আজ মেঘলার বোন মিমের বিয়ে । ভুঁইয়া বাড়িতে খুশির বন্যা বয়ে যাচ্ছে। খুশি হওয়ার আরেকটা কারন হচ্ছে আফজাল ভুঁইয়া ও তার পরিবারের সদস্যদের কারনে ।
বাড়ির মহিলারা সবাই কাজে ব্যাস্ত। পুরুষরাও কাজ করছে ।
আরাফিয়া আর মেঘলা সেজেগুজে বোনের কাছে বসে আছে । বরযাত্রী আসতে এখনো দুই ঘণ্টা দেড়ি হবে ।আরাফিয়া আর মেঘলা দুজনে গল্প আড্ডায় জমে উঠেছে। আরাফিয়া মাঝে মাঝে মিমকে এটা সেটা উপদেশ দিচ্ছে। তখনই মিমের মা মনোয়ারা বেগম,আকাশের মা রেখা বেগম , রবিনের মা সুফিয়া বেগম আর মিমের ফুপি সবাই একসাথে ঘরে ঢুকলো।
মনোয়ারা বেগম এসেই মেয়েকে জড়িয়ে ধরলো , চোখের পানি যেন আর বাঁধ মানছিলো না তার , হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো । তার কান্না দেখে সেখানে উপস্থিত সবারই চোখে পানি চলে এলো । রেখা বেগম এসে জা এর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল কেঁদো না ছোট , আমরাও তো বাবার বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছি । মেয়েটাকে হাসি মুখে বিদায় দিয়ে দাও। চির সত্য নিয়ম তো সবারই পালন করতেই হবে । কোন মেয়েই সারাজীবন বাবার বাড়িতে থাকার জন্য জন্মায় নি। তারা আরো কিছুক্ষণ মিমের সাথে কথা বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রবিন আর রাজিব মেয়ে পটানো নিয়ে ব্যস্ত আছে ।
রবিনের কাজই হলো একটার পর একটা মেয়ে পটানো । রাজিব এসবের মধ্যে যেতে চায়না কিন্তু রবিনের জোড়া জোড়ি তে তাকে যেতে হয় ।
আর আকাশ তার রুমে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে।
হঠাৎ করেই আকাশের মাথায় যেন টনক নেমে এলো। ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রাখলেও মন তার অনেকক্ষণ ধরেই ভেসে বেড়াচ্ছিলো অবচেতনের কোনো কোণে। আর সেই কোণ থেকে হঠাৎই একটা স্মৃতি ঝলক মেরে উঠলো ।গতকাল মেঘলাকে সে তার শার্ট পরিষ্কার করতে দিয়েছিল।
সেটা তো এখনও ফেরত নেওয়া হয়নি!
ভাবতেই আকাশের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ধাক্কার মতো অনুভূতি হলো।
শরীরের প্রতিটা স্নায়ু যেন সচেতন হয়ে উঠল।
কী করছে মেঘলা এখন? শার্টটা কি ধুয়ে রেখেছে? কোথায় রেখেছে?
আকাশ বুঝতেও পারলো না কেন এত অস্থির লাগছে। সে কখনো কারও কাছে কাপড় পরিষ্কার করায় না। অথচ গতকাল হঠাৎ করেই, আবেগের তাড়নায়, এক অদ্ভুত মুহূর্তে মেঘলার হাতে নিজের শার্টটা তুলে দিয়েছিল।
মনে পড়তেই তার ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক ক্ষীণ হাসি ভেসে উঠল। সেই মুহূর্তটার কথা মনে পড়ে গেল মেঘলার ভড়কে যাওয়া চোখ, লজ্জায় গোলাপি হয়ে ওঠা গাল, আর শার্ট হাতে নিয়ে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য। যেন পুরো পৃথিবী থমকে গিয়েছিলো সেকেন্ডে।
আকাশ মাথা নাড়ল, নিজের আচরণ নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিল না।
এটা কি ঠিক করলাম আমি?
মেঘলাকে শার্ট টা না দিলেও পারতাম।
এই বলে আকাশ ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা মেঘলার ঘরের দিকে গেল। কিন্তু ঘরে গিয়ে দেখলো কেউ নেই। আকাশ পুরো বাড়িটা মেঘলাকে খুঁজতে লাগলো কিন্তু কোথাও মেঘলাকে পেল না । অবশেষে আরাফিয়ার নাম্বারে ফোন দিলো।
- হুম ভাইয়া বলো কি হয়েছে ?
- তুই কি মেঘলা কে দেখেছিস কোথাও?
- হুম মেঘলা তো আমার কাছে আছে । কিন্তু হটাৎ মেঘলার খোঁজ কেন করছো তুমি?
- এতো প্রশ্নের জবাব দিতে পারবো না । তুই তাড়াতাড়ি ওকে ছাদে আসতে বল।
আরাফিয়া ফোন রেখে মেঘলা কে বললো - আকাশ ভাইয়া তোমাকে ডাকছে, ছাদে যেতে বলেছে।
আকাশের নাম শুনেই মেঘলা চমকে উঠলো । কালকের কথা মনে পড়ে গেল । একটা ভুলের জন্য তাকে শাস্তি পেতে হয়েছে। কালকে নাহয় আমি ভুল করেছি বলে শাস্তি পেয়েছি কিন্তু আজ? আজ সকাল থেকে তো তার সাথে আমার দেখাই হয়নি । আজ কেন আমাকে ডেকেছেন? মেঘলার বুক দুরুদুরু করতে লাগলো ।
সে প্রথমে একদমই যেতে চাইলো না। মনে হলো বুকের ভেতর হঠাৎ যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এই আকাশের সামনে দাঁড়ালে তার হাত-পা কেমন করে জানি থরথর করে কাঁপতে শুরু করে, মনে হয় পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে। গলার স্বর যেন কোথাও আটকে যায়। হৃদপিণ্ডটা অকারণে দ্রুত ছুটতে থাকে যেন কেউ জোর করে ধাক্কা দিচ্ছে প্রতিটা ধাপেই।
কিন্তু মিম আর আরাফিয়ার জোড়া জোড়ি তে সে যেতে বাধ্য হলো।
বাড়ি ভর্তি মানুষ কোথাও পা ফেলানোর একটুও জায়গা নেই ।
ছাদে উঠতেই সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
নিচের কোলাহল যেন দূরের কোনো স্বপ্নের মতো শোনায়।
ঠান্ডা বাতাস মুখে ছুঁয়ে দেয়, কিন্তু তার বুকের ধুকধুকানি তাতে থামে না। শাড়ির আঁচল উড়ে ওঠেছে, কপালের চুলগুলো আলতো দুলে পড়ে চোখের কোণ ঘিরে। গভীর শ্বাস নিতে গিয়ে নিজেই শুনতে পায় নিজের হৃদস্পন্দন।
ছাদের এক কোনায় চোখ পড়তেই দেখলো আকাশ ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
মেঘলার বুকের স্পন্দন যেন আরও জোরে ধুকপুক করতে লাগলো।
এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো,এই বিশাল পৃথিবীতে যত শব্দ, যত কোলাহল সব নিঃশেষ হয়ে গেছে।
মেঘলা আস্তে করে ডাক দিলো - আকাশ ভাইয়া।আমাকে কেন ডেকেছেন?
আকাশ মেঘলার দদিকে না তাকিয়েই বলল- আমার শার্ট টা কোথায়?
- আসলে ভাইয়া কোন কিছু দিয়েই আমি আপনার শার্ট থেকে মেহেদীর রংগুলো তুলতে পারিনি । তাই আমি ওটা ফেলে দিয়েছি । আব্বুকে বলবো আপনাকে যেন একটা শার্ট বানিয়ে দেয় ।
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে ফেললো মেঘলা ,মনে হচ্ছে তার ভীষণ তাড়া আছে।
আকাশ এবার মেঘলার দিকে ঘুরলো। মেঘলাকে এই প্রথমবার সে শাড়ি পড়তে দেখলো । নীল শাড়িতে একদম পরির মত লাগছে।মনে মনে বললো- এতো সুন্দর করে তোমাকে কে সাজতে বলেছে ? আর একটু কম করে সাজতে পারোনি । একদম পরির মত লাগছে যে।
কিন্তু কথাগুলো আর বলা হলো না।
মুখ থেকে বেরিয়ে এলো অন্য কথা- কেন আমার শার্ট ফেলে দিয়েছো বলো ? আমি তোমাকে ফেলে দিতে বলেছি ? এক্ষুনি আমাকে আমার শার্ট এনে দাও নয়তো আমি তোমাকে......
- আপনি আমাকে কি করবেন? মারবেন তো? মারুন তাহলে আমি কিছু বলবো না কারন অপরাধী আমি ।
- এই মেয়ে বেশি কথা না বলে এখান থেকে চলে যাও আর এক মুহূর্তও এখানে থাকতে পারবেনা ।
এই আঠারো বছর বয়সে কেউ তাকে একটা কটু কথা পর্যন্ত শুনাইনি ।আর আজ আকাশ তাকে এতো গুলো কথা কেন শুনালো?
এসব ভাবতে ভাবতে যখনি সিঁড়িতে এক পা দিতে যাবে পেছন থেকে আকাশ তার হাত ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে মেঘনার ঠোঁটের সাথে নিজের ঠোঁট মিলিয়ে নিলো ।