আকাশ আজ মেঘলা ভীষণ

পর্ব - ৮

🟢

মেঘলা ভীষণ অবাক হয়ে হলো। যেন তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল এক মুহূর্তে। বাবা-মা, যাদের ভালোবাসা, মমতা আর বিশ্বাসে এতদিন সে নিজেকে নিরাপদ ভেবেছিল, আজ তারাই যেন সবচেয়ে বড় অপরিচিত মানুষ হয়ে দাঁড়িয়েছে সামনে।

যে মেয়েটা একটা ওড়না কিনতে গেলেও নিজের পছন্দে রঙ, কাপড়, নকশা বেছে নিত।সেই মেঘলার জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটা তারা নিয়ে ফেললো একটিবারও তার মতামত জানার প্রয়োজন মনে করলো না।

একজন মানুষ, যার সাথে সারাটা জীবন কাটাতে হবে, সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিতে হবে, তাকে একবার দেখার সুযোগটুকুও দিলো না বাবা মা। কী অপরাধ করেছে সে? কেন এই অবিচার?

তার বুকের ভেতর হাহাকার জমে গেল।বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মেঘলার চোখ ভিজে গেল অজান্তেই। মনে হলো, যেন চারপাশের সব চেনা মুখ আজ অচেনা হয়ে গেছে।

বাবা-মা কি আর আগের মতো নেই? কবে থেকে তারা এমন কঠিন হয়ে হলো?

এই প্রশ্নগুলো মাথার ভেতর ঘুরতে ঘুরতে তার মনে এক অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হলো যেন ভরসার পৃথিবীটাই ভেঙে পড়ছে ধীরে ধীরে।

আরাফিয়া একে একে বিয়ের সাজের সব জিনিস বের করতে লাগলো।

প্রথমে আনলো লাল বেনারসী চমচমে সোনালী জরির কাজ করা, আলো পড়তেই যেন রোদ্দুরের মতো ঝলমল করে উঠছে।

তারপর গয়নার বাক্স খুলে দেখালো সোনার নেকলেস, মাথার টিকলি, নথ, কানের দুল, চুড়ি, পায়েল সবই যত্ন করে সাজানো। প্রতিটি জিনিস যেন একেকটা স্মৃতি, একেকটা গল্প বলছে।

আরাফিয়া মিষ্টি হেসে বললো,

-দেখো মেঘলা, এটা গলার হারটা পরবে ঠিক বেনারসীর সঙ্গে, আর টিকলিটা আমি নিজে বেছে নিয়েছি তোমার জন্য। তোমার কপালে একদম মানাবে।

মেঘলা নিঃশব্দে বসে আছে। মনের ভেতর অস্থিরতা। বার বার আকাশের মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠছে।

মনের মধ্যে সেদিনের সেই কিস করার দৃশ্য টা উঁকি দিচ্ছে বার বার।

এসব মনে পড়তেই মেঘলার গাল গরম হয়ে ওঠলো বুকের ভেতর একটা কাঁপন ধরে গেল,যেন কোথাও খুব গভীরে জমে থাকা ভালোবাসা আর অপরাধবোধ একসাথে দোলা দিচ্ছে।

কোন কিছু না ভেবেই মেঘলা হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো।

পরের মুহূর্তেই সে আরাফিয়ার বুকে মুখ গুঁজে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।

তার কান্নার শব্দে ঘরটা যেন মুহূর্তেই ভারী হয়ে গেল একটা ব্যথায় ভরা, দমবন্ধ করা শব্দে কেঁপে উঠলো চারদিক।

মেঘলার হাত দুটো শক্ত করে চেপে আছে আরাফিয়ার গায়ে, যেন সেই আলিঙ্গনেই সব কষ্ট ভুলে থাকতে চায়। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে আরাফিয়ার শাড়ির আঁচলে, আর মেঘলার গলাটা কাঁপছে অনবরত।

আপু…

মেঘলার কণ্ঠ যেন ভাঙা সুরে কাঁপতে লাগলো, “আমি আকাশ ভাইয়াকে ভালোবাসি… আপু, আমি ওকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না। অন্য কারো সাথে নিজেকে ভাবলেই মনে হয় দম বন্ধ হয়ে যাবে। আমার ভেতরটা… শেষ হয়ে যাচ্ছে আপু…”

আরাফিয়া হতবাক হয়ে চেয়ে রইলো মেঘলার মুখের দিকে।

তার চোখে তখন শুধু ভালোবাসার অসহায়তা আর হাহাকার ,যেন সব রঙ, সব হাসি, সব স্বপ্ন মিলেমিশে এক নিঃশেষ অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে।

-এখন এসব কথা বলে লাভ নেই মেঘলা আপাতত এগুলো পড়ে নাও । আমি তোমাকে এগুলো পড়ে দিচ্ছি।

বিজ্ঞাপন

মেঘলা ভেবেছিল আরাফিয়া হয়তো আকাশ ভাইয়া কে গিয়ে বলবে কিন্তু আরাফিয়া তাকে সাজানোর জন্য ইউটিউবে টিউটোরিয়াল বের করতে লাগল।

রাত তখন প্রায় দশটা বেজে গেছে। আরাফিয়া মেঘলাকে সাজিয়ে দিয়ে ঘরের মধ্যে বসিয়ে রেখেছে । হটাৎ করে পুরো বাড়ির সব আলো নিভে গেল। সবাই হৈচৈ করতে লাগলো।

মেঘলা চমকে উঠে দু’হাতে আঁকড়ে ধরলো চেয়ারের হাতলটা। তার বুকের ভেতর তীব্র ধকধকানি, যেন এই অন্ধকারের ভেতর কিছু অজানা আশঙ্কা ঘাপটি মেরে আছে।

আরাফিয়া তাড়াতাড়ি জানালার পাশে গিয়ে বাইরে তাকালো পুরো উঠোন জুড়ে অন্ধকার, শুধু দূরের আকাশে আধখানা চাঁদ হালকা আলো ফেলে রেখেছে।

এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই ভেতর উঠোন থেকে কারো গলা ভেসে এলো,

কাজী সাহেব এসে গেছেন! আলোটা ঠিক করো তাড়াতাড়ি!

ঘরে থাকা সবাই একসাথে দৌড়ঝাঁপ শুরু করলো, কেউ মোমবাতি খুঁজছে, কেউ ফোনের টর্চ জ্বালাচ্ছে।

আর মেঘলা তখনও চুপচাপ বসে আছে অন্ধকারে তার মুখে সেই হালকা আতঙ্কের ছায়া, চোখে অজানা এক আলো, যেন এই অন্ধকারে লুকিয়ে আছে তার জীবনের এক নতুন অধ্যায়।

আরাফিয়া মেঘলাকে ডেকে নিয়ে গেল পাশের ঘরে। যেখানে কাজি সাহেব আগে থেকেই বসে আছে। কাজি সাহেব বিয়ে পড়ানো শেষ করে দিলো । মেঘলা তখনও পর্যন্ত ছেলে টাকে এক নজর দেখলো না । শুধু কাজি সাহেবের থেকে জানতে পারলো ছেলেটার নাম আরহাম ।

ভুঁইয়া বাড়ির সবাই আজ একসাথে খেতে বসেছে কিন্তু মেঘলা শুধু ঘরে বসে আছে । সে দরজার ফাক দিয়ে বার বার ছেলেটাকে দেখার চেষ্টা করছে। কিন্তু পুরো বাড়ি অন্ধকার থাকায় সে স্পষ্ট ভাবে দেখতে পাচ্ছে না আর খাবার টেবিলে কোন অপরিচিত ছেলেই তো নেই । সবাই তো আমাদের বাড়ির লোকজন।

কিন্তু আকাশ ভাইয়া কোথায় আকাশ ভাইয়াকেও তো দেখছি না খাবার টেবিলে । এখানে তো শুধু বাবা চাচারা খেতে বসেছে।

মনে মনে ভাবলো আকাশ ভাইয়া কি আমার ওপর রাগ করে আছে নাকি? আমি অন্য কাউকে বিয়ে করে নিয়েছি বলে?

কিন্তু পরক্ষণেই আকাশের ওপর ভীষণ রাগ হলো মেঘলার। বুকের ভেতরটা হঠাৎ যেন জ্বলে উঠলো ক্ষোভে, অভিমানে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে মেঘলা চোখ তুলে তাকালো আকাশের দিকের আকাশটার দিকেই যেন কোনো উত্তর লুকিয়ে আছে। মনে মনে বলল-

আমি না হয় রাগ করে বিয়েটা করে ফেললাম। আকাশ ভাইয়া তো এই বিয়েটা আটকাতে পারতো ?

আর আটকাবেই বা কেন সে তো আমাকে ভালোবেসে না । সেদিন শুধু নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি বলে এমন করেছে।

মন থেকে কখনোই সে আমাকে ভালোবাসেনি।

_________________

রবিন সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল । এই প্রথম করো কষ্ট সে উপলব্ধি করতে পারছে । ছোট বেলা থেকেই বেপরোয়া স্বভাবের ছেলেটা আজ । নিজেকে রাইশার জায়গায় দাড় করিয়ে তার কষ্ট বোঝার চেষ্টা করছে।

গত কয়েক দিন ধরে রাইশাকে ক্যাম্পাসে দেখতে পাচ্ছে না রবিন। প্রতিদিন সকালে ক্লাসে ঢোকার আগে, করিডোরের প্রতিটা মোড়ে, ক্যান্টিনের জানালার পাশে সব জায়গাতেই তার চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছে একটিমাত্র মুখ, রাইশার মুখ। কিন্তু কোথাও নেই সে। যেন হঠাৎ করেই মেয়েটা অদৃশ্য হয়ে গেছে পৃথিবী থেকে।

রবিনের ভেতরটা অদ্ভুত এক অস্থিরতায় ভরে উঠেছে। ক্লাসে বসে শিক্ষক কি বলছেন কিছুই বুঝতে পারে না, চোখ যায় দরজার দিকে হয়তো এখনই রাইশা এসে ঢুকবে, চুলগুলো কাঁধে এলিয়ে দিয়ে নির্লিপ্ত মুখে আসনে বসবে। কিন্তু না, প্রতিবারই হতাশ হতে হয়।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এতদিনে একবারও রাইশার ফোন নাম্বার চায়নি রবিন। ভাবতো, “এই তো প্রতিদিন দেখি, দরকার কী?” এখন মনে হচ্ছে কত বড় ভুল করেছে! আজ হঠাৎই মনটা ভারি কেমন করছে ।অকারণে মন কাঁদছে, শুধু এক ঝলক দেখার জন্য।

তার মনে এক অজানা টান, এক অপ্রকাশ্য বাসনা রাইশাকে একবার দেখলে ভালো লাগতো, যদি দু’টো কথা বলা যেত, যদি একবার তার হাসিটা দেখা যেত।

বিকেলের নরম রোদে ক্যাম্পাসের মাঠে বসে রবিন চুপচাপ তাকিয়ে রইলো, মনে হলো পুরো পৃথিবীটা যেন নিঃশব্দ হয়ে গেছে, শুধু রাইশার অনুপস্থিতিই আজ সবকিছুকে ফাঁকা করে রেখেছে।

বিজ্ঞাপন
আকাশ আজ মেঘলা ভীষণ গল্পটি আজেরিন হিরানুর-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প