আকাশ মেঘলাকে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়ার সমস্ত প্রস্তুতি শেষ করেছে। মাত্র বিশ দিনের মধ্যেই যাবার দিন নির্ধারিত হয়েছে। দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই মেঘলার বুকের ভেতর একটা অজানা শূন্যতা জমে উঠছে নিজের মাটি, প্রিয়জন, ছোট্ট পরিচিত জগৎ ছেড়ে একদম নতুন জীবনের পথে পা বাড়ানোর উত্তেজনা আর আশঙ্কা একসাথে তার বুকের ভেতর ঢেউ তুলছে।।
সকাল থেকেই সবাই ব্যস্ত। রাইশা, রবিন আর মেঘলার বাবা একসাথে তাকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত পৌঁছে দিতে এসেছে। গাড়ি থেকে নামতেই ঠাণ্ডা বাতাসের সঙ্গে মিশে থাকা জেট ফুয়েলের গন্ধে মেঘলার বুকটা হঠাৎ করে ভারী হয়ে উঠলো। মনে হলো, প্রতিটা নিঃশ্বাস যেন এক একটা স্মৃতির ভারে নুয়ে পড়ছে।
চেক-ইন শেষে অপেক্ষার ফাঁকে রাইশা বারবার বলছে, সাবধানে থেকো।
রবিন মুখে হাসি রাখার চেষ্টা করলেও চোখের ভেতর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল এক অদ্ভুত কষ্ট যেন কেউ চিরচেনা একটা মুখ হারাতে যাচ্ছে। আর মেঘলার বাবা চুপচাপ দাঁড়িয়ে তার মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন । চোখ দুটো লালচে, ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কিছু বলছেন না।
বিদায়ের মুহূর্তে মেঘলা একে একে সবাইকে জড়িয়ে ধরলো। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু লুকোতে চাইলেও তা গাল বেয়ে নেমে এল নিঃশব্দে।
তারপর ঘোষণা এলো ,বোর্ডিং শুরু হয়েছে।
প্লেনের ধাতব সিঁড়িতে প্রথম পা রাখতেই মেঘলার বুকের ভেতর কেমন একটা অচেনা কাঁপুনি বয়ে গেল। যেন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পা বাড়ানো নয়, বরং এক পরিচিত জীবনের সমাপ্তি আর এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে।
দীর্ঘ যাত্রা শেষে মেঘলা আমেরিকার বুকে পা দিতেই তার ভেতর এক সুন্দর অনুভূতি বয়ে গেল।
মনে মনে ভাবলো সবাই কতো চেষ্টা করার পরেও এখানে আসতে পারে না আর আমি না চাইতেই চলে এলাম হাজার মানুষের স্বপ্নের শহর ক্যালিফোর্নিয়ায় ।
প্লেন থেকে নামতেই ক্যালিফোর্নিয়ার ঠান্ডা হাওয়া মেঘলার মুখে এসে লাগল। আকাশে রোদের ঝিলিক, কিন্তু বাতাসে হালকা শীতের ছোঁয়া। চারপাশে ছুটে চলেছে গাড়ি, ট্রলির শব্দ, মানুষের হাঁটাচলা—সবকিছুই যেন এক নতুন জীবনের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। প্লেনের ক্লান্তি সত্ত্বেও মেঘলার বুকের ভেতরটা উত্তেজনায় কাঁপছিল, কারণ এটাই ছিল তার জীবনের প্রথম বিদেশ যাত্রা।
সুটকেস টেনে নিয়ে একটু পাশে দাঁড়াতেই সে ফোন বের করে আকাশ কে ফোন দিলো।
-হ্যালো আকাশ, আমি নেমে গেছি।
ওপাশ থেকে আকাশের হাসি ভেসে এল,
-বিশ মিনিট অপেক্ষা করো জানপাখি, আমি আসছি।
এই বলে ফোনটা কেটে দিলো আকাশ।
মেঘলা মোবাইলটা ব্যাগে রাখতেই পাশে হঠাৎ এক মেয়ে এসে দাঁড়ালো। মেয়েটার স্বর্ণাভ চুলে হালকা ঢেউ খেলছে, চোখে কালো সানগ্লাস, পরনে লাইট ব্লু ডেনিম আর সাদা টপ।দেখতে যেন সিনেমার নায়িকা। মেয়েটি মেঘলার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে ইংরেজিতে বলল,
-Hi! Can we be friends?
সরল-সোজা মেঘলা একটু লজ্জা পেয়ে মাথা নেড়ে বললো, --হুম, অবশ্যই।
মেয়েটা এবার হেসে উঠলো, দাঁতগুলো যেন মুক্তোর মতো ঝলমল করছে। সে আঙুল দিয়ে দূরের রাস্তার দিকে দেখিয়ে দিয়ে বললো
-Let’s go that way, Such a beautiful place! Let’s enjoy!
মেঘলা রাজি হয়ে গেল। দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। রাস্তার দুই পাশে উঁচু উঁচু নারকেল গাছের মতো লম্বা পাম ট্রি, বাড়িগুলো যেন ছবির মতো সাজানো । সাদা দেয়াল, ফুলে ভরা বাগান, জানালায় রঙিন পর্দা। দূরে সোনালি রোদে চকচক করছে ক্যালিফোর্নিয়ার পাহাড়ি ঢাল।
মেয়েটা হেসে গল্প করতে করতে মেঘলাকে এমনভাবে মুগ্ধ করে ফেলল যে আকাশের কথা প্রায় ভুলেই গেল মেঘলা। হঠাৎ খেয়াল করল তারা এয়ারপোর্ট থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে। মেঘলা বলল,
-আমার হাসব্যান্ড আসবে, ও হয়তো এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করছে…
কিন্তু মেয়েটা যেন কিছু শুনছেই না। বারবার বিষয় বদলে হাসছে, মাঝে মাঝে মেঘলার চোখের দিকে গভীরভাবে তাকাচ্ছে।
একসময় তারা একটা শান্ত, নিস্তব্ধ এলাকায় এসে পৌঁছাল। রাস্তার দু’পাশে বড় বড় ভিলা, সবগুলোয় লোহার গেট, নাম লেখা ফলক, কিন্তু আশপাশে আশ্চর্য নীরবতা। মেয়েটা একটা কালো গেট খুলে বলল,
-This is my home. Come in! Just one cup of coffee, then I’ll drop you to your husband.
মেঘলার বুকের ভেতর কেমন অজানা ভয় জেগে উঠল। বাড়িটা অদ্ভুত নিরব, যেন কেউ থাকে না এখানে। দেয়ালে বড় বড় ছবি, নরম সোফা, ঘরে হালকা ল্যাভেন্ডার গন্ধ সবকিছুই অতিরিক্ত নিস্তব্ধ।
মেয়েটি রান্নাঘরে চলে গেল। মেঘলা বসে চারদিকে তাকাতে লাগল এক কোণে কালো পিয়ানো, দেয়ালে সাদা পর্দা দুলছে, জানালা দিয়ে ঢুকছে সূর্যের শেষ রশ্মি। ঠিক তখনই মেয়েটি ফিরে এলো দুটো কাপ হাতে নিয়ে।
একটা মগ মেঘলার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সে বলল, -Here’s your coffee.
মেঘলা ধীরে ধীরে কাপটা হাতে নিল। কফির গন্ধটা অদ্ভুতভাবে মিষ্টি আর ঘন লাগছে আজ । সবেমাত্র মেঘলা কফির কাপে চুমুক দিতে যাবে ঠিক সেই মুহূর্তে মেয়েটি হঠাৎ তার দিকে ঝুঁকে এসে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল
-Do you like lesbians?
মেঘলার হাত কাঁপতে শুরু করলো, কাপের ভেতর কফি ছলকে পড়ে গেল সাদা টেবিলক্লথে। তার বুকের ভেতর ঢেউয়ের মতো একটা ভয় আর অচেনা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়লো। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল…
-কি বললে তুমি?
মেয়েটা এগিয়ে এসে মেঘলার হাতের ওপর নিজের আঙুল রাখল। তার চোখে একধরনের তীক্ষ্ণ, অদ্ভুত উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে পড়েছে। মেয়েটা নরম গলায় বলল-
-Relax, sweet girl, তুমি ভয় পাচ্ছো কেন? আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম… তুমি কি লাইক করো?
মেঘলা তৎক্ষণাৎ হাতটা টেনে নিল।
-না! আমি এগুলো পছন্দ করি না ।আমি আমার স্বামীর জন্য অপেক্ষা করছি। আমাকে যেতে দাও।
মেয়েটি হেসে উঠল ! হাসতে হাসতে বলল
-Oh, sweetheart, তোমার husband এখন অনেক দূরে। তুমি এখন আমার সঙ্গে…
বলার আগেই মেঘলা উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে দৌড় দিল। কিন্তু দরজাটা ভেতর থেকে লক করা।
মেয়েটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো, তার হাতে ঝুলছে একটা ছোট চেইন যেন নরম খেলনার মতো, কিন্তু চোখে কামনার আগুন জ্বলছে। মেয়েটা মেঘলার কাছে এসে বললো
-Don’t scream. I just want you close to me…
মেঘলা চিৎকার করে উঠল -আকাআআআআশ!
তার গলার আওয়াজ নিস্তব্ধ ঘরে প্রতিধ্বনি হয়ে নিজের কাছেই ফিরলো।
মেয়েটা তখন হঠাৎ এমন এক ক্ষিপ্ততায় ফেটে পড়ল, যেন বহুদিনের জমে থাকা রাগ এক মুহূর্তে বিস্ফোরিত হয়েছে। চোখ দু’টো লাল হয়ে জ্বলে উঠেছে, শ্বাস দ্রুত ওঠানামা করছে। সে ঝটকা মেরে মেঘলার কাঁধ চেপে ধরলো আঙুলের চাপ এতটাই শক্ত যে মেঘলার মনে হলো যেন হাড় পর্যন্ত দমচাপা পড়ে যাচ্ছে।
পরের মুহূর্তেই মেয়েটা তাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল সোফার দিকে। মেঘলার পা মেঝেতে পিছলে যাচ্ছে, সে প্রাণপণে হাত-পা ছুঁড়ে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। তার চুল এলোমেলো হয়ে মুখের ওপর ঝুলে পড়েছে, কপালে ঘাম চিকচিক করছে। আতঙ্কে বুক ধড়ফড় করছে প্রতিটি শ্বাস যেন গলা আটকে আসছে।
মেঘলা কাঁপা কণ্ঠে “ছাড়ো… দয়া করে ছাড়ো…” বলতে চাইছে, কিন্তু কণ্ঠ বেরোচ্ছে না। শরীরটা একদম অসহায় হয়ে পড়েছে। সোফার গা ঘেঁষে টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় তার হাঁটু মেঝেতে ঠেকে তীব্র ব্যথা লাগল, তবু মেয়েটার হাতের শক্ত থাবা একটুও আলগা হলো না বরং আরও আঁকড়ে ধরে কাছে টেনে নিচ্ছে, যেন কোনো অদৃশ্য বাসনা তাকে গ্রাস করেছে।
মেঘলা জানালার দিকে ছুটে গিয়ে জোরে ধাক্কা দিল, কিন্তু কাচটা নড়ল না।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে এক গাড়ির ব্রেকের তীব্র শব্দ শোনা গেল।
তারপর দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়ে আকাশ বলল-
মেঘলা! দরজা খোলো! আমি আকাশ!
মেয়েটি ঘুরে তাকানোর আগেই দরজার তালাটা ভেঙে পড়ল, আকাশ দৌড়ে ঢুকে পড়ল ঘরে।
তার চোখে আগুন জ্বলছে মুখে রক্তচাপা রাগ। মনে হচ্ছে এখনি মেয়েটাকে চি'বি'য়ে খা'বে
মেঘলা আকাশের দিকে দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
-আকাশ! ও আমাকে যেতে দিচ্ছিল না…
আকাশ এক মুহূর্ত দেরি না করে মেয়েটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
-Who the hell are you? আকাশ গর্জে উঠল।
মেয়েটি তীক্ষ্ণ হাসি দিয়ে বলল “She wanted to be my friend… I was just showing her some love.
আকাশ আর শুনল না, মেঘলাকে নিজের পিছনে সরিয়ে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে বলল,
-Stay away from my wife! একটু দাঁড়াও তোমার ব্যাবস্থা আমি করছি।
তারপর মেঘলার হাত শক্ত করে ধরে বাইরে বেরিয়ে এল।
রাস্তার বাতাসে ঠান্ডা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে, কিন্তু মেঘলার শরীর কাঁপছে ভয়ে, চোখ ভিজে যাচ্ছে অশ্রুতে।
আকাশ তার মুখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
-সব ঠিক আছে জানপাখি, আমি আছি তোমার পাশে কেউ তোমাকে আর আঘাত দিতে পারবে না
মেঘলা শুধু নিঃশব্দে তার বুকে মুখ লুকিয়ে রাখল।
দূরে সূর্য ডুবছে, আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে কমলা আলো, আর তাদের নিঃশব্দ আলিঙ্গনে মিশে আছে অজানা ভয়ের পর এক বিশাল শান্তি।