মেঘলা দৌড়ে ছাদ থেকে নেমে এল, যেন পায়ের তলার মাটি হারিয়ে ফেলেছে। শ্বাসটা অস্থির, বুকের ভেতর ধুকপুক ধুকপুক শব্দটা যেন সারা দালানজুড়ে প্রতিধ্বনি তুলে চলেছে। নিজের রুমে ঢুকেই কাঁপা হাতে দরজাটা ঠেলে বন্ধ করল, তারপর ধপ করে পিঠটা ঠেকিয়ে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। চোখের সামনে সব ঝাপসা ,ঘরের আলোটা আজ কেন এত নিস্তেজ লাগে?
চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে, বুকের ভেতর জমে থাকা ব্যথা যেন হঠাৎ কোনো বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকে মেঘলা ফিসফিস করে বলল -
আকাশ ভাইয়া… যদি সত্যিই অন্য কাউকে বিয়ে করতে চান, তবে কেন বলুন তো, কেন এই একদিনেই আমার মনে বসন্ত এনে আবার তীব্র শীতের রুক্ষতা ঢেলে দিচ্ছেন? কেন আমার ভেতরে এমন অদ্ভুত আলোড়ন তুললেন? কেন আপনার স্পর্শে, আপনার চোখের সেই এক ঝলকে আমার বুকের প্রতিটা কোণ যেন আপনার দখলে চলে গেল? কেন আপনি আমার মনটা এলোমেলো করে দিলেন? কেন?
এত অল্প সময়ে আমার পুরোটা জুড়ে আপনার রাজত্ব হলো কীভাবে? কেন এমন হলো? কেন… কেন… কেন?
দুমুঠো চুল মুঠো করে টেনে ধরল সে, চোখ বেয়ে নীরব অশ্রু ঝরছে। ঘরটা নিস্তব্ধ, কিন্তু মেঘলার বুকের ভাঙা শ্বাস আর হৃদয়ের কান্না যেন পুরো পৃথিবী জুড়ে তীব্র, বেদনাভরা আওয়াজ তুলছে।
মেঘলা জানে না সময়ের খেলায় প্রেম কখন ঢুকে পড়ে… শুধু জানে, আকাশের নাম আজ তার বুকের মধ্যে আগুনের মতো জ্বলে উঠছে।
বলুন আকাশ ভাইয়া…কেন? কেন এত অনুভূতি জাগিয়ে আমার জগতে ঝড় তুললেন ?
যখন আপনি জানেন ,আপনি আমার হবার নন?
আমি জানতে চাই…এতো প্রশ্নের উত্তর কি আপনার কাছে নেই? নাকি আপনি শুধু নীরবতাকেই উত্তর বানিয়ে নিয়েছেন?
কান্না করতে করতে চোখের পানি যেন অনেক আগেই ফুরিয়ে গেছে,চোখদুটো এখন শুকনো মরুভূমির মতো,
লাল আর জ্বালাপোড়া করছে। তবুও কান্না থামছে না মেঘলার। শব্দ নেই, অশ্রু নেই,কিন্তু বুকের ভেতর হাহাকারটা এমন হয়েছে যেন হাজারটা নদী গর্জন তুলে বইছে।
শ্বাস নিতে গেলেই বুকের ভেতর ধরফর করে ওঠছে যন্ত্রণায়। গলা এতটাই ভারী হয়ে আছে যেন কেউ শক্ত করে চেপে ধরেছে।
প্রতিটি মুহূর্তে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে মেঘলাকে।
এই কষ্টের কোনো ভাষা নেই,কোনো সান্ত্বনা নেই,
শুধু আছে নিজের ভিতরের ভাঙাচোরা আর হারিয়ে যাওয়া শান্তির নিঃশ্বাস।
অপরদিকে আকাশ দাঁড়িয়ে আছে ছাদের নির্জনতায়। রাতের আকাশ মেঘলা-বিহীন, তবুও তার বুকের ভেতর যেন হাজার মেঘ জমে আছে। একটার পর একটা সিগারেট জ্বালিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে দিচ্ছে সে ।ধোঁয়ার ধূসর রেখার সাথে যেন নিজের অস্থিরতা, নিজের অপরাধবোধকেও মিলিয়ে দিতে চাচ্ছে।
ঠোঁটের কোণে সিগারেট, চোখ দুটো লালচে, তবুও সেই চোখে আছে এক অদ্ভুত কঠোরতা আর গভীর, অদ্ভুত আকুলতা।
-মেঘলা আমি তো তোমার ভালোবাসার পরিক্ষা নিচ্ছি । তুমি সেটা বুঝতে পারছো না? এই যেমন নিজে থেকে আমার কাছে এসে বললে তুমি আমাকে ভালোবেসে ফেলেছো। এটাই তো আমি চেয়েছিলাম, তুমি নিজে থেকে আমার কাছে আসো।
আজকে একটু কষ্ট করো জানপাখি কালকে আমি তোমাকে আমার করে নিবো দেখে নিও । এই আকাশ শুধু তোমার হবে । শুধুই তোমার ।
মনে মনে কথাগুলো বলে ছাদ থেকে নেমে এলো আকাশ।
__
-বাবা আজকে সকালের পরিবেশটা একটু বেশিই সুন্দর তাইনা ।
আফজাল ভুঁইয়া ছেলের কথায় সম্মতি দিয়ে বললো নিজের জন্মভূমি বলে কথা সুন্দর তো হবেই ।
বাবা ছেলে সকাল সকাল হাঁটতে বেরিয়েছে। আমেরিকাতেও বাবা ছেলে এমন করতো ।
- এই সুন্দর সকালে তোমাকে একটা সুন্দর প্রস্তাব দিতে চাই বাবা । তুমি সম্মতি দিলে ভালো না দিলে আরো ভালো ।
-কি বলবে বলো ।
-বাবা আমি তোমার ভাতিজিকে অর্থাৎ মেঘলাকে বিয়ে করতে চায় । আর সেটা আজকেই।
আফজাল ভুঁইয়া সেখানে দাঁড়িয়ে গেলেন ।
আকাশের কথায় খুশি হলো নাকি রাগ করলো কিছু বুঝতে পারছে না আকাশ ।
-এমন বেপরোয়া ভাবে তো কখনো কথা বলো নি তুমি ।
-প্রেমে পড়লে সবাই বেপরোয়া হয়ে যায় বাবা ,আর সেটা যদি হয় জীবনের প্রথম বসন্ত ।তাহলে তো কোন কথাই নেই।
-তোমার এই শিশুসুলভ কথা আমার মোটেই পছন্দ হচ্ছে না আকাশ । আজকে তো মেয়ে দেখতে যাওয়ার কথা । কিন্তু তুমি অন্য কথা বলছো কেন ?
-বাবা আমি যেটা বলছি সেটাই করবো । আমি শুধু আপনাকে জানিয়ে দিলাম । এখন সিদ্ধান্ত আপনার ,আমরা কি পালিয়ে যাবো নাকি চাচ্চুকে ম্যানেজ করে পারিবারিকভাবে বিয়েটা দিবেন ।
আফজাল ভুঁইয়া একদিকে খুশি হলেন কারন ছেলের সাথে ভাইয়ের মেয়ের বিয়ে হলে তাদের ভাই ভাই সম্পর্কটা আরো জোড়ালো হবে । কিন্তু আজিজুল কি রাজি হবে আমার প্রস্তাবে?
মনে মনে বললো দেখি একবার কথাটা বলেই দেখি ।
মেঘলা তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কলেজের জন্য রেডি হচ্ছিল। সাদা ড্রেস পরে চুলগুলো আঁচড়াচ্ছে, তবু যেন চুলের ফাঁকে ফাঁকে আকাশের ছায়া লুকিয়ে আছে। মুখে হালকা পাউডার, চোখে ক কাজল টানল কিন্তু চোখদুটো আজও একটু ফোলা, রাতের কান্নার ছাপ যেন ঠিকমতো মুছতে পারেনি।
ব্যাগটার চেইন টানতে টানতে নিজের চোখের দিকে তাকাল আবার।
- আজ মন খারাপ করে ঘরে বসে থাকলে চলবে না। বাইরে গেলে, বান্ধবীদের সাথে হাসি-ঠাট্টা করলে হয়তো মনের এই দমচাপা ভারটা কমবে।
তার হৃদয়টা কেমন ভারী লাগছে, তবুও নিজের মনকে জোর করে সামলে নিচ্ছে।
-কলেজেই যাই আজ… আকাশের কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে।
মনে মনে যেন নিজেকেই আদেশ দিল সে।
বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই সকালের রোদ গায়ে পড়ল। কিন্তু সেই উষ্ণতা মেঘলার বুকের ঠাণ্ডা ভাবটা গলাতে পারল না।
ব্যাগটা কাঁধে তুলে দরজার দিকে এগিয়ে যেতেই আকাশ মেঘলার হাত ধরে ফেলল । পিছনে তাকিয়ে আকাশকে দেখে রাতের কথা মনে পড়তেই আকাশের থেকে হাত ঝাড়ি দিয়ে ছাড়িয়ে নিলো ।
-কেন এসেছেন আমার কাছে ? আমি আসতে বলেছি আপনাকে? খবরদার আমার আশেপাশে আসবেন না চলে যান এখান থেকে ।
-যাবো একবারে যাবো কিন্তু তোমাকে সাথে নিয়েই যাবো।
আকাশের কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারলো না মেঘলা । ভ্যাবলার মত কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হনহনিয়ে রাস্তার দিকে হাঁটা ধরলো।