মেঘলা যেন সেখানেই বরফ হয়ে গেল। শরীরের প্রতিটি শিরায় রক্ত জমে যাওয়ার মতো অনুভূতি হলো তার। চোখ দু’টো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেলো, ঠোঁট কাঁপছে অথচ শব্দ বের হচ্ছে না। আকাশের হাতের মুঠোতে অবশ দেহটা যেন নিজের অস্তিত্বই ভুলে বসেছিলো সে। চারপাশের শব্দ, মানুষের হাঁকডাক, হাসির আওয়াজ সব কিছু মিলেমিশে এক অদ্ভুত শূন্যতায় হারিয়ে গেলো মেঘলার কাছে।
পুরো সতেরো মিনিট… প্রতিটি সেকেন্ড যেন তার কাছে ঘণ্টার মতো দীর্ঘ। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিলো, মনে হচ্ছিলো বুকের ভেতরটা ধুকধুক করে ফেটে যাবে।
অবশেষে আকাশের হাত থেকে ছাড়া পেতেই যেন প্রাণ ফিরে পেলো মেঘলা। দমবন্ধ করা মুহূর্ত থেকে মুক্ত হয়ে হঠাৎ করেই জমে থাকা বাতাস ফুসফুসে ঢুকে পড়লো। চোখ নামিয়ে কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে দ্রুত পায়ে সিঁড় বেয়ে নিচে নেমে গেল।
-মেঘলা মা তোর কি হয়েছে এমন হাপাচ্ছিস কেন ? কি হয়েছে তোর মা?
আফজাল ভুঁইয়া সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে যাবে তখনই মেঘলা কে এভাবে দৌড়ে আসতে দেখে কথাগুলো বললেন।
এখন মেঘলা কি করে বলবে আকাশ তাকে আলতো করে টেনে নিয়ে নিজের বুকের কাছে জড়িয়ে ধরেছিল, তারপর… সেই উষ্ণ, অপ্রত্যাশিত চুমু!
না, এটা বলা যাবে না। কোনোভাবেই না। এই সত্যি মুখ ফসকে বের হয়ে গেলে ধ্বংস নামবে দুজনের ওপর।
তাই সে আমতা আমতা করে বলল আসলে বড়ো আব্বু আমি কখনো শাড়ি পরিনি আজ প্রথম বার শাড়ি পরে এমন হাঁসফাঁস লাগছে ।
আফজাল ভুঁইয়া বলল-ঠিক আছে মা ভালো করে শাড়িটা সামলে নিয়ো।
মেঘলা মাথা নেড়ে চলে গেল সেখান থেকে । নিজের ঘরে গিয়ে একেবারে দরজা বন্ধ করে দিলো ।
বাইরে সবাই বর আসছে! বর আসছে! বলে মুখরিত করে যাচ্ছে।মানুষের হাসি-খুশির কোলাহলে পুরো বাড়িটা যেন কেঁপে উঠছে।
কিন্তু মেঘলার কানে এসব কিছুই পৌঁছোচ্ছে না।
সে যেন আরেকটা জগতে ডুবে আছে।
তার বুকের ভেতর ধকধক শব্দ করছে মনে হচ্ছে কেউ যেন নিঃশব্দে বুকে ধাক্কা দিচ্ছে বার বার ।আকাশ কেন করলো এটা? কেন?
আকাশের দুই হাতের শক্ত, স্থির আঁকড়ে ধরা তাকে এমন করে অসহায় করে দেবে ও কল্পনাও করেনি।
ওর ঠোঁট এখনো থরথর করে কাঁপছে, যেন সেখানে উষ্ণ শ্বাস আর অপ্রত্যাশিত স্পর্শ লেগে আছে এখনও।
জীবনে প্রথম কোনো ছেলের স্পর্শে মেঘলার ভেতরটা যেন কেঁপে উঠেছিল।সে একদম নুইয়ে পড়েছে মানসিকভাবে, শরীরটাও কেমন যেন আলগা হয়ে আছে।
বুকের গভীরে এক অদ্ভুত গরম অনুভূতি হচ্ছে মাথা ঘোরার মতো অবস্থা ।
চুলের খোঁপা থেকে আলতো ভেসে আসা সুগন্ধের মতোই আকাশের শরীরের গন্ধটা এখনো তার গায়ে লেগে আছে।
অদ্ভুত এক উষ্ণতা মেশানো রহস্যময় পুরুষালি গন্ধ ।
মেঘলার মনে প্রশ্নের ঝড় বইছে। আকাশ কি আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রেখেছিল? নাকি মুহূর্তের আবেগ?
কিন্তু যাই হোক…একবার চোখ বন্ধ করলেই সেই দৃশ্যটা চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠছে । আকাশের চোখের গভীরতা, তার বুকে চেপে ধরা, আর সেই অনাহূত, চমকে দেওয়া চুম্বন।
মেঘলার হাত দুটো হঠাৎ কাঁপতে শুরু করলো।
সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঠোঁটের কোণ ছুঁয়ে দেখলো
স্পর্শটা সত্যি ছিলো।
অপরদিকে আকাশ যেন নিজের ভেতরেই ডুবে যাচ্ছে। বুকের ভেতর ভারী পাথরের মতো কিছু চেপে বসেছে। মনে হচ্ছে সমস্ত ঘরের বাতাস হঠাৎ ঘন হয়ে গেছে, শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। চোখ দুটো লাল, কপাল ঘামে ভিজে গেছে, বারবার হাতের আঙুলগুলো একসাথে চেপে ধরে আবার ছেড়ে দিচ্ছে, যেন এই অস্থিরতা থেকে মুক্তি খুঁজছে।
দীর্ঘ আটাশ বছরের জীবনে যেখানে সে কখনো কোনো মেয়ের দিকে অসম্মানজনক চোখে তাকায়নি, এমনকি কারো সাথে কথা বলার সময়ও সম্মান, দূরত্ব আর শালীনতার দেয়াল বজায় রেখে চলেছে। সেই মানুষটিই আজ এক মুহূর্তের ভুলে, এক ঝলক আবেগে নিজের চাচাতো বোনের সাথে সীমা অতিক্রম করলো।
নিজের বুকের উপর হাত রেখে অনুভব করছে অপরাধবোধের তীব্র ব্যথা। মনটা টান টান হয়ে যাচ্ছে।
মনে মনে বার বার একটাই কথা বলছে আমি কেন এমন করলাম ? কেন?
কিন্তু এই কেনো এর কোন উত্তর নেই কারো কাছে।
______________
মিমের বিয়ের সব কার্যক্রম শেষ হয়েছে এখন শুধু বিদায় দেওয়া বাকি আছে ।
মিমের চোখ যেন কারো অপেক্ষায় ছুটে চলেছে অবিরাম। আঙিনার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত, অতিথিদের ভিড়ের ফাঁক, সাজঘরের দরজা, রান্নাঘরের দিকে যাওয়া পথ সবখানেই সে দ্রুত দৃষ্টি ছুঁড়ে দিচ্ছে। মাথায় শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে বারবার ঘাড় উঁচু করে তাকাচ্ছে, কিন্তু কোথাও মেঘলার মুখ দেখা যাচ্ছে না।
মনে মনে বললো মেঘলা কোথায় ? তার তো এখন আমার কাছে থাকার কথা । একবার মাকে জিজ্ঞেস করে দেখি মেঘলা কোথায় ? একটু পর তো আমি চলে যাবো ।
ঠিক সেই মুহূর্তেই হঠাৎ যেন ঝড়ের মতো মেঘলা হাজির হলো মিমের সামনে। কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই সে দৌড়ে এসে বোনকে শক্ত করে জড়িযে ধরে হাউমাউ করে কঁদতে শুরু করলো। যেন ভেতরের সব যন্ত্রণা আর ভয় শব্দ হয়ে গলে পড়ছে।
মেঘলার শাড়িটা পুরো এলোমেলো হয়ে আঁচলটা আধখানাই মাটিতে ঝুলছে, মাথার চুলগুলো গুছিয়ে সুন্দর করে বাধা ছিল, এখন সেগুলো ছিঁড়ে-ছিঁড়ে নেমে এসেছে; কিছু চুল গাল বেয়ে লেগে আছে, কিছু পিঠ জুড়ে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। চোখদুটো লাল হয়ে গেছে।
মিম প্রথমে হতভম্ব হয়ে যায় এভাবে মেঘলাকে সে কখনো দেখেনি। তার বুকে থাকা মেঘলার শরীর কাঁপছে, থরথর করে কাঁপছে প্রতিটি শ্বাস। মেঘলার আঙুলগুলো শক্ত করে মিমের শাড়ি আঁকড়ে ধরে আছে, যেন পৃথিবীর সব নিরাপত্তা এই আলিঙ্গনেই।
মিম ধীরে ধীরে হাত তুলে বোনের মাথায় রাখে, আর ফিসফিস করে বলল
কি হয়েছে মেঘলা? কেউ কিছু বলেছে? তুই কেন এমন করে কাঁদছিস?
কিন্তু মেঘলা কোনো উত্তর দিতে পারলো না।
আকাশের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেঘলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হলো । এতোক্ষণ ধরে মনে হয় এটারি অপেক্ষায় ছিলো ।মনে মনে ভাবলো মেয়েটা এতোক্ষণ কোথায় ছিলো ? আমি ভীষণ পাপী । মেয়েটাকে খুব কষ্ট দিয়ে ফেললাম। কেন আমি তখন নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না , কেন আমি মেয়েটার সাথে এমন আচরন করলাম । কি করে আমি তার সামনে দাঁড়াবো।
কিন্তু আমাকে সরি বলতেই হবে ।