বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৩১

🟢

মায়ের সাথে কথা শেষে নিধি ড্রয়িং রুমে সোফায় বসে ছিল। হঠাৎ করেই ওর কানে জারা আর জান্নাতের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। একটু আগেই সিনথিয়া বাইরে গিয়েছে। এখনই আসবে জন্য নিধি আর দরজাটা বন্ধ করেনি। দরজাটা খোলা থাকায় তাই বাইরে থেকে ওদের ভিতরে প্রবেশ করতে অসুবিধা হলো না।

ওদের কণ্ঠ পেতেই নিধি উঠে দাঁড়ালো। জান্নাত এসে নিধি কে দুহাতে জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,

“কতদিন পর তোমায় দেখলাম ভাবি। কেমন আছো তুমি?”

এই মেয়েগুলোর আন্তরিকতা নিধির ভীষণ ভালো লাগে। মেয়েগুলো এমন ভাবে নিধি কে আগলে নেয় যেন মনে হয় নিধি ওদের কত আপন। কত পুরনো পরিচয় ওদের সাথে।

নিধি নিজেও পাল্টা জান্নাত কে জড়িয়ে ধরে আলতো হেসে বলল,

“আমি ভালো আছি। তুমি ভালো আছো?”

জান্নাত নিধিকে ছেড়ে দিয়ে বলল,

“এইতো তোমায় দেখলাম এখন অনেক ভালো লাগছে।”

জান্নাত নিধিকে ছাড়তেই এবার জারা ওর কাছে এগিয়ে এসে একই প্রশ্নগুলো করলো। নিধির সাথে টুকটাক কথোপকথন শেষে জারা একবার দেখলো আশেপাশে কে কে আছে। কেউ নেই এই ব্যাপারটা জারার একদমই পছন্দ হলো না। এখন তো এখানে বাড়ির সবার থাকা দরকার ছিল। সবার তো এই চমকপ্রদ খবরটা জানা দরকার ছিল। এই সংবাদটা জারা কোনো মতেই বাড়ির সবাইকে না দিয়ে থাকতে পারবে না। তবে এভাবে সরাসরি তো বলাও যায় না।

হঠাৎ করে জারা নিধিকে উদ্দেশ্য করে উচ্ছ্বসিত গলায় একটু চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলল,

“নিধি জানো তোমার জন্য গহন আজকে একটা সারপ্রাইজ এনেছে। হ্যাঁ তোমার জন্য গহন দারুন একটা সারপ্রাইজ এনেছে। শুনেছো নিধি? তোমার জন্য সারপ্রাইজ এনেছে গহন।”

নিধি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। গহন সারপ্রাইজ দেবে নিধি কে ভালো কথা। জারা সেই খবরটা নিধিকে জানাচ্ছে সেটাও ভালো কথা। কিন্তু এভাবে চেঁচানোর কি আছে? পুরো পাড়াকে তো জানানোর দরকার নেই এই ব্যাপারটা তাই না?

নিধি একটু জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে আপু সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু তুমি এত জোরে কথা বলছো কেন?”

জারা ফের চেঁচাতে চেঁচাতেই বলল,

“আরে জোরে কোথায় কথা বলছি। এটাতো অনেক খুশির খবর সেজন্য খুশিতে আমার কন্ঠটা একটু জোরে শোনাচ্ছে। তুমি শুনতে চাও না গহন তোমার জন্য কি সারপ্রাইজ এনেছে?”

নিধি এবারেও জোর পূর্বক হাসার চেষ্টা করে শুধু উপর নিচ মাথা নাড়ালো। তার মানে ও জানতে চায় গহন কি সারপ্রাইজ এনেছে ওর জন্য। জারা আশেপাশে আবারো খুঁজলো যে কেউ এসেছে কিনা। তবে কাউকেই দেখতে না পেয়ে একটু হতাশ হলো।

গহন ততক্ষণে গাড়ি পার্ক করে উপরে চলে এসেছে। জারার কন্ঠ নিচ থেকেও পাচ্ছিলো। তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসে জারা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এভাবে চেঁচাচ্ছো কেন জারা? আর আমি তোমায় কি বলেছিলাম ভুলে গেছো?”

গহন কথাটা বলতেই নিধির খুব আগ্রহ হলো জানার জন্য যে গহন কি বলেছিল জারা কে। নিধি কৌতূহলী গলায় বলল,

“কি বলেছিলেন?”

জারা বলতে যাবে নিধি কে কথাটা তখনই দেখলো ঘর থেকে সালমা বেগম আর ওনার দুই বোন বেরিয়ে এলেন। এই প্রথম সালমা বেগমকে দেখে জারা এতটা খুশি হলো। ইচ্ছে করলো গিয়ে একটু জড়িয়ে ধরতে। গহন কি বলেছিল, কি বলতে নিষেধ করেছিলো সেসব ভুলে গেলো জারা। পূর্ণ মনোযোগ নিধির উপর নিবদ্ধ করে বলল,

“গহন তোমার ভার্সিটিতে এডমিশনের ব্যবস্থা করেছে। তুমি তোমার পড়াশোনাটা আবার কন্টিনিউ করতে পারবে নিধি। কংগ্রাচুলেশন।”

সালমা বেগম আর ওনার তিন বোনের মাথায় যেন বাজ পড়লো। সালমা বেগম তখন সবেমাত্র সোফায় বসতে ধরেছিলেন। অর্ধেকটা নিচু হয়েই তিনি থেমে গেলেন। বসা আর তার হলো না। তিনি আবারো দাঁড়িয়ে গেলেন। ওনার দুই বোন একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে।

জারা আড়চোখে একবার তাকালো ওনাদের দিকে। ওনাদের অভিব্যক্তি দেখে খুব শান্তি পেলোফিরিঙ্গি জারা। গহন তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে এসে মৃদু রাগী গলায় জারা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোমায় আমি নিষেধ করেছিলাম জারা এই কথাগুলো বলতে।”

গহন কে পাত্তা না দিয়ে জারা নিধি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“শোনো নিধি, এখন থেকে কিন্তু ভালো করে পড়াশোনা করতে হবে। রেজাল্ট যেন ভালো হয়। এই সংসারের কাজ, ঝগড়াঝাঁটি এসবের মাঝে তোমায় থাকতে হবে না। যার কাজ সে বুঝে নেবে। তুমি শুধু পড়াশোনা করবে, নিজের খেয়াল রেখবে আর সেই সাথে গহনেরও খেয়াল রাখবে বুঝতে পেরেছো?”

নিধি খুশি হয়েছে এই ব্যাপারটায়। আবার হঠাৎ করে বলায় একটু অবাকও হয়েছে। গহন তো ওর সাথে কোন কিছু আলোচনা করেনি এই নিয়ে। সেজন্যই একটু চমকেছে। তবে লোকটা নাছোড়বান্দা। ওকে পড়াশোনা করিয়েই ছাড়বে।

নিধি কে চুপ করে থাকতে দেখে জারা বলে উঠলো,

“তুমি খুশি হওনি নিধি?”

নিধি আড়চোখে একবার গহনের দিকে তাকালো। গহনও এই উত্তরটা শোনার অপেক্ষায় আছে। হয়তো নিধি কে চুপচাপ থাকতে দেখে গহন ভেবেছে হয়তো নিধি খুশি হয়নি। কিন্তু নিধি তো খুশি হয়েছে। নিধি যেই না কিছু বলতে যাবে অমনি শাহানা মুখ ভেঙচিয়ে বলে উঠলেন,

“বাড়ির বউয়ের আবার কিসের এত পড়াশোনা? এত বড় একটা সংসার, বাড়িতে এত মানুষ এদের রেখে আবার ঢং করে পড়াশোনা করতে যেতে হবে? কি করবে এত পড়াশোনা করে? শোন গহন, বউকে এত পড়াশোনা শেখাতে নেই। দুদিন পর ডানা গজিয়ে ফুরুত করে উড়ে যাবে।”

গহন কিঞ্চিৎ গম্ভীর গলায় বলল,

“সেসব আমি বুঝে নেব খালা।”

গহন কথাটা বলতেই জারা ওকে বাহবা দিয়ে বলল,

“একদম ঠিক বলেছো গহন। আসলে পড়াশোনার মর্ম সবাই বুঝবে না। অন্তত যাদের জীবনের আসল উদ্দেশ্য অন্যদের সংসারে অশান্তি তৈরি করা তারা তো কখনোই এর মর্ম বুঝবে না।”

শাহানার কেন যেন মনে হলো জারা কথাটা ওনাকে খোঁচা দিয়ে বলল। ব্যাপারটা মোটেও ওনার পছন্দ হলো না। বাইরের একটা মেয়ে এসে ওনাকে এভাবে খোঁচা দিয়ে যাবেন। একটু খেঁকিয়ে উঠে বললেন,

“এই মেয়ে তুমি এত এই সংসারে নাক গলাও কেন? তোমার নিজের তো বয়স কম হয়নি। তা এখনো বিয়ে করোনি কেন? নিজে বিয়ে না করে তো অন্যের সংসারে অশান্তি লাগানোর জন্য সারাদিন এখানে চলে আসো। এমন মেয়েরা মা-বাবার ম'র'ণ দশা করে ছাড়ে।”

জারা মোটেও রাগলো না আজ শাহানার কথা শুনে। বরং ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,

“বিয়ে করার তো আমার অনেক ইচ্ছে আছে আন্টি। তবে আপনার মত খালা শাশুড়িদের ভয়ে করতে পারিনা। তার থেকে বরং আমি পড়াশোনাটাই করবো। আর আমার বিয়ে নিয়ে আপনাকে চিন্তা করতে হবে না আন্টি। ছেলেদের লাইন লেগে থাকে আমার পিছনে। আমার মা বাবারও আমাকে নিয়ে কোন চিন্তা করতে হয় না। অন্তত কোন বড়লোক বাড়ির ছেলের পেছনে নিজের মেয়েকে লাগানোর মোটেই চেষ্টা করে না তারা। তাই আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন আমাকে নিয়ে।”

শাহানা মুখ ভেঙচিয়ে চুপ করে রইলেন। এত অশান্তি আর ভালো লাগছে না নিধির। বুঝতে পারছে গহনেরও এসব পছন্দ হচ্ছে না। সেজন্য ভাবলো এখানে আর না থাকাটাই ভালো। জারা আর জান্নাত কে নিয়ে ঘরের দিকে যেতে ধরলো। তখনই সামনে এসে দাঁড়ালো সাবিত।

জারা জানতো না যে সাবিত বাড়িতে এসেছে। গহনের সাথে এই নিয়ে কোন কথাই হয়নি।

এর আগে একদিন এসেছিল সেই দিনও সাবিতের সাথে দেখা হয়নি। যদি জানতো সাবিত বাড়িতে আছে তাহলে কোনদিনও জারা এই বাড়িতে পা রাখত না। সাবিত কে দেখেই বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে গহন কে বলল,

“গহন, এই ছেলে বাড়িতে আছে সেটা তুমি আমায় আগে জানাওনি কেন?”

গহন পাল্টা প্রশ্ন করলো,

“তুমি জানতে না?”

“না, জানতাম না। জানলে কি আমি এই বাড়িতে আসি।”

জারা কথাটা বলতেই ওর কানে ভেসে এলো সাবিতের কন্ঠস্বর।

“কেন জারা আপু কি করেছি আমি? কতদিন পর তোমার সাথে দেখা হলো বলোতো। একটু ভালো করে কথা বলবে না আমার সাথে?”

এই ছেলেটার মুখ দেখলেই রাগ ওঠে জারার। সহ্যই করতে পারে না। ইচ্ছে করে জুতো দিয়ে পি'টি'য়ে সোজা করতে। চোখে মুখে রাগী ভাব বজায় রেখেই বলল,

“না, ইচ্ছে করে না তোমার সাথে কথা বলতে। ইনফ্যাক্ট তোমার নিজেরই আমার সামনে এসে দাঁড়ানোর আগে লজ্জা হওয়া উচিত ছিল।”

সাবিত বুঝলো জারার সাথে ভাব জমানো অসম্ভব। দৃষ্টি গেল জারার পাশে দাঁড়ানো জান্নাতের উপরে। এই মেয়েটা যথেষ্ট ভালো, সহজ সরল। অন্তত জারার মতন না। ওর সাথে হয়তো ভাব জমানো যেতে পারে।

সাবিত এবার জান্নাত কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“জান্নাত, তুমি কেমন আছো? ভাইয়াকে চিনতে পেরেছো, না ভুলে গেছো?”

জান্নাত আসলেও সহজ সরল। মেয়েটা বড্ড মিশুকে। কথা বলতে ভীষণ ভালোবাসে। তার উপর সাবিত তো ওর ভাই। তাহলে কথা বলতে অসুবিধা কি। তবে কথা বলার সুযোগ পেল না। জান্নাত যেই না কিছু বলতে যাবে অমনি জারা ওকে ধমকে থামিয়ে দিয়ে জান্নাত কে আড়াল করে দাঁড়িয়ে সাবিতকে শাসিয়ে বলল,

“ভুলেও আমার বোনের দিকে নজর দেবে না। প্রথম এবং শেষবারের মতন তোমায় সাবধান করে দিয়ে গেলাম। আর গহন তোমাকে বলছি, একে বাড়িতে কেন রেখেছো? ওর নজর দেখেই আমি বুঝতে পারছি ও এখনো শোধরায়নি।”

ব্যাপারটা নিধির ঠিক ভালো লাগলো না। সাবিত শোধরায়নি মানেটা কি? কেন শোধরাবে? কি এমন গুন ছিল যেটা শোধরানো প্রয়োজন ছিল। জারা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

বিজ্ঞাপন

“ওনার সাথে এভাবে কথা বলছো কেন আপু? তুমিও কি আমার মতন ভুল বুঝেছো নাকি ওনাকে? উনি এতটা খারাপ না।”

“ওহ্ তোমারও তো অবস্থা দেখছি আমার বোনের মতনই। মানুষ চেনো না। যাই হোক, এই ইডিয়েটটার থেকে দূরে থাকবে। ভাবি ভাবি করতে করতে কখন কি করে দেবে বুঝতেও পারবে না। আর কি বললে ভালো? এক নাম্বারের চরিত্রহীন, গাঁজাখোর। এসেছে তো রিহ্যাব থেকে। গাঁজা খেতে খেতে কোমর বেঁকিয়ে ফেলেছিল। আমার দেখা সবথেকে বাজে, চরিত্রহীন, লম্পট, বাটপার একটা ছেলে।”

বেশ অনেকক্ষণ ধরে চুপচাপ সবটা শুনে যাচ্ছিলেন সালমা বেগম। তাই বলে এতটা তো সহ্য করা সম্ভব না। ওনারই বাড়িতে এসে ওনারই ছেলেকে এভাবে অপমান করে যাবে আর উনি চুপচাপ সহ্য করবে সেটা তো হতে পারে না তাই না। রাগান্বিত গলায় জারা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কি যা তা বলছো তুমি। আমার বাড়িতে এসে আমার ছেলেকে অপমান করার অধিকার তোমায় কে দিয়েছে? গহন, তুমি চুপচাপ শুনছো কেন? তোমার ভাইকে তোমার সামনে অপমান করছে কিছু বলবে না তুমি?”

গহন কিছু বলে উঠতে ধরলো, সেই সাথে নিধিও কিছু বলতে চাইলো। তবে জারা কারোর কথা শুনতে নারাজ। ওদের দুজনকেই থামিয়ে দিয়ে জান্নাতের হাতটা ধরে সালমা বেগমের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,

“আপনি এমন তিনটে সন্তানকে জন্ম দিয়েছেন যারা সারা জীবন অপমানিত হওয়ারই যোগ্য। আর গহন কেন চুপচাপ শুনলো জানেন? কারণ ও খুব ভালো করে জানে আমি যা বলেছি সেগুলোর একটাও মিথ্যে না। যাইহোক, এত কথা বলে আমার কাজ নেই। শেষ একটা কথা বলি আপনাকে। আমি আপনার বাড়িতে দাঁড়িয়ে আপনার ছেলেকে অপমান করিনি। গহনের বাড়িতে দাঁড়িয়ে আপনার ছেলেকে অপমান করেছি। মাইন্ড ইট, এই বাড়ি গহনের।”

কথাটা বলে জারা জান্নাতের হাত ধরে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। গহন তাড়াহুড়ো কন্ঠে নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ওরা গাড়ি আনেনি। আমি ওদেরকে ড্রপ করে দিয়ে আসছি।”

নিধি চুপচাপ মাথা নাড়াতেই গহন বেরিয়ে গেল ওদের পিছন পিছন। একে একে সালমা বেগম আর ওনার বোনেরাও ঘরে চলে গেল।

বসার ঘরে তখন কেবল উপস্থিত নিধি আর সাবিত। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে ঋতু। পুরো ঘটনাটা ও নিজেও দেখেছে, শুনেছে সবকিছু। তবে এই বিষয় নিয়ে ওর মতামত বোঝা যাচ্ছে না। রেগে আছে নাকি ভালো লেগেছে এই বিষয়টা সেসবও বোঝা যাচ্ছে না।

এদিকে নিধি ভীষণ ভাবনার মাঝে পড়ে গেছে। তার মানে সত্যি ও সাবিতকে যেমন ভেবেছিল তেমনি ছেলেটা। কিন্তু জারার কথা শুনে তো তার থেকেও বেশি খারাপ মনে হলো। কিন্তু তাহলে সেদিন আবার এসে ওর কাছে ক্ষমা চাইলো কেন? আর তো কোন বিরক্তও করে না। তাহলে আসলেই কি মানুষটা খারাপ না ভালো কিছুই তো বুঝতে পারছে না।

নিধির এসব ভাবনার মাঝে ওর কানে সাবিতের কন্ঠস্বর ভেসে এলো। নিধি চমকে পিছন ঘুরে তাকাতেই দেখল সাবিত ওর সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

“কিছু বলবেন ভাইয়া?”

সাবিত মাথা নিচু করেই ধীর গলায় নিধি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আসলে ভাবি কম বয়সে তো অনেক ভুলই করে ফেলি আমরা। আমিও বাজে মানুষদের সঙ্গে মিশে ভুল পথে চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু ভাইয়া, আমার বাড়ির লোক মিলে আমাকে আবার ঠিক পথে ফিরিয়ে এনেছে। এটা ঠিক আমি হয়তো নেশা করতাম আগে। তবে এখন করি না। আর জারা আপু যে আমার চরিত্রের উপর আঙুল তুলল এটা সম্পূর্ণ আপুর ভ্রান্ত ধারণা। আন্দাজ থেকে বলেছে কথাটা। তুমি আমায় খারাপ ভেবো না ভাবি। ওরা তো পর। ওরা আজেবাজে কথা বললে খারাপ লাগে না আমার। কিন্তু তুমি তো আমার আপন। তুমি যদি আমায় খারাপ ভাবো আমি কষ্ট পাবো।”

কথাটা বলে সাবিত চলে গেল সেখান থেকে। নিধি এবারে প্রচুর দোটানার মাঝে পড়ে গেল। বুঝে উঠতে পারছে না কি ঠিক, কে সত্যি বলছে।

হয়ত জারার মনে কোন ভুল ধারণা তৈরি হয়েছিলো সাবিত কে নিয়ে ঠিক যেমন নিধির হয়েছিলো। এটা তো সত্যি কথা অনেক সময় মানুষ অসৎ সঙ্গের কারণে খারাপ পথে চলে যায়। কিন্তু সাবিত হয়তো ভালো পথে ফিরে এসেছে। কিন্তু জারা হয়তো এখনো সাবিতের সেই পুরনো রূপটা ভুলতে পারেনি।

________

খাবার টেবিলে সবার প্লেটে সকালের নাস্তা দিচ্ছে নিধি। সিনথিয়া আজ বেশ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে খেতে চলে এসেছে। গহন সালমা বেগম কে চেয়ারে বসিয়ে রেখে আবার ঘরে গেছে সালমা বেগমের ওষুধ আনতে। যাওয়ার আগে গহন নিজের ফোনটা টেবিলের ওপরে রেখে গেছে। এর মাঝে গহনের ফোনটা বেজে উঠলো। নিধি একবার স্ক্রিনে উঁকি দিয়ে দেখলো। অপরিচিত একটা নাম্বার। রিসিভ করার ইচ্ছে হলো না।

কলটা কেটে যাওয়ার পর কয়েক সেকেন্ড বিরতি নিয়ে আবারো বেজে উঠলো। সে একই নাম্বার থেকে কল এসেছে। নিধির মনে হলো এবারে কলটা রিসিভ করা দরকার। ফোনটা যেই হাতে নিল রিসিভ করার জন্য অমনি সিনথিয়া বলে উঠলো,

“তুমি ভাইয়ের ফোন নিচ্ছো কেন? ভাইয়ার কল এসেছে। তুমি রিসিভ করবে নাকি?”

“আমি যেহেতু ওনার বউ তাহলে আমিই রিসিভ করবো। যত্তসব।”

কথাটা বলে নিধি ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে একটা সালাম দিল। অপর পাশ থেকে একটা মেয়েলী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। নিধির জন্য সম্পূর্ণ অপরিচিত। পরিচিত হওয়ার কথাও না। গহনের পরিচিত কজন কেই বা নিধি চেনে। ফোনের অপর পাশে থাকা ভদ্রমহিলাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কে বলছেন? আপনার পরিচয়টা দিন গহন এলে আমি জানিয়ে দেবো।”

অপর পাশ থেকে ভদ্রমহিলা পাল্টা প্রশ্ন করে উঠলেন,

“আপনি কে কথা বলছেন?”

প্রশ্নের প্রেক্ষিতে আবার পাল্টা প্রশ্ন মোটেই পছন্দ না নিধির। কিন্তু তারপরও কিছু করার নেই। বিরক্ত হলেও সেটা প্রকাশ করতে পারলো না।

“আমি গহনের ওয়াইফ কথা বলছি। আপনার পরিচয়টা দিন আমি গহন কে জানিয়ে দেব।”

নিধির পরিচয়টা পেতেই ভদ্রমহিলার মুখে হাসি ফুটে উঠলো। যাক ভালো কেউই কলটা রিসিভ করেছে। একটু ইতস্তত গলায় বলল,

“আমি গহনের মা। ওকে একটু ফোনটা দেবে!”

চমকে উঠল নিধি। তৎক্ষণাত তাকালো সম্মুখ চেয়ারে বসা সালমা বেগমের দিকে, যিনি চুপচাপ চেয়ারে বসে আছেন। নিধি অবিশ্বাস্য গলায় ফোনের অপর পাশে থাকা মানুষটাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এটা কি করে সম্ভব! গহনের মা আমার চোখের সামনে বসে আছে। কি আজেবাজে কথা বলছেন? কে আপনি সত্যি করে বলুন তো?”

নিধির মুখ থেকে কথাটা শুনতেই সালমা বেগম চমকে তাকালেন নিধির দিকে। বুঝে উঠতে পারলেন না উনি ঠিক শুনলেন নাকি ভুল শুনলেন। নিশ্চিত হওয়ার জন্য কম্পিত গলায় নিধি কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“কে কল করেছে?”

“আর বলবেন না মা। কে যেন কল করে বলছে উনি নাকি গহনের মা। অদ্ভুত না বলুন তো! চোখের সামনে আপনি বসে আছেন অথচ আপনার পরিচয় দিয়ে কল করেছে। আজকালকার যুগে মানুষের ভন্ডামি এত বেড়েছে যে কি বলবো।”

সালমা বেগম কে কথাটা বলা শেষে ফোনের অপর পাশে থাকা ভদ্রমহিলাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এবার আপনি বলুন তো কে আপনি? মিথ্যে বলছেন কেন?”

“না, আমি মিথ্যে বলছি না। আমি গহনের মা কথা বলছি।”

নিধি এবার বিরক্তিকর গলায় বলল,

“ধুরু। কি জ্বালায় পড়লাম! আচ্ছা ঠিক আছে আপনি যদি সত্যি গহনের মা হয়ে থাকেন তাহলে এতদিন কোথায় ছিলেন? হঠাৎ করে ছেলের কথা মনে পড়লো কি করে?”

অপর পাশ থেকে ভদ্রমহিলা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,

“ছেলের কথা তো আমার রোজই মনে হয় মা। কিন্তু ছেলে আমার সাথে কথা বলতে চায় না। তুমি একটু ওকে দেবে ফোনটা!”

নিধির কেন জানি এবারে ব্যাপারটা ঠিক মনে হচ্ছে না। ভদ্র মহিলার কথার সুরটা অন্যরকম। যদি উনি মিথ্যে পরিচয় দিতেন নিজের, তাহলে নিধির এভাবে কথা বলার পর কলটা কেটে দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু উনি তো কলটা কেটে দিলেন না। এখনো নিজেকে গহনের মা হিসেবেই পরিচয় দিচ্ছেন। এদিকে গহনের মা তো নিধির চোখের সামনে বসে আছে। তাহলে কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যে?

সালমা বেগম খেয়াল করলেন গহন আসছে। তাড়াহুড়ো করে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নিধির দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,

“ফোনটা আমায় দাও।”

নিধি আপত্তি জানিয়ে বলল,

“না মা আপনাকে কথা বলতে হবে না। ওনার গহনের সাথে কথা বলা দরকার। হয়তো গহনের পরিচিত কেউ মজা করছে।”

সালমা বেগম অগ্নিদৃষ্টিতে নিধির দিকে তাকিয়ে বলল,

“ফোনটা দিতে বলেছি আমি তোমায়।”

নিধি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল হঠাৎ করে সালমা বেগমের এমন আচরণে। ফোনটা দিতেই ধরেছিল সালমা বেগমকে। আর ঠিক তখনই সেখানে গহন এসে নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কে কল করেছিলো নিধি?”

সালমা বেগম এবারে বিস্ফোরিত নয়নে তাকালেন গহনের দিকে। কি করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। নিধিকেই বা এখন তিনি কি করে থামাবেন। হঠাৎ করে গহনকেই বা তিনি এখান থেকে কি করে সরাবেন। ওনার এসব ভাবনার মাঝেই নিধি ওর কানে থাকা ফোনটা গহনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“আপনার মা নাকি কল করেছে।”

গহনের হাতে থাকে ওষুধের পাতাটা পড়ে গেল। আগে পিছে কোন কিছু না ভেবে তাকালো সালমা বেগমের দিকে। সালামা বেগম ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লো। নিধি পরিবেশটা ঠিকঠাক ভাবে আয়ত্ত করতে পারছে না। একদিকে গহনের হাত থেকে ওষুধের পাতা পড়ে গেল। অন্যদিকে সালমা বেগম ধপ করে বসে পড়লেন। আবার আরেক দিকে ফোনের অপর পাশ থেকে ভদ্রমহিলা সমানে বলে যাচ্ছেন উনি গহনের মা। যেন গহন কে ফোনটা দেয়। সব থেকে বেশি দোটানার মাঝে পড়েছে নিধি নিজেই।

নিধির এসব ভাবনার মাঝে হঠাৎ করে সালমা বেগমের শরীরটা খারাপ করলো। শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে ওনার। তবে বহুদিন ধরে সুস্থই ছিলেন। শ্বাসকষ্টের সমস্যা তেমন একটা দেখা দেয়নি। তবে হঠাৎ করেই ওনার সেই সমস্যাটা আবারও দেখা দিল। জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছেন তিনি। বুক ধরফর করছে। গহন তাড়াহুড়ো করে সালমা বেগমের দিকে এগিয়ে গিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“মা কি হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে? নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে?”

সালমা বেগম কিছুই বলতে পারলেন না। গহন ছুটে গিয়ে ওনার ঘর থেকে ইনহেলারটা নিয়ে এলো। নিধি ফোনটা না কেটেই অমনি টেবিলের ওপরে রেখে সালমা বেগমের কাছে গেল। একটু আরাম পেল সালমা বেগম ইনহেলারটা নিয়ে। কিন্তু তারপরেও শ্বাস প্রশ্বাসের প্রতি স্বাভাবিক হচ্ছেই না। গহন জানে ওর মায়ের এই সমস্যাটা কতটা সাংঘাতিক হতে পারে। তাই আর দেরি করতে ইচ্ছে করল না। তাড়াহুড়ো কন্ঠে নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“নিধি, গাড়ির চাবি নিয়ে এসো।”

নিধি দৌড়ে ঘরে গেল গাড়ির চাবি আনতে। ততক্ষণে গহন সালমা বেগম কে নিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসেছে। গহনের ফোনটা টেবিলের ওপর অমনি পড়ে রইল। ফোনের অপর পাশে থাকা গহনের মা শুনলেন ওনার ছেলে অন্য একজনকে মা বলে ডাকছে। নিধি তো বলেছিল গহন কে যে ওর মা কল করেছে। কিন্তু তারপরও গহন একটা বারও ফোনটা হাতে নেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না। বরং ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লো যাকে মা হিসেবে মেনেছে সেই মানুষটার অসুস্থতা নিয়ে।

বরাবরের মতনই দুচোখ তার অশ্রুতে ভরে উঠলো। উনি নিজেই কলটা কেটে দিলেন। কেননা তার ছেলের তার সঙ্গে কথা বলার সময় নেই।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প