বলবে আমাকে ভালোবাসে। মুখে বলার মাধ্যমে আসলে ভালোবাসাটা প্রকাশ করা যায় না। ভালোবাসা প্রকাশ পায় আপনার আচরণে, আপনার যত্নে। শুধু মুখ বললেই ভালোবাসা হয়ে যায় না। ভালোবাসা খুব কঠিন একটা কাজ।”

থেমে গেল গহন। আর কিছু বলল না নিধিকে। তবে নিধির বলা কথাগুলো ভাবলো। সত্যি কি ভালোবাসা খুব কঠিন? কই গহনের কাছে তো অতটাও কঠিন মনে হলো না। হ্যাঁ বিয়ের পর নতুন নতুন কঠিন মনে হয়েছিল। তবে ধীরে ধীরে ব্যাপারটা খুবই সহজ মনে হয়েছে গহনের কাছে। যবে থেকে নিধিকে বুঝতে শিখেছে, নিধি ওকে বুঝতে শিখেছে, দুজন দুজনের পাশে থাকতে শিখেছে তবে থেকে গহনের কাছে ভালোবাসা খুব সহজ মনে হয়েছে। হঠাৎ করেই তো তারপরে নিধিকে ভালোও বেসে ফেলেছে। তাহলে কোথায় কঠিন? ভালোবাসা মোটেই কঠিন না। শুধু মানুষটা সঠিক হওয়া প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প