বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৩২

🟢

হসপিটালের করিডরে রো চেয়ারে বসে আছে গহন। চোখে মুখে তার দুশ্চিন্তার চাপ। ডাক্তার দেখানো শেষে সালমা বেগমকে আপাতত কেবিনে রাখা হয়েছে। গহন চাইলে বাড়ি নিয়ে যেতে পারতো। তবে কোন ঝুঁকি নিতে চায়নি। যদি আবার সমস্যাটা বাড়ে!

নিধিও গহনের পাশে বসে আছে। ওরা দুজনেই এসেছে। সিনথিয়া নিশ্চয়ই এতক্ষনে সাবিত কে জানিয়েছে। তবে তাও সাবিতের আসার সময় হয়ে ওঠেনি।

নিধির মাথার মধ্যে এখনো সেই কথাগুলোই ঘুরছে। কে কল করেছিল, কেন নিজেকে গহনের মা বলে পরিচয় দিচ্ছিলো, সালমা বেগমের শরীরই বা এতটা খারাপ হয়ে গেল কেন হঠাৎ করে যে সোজা হাসপাতালে নিতে হলো। গহন কে এখন এই ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করতেও ইচ্ছে করছে না। দেখেই বুঝতে পারছে দুশ্চিন্তায় আছে।

নিধি গহনের কাঁধে হাত রেখে বলল,

“এত চিন্তা করছেন কেন? ঠিক আছে তো মা।”

“কে কল করেছিল জানতে চাইবে না?”

“সেসব জানার জন্য অনেক সময় আছে আমাদের হাতে। আমি জানি আপনি এখন দুশ্চিন্তার মাঝে আছেন। এখন ওসব কথা তোলার দরকার নেই।”

গহন ঘাড় ঘুরিয়ে একবার নিধির দিলে তাকালো। কি অসীম ধৈর্য মেয়েটার! গহন কে কত সুন্দর বুঝতে শিখেছে! পরিস্থিতি বোঝে মেয়েটা, গহনের মনের অবস্থা বোঝে।

গহনের এসব ভাবনার মাঝেই কেবিন থেকে নার্স বের হয়ে গহন কে বলল যে সালমা বেগম নাকি ওর সাথে দেখা করতে চাইছে।

গহন আর এক সেকেন্ডও ব্যয় না করে কেবিনের ভিতরে গেল। ওর পিছন পিছন নিধিও গেল। সালমা বেগম শুয়ে ছিলেন। গহন গিয়ে ওনার কাছে বসতেই উনি ওঠার চেষ্টা করলেন। গহন ওনাকে উঠে বসতে সাহায্য করলো। উঠে বসার সঙ্গে সঙ্গে সালমা বেগম দুহাতে গহনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। গহনের পিঠের শার্ট খামচে ধরলেন, যেন গহন ওনার থেকে কোথাও পালিয়ে যাচ্ছে। আর উনি গহন কে আটকে রাখতে চাইছেন। গহন যেন বুঝতে পারলো হঠাৎ করে সালমা বেগমের ওকে এভাবে জড়িয়ে ধরার কারণটা। নিজেও পাল্টা দুই হাতে সালমা বেগমকে জড়িয়ে ধরে বলল,

“কি হয়েছে মা? আমি আছি তো।”

সালমা বেগম গহন কে আরেকটু আঁকড়ে ধরে বললেন,

“তুমি ওনার সাথে যোগাযোগ রেখেছো?”

“না মা।”

“তাহলে উনি তোমার সাথে যোগাযোগ করার মাধ্যম পেলেন কোথা থেকে?”

“এখনকার যুগে কারো সাথে যোগাযোগ করা খুব কঠিন কাজ নয় মা। যার দরকার সে ঠিক প্রয়োজনীয় মানুষটার সাথে যোগাযোগ করার পথ খুঁজে নেয়।”

এবারে সালমা ছেড়ে দিলেন গহন কে। গহনের গালে মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে দিলেন। গহন খেয়াল করলো সালমা বেগমের চোখ দুটো ছলছল করছে। গহন জানে কখন এই চোখ দুটো ছলনা করে, আর কখন এই চোখ দুটো সত্যি ছলছল করে। সেই পার্থক্যটা গহন অনায়াসে ধরতে পারে।

সালমা বেগম যেমন গহনের চোখের ভাষা পড়ে নিতে পারে। ঠিক তেমনিভাবে গহনও অনায়াসে নিজের মায়ের চোখের ভাষা পড়ে নিতে পারে।

সালমা বেগম গহনের কপালে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে মৃদু ক্রন্দনরত ভঙ্গিতে বললেন,

“আমি তোমাকে বড় করে তুলেছি। তোমায় আদর, যত্ন, ভালোবাসা, কষ্ট যা দেওয়ার সব আমি দিয়েছি। তোমার উপর সব থেকে বেশি অধিকার আমার। তুমি আমার ছেলে, আমার বড় ছেলে তুমি। তোমার মা আর কেউ না। আমিই শুধুমাত্র তোমার মা।”

গহন আলতো হেসে বলল,

“আমি তো জানি তুমি আমার মা। আমি তো সবসময় এই কথাটাই বলি। তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন? আমি তো তোমায় বলছি আমি তোমার ছেলে।”

“শুধু তুমি আমার ছেলে বললেই হবে না। তোমাকে বলতে হবে আমিই তোমার মা। আর কেউ না।”

“আচ্ছা ঠিক আছে তুমিই আমার মা। নতুন করে এটা বলার কিছু নেই মা। আমি তো সব সময় এটাই বলি। তুমি এখন শান্ত হও। আমি তোমার কাছেই আছি।”

কথাটা বলে গহন সালমা বেগম কে নিজের জায়গায় শুইয়ে দিয়ে পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। সালমা বেগম এখনো গহনের একটা হাত আঁকড়ে ধরে শুয়ে আছেন। কোনমতেই তিনি গহনের সেই হাতটা ছাড়লেন না। গহন ছাড়ানোর চেষ্টাও করলো না। যদি এভাবেই তিনি শান্তি পান তবে এভাবেই থাকবে গহন।

দরজার কাছে দাঁড়িয়ে নিধি পুরো দৃশ্যটা দেখলো। সব কথোপকথন শুনলো ওদের দুজনের মাঝের। নিধির মাথাটা এখন ভনভন করে ঘুরছে। এদের মা ছেলের কথাবার্তার আগামাথা কোনো কিছুই তো বুঝে উঠতে পারছে না।

_____________

দুপুরের দিকে বাড়ি ফিরে এসেছিলো গহনরা। সালমা বেগম আর নিধি কে বাড়িতে রেখে গহন অফিস চলে গিয়েছিল। রাতে বাড়ি ফেরার পর খাওয়া দাওয়া শেষে নিধি সবে মাত্র গহন কে একটু একা পেল। তবে কিভাবে কি জিজ্ঞেস করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। আবার এখন জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে কিনা সেটাও বুঝে উঠতে পারছে না। গহন তো নিজ থেকে কিছু বলছেও না। তাহলে কি নিধির জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে আগবাড়িয়ে? নাকি গহন আবার রেগে যাবে এটা জিজ্ঞেস করলে? নাকি অস্বস্তি হবে গহনের?

নিধির মুখটা দেখে যেন গহন বুঝতে পারলো সেসব। বুঝলো নিধির মনের মাঝে হাজারো প্রশ্ন চলছে। কিন্তু গহন কে একটা প্রশ্নও জিজ্ঞেস করেনি এই ব্যাপারটা গহনের বেশ ভালো লাগলো। এই যে নিধি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে গহন কখন ওকে জানাবে সবকিছু এই ব্যাপারটা ভালো লাগলো।

প্রত্যেক দিনের মতন গহন তখন ল্যাপটপ নিয়ে গিয়ে সবেমাত্র সোফায় বসেছে। তবে মনে হলো অফিসের কাজের আগে নিধির সঙ্গে টুকটাক কিছু কথাবার্তা সাড়া প্রয়োজন। নিধি কে কিছু জানানো প্রয়োজন।

“যা জানতে চাও জিজ্ঞেস করতে পারো। আমি উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো।”

গহনের কথায় নিধির ধ্যান ভাঙ্গলো। গহন ওকে প্রশ্ন করার অনুমতি দেওয়ায় বেশ খুশি হলো। বিছানা থেকে উঠে এসে সোফায় গহনের পাশে বসে গুরুতর ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলো,

“সকালে কে কল করেছিল? আপনি চেনেন তাকে? উনি কেন নিজেকে আপনার মা বলে পরিচয় দিচ্ছিলেন?”

কিছুক্ষণ নীরবতা পালনের পর গহন একটা লম্বা শ্বাস টেনে বলল,

“কারণ উনি আমার মা।”

নিধির ব্যাপারটা ঠিক বোধগম্য হলো না। চোখে মুখে হাজারটা প্রশ্ন ফুটিয়ে তুলে বলল,

“মানে উনি কি করে আপনার মা হবেন? তাহলে যাকে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিয়ে এলাম তিনি কে?”

“তিনিও আমারই মা।”

নিধি এবারে বেশ বিরক্তিকর গলায় বলল,

“মজা করছেন আমার সাথে আপনি? একজনের এতগুলো মা কি করে থাকতে পারে! ধুর!”

কথাটা বলে নিধি উঠে যেতে ধরলো। কি ভেবে যেন আবার থেমে গেল। হঠাৎ করে মস্তিষ্কে কিছু একটা এলো। তড়িৎ গতিতে আবার নিজের পূর্বের জায়গায় বসে গুরুতর মুখভঙ্গি করে গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এক মিনিট। আমি যেটা ভাবছি সেটাই কি ঠিক? আপনার দুজন মা। তার মানে একজন নিজের মা, আর একজন কি......”

গহন পছন্দ করেনা সালমা বেগম কে নিজের সৎ মা হিসেবে পরিচয় দিতে। তবে এখন কোন উপায় নেই। নিধিকে পুরো ব্যাপারটা বোঝানোর জন্য হলেও বলতেই হবে।

উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে বলল,

“হ্যাঁ। একজন নিজের মা, একজন সৎ মা।”

বিজ্ঞাপন

বিস্ময়ে নিধির চোখ কপালে উঠে গেল। অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“সত্যিই আপনার দুটো মা? সৎ মা কোনটা?”

“যার সঙ্গে আমি থাকি।”

নিধি এবারে বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠে বলল,

“কিইই? উনি আপনার সৎ মা? মানে আপনি ওনার সৎ ছেলে? মানে আপনি ওনার নিজের ছেলে নন? তারমানে আমার আসল শাশুড়ি হলো যিনি কল করেছিলেন? হায় আল্লাহ কি শুনছি আমি এগুলো! এই গহন মজা করছেন না তো?”

গহন চুপচাপ শুধু দুদিকে মাথা নাড়ালো। নিধি নিজের শরীরটা সোফায় এলিয়ে দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে কিছুক্ষণ কিসব যেন ভাবলো। হয়তো মনে মনে কিছু সমীকরণ মেলানোর চেষ্টা করলো। বেশ কিছুটা সময় পর চোখ খুলে আবারও সোজা হয়ে বসে গহনের দিকে তাকিয়ে এবারে কিঞ্চিত রাগী গলায় বলল,

“আগে কেন জানাননি আমায় এই কথাটা যে উনি আপনার সৎ মা?”

গহন বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,

“কারণ এই বিষয়টার কোন গুরুত্ব আমার কাছে নেই। তুমি ঘটনাটা বুঝবে না বিধায় তোমাকে সৎ মা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলাম। নয়তো আমি কখনো কাউকে এই কথাটা বলি না। আমি ওনাকে আমার মায়ের জায়গা দিয়েছি। ওনাকেই আমি আমার মা হিসেবে মনে করি। মায়ের মতন শ্রদ্ধা, ভালোবাসা সব অনুভূতি ওনার প্রতিই আছে আমার।”

নিধি একটা ঝাড়ি দিয়ে বলল,

“চুপ করুন তো। এখন আমি সব বুঝতে পারছি কেন সিনথিয়া, শম্পা আর সাবিতের সাথে আপনার নামের মিল নেই। কেন এই বাড়িতে আপনি ঝাল খেতে পছন্দ করেন না জানা সত্ত্বেও সবাই ঝাল খেতে চায়। আমি এটাও বুঝতে পারছি কেন এই বাড়িতে আপনাকে খাবার বেড়ে দেওয়া তো দূর কেউ একটু কফি পর্যন্ত বানিয়ে দেয় না। কেন আপনি সারাদিনরাত না খেয়ে খেটে ম'র'লেও কেউ আপনার খোঁজ নেয় না সেটাও বুঝতে পারছি। সেই সাথে আমি এটাও বুঝতে পারছি কেন আপনার ভাই বোন, আপনার মায়ের দিকের সকল আত্মীয়-স্বজন আপনার সাথে এমন উঠে পরে লাগে।”

গহন শান্ত গলায় বলল,

“এসব নিয়ে ভেবোনা। আমি এই জন্যই তোমায় এই কথাগুলো আগে জানাতে চাইনি। কেননা আমি জানতাম এই কথাগুলো তুমি জানলে সব বিষয়ে তোমার সন্দেহ বাড়বে। তুমি সব বিষয়কে নেগেটিভ ভাবে নেবে। ভুলে যাও এই কথাগুলো নিধি। যেমন সবকিছুকে স্বাভাবিকভাবে দেখছিলে তেমন স্বাভাবিকভাবেই দেখো।”

নিধি আবারও গহনকে একটা ঝারি মেরে বলল,

“ধুরু। অস্বাভাবিক একটা ব্যাপার কে স্বাভাবিকভাবে দেখব কি করে? আচ্ছা তার আগে বলুন তো আপনার নিজের মায়ের জায়গা ওনাকে দিলেন কেন? আপনার মা গেল কেন? আপনি আপনার নিজের মায়ের কাছে নেই কেন? ওনাকে আপনি সহ্য করতে পারেন না কেন?”

নিধির কথাগুলো শুনে গহন ভাবনার রাজ্যে ডুব দিল। মনে পড়ে গেলে বহু বছর পুরনো কিছু কথা। তখনকার কথা যখন গহন অনেক ছোট ছিল। সবেমাত্র স্কুলের গণ্ডিতে পা রেখেছে। পুরনো স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠতেই অনাকাঙ্খিতভাবে চোখ দুটো কেমন যেন ঝাপসা হয়ে এলো গহনের। মনে পড়ে গেল যখন ওর মা ওকে একা ছেড়ে গিয়েছিল সেই মুহূর্তের কথাটা। হাজারো মানুষের ভিড়ের মাঝে নিজের মায়ের মুখটা খোঁজার কথা মনে পড়ে গেল। মনে পড়ে গেল একটা কোনার দিকে দাঁড়িয়ে কত কেঁদেছিল সেদিন গহন। কিন্তু কেউ সেদিন গহনকে সামলায়নি। গহনের মা ছিল না সেদিন গহনের কাছে। ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে চলে গিয়েছিল।

নিধি খেয়াল করলো গহনের গাল বেয়ে হঠাৎ করে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লো নিধি। উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“আরে আরে কি হলো কাঁদছেন কেন? এত জোরেও ঝাড়ি দেইনি। আরে কাঁদার মতন কিছু বলেছি নাকি আমি? এই গহন কাঁদছেন কেন?”

ধ্যান ভাঙলো গহনের। তাড়াহুড়ো করে হাতের উল্টো পিঠে চোখের জল মুছে একটু হাসার চেষ্টা করে বলল,

“না না তুমি কিছু করোনি। এমনি চোখ দিয়ে জল পড়ছিল।”

গহনের কথাটা নিধির মোটেই পছন্দ হলো না। গহনের যুক্তিতে কোন যুক্তিই নেই। এমনি এমনি আবার চোখ দিয়ে জল পড়ে নাকি! কপট রাগ দেখিয়ে বলল,

“আমাকে দেখে কি আপনার পাগল মনে হয় যে, আপনি অযথা এক কথা বলবেন আর আমি বিশ্বাস করে নেব? এমনি এমনি কারো চোখ দিয়ে জল পড়ে না। কোন একটা কারণ অবশ্যই থাকে। কি কারণ বলুন।”

গহন আবারো কোন একটা অজুহাত বানাতে চাইলো। তবে নিধি সেটা যেন বুঝে ফেললো। গহন কিছু বলে ওঠার আগেই ওকে সাবধান করে দিয়ে বলল,

“একদম আমাকে ভুজুংভাজুং বোঝাতে আসবেন না। এমনিতেই যথেষ্ট রেগে আছি আপনার উপরে আমার কাছ থেকে এত বড় একটা কথা লুকোনোর জন্য। তারপরও আপনার চৌদ্দ গুষ্টির কপাল ভালো যে আমি এখনও আপনার সাথে কথা বলছি। তাই যদি নিজের ভালো চান আমার থেকে আর কিছু লুকোবেন না। নয়তো বউয়ের ভালোবাসাও কিন্তু আর পাবেন না।”

নিধির কথাটা শুনে গহন একটু হাসলো। কিছুক্ষণ নিজেই নিজের সাথে আলোচনা করলো মনে মনে যে নিধি কে কথাগুলো বলবে কিনা। কতটুকুই বা বলবে, কোথা থেকে শুরু করবে। বেশ কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তার পর নিধি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমার মায়ের কাছে আমি কেন থাকি না শুনবে?”

নিধি কৌতূহলী গলায় বলল,

“হ্যাঁ শুনবো।”

গহন মলিন হেসে বলল,

“তার কারণ আমার মা আমাকে চায়নি। তিনি চেয়েছিলেন তার নিজের জীবনে উন্নতি করতে। তিনি চেয়েছিলেন একা একা ভালো থাকতে। তার নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে। তিনি বাঁচতে চেয়েছিলেন আনন্দে। আর তার এত এত স্বপ্নের মাঝে কোথাও আমি ছিলাম না। তার ভালো থাকার কারণের মাঝে আমি ছিলাম না। সেজন্য আমি আর আমার মা একসাথে থাকি না।”

“কবে চলে গিয়েছিল আপনার মা? মানে তখন আপনি কত বড়?”

গহন কে আবারও সেই পুরনো বিষাক্ত স্মৃতিগুলোর মাঝে ডুব দিতে হলো। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“ক্লাস ওয়ানে পড়তাম। বাবা ব্যবসার কাজে শহরের বাইরে ছিল তখন। ফুপি অনেক দিন পর দেশে ফিরেছিল। আমাদের বাড়িতেই ছিল তখন। দাদিও ছিল। একদিন দুপুরের দিকে হুট করে আম্মু বলল কি সব যেন কেনাকাটা করতে যাবে। আমাকে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না আম্মুর। কিন্তু আমি কি ভেবে যেন জোর করে আম্মুর সঙ্গে গিয়েছিলাম। আম্মুকে ছাড়া থাকতে পারতাম না। ভালো লাগত না। আমি ছোটবেলা থেকেই স্বভাবে চুপচাপ ছিলাম। কোন বন্ধুও ছিল না। আম্মু ছাড়া কাউকে ভালোও লাগতো না।”

“তারপর?”

“তারপর আর কি। আম্মুর সাথে শপিং মলে গেলাম। অনেকগুলো দোকান ঘুরলাম আমরা। কিন্তু আম্মু কিছু কিনলো না। হঠাৎ করে আমায় লিফটের সামনে অপেক্ষা করতে বলে বলল, কোন দোকানে যেন কি একটা দেখে পছন্দ হয়েছে। সেটা আনতে যাচ্ছে। এক্ষুনি চলে আসবে। আমি যেতে চাইলাম আম্মুর সাথে। কিন্তু আম্মু নিয়ে গেল না। বলল আবার এতদূর হাঁটার দরকার নেই। চুপচাপ আমাকে ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে বলল। আমাকে ওখানেই অপেক্ষা করতে বলে আম্মু চলে গেল। আমার হাতে আম্মুর ফোনটাও দিয়ে গিয়েছিল। অনেকটা দূরে চলে যাওয়ার পর আম্মু হঠাৎ করে পিছন ঘুরে তাকিয়ে আমার উদ্দেশ্য হাত নাড়ালো। আমি বুঝতেও পারিনি তখন যে আম্মু আমাকে ছেড়ে সারা জীবনের জন্য চলে যাচ্ছিল। আমি ভেবেছিলাম হয়ত এক্ষুনি চলে আসবে। জানো নিধি, আমি আম্মুর খুব বাধ্য ছিলাম। আমি আম্মুর কোন কথা অমান্য করতাম না। আম্মু কে কষ্ট দিতে চাইতাম না। সেজন্য চুপচাপ ওই জায়গাটাতেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। আধা ঘন্টা, এক ঘন্টা, দুই ঘন্টা এমন করে করে আমি প্রায় তিন থেকে চার ঘন্টার মতন ওই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু আম্মু এলো না।”

গহনের শুকিয়ে যাওয়া চোখ দুটো আবারও ভিজে উঠল। এদিকে নিধির কেঁদেকেটে অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। ক্রন্দনরত গলায় গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এভাবে ছেড়ে চলে গেল! মায়েরা এভাবে ছেড়ে চলে যায়!”

“যায়। আমার আম্মু চলে গিয়েছিল। আমাকে ওখানে দাঁড়িয়ে কাঁদতে দেখে কিছু লোকজন এসে জিজ্ঞেস করেছিল যে কেন কাঁদছি আছি। পরে ওরা বাবাকে কল করেছিল। পরে ফুপি এসে আমাকে নিয়ে যায়। ওই রাতেই বাবা বাড়ি ফেরে। পরে বাবাদের ঘরে মায়ের লেখা একটা ছোট্ট চিঠি পাই। ওখানে মা শুধু লিখেছিলো মা স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমরা যেন মায়ের কোন খোঁজ না করি। মা নিজের জীবনে একটু বাঁচতে চায়। এই সংসারের চাপ, বাবার দুর্ব্যবহার, দাদীর দুর্ব্যবহার এসব কিছু থেকে মা একটু মুক্তি চায়। নিজের মতন করে বাঁচতে চায়। আমরাও সেজন্য মা কে নিজের মতন করে বাঁচতে দিয়েছিলাম।”

কথাটা বলে গহন হাসলো। গহন হাসছে ঠিকই তবে তারপরেও ওর গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। নিধির গহনের কথাগুলো শুনে যতটা না খারাপ লাগলো তার থেকেও বেশি খারাপ লাগলো গহন কে কাঁদতে দেখে। বসা অবস্থাতেই গহনপর দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে গহনের চোখের জল মুছে দিয়ে বলল,

“কাঁদছেন কেন? এমন মায়ের জন্য কাঁদতে হবে না। উনি আপনার ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্যই না।”

গহন নিধির মুখের দিকে তাকিয়ে আলতো হেসে বলল,

“মায়ের জন্য কাঁদছি না নিধি। কাঁদছি আমার দুর্ভাগ্যের কথা ভেবে। আমার ভাগ্য কতটা নিষ্ঠুর বলোতো। মা কে হারালাম। বাবা ভালোবাসতো খুব, বাবাকেও হারালাম। দাদীও খুব ভালোবাসতো, তাকেও হারালাম৷ কেউ আমার হয়ে থাকে না নিধি।”

গহন কথাটা বলতেই নিধি ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। উঠে দাঁড়িয়ে দুই হাতে গহনের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,

“আমি থাকবো। কেউ না থাকলেও আমি থাকবো। ওরা আপনাকে ছেড়ে চলে গেছে তো কি হয়েছে? আমি আছি তো। আমি সারা জীবন আপনার হয়ে থাকবো। আর যারা যারা এবার আপনাকে কষ্ট দিতে আসবে সবকটাকে এক লা'থি দিয়ে আপনার জীবন থেকে বের করে দেব।”

গহন শুধু হাসলো নিধির কথাগুলো শুনে। একটু বোধহয় শান্তিও অনুভব করলো। এতগুলো বছর পর তাহলে আবারও গহনের জীবনে কেউ এলো গহনের হয়ে থাকার জন্য। আবারো কেউ এলো গহন কে ভালোবাসার জন্য, গহনের বিপদে-আপদে পাশে থাকার জন্য। গহনও আঁকড়ে ধরতে চায় এই মানুষটাকে। অনেক কিছু হারিয়েছে গহন। তবে নিজের এই শেষ ভরসাটাকে আর হারাতে চায় না। এই ভরসাটাকে আঁকড়ে ধরে বাকিটা জীবন হেসে খেলে বাঁচতে চায়।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প