সালমা বেগমের বোনেরা চলে গিয়েছেন। বাড়িতে বর্তমানে অশান্তি তৈরি করার মতন কেউ নেই। শম্পা নেই, সিনথিয়া গহনের হাতে একদিন ঝারি খেয়েই অনেকটা ঠান্ডা হয়ে গেছে। আর সাবিত বাড়িতে আছে কিনা সেটা তো বোঝাই যায় না, ওর উপস্থিতি এতটাই নীরব। সালমা বেগমকে কুমন্ত্রণা দেওয়ার জন্য কেউ নেই। উনি যে পরামর্শ করবেন কারো সাথে তেমন কাউকেও পাচ্ছিলেন না। সেজন্যই মেয়ে কে আসতে বলেছিলেন আজ।
পিয়াল তো আবার এত তাড়াতাড়ি শম্পাকে আসতে দিতে ভীষণ নারাজ ছিল। এই নিয়ে শম্পার পিয়ালের সাথে বেশ ভালোই একটা ঝামেলা হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে শম্পাকেই কয়েক ঘন্টার জন্য আসতে হয়েছে। পিয়াল ওকে দুপুরে নামিয়ে দিয়ে গেছে গহনদের বাড়ি। বলেছে রাতে অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় আবার নিয়ে যাবে। অনেকটা বাধ্য হয়েই শম্পা কে পিয়ালের প্রস্তাবে রাজি হতে হয়েছে। নয়তো আসতেই পারতো না।
এই বাড়িতে কি হচ্ছে সেসব জানতে না পেরে যেমন শম্পার অস্থির অস্থির লাগছিলো। ঠিক তেমনি মেয়েকে সবকিছু জানাতে না পেরে সালমা বেগমের পেটটাও যেন ফুলে উঠেছিল। শম্পা এসেই সোজা নিজের মায়ের ঘরে গিয়েছে। তিন মা মেয়ে মিলে ঘরের ভেতরে উঠে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। কে জানে কি এত কথা বলছে।
নিধি তো বেশ ভালোই বুঝতে পারছে যে ওর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। কি আর করার। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলে তো আর ভেতরে ওদের কথা শোনা যাবে না। আর ব্যাপারটা কেমন দেখায় না!
আর সব থেকে বড় কথা নিধির স্বামী তো ভালো হয়ে গেছে। ওরা নিশ্চয়ই চাইলেও আর গহনের কানে নিধির নামে কোন আজেবাজে কথা দিতে পারবে না। আর দিলেও গহন প্রতিবাদ করবে। তাহলে নিধির আর চিন্তা কিসের যখন গহন ওর পাশে আছে! সেজন্যই নিশ্চিন্ত মনে নিজের কাজ করে যাচ্ছে।
বিকেল চারটা নাগাদ জারা এলো। গহন তো দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে অফিসে বেরিয়ে গিয়েছিল। শরীরটা যেই না একটু ভালো হয়েছিল অমনি মিটিং এর অজুহাতে বেরিয়ে গেছে। অবশ্য অজুহাত না, সত্যি একটা দরকারি মিটিং ছিল আজকে। নিধিও সেজন্য বাধা দেয়নি। যেহেতু শরীরটা একটু ভালো হয়েছে তাহলে কাজেই যাক। নয়তো পরে আবার একেবারে বেশি চাপ পড়ে যাবে।
জারা কে আবার এই বাড়িতে দেখে নিধি যেমন অবাক হলো তেমন খুশিও হলো। এর আগের দিন জারা যেভাবে রেগে মেগে বেরিয়ে গিয়েছিল তারপরে নিধি ভাবেনি যে জারা আবার এই বাড়িতে আসবে। তাও আবার সাবিতের উপস্থিতি তে।
ঘরে ঢুকেই জারা আগে আশেপাশে সাবিত কে খুঁজলো। কোথাও দেখতে না পেয়ে নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ওই নির্লজ্জটা কি বাড়িতে আছে?”
নিধিকে আলাদাভাবে বোঝাতে হলো না যে জারা কার কথা জিজ্ঞেস করছে। নিধি একটু হেসে উঠে বলল,
“হ্যাঁ বাড়িতেই আছে। বরাবর যা করে তাই করছে।
ঘুমোচ্ছে।”
“যাক গে ওকে নিয়ে কথা বলার রুচিও আমার নেই। আমি তোমায় নিতে এসেছি। বাবা এসেছেন। তোমার সাথে দেখা করতে চায়। মা গহন কে কল করে তোমাদের দুজনকে একসঙ্গে আসতে বলেছিল। কিন্তু গহনের নাকি কি সব জরুরী মিটিং আছে দেরি হবে। সেজন্য আমি গহনের সাথে কথা বলে তোমায় আগেভাগে নিতে চলে এসেছি।”
জারার কথাটা শুনে নিধি খুশিতে লাফিয়ে উঠে উচ্ছ্বশিত গলায় বলল,
“খুব ভালো করেছো আপু। শম্পা আপু এসেছে। ওনারা তিন মা মেয়ে ঘরের ভেতরে উঠে না জানি আমার নামে কি ষড়যন্ত্র করছে। আমার একা একা ভালো লাগছিলো না। তুমি এসেছো খুব ভালো করেছো। তুমি আমাকে পাঁচ মিনিট সময় দাও। আমি তৈরি হয়ে আসছি।”
নিধি সত্যি সত্যি পাঁচ মিনিটেই তৈরি হলো। সাজগোজ তো তেমন করে না নিধি। ওই আলমারি থেকে শুধু একটা কালো জামদানি বের করে পরলো। নিধি আজকাল বেশিরভাগ সময়ই শাড়ি পরে। এরও একটা বিশেষ কারণ আছে।
নিধি খেয়াল করেছে নিধি যখন শাড়ি পরে তখন বেশিরভাগ সময় গহন ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। কখনো নিধির বেখেয়ালে, কখনো বা আড়চোখে, কখনো বা সরাসরি তাকিয়ে থাকে নিধির দিকে। নিধি বুঝতে পারে গহন ওকে শাড়ি পরে দেখতে পছন্দ করে। মুগ্ধও হয় বোধ হয়। সেজন্য নিধিও শাড়ি পরে। ভালোই তো লাগে গহনের মুখ থেকে প্রশংসা শুনতে, গহন ড্যাবড্যাব করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলে।
জারা তখন ড্রয়িং রুমে বসে আছে। নিধি তৈরি হয়ে এসে একটু তাড়াহুড়ো কন্ঠে বলল,
“আপু আর দু মিনিট সময় দাও। আমি মা কে বলে আসি।”
জারা কন্ঠে একরাশ অনীহা প্রকাশ করে বলল,
“আবার ওনাকে বলতে হবে কেন! ওনাকে বলতে গেলেই ঝামেলা হবে। আমার মনে হয় গহন ওনাকে জানিয়েছে।”
নিধি একটু ভাবনা চিন্তা করে বলল,
“তাও আমি একবার জানিয়ে আসি যেন আমার দোষ না হয়। কি দরকার বলো অশান্তি করার? গহনের ভালো লাগেনা অশান্তি।”
জারা মাঝে মাঝে খুব অবাক হয় নিধি কে দেখে। নিধি মেয়েটাও প্রতিবাদী। একটুও অন্যায়ের সাথে আপোষ করতে চায় না। কিন্তু তবুও গহনের ভালোলাগা না লাগা নিয়ে কতটা চিন্তিত। গহনের খারাপ লাগবে জন্য কত কাজ নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে করে। সবার মন জুগিয়ে চলার চেষ্টা করে। শুধুমাত্র গহনের জন্য অনেক সময় চুপচাপ অনেকের কথা সহ্য করে।
জারা মাঝে মাঝে ভাবে ও কি পারতো এভাবে চুপ করে থাকতে? ও কি পারতো গহনের খুশির জন্য অপমান সহ্য করে নিতে? হয়তো পারতো না। জারা যে জবাব না দিয়ে থাকতে পারে না। অন্তত যখন নিজের আত্মসম্মানে আঘাত করে কেউ তখন তো মোটেই চুপ থাকতে পারে না। গহনের জন্যও হয়ত চুপ থাকতে পারতো না। সেই জন্যই নিধি গহন কে পেয়েছে। এখানেই হয়তো জারা আর নিধির মাঝে পার্থক্য।
জারার এসব ভাবনার মাঝেই সালমা বেগম আর ওনার তিন মেয়ে সেখানে এলো। নিধি কে আর যেতে হলো না। জানালা দিয়ে সিনথিয়া দেখেছিল জারা কে বাড়িতে আসতে। তবে সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে বেরোয়নি। তার কারণ জারা কে বুঝতে দিতে চায়নি যে ওর সাথে দেখা করার জন্য বেরিয়েছে। বরং ওরা ঘর থেকে বেরিয়ে এমন একটা ভাব দেখালো যেন জানতোই না জারা এসেছে।
নিধি কে তৈরি হয়ে হতে দেখে সালমা বেগম ওর দিকে এগিয়ে এসে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
“কোথায় যাচ্ছো তুমি?”
“জারা আপুদের বাসায় যাচ্ছি মা। জারা আপুর বাবা নাকি এসেছেন। উনি দেখা করতে চেয়েছেন আমার সঙ্গে।”
“দেখা করতে চাইলেই তোমায় যেতে হবে? তুমি দেখলে না বাড়িতে শম্পা এসেছে, রাতে জামাই এসে খাওয়া দাওয়া করবে। রান্নাবান্না কে করবে? নাকি অসুস্থ শরীর নিয়ে এখন আমায় রান্না করতে বলছো?”
“দুপুরেই তো অনেক কিছু রান্না করেছিলাম মা। অনেক কিছুই রয়ে গেছে। ওগুলো দিয়ে আপনি খুব ভালোভাবে আপনার জামাই আর মেয়েকে আপ্যায়ন করতে পারবেন।”
সালমা বেগম রাগী গলায় বলে উঠলেন,
“জামাইকে আমি বাসি খাবার খাওয়াবো? দুপুরে রান্না করেছিলে কোনটা থেকে কি বেঁচে গেছে সেসব দিয়ে আমি জামাইকে আপ্যায়ন করবো? এটা কি ভিখিরির বাড়ি পেয়েছো তোমার মতন যে, যে সে জিনিস দিয়ে জামাই মেয়েকে আপ্যায়ন করা যায়? আর তোমায় আরো কতবার বোঝাতে হবে যে আমার অনুমতি ছাড়া তুমি কোথাও যাবে না। একবারও কি জিজ্ঞেস করেছিলে আমায়?”
নিধি যথা সম্ভব শান্ত বলায় বলল,
“আমি আপনাকে বলতেই যাচ্ছিলাম মা। তার আগে আপনারাই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। মাছ রান্না করা আছে, মাংস রান্না করা আছে। আরো কি লাগবে? এখন আপনার জামাইকে আপ্যায়ন করার জন্য কি অন্য দেশ থেকে আমি খাবার আনব?”
বড্ড সাহস বেড়েছে এই মেয়ের। সালমা বেগম বুঝলেন এই মেয়েকে ভয় না দেখালে চলবে না। অন্তত গহন কে তো জানাতেই হবে। সিনথিয়ার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে গহনের নাম্বারে ডায়াল করতে করতে বললেন,
“বুঝেছি। তোমায় শিক্ষা না দিলে তোমার অবাধ্যতা কমবে না। গহন কে আমায় জানাতে হবে।”
নিধির একদমই ভালো লাগলো না ব্যাপারটা। এমনিতেই সকাল থেকে গহন অসুস্থ ছিল। তার উপর এখন আবার একটু কাজে গেছে। এর মাঝে আবার এসব পারিবারিক ঝামেলা নিশ্চয়ই ভালো লাগবে না। ছেলেটার আবার নিশ্চয়ই মাথা ব্যথা করবে, চিন্তা করবে। কাজে মনোযোগ দিতে পারবে না। এই মানুষগুলোকে নিয়ে আর পারা যায় না। বিরক্ত হয়ে শেষে নিধি জারা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“জারা আপু তুমি বরং আজ যাও। আমি কালকে আঙ্কেলের সাথে দেখা করে আসবো। আগে জামাই আপ্যায়নের ব্যবস্থা করি।”
জারা ভেবেছিল আজকে ওদের পারিবারিক বিষয়ে সত্যি কথা বলবে না। নিধি তো একাই সামলানোর জন্য যথেষ্ট। কিন্তু এখন জারার মনে হচ্ছে নিধি যথেষ্ট না। গহনের ভালো খারাপ ভাবতে গিয়ে নিধি দমে যাচ্ছে। তবে ওদের এই অন্যায় আবদার তো জারা মানতে পারবেনা।
নিধির কথায় তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলল,
“কক্ষনো না নিধি। তুমি আজকেই যাবে। গহনের সাথে মায়ের কথা হয়েছে, আমারও কথা হয়েছে। গহনের সাথে কথা বলেই এখানে তোমাকে নিতে এসেছি আমি। আর মামি তো কল করছেন গহন কে। কথা বলতে দাও ওনাকে গহনের সাথে। এমনিই ওনার মুখ বন্ধ হয়ে যাবে।”
সালমা বেগম কয়েকবার কল করলেন গহনের নাম্বারে। তবে গহন কলটা রিসিভ করলো না। রিং হয়ে গেলে তো হয়েই গেল। সালমা বেগমের রাগ তরতর করে বাড়ছে। কয়েক মিনিট সেখানে দাঁড়ানোর পর যখন গহন ফোনটা রিসিভ করলো না তখন জারা নিধির হাত ধরে বলল,
“নিধি চলো। আর অপেক্ষা করতে হবে না। গহনের সাথে আমার কথা হয়ে গেছে। আমি বলছি তো তোমাকে কিছু বলবে না গহন।”
নিধি মৃদু অনুরোধের স্বরে বলল,
“আজ থাক না আপু। উনি খুব অসুস্থ ছিলেন। এসব অশান্তি ওনার ভালো লাগবে না। মানুষটা একটুও শান্তি পায় না। এরা তো কেউ ওনাকে শান্তি দিতে পারে না। আমিও যদি ওনাকে না বুঝি তাহলে কি চলে!”
জারা কিছু বলতে যাবে তার আগেই শম্পা নিধির কথায় সায় জানিয়ে বলল,
“একদম ঠিক কথা বলেছো নিধি। তোমাকেই তো ভাইয়াকে বুঝতে হবে। আর শোনো, ভাইয়া যদি জানে যে তুমি মায়ের কথা অমান্য করে চলে গেছো তাহলে কিন্তু খুব রাগারাগি করবে। সে তোমায় যতই ভালো বাসুক না কেন। কিন্তু সংসারে অশান্তি হোক এটা ভাইয়া চায় না।”
নিধি কে কথাগুলো বলা শেষে শম্পা এবার জারা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আর জারা আপু, কেন তুমি ওদের দুজনের সম্পর্ক নষ্ট করতে চাইছো বলতো? মানছি ভাইয়া তোমায় বিয়ে করেনি। ভাইয়া তোমায় পছন্দ করতো না। তাই বলে এখন তুমি ভাইয়ার সংসারে অশান্তি তৈরি করার চেষ্টা করবে! নিধি তোমার কি ক্ষতি করেছে বলোতো? ওই মেয়েটা তো জানেও না এই সম্পর্কে কিছু। কেন অযথা ওকে হিংসা করছো?”
জারা বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেল শম্পার কথাটা শুনে। একবার নিধির দিকে তাকালো। কে জানে নিধি কি বুঝলো। আবার ভুলই বুঝলো কিনা জারা কে, কে জানে। জারা সঙ্গে সঙ্গে শম্পার দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে সাবধানী গলায় বলল,
“ডোন্ট ক্রস ইওর লিমিট সম্পা। আমি তোমাদের মতন হিপোক্রিট না। আমি সব সময় চাই যেন নিধি আর গহনের সম্পর্কটা ভালো থাকে। প্রথম এবং শেষবারের মতন সাবধান করছি তোমায় বাড়তি কোনো কথা বলবেনা। অন্তত আমার আর গহনের সম্পর্ক তুলে তো কক্ষনো না।”
“অবশ্যই বলব। নিধিরও তো সত্যিটা জানা উচিত যে, ও যাকে ভালো ভাবছে সে আসলে ওকে হিংসে করে। নিধি নাহয় তোমার ভালো মানুষের মুখোশের আড়ালে থাকা আসল চেহারাটা ধরতে পারছে না। কিন্তু আমরা তো সত্যিটা জানি। আমরা কি বুঝি না যে কেন তুমি ভাইয়ার বিয়েতে আসোনি! কষ্ট হতো তো তোমার ভাইয়ার বিয়েতে থাকতে। এত চেষ্টা করলে তবুও ভাইয়াকে নিজের জালে ফাঁসাতে পারোনি। এই বাড়িতে ভাইয়ার বউ হয়ে আসতে পারোনি। তোমাকে নিধির মতন একটা সাধারন মেয়ে হারিয়ে দিয়েছে। হিংসে হবে এটাই তো স্বাভাবিক।”
“বাড়াবাড়ি করছো কিন্তু তুমি শম্পা। নিধির মনে একদম আজেবাজে কথা ঢোকানোর চেষ্টা করবে না।”
শম্পা আবার কিছু বলতে গেল তবে তার আগেই সালমা বেগম রেগে উঠে ওকে থামিয়ে দিয়ে নিধি কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“তোমার কোথাও যাওয়া হবে না। চুপচাপ গিয়ে জামা কাপড় বদলে আমার মেয়ে জামাইয়ের জন্য রান্না করো। বাসি খাবার ওরা খাবে না। আর জারা তোমাকেও বলছি, সব সময় আমাদের সংসারে নাক গলানোর চেষ্টা করো না। শম্পা একদম ঠিক কথা বলেছে। আমার ছেলে তোমায় বিয়ে করেনি জন্য তুমি নিধি কে উষ্কিয়ে আমার ছেলের সংসারে অশান্তি তৈরি করার চেষ্টা করবে এটা কিন্তু আমি হতে দেব না। আমার ছেলেও এটা পছন্দ করবে না যে নিধি আমার কথা অমান্য করে চলে যাবে।”
নিধির যে রাগ হচ্ছে না তেমনটা না। তবে আবার একটু ভয়ও করছে। সালমা বেগম কিন্তু কথাটা একদমই ভুল বলেননি। গহনের সত্যি হয়ত পছন্দ হবেনা নিধির ওনার কথাটা অমান্য করে এভাবে চলে যাওয়া। গহন তো চায় সব সময় যেন সংসারে শান্তি বজায় থাকে।
নিধি এবার সত্যি ভাবলো যাবেনা। গহন এলে ওকে আগে সবটা জানাবে। সেই সাথে ভালো করে বলে দেবে যেন পরবর্তী থেকে নিধির কোথাও যাওয়ার হলে এত সমস্যার সৃষ্টি না হয়।
নিধি এত কিছু ভাবনা চিন্তা করলেও জারার তো এতকিছু ভাবার দায় নেই। ওর আর গহনের সম্পর্কে আজেবাজে কথা বলা, ওকে অপমান করা ব্যাপারগুলো একেবারে সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল জারার। নিধির হাতটা ধরেই ছিল। আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরে সালমা বেগমের চোখে চোখ রেখে কাট কাট গলায় বলল,
“নিধি কে যখন নিতে এসেছি তখন ওকে নিয়েই যাব। আমিও দেখতে চাই আমার জন্য ওদের সংসারে কতটা অশান্তি তৈরি হয়। নিধিকেও বোঝার সুযোগ দিন যে আমি ঠিক কতটা খারাপ। আর বাকিটা গহন সামলে নেবে। চলো নিধি।”
কথাটা বলে জারা নিধির হাত ধরে ওকে টেনেই নিয়ে গেল। নিধি কয়েকবার জারা কে আটকানোর চেষ্টা করলো। তবে জারা শুনলো না ওর কথা। সালমা বেগমও আর আটকালেন না। নিধি কে শায়েস্তা করার দারুন একটা সুযোগ পেয়ে গেলেন তিনি।
_______
জারা নিজেই ড্রাইভ করছে। ওর পাশের সিটে নিধি চুপচাপ বসে আছে। জারা এত বেশি জোরাজোরি করেছিল যে শেষে নিধি আর ওকে না করতে পারেনি। নয়তো জারা মন খারাপ করতো। তবে এখন খুব চিন্তা হচ্ছে। কে জানে গহন কি মনে করবে। নিধি কল তো করলো। কিন্তু ছেলেটা রিসিভই করলো না ফোন।
এদিকে জারার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। জারা কখনোই চায়নি যে নিধি এই ব্যাপারটা জানতে পারুক যে জারার মনে গহনের জন্য কোন অনুভূতি আছে। এই কথাগুলো জানলে ওদেরই অস্বস্তি হবে। একে অপরের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্কটাই বজায় রাখতে পারবে না। কে জানে নিধির মনে এখন কি চলছে। কেমন চুপচাপ বসে আছে মেয়েটা। জারার সাথে কথাও বলছে না।
অনেকক্ষণ দ্বিধা দ্বন্দ্বের মাঝে ভুগে অবশেষে জারা আর চুপ থাকতে পারলো না। নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“নিধি, তুমি কি রাগ করেছো আমার উপরে? শম্পার বলা কথাগুলো কি তুমি সিরিয়াসলি নিয়ে নিয়েছো? আসলে ও যেভাবে বলল তেমন সম্পর্ক ছিল না আমাদের মাঝে। ও বাড়াবাড়ি বলে ফেলেছে।”
নিধি অন্য ভাবনার মাঝে ছিল। জারার কথায় ধ্যান ভাঙ্গলো। ও শম্পার কথায় কিছু মনে করেনি। কেননা জানে, শম্পা সব সময় দশ লাইন বাড়িয়ে বলে। আর ওরা তো চায় যেন জারার সাথে নিধির সম্পর্কটা খারাপ হয়ে যায়, যেন ওর আর গহনের সম্পর্কের মাঝে একটা ফাটল তৈরি হয়।
তবে জারার থেকেও একটু কিছু শোনা প্রয়োজন। অন্তত এখনো গহনের প্রতি অনুভূতি আছে কিনা সেটা শোনা প্রয়োজন। সেজন্য নিধি একটু গম্ভীর ভঙ্গিতেই বলল,
“এখন তুমি ভালোবাসো না গহন কে? ওনার প্রতি আর কোন অনুভূতি নেই?”
হঠাৎ করে গাড়ির ব্রেক কষলো জারা। সিট বেল্ট থাকা সত্ত্বেও নিধি সামনের দিকে একটু ঝুঁকে গেল। জারা বুঝলো একেবারে বোকার মতন একটা কাজ করেছে। এভাবে কেউ গাড়ি থামায় নাকি হঠাৎ করে! অপরাধী গলায় নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“সরি নিধি। আমি আসলে বুঝতে পারিনি।”
“আচ্ছা ঠিক আছে সমস্যা নেই আপু।”
নিধি খেয়াল করলো জারা কে অস্থির দেখাচ্ছে। খুব জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে মেয়েটা। কেমন যেন হাঁসফাঁস করছে। গাড়ির কাঁচটা নামিয়ে একটু বাইরে মুখ বের করে নিঃশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করলো। নিধির কেমন যেন অদ্ভুত লাগল জারার আচরণ। জারার কাঁধে হাত রাখতেই জারা কেমন চমকে উঠলো। নিধির দিকে তাঁকিয়ে জোর করে হাসার চেষ্টা করে বলল,
“আমি ঠিক আছি। কিছু হয়নি আমার।”
কথাটা বলে জারা খুব চটপট নিজেকে স্বাভাবিক করে আবারও গাড়ি স্টার্ট দিল। জারার এখন ভয় হচ্ছে নিধি কে দেখে। কে জানে আবার কখন কোন প্রশ্ন করে বসে, জারা আবার কি ভুল ভাল উত্তর দিয়ে বসে।
জারা চাইছে তাড়াতাড়ি যেন ওরা বাড়ি পৌঁছে যায়। নিধি যেন ওকে কোনো প্রশ্ন না করে। তবে জারার সেই ইচ্ছে পূরণ হলো না। ওর এসব ভাবনার মাঝে আবারও নিধির কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
“কি হলো আপু বললে না তো এখনো ভালোবাসো গহন কে?”
জারার হৃদস্পন্দনের গতি আবারো বেড়ে গেল। হালকা তুতলিয়ে বলল,
“না, তেমন কোন ব্যাপার না। আসলে বলতে পারো ওই ভালো লাগা ছিল। গহন আমার ক্রাশ ছিল। এতোটুকুই।”
“উঁহু। উনি বলেছিলেন একতরফা অনুভূতির কথা। একতরফা অনুভূতি কি শুধু ভালো লাগা এতটুকুর মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে?”
জারা চমকে উঠে বলল,
“গহন বলেছে তোমায় এই কথাগুলো?”
“হ্যাঁ বলেছে। উনি নিজের দিকটা ক্লিয়ার করেছেন আমার কাছে। তোমার প্রতি ওনার কি অনুভূতি ছিল, তোমার ওনার প্রতি কি অনুভূতি ছিল সব জানিয়েছে। আর আমি তোমায় ভুল বুঝিনি আপু। গহনের বাড়ির লোকের যে একটু বাড়িয়ে বলার স্বভাব সেটা আমি জানি। আর তাছাড়া একজন মানুষের অতীত থাকতেই পারে। এটা তেমন কোন ব্যাপার না। গহন বর্তমানে আমার কিনা, ভবিষ্যতে আমার হয়ে থাকবে কিনা এটা বড় কথা। আর তোমায় আমি বিশ্বাস করি। তোমায় দেখে বোঝা যায় তুমি কেমন স্বভাবের মেয়ে। যদি তোমার আমাদের মাঝে তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে থাকারই হতো তবে তুমি অনেক কিছুই করতে পারতে যেগুলো গহনের মনে আমার জন্য খারাপ ধারণা তৈরি করতে পারতো। কিন্তু তুমি সেগুলো করোনি। তুমি সব সময় আমার পাশে থেকেছে। আমার হয়ে গহনকেও কথা শুনিয়েছো। ওরা যাই বলুক না কেন আমি তোমায় বিশ্বাস করি।”
জারা একটু স্বাভাবিক হলো। তবে সেই সাথে মনের মাঝে একটু ভয়ও তৈরি হলো। নিধি খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল যে ও জারা কে বিশ্বাস করে।
সত্যি মেয়েটা জারা কে বিশ্বাস করে। জারা কোনদিনও নিধির বিশ্বাস ভাঙবে না। কিন্তু হঠাৎ করেই মনে হলো যদি ভুলক্রমে কখনো খারাপ কিছু করে বসে নিধির সাথে! যদি কখনো নিজের অজান্তেই গহনের প্রতি জমে থাকা অনুভূতিগুলো বেরিয়ে আসে আর নিধি কষ্ট পায়!