দীর্ঘ বিশ বছর পর বাড়ি ফিরছে ভুঁইয়া বাড়ির বড়ো ছেলে আফজাল ভুঁইয়া ও তার পরিবার। বিশ বছর আগে রাগ করে পরিবারসহ আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। আর আজ নিজের ভাইয়ের মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে এবাড়িতে আসছে ।এই বিশ বছরে একবারও বাড়ির কারো সাথে যোগাযোগ করেনি আফজাল ভুঁইয়া।
কিন্তু গত তিন দিন ধরে তার ভেতরটা কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠেছিল। অফিসে বসে কাজ করলেও মন ছটফট করতো চোখের সামনে ভেসে উঠতো সবুজে ঢাকা গ্রামটা দোতলা পুরোনো বাড়িটা, ছোট ভাইদের হাসিমুখ আর মায়ের স্নেহমাখা ডাক। মনে হচ্ছিলো, বুকের ভেতরে একটা শূন্যতা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
অবশেষে এক বিকেলে অনেক দ্বিধা আর উত্তেজনা নিয়ে ফোনটা তুলে নিলেন তিনি। আমেরিকার ঠান্ডা সন্ধ্যার মধ্যে বাংলাদেশের নাম্বারে কল দিলেন। ওপাশ থেকে ভেসে এলো এক পরিচিত কিন্তু বহু বছর পর শোনা কণ্ঠ তার ছোট ভাই। কিছুক্ষণ নীরবতার পর আফজাল ধীরে বললেন-
“কেমন আছিস আজিজুল?"
ওপাশ থেকে আনন্দভরা উত্তরে জানালো,
“ভাইয়া! তুমি ফোন দিছো! ভাবতেও পারিনি! আমি তো ঠিক আছি, তুমি কেমন আছো? জানো ভাইয়া, চারদিন পর আমার মেয়ের বিয়ে!”
এই কথা শুনেই আফজালের বুকের ভেতর কেমন জানি আলোড়ন উঠলো। এত বছর পর পরিবারের হাসি-আনন্দের একটা খবর যেন তাকে আবার নিজের মাটির গন্ধ মনে করিয়ে দিল। মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিলেন ,আর দেরি নয়। এই আনন্দে তিনিও থাকবেন, নিজের জন্মভূমিতে, নিজের বাড়িতে।
আফজাল ভুঁইয়ারা চার ভাই এক বোন ।
আফজাল ভুঁইয়ারা এক ছেলে এক মেয়ে । সে যখন এবাড়ি ছেড়েছিলেন তখন ছেলেটার বয়স ছিল মাত্র আট বছর। আর মেয়েটার বয়স তিন বছর ছিলো । এখন ছেলের বয়স আটাশ বছর আর মেয়েটার বয়স তেইশ বছর। ছেলে #আকাশ_ভুঁইয়া আমেরিকার একটা ইউনিভার্সিটির প্রফেসর। আর মেয়ে আরাফিয়া এখনো পড়াশোনা শেষ হয়নি কিন্তু সে একজন ইউটিউব কন্টেন্ট ক্রিয়েটর।
আফজালের ছোট আসলাম ভুঁইয়া , তার দুইটা ছেলে রবিন আর রাজিব ।রবিন এখন অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আর রাজিব দশম শ্রেণীর ছাত্র।
তারপর আজিজুল ভুঁইয়া আফজালের তিন নম্বর ভাই । তার দুই মেয়ে মিম আর #মেঘলা । মিমের বয়স বাইশ বছর আর মেঘলার আঠারো । মেঘলা ইন্টারমেডিয়েটে প্রথম বর্ষের ছাত্রী।আর মিমের বিয়ে উপলক্ষেই তো আফজাল ভুঁইয়া এ বাড়িতে পা রাখছেন।
আর ছোট ভাইটা এখনো অবিবাহিত। মাঝে মাঝে গান গায়- আমার আইবুড়ো নাম আর ঘুচলো না।
ছোট বোন নুরজাহান ভুঁইয়ার কোন সন্তান নেই।
আফজাল ভুঁইয়া বাড়ির গেটের সামনে এসে দাড়াতেই সবাই তাকে ঘিরে ধরলো । আহেরজান বিবি লাঠি ঠকঠক করতে করতে এগিয়ে এলেন ছেলের কাছে আজ কতোদিন পরে ছেলের মুখ দেখছে সে । স্বামী মারা গিয়েছে প্রায় একুশ বছর আগে , তারপর বড় ছেলেটার চলে গেল দেশ ছেড়ে। দিনের পর দিন প্রহর গুনছে কবে আসবে ছেলে । আজ ছেলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না তিনি। সবাই বাড়িতে ঢুকলো কিন্তু আকাশ ভুঁইয়া বাড়ির বাইরে কার সাথে যেন ফোনে কথা বলছে ।
কথা বলা শেষ হলে দরজার সামনে আসতেই তার সাথে ধাক্কা খেয়ে একটা মেয়ে পড়ে যেতে নিলে আকাশ ভুঁইয়া তার শক্ত পোক্ত হাত দিয়ে মেয়েটাকে ধরে ফেলে । মেয়েটা ড্যাবড্যাব করে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
একটু পরে খেয়াল করলো তার সাদা শার্ট টা মেয়েটার হাতের মেহেন্দি দিয়ে লাল হয়ে গেছে ।
- এই মেয়ে এই দেখেশুনে চলতে পারো না ? বানরের মতো এভাবে লাফাচ্ছো কেন ? আমার শার্ট টা মাখালে কেন ? এর জন্য তোমাকে ভীষণ শাস্তি পেতে হবে ।
এই বলে মেয়েটার হাত ধরে একটা ঘরে নিয়ে গেল ।
- এটা নিশ্চয়ই তোমার ঘর ? এম আই রাইট? মেয়েটা ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়ালো , আর আস্তে করে বললো হুম ।
-আজ সারাদিন তুমি এই ঘরেই বন্দী থাকবে।
এই বলে সে চলে যেতে নিয়ে পেছন ফিরে তাকিয়ে আবার বললো তোমার নাম কী?
মেয়েটা ভয়ে আস্তে করে বললো মেঘলা মনি।
আকাশ বিরবির করে বললো মেঘলা মনি ওয়াও কি সুইট নেইম!
এই বলে সে দরজা খুলে বাইরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো , কিন্তু পেছনে মেয়েটার কথায় থেমে গেল।
-আমার ভুল হয়ে গেছে আকাশ ভাইয়া আমি আপনার শার্টটা নষ্ট করে দিয়েছি । কিন্তু তাই বলে আমাকে এভাবে বন্দি করে রাখবেন? আজকের দিনটা আমাকে এভাবে বন্দি করে রাখবেন না প্লিজ ! আজকের পর থেকে আমি আর কখনো আপনার সামনে যাবো না ।
মেয়েটার কাঁদো কাঁদো মুখের দিকে তাকিয়ে আকাশের ভীষণ হাসি পেলো। চোখে জল টলমল করছে, ঠোঁট কাঁপছে, আর মুখের সেই অসহায় অভিব্যক্তিটা যেন শিশুদের মতো সরল ও মায়াময়। মনে হচ্ছিল, একটু হাসলেই তার কান্না থেমে যাবে। কিন্তু তবুও আকাশ হাসলো না ঠোঁটের কোণে জমে থাকা হাসিটা সে জোর করে গিলে ফেললো। জানে, এখন হাসলে মেয়েটার চোখের সেই শিশিরভেজা অভিমান হয়তো আরও গভীর হয়ে যাবে।
-তাহলে আমার এই শার্ট টা দ্রুত পরিষ্কার করে দাও ।
-আপনি তো শার্ট গায়ে দিয়ে আছেন আমি কিভাবে পরিষ্কার করে দেবো?
মেঘলার কথা বলা শেষ না হতেই আকাশ কোনো উত্তর না দিয়েই ধীর গতিতে হাত উঠিয়ে বোতামগুলো খুলতে শুরু করলো।
একটার পর একটা বোতাম খোলার শব্দ যেন মেঘলার বুকের ভেতর ধকধক আওয়াজ তোলে।
মুহূর্তের মধ্যেই সে শার্টটা খুলে ফেললো, আর তার গরম শরীর থেকে একরাশ মৃদু সুবাস ভেসে এলো মেঘলার নাকে ।
তারপর শার্টটা মেঘলার হাতের দিকে বাড়িয়ে দিলো।
মেঘলা থমকে দাঁড়িয়ে রইলো।
শার্ট টা হাতে নেয়ার আগে কিছুক্ষণের জন্য তার দৃষ্টি আটকে গেল আকাশের শার্ট বিহীন শরীরের দিকে।
লম্বা , ফর্সা, স্বাস্থ্যবান পুরুষটার দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে মেঘলা।
আকাশের কথায় তার হুঁশ ফিরে এলো ।
- এই মেয়ে তাড়াতাড়ি কাজে যাও । ফাঁকিবাজ মানুষ কিন্তু আমি মোটেও পছন্দ করি না ।
মেঘলা শার্টটা নিয়ে দ্রুত দৌড় দিল।
আকাশ ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আহেরজান বিবির কাছে বসলো । আহেরজান বিবি নাতীর দিকে তাকিয়ে বললেন - আমার দাদুভাই কতো বড়ো হয়ে গেছে ।আজ কতোদিন পরে দেখা পেলাম তোর ।
ছোট বেলায় অনেক দুষ্টুমি করতি এখনো কি এরকমই আছিস?
- কি যে বলো দাদিমা আমি মোটেও দুষ্টামি করি না এখন।
- তো আমি কি নাতবউ এর মুখ না দেখেই কবরে যাবো। বিয়ে শাদি করবি না ? এতো বড় একটা দামড়া পোলা হইয়াও বিয়ে করিস নি কেন রে দাদুভাই?
- মনের মতো মেয়ে পেলে তবেই বিয়ে করবো দাদুমনি।