আকাশ আজ মেঘলা ভীষণ

পর্ব - ১০

🟢

ভুঁইয়া বাড়ির সবাই সকালের খাবার খেতে বসেছে ।

ঠিক তখনই সদর দরজার দিক থেকে কারো পায়ের শব্দ ভেসে এলো।

সবাই একসাথে চেয়ে দেখল রবিন ঢুকছে, পাশে একটা রোগা পাতলা মেয়ে।

মেয়েটার মুখ এতটাই ফ্যাকাশে যে মনে হচ্ছে রক্তের কোনো ছোঁয়া নেই সেখানে। ঠোঁটজোড়া শুকিয়ে গেছে, চোখের নিচে গভীর কালচে দাগ পড়েছে, যেন দীর্ঘদিনের নির্ঘুম রাতের সাক্ষী। চুলগুলো এলোমেলো আছে, চোখদুটো নিস্তেজ হয়ে আছে চোখের মাঝে এক অদ্ভুত শূন্যতার ছায়া দেখা যাচ্ছে।

গায়ে হালকা নীল সালওয়ার-কামিজ, কিন্তু কাপড়টা কুঁচকে গেছে, যেন বহুদিন ইস্ত্রি দেখেনি।

ধীর পায়ে রবিনের পিছন পিছন হেঁটে আসছে।

ঘরের ভেতর মুহূর্তেই নেমে এলো এক নিস্তব্ধতা। সবার মনে একটাই প্রশ্ন কে এই মেয়ে, আর কেন তার মুখে এমন অচেনা বিষাদের ছায়া?

ঠিক তখনই আকাশ বলে উঠলো - ফ্রেন্ড নিশ্চয়ই?

রবিন একবার রাইশার দিকে তাকিয়ে বলল- না ভাইয়া ।

- তাহলে কে এই মেয়েটা‌?

-আমার ওয়াইফ।

এটা শুনে সবাই একদম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেল ।

সবার মনে একটাই প্রশ্ন রবিন বিয়ে করেছে এই রোগা পাতলা মেয়েকে?

সুফিয়া বেগম হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো -- বাবা তুই কেন আমাকে না জানিয়ে এই শ্রীহীন মেয়েটাকে বিয়ে করলি?

দেশে কি মেয়ের অভাব ছিলো যে ওকে বিয়ে করতে হবে? ভুঁইয়া বাড়ির ছেলে এমন মেয়ে বিয়ে করেছে লোকজন জানলে আমাদের মান ইজ্জত সব ধুলোই মিশে যাবে।

সুফিয়া বেগম রাইশার সামনে তেড়ে এসে বললো এই মেয়ে এই এই চিকনি চামেলি সুরত নিয়ে আমার ছেলেটার মাথা খাইছোস? বাপ মায়ে কি কোন আত্মসম্মান বোধ শিখায় নি ? নাকি সারাদিন শুধু ছেলেদের পেছনে পেছনে ঘুরতে শিখাইছে।

রাইশার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। মনে হচ্ছে, প্রতিটি অশ্রুবিন্দুর সঙ্গে তার বুকের ভেতরের সমস্ত যন্ত্রণা গলে বেরিয়ে আসছে। ভেতরে যেন এক অদৃশ্য ঝড় বয়ে যাচ্ছে । যার শব্দ শুধু সে-ই শুনতে পাচ্ছে। কাল রাতেই মায়ের মৃত্যু তাকে ভিতর থেকে ভেঙে দিয়েছে, আর আজকের অপমান সেই ক্ষতের ওপর যেন নুনের ছিটা। বুকের ভেতরটা হুহু করে জ্বলছে, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সব ভার যেন তার কাঁধে চেপে বসেছে। এত কষ্ট, এত অপমান সবকিছু মিলিয়ে রাইশা ভীষণ ক্লান্ত, ভীষণ অবসন্ন। আর একফোঁটা শক্তিও যেন অবশিষ্ট নেই তার মধ্যে। সে চুপচাপ বসে আছে, কিন্তু তার চোখের জল থামছে না।

মনে মনে ভাবলো লোকটা রবিনের কে হয়? এটা রবিনের থেকে জেনে নেই পরক্ষণেই আবার কি মনে করে বললো না।

একটু পরে রবিনই বলে উঠলো মা কালকে ওর মা মারা গেছে। ওর.....

-থাক আর বলতে হবে না ।

পাষান মনের মানুষটার মনে একটুও দয়া হলো না । সুফিয়া বেগম খাবার টেবিল থেকে হনহনিয়ে নিজের রুমে চলে গেল। ব্যাগ ভর্তি কাপড় নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল এই মেয়েটা যতোদিন এবাড়িতে থাকবে ততদিন আমি এবাড়ির ত্রিসীমানায় পা‌ রাখবো না ।

রবিনের বাবা অনেকবার আটকানোর চেষ্টা করেও তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে পারলো না ।‌

মনোয়ারা বেগম মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল - আমি আছি মা তুমি কোন চিন্তা করো না । তোমার শাশুড়ি এরকমই । একটুতেই রেগে যায় আবার ঠিক হয়ে যায়।

তোমার নাম কি মা?

বিজ্ঞাপন

মেয়েটা ছোট করে বলল- রাইশা।

-কি সুন্দর নাম। যাও ফ্রেশ হয়ে নাও তারপর খাবার খেতে হবে না? যাও যাও তারাতাড়ি।

মনোয়ারা বেগম আবার খাবার পরিবেশনে মনোযোগ দিলেন।

রবিন রাইশাকে নিয়ে রুমে চলে গেল।

দেখতে দেখতে সাতটা দিন কেটে গেল । দিনগুলো যেন মেঘলার জীবনের ক্যালেন্ডারে একেকটা ভারী পাথরের মতো পড়ে রইল। আজ রাতেই আকাশদের ফ্লাইট। বাড়ির সবাই ব্যস্ত শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে, কারো মুখে তেমন হাসি নেই।

মেঘলা এক কোণে বসে চুপচাপ সবকিছু দেখছে। সাত দিনে কাগজপত্রের ঝামেলা কাটাতে পারেনি আকাশ। তাই চাইলেও এবার তাকে সঙ্গে নিতে পারছে না।

মেঘলার বুকের ভেতরটা কেমন হালকা অথচ শূন্য লাগছে যেন কেউ নিঃশব্দে তার ভেতরের সব রঙ মুছে দিয়েছে।

আকাশও কষ্টটা লুকোতে পারছে না, তবু মুখে মেঘলাকে আশ্বস্ত করে বলল,

-সব ঠিক হয়ে যাবে, মেঘলা। তোমাকে আমি শিগগিরই নিয়ে যাব।

কিন্তু মেঘলার মনে সেই কথার নিশ্চয়তা নেই। তার চোখে ভাসছে বিদায়ের অনিশ্চয়তা, আর বুকের গভীরে জমে থাকা এক নিঃশব্দ ভয়—যদি এই ‘পরে নিয়ে যাওয়া’র প্রতিশ্রুতি সময়ের ভিড়ে কোথাও হারিয়ে যায়?

মেঘলার আজ ভীষণ মন খারাপ । কারন আকাশ আজ তাকে ছেড়ে চলে যাবে । এই সাত দিনে কতো হাসিখুশি ছিলো মেয়েটা আর আজ মনের আকাশে মেঘ জমেছে ভীষণ।

এই কয়দিনে রাইশার সাথেও মেঘলার ভীষণ ভাব হয়ে গেছে। রোগা, পাতলা, কিন্তু মায়াময় চেহারার মেয়েটিকে তার বেশ মনে ধরেছে। রাইশার চোখে যেন এক অদ্ভুত কোমলতা আছে, আর কথাবার্তায় এমন একটা উষ্ণতা, যা মেঘলার নিঃসঙ্গ বিকেলগুলোকে রঙিন করে তুলেছিল।

দিনের বেলায় আকাশ যখন বাইরে যেত, তখন রাইশার সঙ্গেই সময় কাটাতো মেঘলা কখনো ছাদে বসে গল্প করত, কখনো একসঙ্গে চা বানাতো।

বিকেল বেলা ছাদে বসে আনমনে এসব কথা ভাবছিলো সে হঠাৎ আকাশ এসে কোলে করে তাকে নিচে নেমে নিয়ে এলো। মেঘলা ছটফট করছে আর বলছে কি করছেন টা কি কেউ দেখে ফেলবে তো।

- কেউ নেই বাসায় সবাইকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছি । সবাই এখন ফুফির বাসায় গেছে আসতে আসতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগবে । এই সময়টুকু শুধু তোমার আর আমার। ঘরে চলো বেইবি।

আকাশের কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত উষ্ণতা, এক মায়াময় দৃঢ়তা যার জন্য মেঘলার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল ভয়, লজ্জা আর ভালোবাসা একসঙ্গে মিশে এক মধুর অস্থিরতা তৈরি করল।

মেঘলা হাসতে হাসতে বলল আপনি পারেনও বটে এসব করতে ।

- হুম শুধু তোমার জন্য।

আকাশের চোখে এক অদ্ভুত কুয়াশা ভাসছে বিদায়ের কুয়াশা, যেখানে শব্দ হারিয়ে যাচ্ছে, কেবল অনুভূতিই কথা বলছে। নিঃশব্দ ঘরে মেঘলার চোখের কোণে জমে উঠেছে না বলা হাজার কথার জল।

আকাশ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে নরম কণ্ঠে বলল,-জানিনা আবার কবে তোমার সাথে আমার দেখা হবে…

কথাগুলো বলেই সে মেঘলার দিকে এক পা এগিয়ে এলো। মুহূর্তটা যেন থেমে গেল সময়, বাতাস, চারপাশের শব্দ সব নিঃশব্দ হয়ে গেল।

আকাশ আলতো করে মেঘলার মুখ দু’হাতে তুলে নিয়ে তার কপালে এক গভীর,চুম্বন এঁকে দিল।

তারপর ডুবে গেল এক অদৃশ্য, অথচ বিস্তীর্ণ সুখের মহাসমুদ্রে যার গভীরতা মাপা যায় না, শুধু অনুভব করা যায় হৃদয়ের নরম কম্পনে। সেখানে নেই কোনো কোলাহল, নেই বিচ্ছেদের তীব্রতা, নেই পৃথিবীর ব্যস্ততা কিংবা সময়ের বাঁধন। সবকিছু যেন থেমে গেছে এক নীরব প্রশান্তির ভেতর।

সেই মহাসমুদ্রে আছে কেবল এক অনন্ত শান্তি, এক অপার মায়ার ঢেউ যা আস্তে আস্তে তাদেরকে ঘিরে ধরছে। তাদের মনে হচ্ছে, তারা ভাসছে এক নরম আলোয় মোড়া স্বপ্নের জগতে।

মেঘলার চোখের কোণে জমে থাকা জল ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ল, একেকটি অশ্রুবিন্দু যেন তার হৃদয়ের অজানা যন্ত্রণা ও অনুভূতি বহন করছে। প্রতিটি জলবিন্দু তার গালে গড়িয়ে নামছে, যেন সময়ের সঙ্গে মিলেমিশে এক নীরব গান গাইছে যেখানে আছে বিষণ্ণতা, আছে ভালবাসার গভীর স্পর্শ, আর আছে বিদায়ের অদৃশ্য বেদনা।

বিজ্ঞাপন
আকাশ আজ মেঘলা ভীষণ গল্পটি আজেরিন হিরানুর-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প