মিমকে বিদায় দেওয়া হয়েছে অনেকক্ষণ হলো।
অনেক আত্মীয় স্বজন চলে গেছে । যারা একেবারে নিকটাত্মীয় শুধু তারাই রয়ে গেছে ।
বাড়িটা ভরা, তবুও আজ কেমন শুনশান।
মিমের হাসি, তার ছুটোছুটি, তার খিলখিল আওয়াজ সব যেন হঠাৎ করেই বাড়ির দেয়ালের ভেতর থেকে হারিয়ে গেছে।
শুধু থেকে গেছে তার বিদায়ের প্রতিধ্বনি আর অদ্ভুত এক শূন্যতা, যা সবাইকে নীরবে গিলে খাচ্ছে।
মেঘলা শাড়ি চেঞ্জ করে ব্ল্যাক কালারের একটা নরমাল থ্রিপিস পড়েছে। ফর্সা শরীরে জামাটা দারুন মানিয়েছে ।
মনোয়ারা বেগম ডিনার করার জন্য মেয়েকে ডেকেছে তাই বাইরে আসতে হয়েছে নয়তো আসতো না । কারন সে আর আকাশের মুখোমুখি হতে চায় না ।
কিন্তু সেটা আর হলো না , কথায় আছে না - যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়। মেঘলারও ঠিক তাই হলো । খাবার টেবিলে একদম আকাশের মুখোমুখি বসতে হলো। আকাশ ইচ্ছে করেই রবিনকে সরিয়ে দিয়ে মেঘলার মুখোমুখি বসেছে । আর রবিনকে বসিয়েছে মেঘলার খালাতো বোন স্বর্ণালীর পাশে।
বাড়ির সবাই আজ একসাথে খেতে বসেছে ।
মনোয়ারা বেগম আর রেখা বেগম খাবার পরিবেশন করছে । রেখা বেগম মেঘলার প্লেটে মাছের মাথা দিতেই পাশ থেকে আকাশ বলল- মা মাছের মাথা মেয়েদের নয় ছেলেদের খাওয়াতে হয় ।
রেখা বেগম আকাশের দিকে একটু রাগী চোখে তাকিয়ে বলল - এর কি কোন বিশেষ কারণ আছে?
ভাত চিবুতে চিবুতে আকাশ বলল - হুম মা এটা বাঙালি সংস্কৃতি।
- তোকে আমি এজন্য আমেরিকায় পড়াশোনা শিখিয়েছি?
হটাৎ করে আহেরজান বিবি বলে উঠলো - এতো বছরেও বিয়ে না করা ছেলের মাছের মাথা খাওয়ার কোন অধিকার নেই ।
আরাফিয়া দাদির সাথে সম্মতি দিয়ে বললো তুমি ঠিক বলেছো দাদিমা , খুব তাড়াতাড়ি আমার ভাইটাকে বিয়ে দিতে হবে ।
- দাদিমা আমি বলছি না মনের মতো মেয়ে পেলে তবেই বিয়ে করবো ।এই বলে আকাশ মেঘলার দিকে তাকালো ।
রেখা বেগম সবার উদ্দেশে বললেন আপনারা মেয়ে খুঁজুন । আমাদের হাতে আর এক সপ্তাহ সময় আছে এর মধ্যে আমাদের চলে যেতে হবে । আমি ভাবছি ওকে বিয়ে দিয়ে বউ সহ নিয়ে যাবো আমেরিকায়।
আফজাল খান সহ বাকি সবাই রেখা বেগমের কথায় সম্মতি দিলেন ।
মেঘলার ফুফি রেখা বেগমকে বলল- ভাবী আমার ননদের মেয়ে আছে । ভীষণ সুন্দরী একদম পরির মত আপনারা চাইলে একবার দেখে আসতে পারেন । আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি মেয়ে আপনাদের পছন্দ হবে । আকাশের সাথে মানাবে ভালো ।
এদের এসব কথা শুনে মেঘলা ভাত রেখে উঠে চলে গেল ।
-কিরে মা এভাবে ভাত রেখে উঠে যাচ্ছিস কেনো । সারাদিন তো কিছুই মুখে দিসনি ।রাতেও উপোস করে থাকবি?
মনোয়ারা বেগম মেয়ের কাছে এসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল।
মেঘলা মাকে জরিয়ে ধরে বললো মা আমার খিদে নেই । আমি খাবো না । এই বলে নিজের রুমে চলে গেল।
-ইয়েএএএএস!
মনে মনে যেন হাজারটা রঙিন আতশবাজি ফাটল আকাশের বুকে।
মেয়ে তোমাকে প্রেমের বাতাস লেগেছে । তাই তুমি এমন করছো । তবে এটা খুবই ভালো । আমি তোমাকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত আছি । তুমিও তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে যাও এই আকাশের মাঝে হারিয়ে যাওয়ার জন্য।
আকাশ তোর জীবনে প্রেম সত্যিই আসছে…
আকাশ মনে মনে বললো ।
এই বলে খাবার টেবিল থেকে উঠে যেতে নিলেই আফজাল ভুঁইয়া বললো দাঁড়াও আকাশ ।
আকাশ দাঁড়িয়ে গেল ।- বলো বাবা কি বলবে তারাতাড়ি বলো ।
-এখন তোমার এতো তাড়া কিসের? বসো তোমার সাথে কথা আছে ।
-না বাবা তেমন কিছু না।
-তোমার ফুফি যেটা বললো আমি কি সেদিকে এগুবো?
- তোমাদের যেটা ভালো মনে হয় তোমরা সেটাই করো বাবা ।
-ঠিক আছে তাহলে আমরা আগামীকাল মেয়ে দেখতে যাই কি বলো?
-কিন্ত বাবা এতো তাড়াতাড়ি?
পাশ থেকে আকাশের ফুফি বলল- শুভ কাজে দেরি করতে নেই আকাশ , যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়েটা হয়ে গেলেই ভালো ।
-ঠিক আছে। তাহলে কালকেই চলো মেয়ে দেখতে । কিন্তু বাবা আমার একটা শর্ত আছে ।এবাড়ির সবাইকে নিয়ে যাবো মেয়ে দেখতে।
-কিন্ত এতো মানুষ মেয়ে দেখতে গেলে সবাই কি ভাববে বলো তো?
-আমি কোন এক্সকিউজ চাইনা বাবা!
-আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে তাই হবে।
এই বলে সে নিজের রুমে চলে গেল ।
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থেকে মেঘলা সবটাই শুনলো ।
মিনিটখানেক তার শ্বাসই যেন ঠিকমতো চললো না।
চোখের ভেতর হঠাৎ করেই কেমন জানি ঝাপসা জল উঠে এলো।যেন কেউ ভেতরের নীরব জলাধারে বড় বড় ঢেউ ছুঁড়ে দিয়েছে।কালই মেয়ে দেখতে যাবে…?
শব্দটা বারবার কানে বাজছে।মনের ভেতর হাহাকারের মতো কিছু ছুটে বেড়াচ্ছে।
রাত তখন প্রায় বারোটার কাছাকাছি। বাড়ির সবাই ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমিয়েছে।
কিন্তু ঘুম নেই শুধু দুই মানব মানবীর চোখে। তাদের মনটা যেন আজ অস্থিরতায় জ্বলে উঠেছে। প্রত্যেক মুহূর্তে তারা অনুভব করছে অদ্ভুত এক টান, নিঃশব্দ তবু বজ্রের মতো তীব্র।
মেঘলা দৌড়ে ছাদে গেলো। ছাদের ওপর এক পা ফেলতেই পুরুষালি কন্ঠ শুনে থমকে গেল।
-এতো রাতে ঘুমাওনি কেন ।
আরেকটু সামনে এগিয়ে যেতেই সিগারেটের তীব্র গন্ধে নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো মেয়েটার।
আস্তে করে বললো - আপনি সিগারেট খান আকাশ ভাইয়া?
-রোজ খাইনা তবে যখন ভীষণ মন খারাপ হয় তখন খাই।
-আপনার তো মন ভালো থাকার কথা কালকে মেয়ে দেখতে যাবেন ।
-তুমি কি করে জানলে আমি মেয়ে দেখতে যাবো ? তুমি তো ঘরে ছিলে ।
-বাদ দিন ঐসব কথা । কালকে কেন আমার সাথে এমন আচরন করলেন ?
-এমনি।
-এটা কোন উত্তর নয় আকাশ ভাইয়া । আপনি আমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিন।
-ভালো লেগেছিলো তাই এমন করছি ।
-কিসের ভালো লাগা ? ভালোলাগলেই কাছে টেনে নিবেন আর তারপর দূরে সরে ফেলে দিবেন । এটা কেমন কথা আকাশ ভাইয়া।
- আমাকে আমার মত করে থাকতে দাও । আমি তোমার কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবো না ।
ঠিক আছে আমি চলে যাচ্ছি । আর কখনো আপনার সামনে আসবো না আকাশ ভাইয়া কখনোই না । কিন্তু যাবার আগে একটা কথা বলে যাচ্ছি । এই অষ্টাদশী মেয়েটা আপনার প্রেমে পড়েছে আকাশ ভাইয়া । যখন আমি আপনাকে প্রথম দেখেছি তখনই আপনার প্রেমে পড়ে গেছি । আর আপনি কালকে যাবেন অন্য মেয়ে দেখতে, আমাকে কি আপনার আপন মনে হয় না আকাশ ভাইয়া? যদি ভালো নাই লাগে তাহলে কালকে এমন করলেন কেন ? প্রশ্ন রেখে গেলাম আশা করি উত্তর পাবো ।
-তুমি তো আর আমার সামনে আসবে না বললে তো উত্তর কি কবুতরের মাধ্যমে দিবো?
-আপনি মজা করছেন । আর আমার অন্তরে কষ্টের ঝড় বইছে।
-এতো প্যারা নিচ্ছেো কেনো ? এখন গিয়ে ঘুমাও তো।