রাইশা এবার চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলো না । তেড়ে এসে রবিনের শার্ট এর কলার ধরে বললো - আমি থার্ড ক্লাস? আমি যদি থার্ড ক্লাসই হই তাহলে এক বছর ধরে আমার পেছনে পেছনে ঘুরছেন কেন আপনি বলুন?
নিজের চাচাতো বোনের অপহরণের কথা শুনে ঠিক থাকতে পারছেন না, আর অন্যের বোনকে এরকম হয়রানি করতে খুব মজা লাগে তাইনা? আপনি কি ভুলে গেছেন যে আমারো একটা ভাই আছে । আমিও কারো বোন ।
আর কি যেন বলছিলেন! আপনার বোন বিপদে পড়েছে তাকে আগে উদ্ধার করতে হবে ।। আজকে আমার সাথে বসতে পারবেন না। তাই না?
তাহলে শুনুন - রোজ রোজ অসুস্থ মাকে ঔষধ খাইয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ভার্সিটিতে আসি । ক্লাস শেষ হওয়া মাত্রই আবার চলে যাই বাসায় । না জানি মা আমার কি করছে এই চিন্তায় আমার মাথার ভেতর সবসময় হয় । কোন দিকে তাকানোর ফুরসৎ হয় না আমার ।
এই এক বছরে কতো শত বার আমি আপনাকে বলেছি যে আমাকে দিয়ে প্রেম হবে না । দূরে থাকুন আমার থেকে । তবুও কেন আমার পিছু ছাড়ছেন না?
মনের মাঝে এতো কষ্ট মাথায় এতো এতো দুশ্চিন্তা নিয়ে কি করে আমি প্রেমে মজে যাই বলুন?কেমন করে হৃদয়কে শান্ত করি,
যেখানে শিরায় শিরায় অনিশ্চয়তা আর অবিশ্বাসের কাঁটা বিঁধে থাকে?
রাইশার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরছে।এমনভাবে, যেন কেউ ভিতরে লুকানো ব্যথার বাঁধটা হঠাৎ খুলে দিয়েছে।
তার দীর্ঘ পাপড়িগুলো ভিজে ভারী হয়ে গেছে,
একা একা কাঁপা কাঁপা শ্বাসে বুকটা ওঠানামা করছে।
চোখের কোণ থেকে গাল বেয়ে নেমে আসা জলফোঁটাগুলো মাটিতে পড়ে ছোট ছোট দাগ রেখে যাচ্ছে,যেন প্রতিটা ফোঁটা তার ভাঙা স্বপ্নের সাক্ষী।
ঠোঁট দুটো কাঁপছে ঠিকমতো শব্দও বেরোচ্ছে না কেবল এক গভীর, দমবন্ধ করা নিঃশ্বাস,যার মধ্যে আছে হাজার বছরের ক্লান্তি,আর বুকের ভেতর জমে থাকা অপার একাকীত্বের চিৎকার।
রাইশা চোখ মুছতে চাইলেও পারছে না,হাত উঠিয়ে আবার নামিয়ে নিচ্ছে ।কারণ চোখের জল থামছে না
বরং প্রতিটা মুহূর্তে যেন আরও ঝড়ের মতো বাড়ছে,
ঠিক যেন তার ভিতরের ভাঙাগুলো আজ আর লুকিয়ে রাখতে চায় না।
-তোমার মা অসুস্থ সেটা আমাকে আগে বলো নি কেন রাইশা?
- বললে কি করতেন? আমার অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার দায়িত্ব নিতেন । কখনোই না ।
এতো কথা বলতে চাইনি রবিন। তবুও অনেক কথা বলে ফেললাম । পারলে আমাকে মাফ করে দিবেন কারন আমি আপনাকে মিথ্যা কথা বলেছি । আজকের পর থেকে আর কখনও আমার সামনে আসবেন না।
এই বলে দ্রুত পায়ে গিয়ে একটা রিকশায় উঠলো।
রবিন সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল । এই প্রথম করো কষ্ট সে উপলব্ধি করতে পারছে । ছোট বেলা থেকেই বেপরোয়া স্বভাবের ছেলেটা আজ । নিজেকে রাইশার জায়গায় দাড় করিয়ে তার কষ্ট বোঝার চেষ্টা করছে।
_______
মেঘলা মা সকালেও না খেয়ে বেরিয়েছিস। এখনো কিছু খাচ্ছিস না কেন? শরীর খারাপ করেছে নাকি?
মনোয়ারা বেগম মেয়ের কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে কথাগুলো বলল।
-না মা তেমন কিছু না।
-মারে তোকে একটা কথা বলবো ।
-কি বলবে মা তুমি আমাকে?
-একটা ছেলে তোকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে মা । আমরা বলেছি তুই রাজি থাকলে বিয়েটা হবে।
ওরা আজকেই ঘরোয়া ভাবেই বিয়েটা সম্পন্ন করতে চায় তুই কি এই বিয়েটা করবি মা মেঘলা?
বিয়ের কথা শুনে মেঘলার মনের ভেতর আকাশের মুখটাই আগে ভেসে উঠলো ।
সে আকাশ কে কি করে ভুলে থাকবে।
তবুও রাগ করে বলে দিলো আমি আজকেই বিয়ে করবো মা । তোমরা কথা বলো ।
মনোয়ারা বেগম খু্শি মনে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ।
কিন্তু মেঘলার মনের আকাশে আজ মেঘ জমেছে কখন যে বৃষ্টি হয়ে নামবে বলা মুশকিল।
আকাশকে সে অনেক কথা বলতে চেয়েছিলো কিন্তু সেগুলো আর কিছুই বলা হলো না ।
মনে মনে ভাবলো রাগ করে তো বিয়েতে রাজি হয়ে গেলাম কিন্তু ছেলেটাকেই তো দেখা হলো না । একটা কথা আমার বুঝে আসছে না ,মা বাবা হটাৎ করে আমার বিয়ে ঠিক করলো কেন ? আমি কি তাদের কাছে বোঝা হয়ে গেছি ? আবার একমন বলছে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে সেটাই ভালো হচ্ছে অন্তত আকাশ কে তো ভুলতে পারবো। এটাই যথেষ্ট।
সূর্য তখন পশ্চিমের আকাশে ধীরে ধীরে রক্তিম রেখা ফেলে অস্তমিত হচ্ছে। সোনালি আলোটা ছড়িয়ে পড়ে পুরো আকাশটাকে যেন গোধূলির ক্যানভাসে রঙ করে দিচ্ছে। হালকা বাতাসে চারপাশের গাছগুলোর পাতা কাঁপছে, পাখিরা দল বেঁধে বাসায় ফিরছে।
মেঘলা চুপচাপ ছাদের এক কোণে বসে আছে। তার চোখের সামনে আকাশের রঙ পাল্টে যাচ্ছে, অথচ তার ভেতরের রঙ যেন আরও নিভে যাচ্ছে। ঠোঁট কামড়ে নিজের কষ্টটা চেপে রাখতে চাইছে, কিন্তু চোখের কোণায় জমে থাকা পানিটা তাকে বারবার প্রতারণা করছে।
মনে মনে ভাবছে আজ সূর্যটা যেমন নেমে গেল, আমার মনেরও সব আলো নিভে যাবে আজ রাতেই।
দূর থেকে আজান ভেসে আসছে, সেই সুরের সাথে অদ্ভুত একটা বিষাদ মেশা। মনে হয়, পুরো পৃথিবীটা আজ তার দুঃখটুকুই বুঝতে পেরেছে… শুধু যার জন্য অপেক্ষা, সে ছাড়া।
হঠাৎ পেছন থেকে হালকা শব্দে মেঘলার ধ্যান ভেঙে গেল। মনে হলো কেউ খুব চাপা পায়ে হাঁটছিল, কিন্তু বাতাসহীন ছাদের নীরবতায় সেই শব্দটা যেন বজ্রপাতের মতো কানে লাগল। মেঘলা ধীরে ধীরে ঘুরে তাকালো।
পিছনে তাকিয়ে দেখে আকাশ দাঁড়িয়ে আছে । চোখ মুছে । ছাদ থেকে নেমে আসতেই পিছনে থেকে পুরুষালি কন্ঠ শুনে মেঘলার বুক কেঁপে উঠলো।
-তাহলে ফাইনালি বিয়েটা করে নিচ্ছো ?
মেঘলা ছোট করে বলল- হুম।
-বিয়েটা আমাকে করা যেত না?
-না
-কেন
-সব কেনর উত্তর মেলে না আকাশ ভাইয়া।
এই বলে সে ছাদ থেকে নেমে চলে গেল।
আকাশ ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি দিয়ে বলল - রাত হলে সব উত্তর পেয়ে যাবো আমি।
সন্ধ্যায় ভুঁইয়া বাড়িতে আড্ডা জমে উঠেছে। সবাই আজ একসাথে বসে আড্ডা দিচ্ছে সেখানে শুধু মেঘলা নেই । মেঘলা নিজের রুমে একলা বসে আপন মনে গান গাচ্ছে -
তাকে আটকে রাখার চেষ্টা,
আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে তেষ্টা।
আমি দাঁড়িয়ে দেখছি শেষটা জানলায় ।
বোঝেনা সে বোঝেনা ........
মেঘলার যখন ভীষণ মন খারাপ হয় তখন সে গান গায়। আবার যখন মনটা ফুরফুরে থাকে তখনও সে গান ।আজ তার ভীষণ মন খারাপ তাই আপন মনে গান গাচ্ছে।
আর তখনই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো আরাফিয়া।
দরজা খোলার শব্দে মেঘলা চমকে উঠলো।
- বিয়ের কনে বিয়ের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও। একটু পরে তোমার বিয়ে হবে।
মেঘলা ভীষণ অবাক হয়ে গেল , বাবা মা কেন তার সাথে এমন করলো । যে মেয়েটা একটা কাপড় কিনতে গেলেও নিজে চয়েস করে কিনতো । আর সেখানে সারা জীবনের জন্য সে যার সাথে থাকবে তাকে একটা বার দেখার সুযোগ টুকুও দিলো না । বাবা মা এতো নিষ্ঠুর কেন হলো ? কবে থেকে হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর সে খুঁজে পাচ্ছে না।