আকাশ চলে গেছে আজ এক মাস পূর্ণ হলো।
এই এক মাসে মেঘলার জীবনের ছন্দ যেন পুরোপুরি ভেঙে গেছে।
যে মেয়েটা প্রতিদিন সকালে ঠিক সময়ে উঠে বই নিয়ে বসত, ক্লাসের আগে আয়নায় দাঁড়িয়ে চুল বাঁধত, আর হাসিমুখে কলেজে যেত । সেই মেয়েটাই এখন এক অগোছালো ছায়ামূর্তির মতো হয়ে গেছে।
এক মাসে মেঘলা কলেজে গিয়েছে মাত্র কয়েকদিন; তাও মন পড়াশোনায় ছিল না। ক্লাসে বসে বইয়ের পাতায় তাকিয়ে থেকেছে, কিন্তু চোখের সামনে ভেসে উঠেছে কেবল আকাশের মুখ। রাত জেগে পড়ার টেবিলে বসলে অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে যায়, মনে হয় যেন সব শব্দের ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে আছে তার নামটাই -আকাশ।
দিন যায়, রাত যায়, কিন্তু মেঘলার ভেতরের শূন্যতা যেন আরও ঘন হতে থাকে । এক নীরব, অদৃশ্য অভাব তাকে ঘিরে ধরে প্রতিক্ষণ।
আকাশের সঙ্গে তার প্রায় প্রতিদিনই ভিডিও কলে কথা হয়। মোবাইলের পর্দায় আকাশের মুখটা ফুটে উঠলে মেঘলার ঠোঁটে হালকা হাসি খেলে যায়, চোখে জমে ওঠে একরাশ অনুচ্চারিত অনুভূতি। তবুও মনটা ঠিক পূর্ণ হয় না তার। পর্দার ওপাশের মানুষটা যতই কাছে মনে হোক, আসলে কত দূরেই না সে! আকাশের কণ্ঠস্বর শুনে বুকের ভেতরটা কেমন হালকা উষ্ণতায় ভরে ওঠে, কিন্তু সেই উষ্ণতা ছুঁয়ে যায় না মেঘলার আঙুলের ডগা।
তার ইচ্ছে করে এই পর্দার সীমারেখা ভেঙে আকাশকে একবার ছুঁয়ে দেখে, তার কাঁধে মুখ রেখে নিরব নিস্তব্ধ বিকেলগুলো কাটিয়ে দেয়। স্ক্রিনের আলো নয়, সে চায় আকাশের নিঃশ্বাসের উষ্ণতা; কণ্ঠস্বর নয়, সে চায় সেই কণ্ঠের কাছাকাছি হৃদস্পন্দনের শব্দ শুনতে।
সকালের নরম আলোটা জানালার ফাঁক দিয়ে মেঘলার মুখে এসে পড়েছিল। চোখ মেলে উঠতেই মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করতে লাগল, চারপাশের সবকিছু ঘুরে উঠছে বলে মনে হলো। বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল সে। মনে মনে ভাবলো হয়তো গতকাল রাতে ঠিকমতো খাওয়া হয়নি, শরীরটা একটু দুর্বল হয়ে পড়েছে বলেই এমনটা হচ্ছে। নিজেকে সান্ত্বনা দিল, “ঠিক হয়ে যাবে।”
সেসব তোয়াক্কা না করেই তাড়াহুড়ো করে মুখ-হাত ধুয়ে নাস্তা সারল, তারপর বই-খাতা ব্যাগে গুঁজে কলেজের উদ্দেশে বেরিয়ে গেল। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কেমন এক অজানা ক্লান্তি ভর করছিল শরীরে, তবুও মেঘলা ভাবল একটু পড়াশোনায় মন দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু কলেজে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরেই যেন পৃথিবীটা থেমে গেল তার চারপাশে। ক্লাসরুমে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎই বুকের ভেতরটা কেমন উল্টে উঠল, মুখ ঢেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেল করিডোরে, তারপর বমি করতে করতে মেঝেতে বসে পড়ল। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছিল, মাথাটা যেন কারও ভারী হাতে টেনে নিচে নামিয়ে দিচ্ছে।
তার সব বান্ধবীরা ছুটে এলো কিন্তু ততক্ষণে মেঘলার শরীরটা সম্পূর্ণ নিস্তেজ। শেষমেশ এক বান্ধবীর সাহায্যে কোনো রকমে ট্যাক্সিতে তুলে তাকে বাড়ি নিয়ে আসা হলো।
মেঘলাকে দরজায় ঢুকতেই দেখে মেঘলার মা যেন হঠাৎ জমে গেলেন। মেয়েটার মুখ পুরো ফ্যাকাশে, ঠোঁট সাদা হয়ে গেছে, চোখ বন্ধ প্রায়। এক মুহূর্ত স্থির থাকার পর তিনি ছুটে গেলেন সামনে, মেঘলার নিস্তেজ শরীরটা বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।
-হায় আল্লাহ! আমার মেয়েটার কী হলো রে!
এই সময় রাইশা এসে মাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
আপনি চিন্তা করবেন না, আমি মেঘলাকে রুমে নিয়ে যাচ্ছি।
তারপর আলতো করে মেঘলার কাঁধে হাত রেখে তাকে নিজের রুমে নিয়ে গেল। বিছানায় শুইয়ে মেঘলার কপালে হাত রাখতেই রাইশা বুঝল শরীরটা যেন আগুনের মতো গরম। বুকের ভেতরটা কেমন কেঁপে উঠল তার।
এক মুহূর্ত দেরি না করে সে ফোনটা হাতে নিয়ে আকাশকে কল দিল। ফোনের ওপাশে আকাশের গলা শুনেই রাইশার গলাটা কেঁপে গেল -আকাশ, মেঘলা একদম ঠিক নেই... মাথা ঘুরে পড়ে গেছে, এখন জ্ঞানও ঠিকমতো নেই।”
আকাশের কণ্ঠে উদ্বেগ ছুঁয়ে গেল,
-রাইশা, এক মুহূর্ত দেরি করো না, এখনই ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও। আমি এখনি চাচ্চুর সাথে কথা বলছি।
আকাশের কথায় রাইশা রবিনকে সাথে নিয়ে মেঘলাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলো।
ডাক্তার সবকিছু টেস্ট করে রাইশাকে বললো মেয়েটা আপনার কে হয়?
রাইশা কিছু বলতে যাবে এরই মধ্যে রবিন এসে বললো মেয়েটা আমার বোন।
ডাক্তার রবিনের দিকে হাস্যোজ্জ্বল ভাবে তাকিয়ে বলল-
অভিনন্দন! আপনি মামা হতে চলেছেন।
মুহূর্তের মধ্যে রবিনের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। যেন হঠাৎ কেউ তার বুকের ভেতর এক পটকা ফাটিয়ে দিলো। আনন্দে, অবাক হয়ে সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল তারপর আচমকাই ফোনটা হাতে তুলে নিলো। আঙুল কাঁপতে কাঁপতে সে আকাশের নাম্বারে কল দিলো।
প্রথমবার, দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বার আকাশের ফোনের স্ক্রিনে রবিনের নামটা ভেসে উঠলেও সে তখন ক্লাসে ব্যস্ত। ভ্রু কুঁচকে কলটা কেটে দিলো। কিন্তু রবিনের ফোন থামছে না। পরপর রিং বাজতেই থাকলো। অবশেষে আকাশ বিরক্ত হয়ে ফোনটা কানে ধরলো
-কী হয়েছে রবিন? ক্লাসে আছি এখন।
ওপাশ থেকে রবিনের গলা যেন উত্তেজনায় কাঁপছে, নিঃশ্বাসটা জড়িয়ে যাচ্ছে কথার ভেতর তবুও কাঁপা কাঁপা গলায় বলল- ভাইয়া… আপনি বাবা হতে চলেছেন!
কথাটা শোনা মাত্রই আকাশের চোখ বড় হয়ে গেল। হাতে ধরা কলমটা টেবিলে পড়ে গিয়ে গড়িয়ে গেল। মুহূর্তে তার কানে আর কিছুই পৌঁছাচ্ছে না শুধু একটা কথাই বার বার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে
আপনি বাবা হতে চলেছেন।
হৃদস্পন্দনটা যেন আচমকা তীব্র হয়ে উঠেছে। হাতের তালু ভিজে গেছে ঘামে। মনে হচ্ছে, পৃথিবীটা হঠাৎ অন্যরকম হয়ে গেছে সবকিছু কেমন উজ্জ্বল, অচেনা, আনন্দে ভরে গেছে।
কিন্তু আনন্দের সেই জোয়ার হঠাৎ যেন থেমে গেল কোথাও। বুকের গভীরে এক অজানা ভারি কষ্ট জমে উঠলো। চোখে ঝাপসা লাগলো আকাশের মনে পড়ে গেল মেঘলার মুখটা, সেই কোমল, সরল, ভীত চাহনি।
মৃদু কাঁপা গলায় সে নিজেই নিজের মনে বললো-
“মেঘলা তো এখনো কত ছোট…! এত বড় একটা পথ, এত দায়িত্ব ও কি করে একা পারবে?”
মনে পড়লো মেঘলার সেই অবুঝ অভিমান, ছোটখাটো কষ্টে মুখ গোমড়া করে বসে থাকা, আবার একটু আদর পেলে শিশুর মতো হেসে ফেলা!
এমন একটা মেয়ে, যে এখনো নিজের ভয়গুলো পর্যন্ত ঠিক করে বলতে শেখেনি, সে কীভাবে এই মা হওয়ার যাত্রাটা একা একা পার করবে?
এক মুহূর্তেই আকাশের বুকটা হাহাকার করে উঠলো।
আনন্দের ভেতর ঢুকে পড়লো এক অদ্ভুত বিষাদ, এক অপরাধবোধের ছায়া।
মনে মনে প্রতিজ্ঞার মতো করে বললো -না, আমি বসে থাকতে পারি না। যেভাবেই হোক, ওকে আমার কাছে আনতেই হবে। ওর পাশে আমিই থাকব… প্রতিটা মুহূর্তে।