She is my Obsession

পর্ব - ৪৭

🟢

আলাস্কার দীর্ঘ শীতের অবসান ঘটিয়ে গ্রীষ্মের আগমন হয়েছে।

যদি ও এখানে চারটি ঋতুরই অস্তিত্ব রয়েছে, তবুও শীতের প্রভাব ই সবচেয়ে বেশি। সাধারণত ছয় থেকে আট মাস পর্যন্ত শীত স্থায়ী হয়, এই বছর ও তার ব্যতিক্রম হয়নি। গ্রীষ্মের পদার্পণের সাথে সাথে পাহাড় - প্রকৃতির রূপে পরিবর্তন দেখা দিতে শুরু করেছে। বরফের নিচে ঢেকে থাকা সবুজ গাছ পালা গুলো ধীরে ধীরে তাদের স্বাভাবিক রূপে ফিরে আসছে।

প্রতিদিনের ন্যায় আরো একটি ঝলমলে সকাল। ঘড়ির কাঁটা এগারো টা পেরোলে ও ইসরাহ এখনো ঘুম থেকে উঠেনি। শরীরের অসুস্থতায় কাল রাতে একটু ও ঘুমাতে পারেনি সে। তার সাথে ফারিস ও জেগে ছিলো। ইসরাহর ক্ষণে ক্ষণে শরীর এমন মনের পরিবর্তন হওয়ার কারণে ফারিসের বেশ প্যারা খেতে হয়েছে তাকে সামলাতে গিয়ে।

তীব্র ঠক ঠক শব্দে ইসরাহ ঘুম হালকা হয়ে এলো। বহু চেষ্টা করে এপাশ ওপাশ করে শুয়ে ও পুনরায় তার চোখে ঘুম ধরলো না। রুক্ষ মেজাজে বিছানা থেকে নেমে, ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো সে। একসাথে শাওয়ার নিয়ে রুমে ফিরলো ইসরাহ। চুল থেকে সাদা টাওয়াল খুলে নিয়ে। অতঃপর, রুমের গ্রিল খোলা বারান্দায় এসে দাঁড়ালো সে। এতোদিন শীতের জন্য এই বারান্দা তারা ব্যবহার করেনি। এখন আবার গরম ফিরতেই ফারিস সেন্টর টেবিল আর চেয়ার পেতে বসার ব্যবস্থা করেছে। ইসরাহর পড়ার সুবিধার্থে পাশেই রাখা ছোট্ট বুক সেল্ফে, নিচের লাইব্রেরি থেকে এনে বিভিন্ন বাংলা, ইংরেজি, উর্দু সহ বহু ভাষার সাহ্যিতিক বই রাখা হয়েছে।

ইসরাহ মাঝে মধ্যে ইংরেজি বই গুলো পড়ে। না হয় সচরাচর বাংলা বই ই পড়ে সে। উপর থেকে নিচে তাকাতে দেখতেই দেখলো কুড়াল দিয়ে ফারিস গাছ কাটছে। সামনে অনেক গুলো ছোটো, বড় গাছ হয়ে ছিলো। সেগুলোর কারণে গোলাপের ঝাড় টা জঙ্গলে রূপ নিয়েছে। একটা গাছের দিকে তাকাতেই তার শিকড়ে চোখ পড়লো ইসরাহর। শিকড় গুলো দেখতে গোলাপি রঙের। কি গাছ ইসরাহর জানা নেই। হঠাৎ ফারিস উপরের দিকে তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হলো। ইসরাহর চুল থেকে টপাটপ পানি ঝরছে। তা দেখে, ঠোঁট কামড়ে বিস্তর হাসলো ফারিস। বিনিময়ে ইসরাহ আহ্লাদি কন্ঠে সুধালো;-

--" আমি ওই গাছটার শিকড় চিবিয়ে খাবো ফারিস। দেখতে কি ইয়াম্মি লাগছে।"

ইসরাহর এমন ধারার কথায় অসহায় চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলো ফারিস। প্রেগন্যান্সি জার্নির এই আট মাসে অসংখ্য অদ্ভুত খাবার খাওয়ার বায়না ধরে ছিলো ইসরাহ। ফারিস ও ধৈর্য্য সহকারে সবটা সামলিয়েছে। যেই খাবার খাওয়ার উপযুক্ত তা এনে দিয়েছে। যা অনুপযুক্ত তা কথার টপিক বদলে বহু কষ্টে কাটিয়েছে। কিন্তু এখন কি করবে সে? ফারিসের জবাবের অপেক্ষায় না থেকে ইসরাহ বারান্দা থেকে চলে এলো। ফারিস বুঝলো মেয়েটা নিচে আসছে। দ্রুত সে হাতের ময়লা ঝেরে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। ফারিস দরজার লক খুলতেই দেখলো সিঁড়ির মাঝামাঝি তে দাঁড়িয়ে আছে ইসরাহ। মন্তর গতিতে পা পেলে পেলে নামছে সে। ফারিস ছুটে গিয়ে মেয়েটাকে নিজের বাহুতে জড়িয়ে নিলো। বাকি সিঁড়ি গুলো নিজের সাথে জড়িয়ে নামিয়ে আনলো সে।

নিচে নেমে সস্থির শ্বাস টানলো ইসরাহ। ফারিসের হাত ধরেই সোফায় এসে বসলো সে। পর পর গম্ভীর মুখে ইসরাহ সুধালো;-

--" এই সিঁড়ি গুলো বড্ড বিরক্তির ফারিস। আমি আর উপরে উঠবো না।"

--" আচ্ছা উঠো না।"

এদিক ওদিক তাকিয়ে নিচে নেমে আসার কারণ মনে করতে চাইলো সে। বার বার ভেবে ও না মনে করতে পেরে ফারিস কে জিজ্ঞেস করলো;-

--" আমাকে নিচে নামিয়ে এনেছেন কেন?"

--" ব্রেকফাস্ট করতে।"

--" ওহ, রিজভি ভাইয়া কোথায়?"

ইসরাহর প্রশ্নে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো ফারিস। রিজভি আজ-কাল এখানেই থাকে। তাও ইসরাহর ইচ্ছেতে। মানুষ ছাড়া নাকি ফাঁকা, ফাঁকা লাগে বাড়িটা। তার থাকতে ইচ্ছে করে না এমন বাড়িতে। তাই অগত্যা রিজভি ফ্ল্যাট ছেড়ে এখানে এসে উঠেছে।

--" রিজভি রেসিং ট্র্যাকে গিয়েছে। এইতো কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসবে। তুমি বসো, আমি নাশতা নিয়ে আসছি।"

--" আমি ও যাবো।"

ইসরাহর কথা ফেললো না ফারিস। তাকে সাথে করে নিয়ে এসে ডাইনিং টেবিলের চেয়ার টেনে বসিয়ে দিলো। টুকটাক কথার বলার মাঝেই সিদ্ধ ডিমের চামড়া ছাড়িয়ে, চপিং বোর্ডে কেঁটে রাখা ফলের টুকরো গুলো বাটিতে তুলে নিলো ফারিস। ইসরাহ উঠে এসে ফারিসের কাজ দেখে কিচেনের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালো।সহসা, পেটে চিনচিনে ব্যথা হতেই কথা বলা থামিয়ে দিলো ইসরাহ। পেট চেপে ভর্য়াত নজরে পায়ের দিকে তাকালো সে। তার পা বেয়ে তরল গড়িয়ে পড়ছে মেঝেতে। ভয়ে বুক কেঁপে উঠলো ইসরাহর। ইসরাহ কে থামতে দেখে ফারিস তার দিকে তাকালো। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে মেঝের দিকে তাকাতেই র*ক্ত হিম হয়ে গেলো ফারিসের। হাত থেমে গেলো তার। অবাক লোচনে কি করবে ভেবে পেলো না। ড্রয়িং রুম থেকে রিজভির কন্ঠ ভেসে এলো।

--" বস, ম্যাম কি কিচেনে? না থাকলে শুনুন, আরসালান শালাটাকে উচিত শিক্ষা দিতে হচ্ছে একবার। ওই নাট*কির নাতি আজ আবার মিটিং বোর্ডে ঝামেলা করেছে।"

কথা বলতে বলতে ইসরাহ কে দেখতেই রিজভি থতমত খেলো। নিজেকে সামলে; কিছু বলবে তার আগেই ইসরাহ কে পড়ে যেতে দেখে পেছন থেকে আঁকড়ে ধরলো। উদগ্রীব হয়ে ভর্য়াত কন্ঠে বলে উঠলো সে;-

--" এই ভাবি কি হয়েছে আপনার?"

ইসরাহর কথায় রিজভি মাঝে সাজে তাকে ভাবি/আপু ডাকে। তবে বেশ ভাগ সময়েই ম্যাম ডাকে সে। কয়েক মাসের অভ্যাস কিনা। ঘাড় কাত করে ফারিস কে দেখে নিয়ে; চেঁচিয়ে উঠলো সে।

--" এই বস, ভাবি পড়ে যাচ্ছে তো। ধরছেন না কেন আপনি?"

হিতাহিত বোধ শূন্য হওয়া ফারিসের হুঁশ ফিরলো রিজভির কথায়। ডাক্তার বলেছিলো সামনের মাসে ইসরাহর ডেলিভারি ডেট। তাহলে এখন কেন এমন হচ্ছে? ভাবনা ছেড়ে ছুটে এসে রিজভির হাত থেকে ইসরাহ কে নিজের বাহুতে টেনে নিলো সে। সুযোগ পেতেই দোতলায় ছুটলো রিজভি। ইসরাহ আর বেবির জন্য গুছিয়ে রাখা ব্যাগটা আর ফারিসের একটা সাদা শার্ট নিয়ে নেমে এলো সে। ফারিস ততক্ষণে ইসরাহ কে কোলে তুলে নিয়েছে।

রিজভির হাতে থাকা ব্যাগটা বাংলাদেশ থেকে ফেরার সময় আসফা বেগম ই গুছিয়ে দিয়েছিলেন। তখন অবশ্য ইসরাহ নিষেধ করেছিলো এসবের দরকার নেই। শুধু শুধু করছেন তিনি। কিন্তু এইতো আজ হঠাৎ ই প্রয়োজন পড়ে গেলো।

********

হাইওয়ে রোডে ঝড়ের বেগে চলছে ফারিসের গাড়ি টা। ড্রাইভিং সিটে রিজভি বসা।

ব্যাক সিটে ইসরাহ আর ফারিস বসা। লেবার পেইন উঠেছে তার। তলপেটে হাত বেঁধে চোখ বন্ধ করে রেখেছে সে। ব্যথার তীব্রতায় তার কপাল বেয়ে ঘামের ফোঁটা গুলো গালে, গলায় এসে ঠেকছে। ফারিস আলতো হাতে ইসরাহ চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। এতে যদি মেয়েটা একটু শান্তি পায়। ক্রমশ তার ব্যথা বেড়েই চলেছে। ফারিসের পিঠের কাছের শার্ট খামচে; নিভে আসা কন্ঠে ইসরাহ সুধালো;-

--" আমি ম..নে হয় মরে যাবো ফা..রিস। আপনার শয়তান বাচ্চাটা আমাকে লাথি দিচ্ছে। ওকে থামতে বলুন। নয়তো আমি বেঁ..চে থাক..লে ওর খব..র আ..।"

এমন মূহুর্তে ও ইসরাহর কথায় ফারিস আর রিজভি ঠোঁট টিপে হেসে ফেললো। ইসরাহর কানে হাসির শব্দ পৌঁছাতেই ফারিসের বুকে কনুই দিয়ে আঘাত করলো সে।

--" আপনি এক..টা অজাত। বা..প যেমন বাচ্চা..টাও তেমন হচ্ছে। মা..গোওও"

--" প্লিজ শান্ত হও লিটল গার্ল। এই সময় উত্তেজনা তোমার জন্য ভালো হবে না।"

--" একদম জ্ঞা..ন দিবে..ন না।"

ইসরাহর রাগী কন্ঠের বিপরীতে বিরস মুখে ছোটো করে "আচ্ছা" বললো ফারিস। এতে ও ইসরাহ সস্থি পেলো না।

--" ওমাগো জন্তুর বা..চ্চাটা আমা.কে মেরে ফে..লতে উঠে প..ড়ে ..."

পুরো কথাটা আর শেষ করতে পারলো না ইসরাহ। নিজের সন্তানকে নিয়ে এমন উদ্ভট অভিযোগ শুনে যেন মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেলো ফারিস। বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠলো তার।

তার আদরের লিটল গার্ল— ই কি না তাকে আর তার অনাগত সন্তান কে এভাবে বলছে? তারা নাকি জন্তু, ছিঃ! সে জঙ্গলে থাকে বলেই কি এই নাম দিলো মেয়েটা?

*******

ইসরাহর চিৎকারের মাঝেই হসপিটালের সামনে এসে থামলো গাড়িটা। রিজভি ছুটে গিয়ে স্ট্রেচার নিয়ে এলো। হসপিটালে ঢুকতেই ইসরাহকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হলো। তাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া মাত্র যেন পুরো পৃথিবী থেমে গেলো ফারিসের। চারপাশে লোকজন ছুটোছুটি করছে, নার্সদের তাড়াহুড়ো, স্ট্রেচারের শব্দ। এতো সব শব্দ যেনো তার কানে পৌঁছাতে পারছে না।

সহসা নার্সের বাড়িয়ে দেওয়া কাগজটার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো সে। কাগজ টা কিসের তা বুঝতে পেরে হাত দুটো কেঁপে উঠলো ফারিসের। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে ইসরাহর মুখশ্রী। ভীত, ক্লান্ত, মায়া ভরা সেই মুখ-চোখ। নার্সটি তাড়া দিলো।

--" স্যার, প্লিজ… টাইম ইজ ভেরি ক্রিটিকাল।"

--" স্যার সাইন করুন। আপনার সাইনের জন্য ম্যামের ট্রিটমেন্ট করতে পারছেন না ওনারা।"

কলমটা হাতে নিতেই আঙুল গুলো অবশ হয়ে এলো ফারিসের। এই একটা সাইন, এই একটা সিদ্ধান্ত— সবকিছু বদলে দিতে পারে। বুকের ভেতরটা হু, হু করে উঠলো তার। মনে হলো, কলম দিয়ে কাগজে সাইন না করে নিজের বুকের মধ্যে সাইন করছে সে। তার গাল বেয়ে; এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো কাগজের ওপর। কাঁপা হাতে অবশেষে সাইন করে দিলো ফারিস। যতো সময় যাবে। তার লিটল গার্ল আর বাচ্চাটা কষ্ট পাবে। নিজের কাজ হতেই নার্সটি ছুটে অন্যদিকে চলে গেলো। সাইন শেষ হতেই যেন সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেলো ফারিসের। দপ করে শরীরটা ঢলে পড়লো চেয়ারের উপর। দুই হাতে মুখে চেপে ধরে নিঃশব্দে কেঁদে উঠলো সে। রিজভি কি করবে বুঝতে পারলো না। ফারিস কে এমন ভেঙে পড়তে সে কখনো দেখেনি। হঠাৎ, ইসরাহর চিৎকার কানে ভেসে আসতেই ফারিস মুখ তুললো।

--" লিটল গার্ল… তোমার কিছু হলে আমি বাঁচবো কি নিয়ে? এইবারের মতো ফিরে আসো জান। সামনে আর বেবির নাম নিবো না।"

ফারিস থেমে, নিচু স্বরে আবার বলে উঠলো।

--" বেশি না, আর দুটো বেবি নিবো। প্রমিস,"

চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো ফারিস। তাকে উঠতে দেখে রিজভি ও উঠে পড়লো।

--" কোথায় যাচ্ছেন বস?"

র*ক্তিম চোখে রিজভির দিকে তাকিয়ে তার ঘাড়ে হাত রাখলো ফারিস। বুঁজে আসা গলায় আওড়ালো সে;-

--" আমার পৃথিবী ওই থিয়েটারে আছে রিজভি। তুই একটু খেয়াল রাখ। আমি আসছি।"

কথা শেষে রিজভির উত্তরের অপেক্ষা করলো না ফারিস। হসপিটাল থেকে ছুটে বেরিয়ে গেলো সে। নিচে নেমে পার্কিং লট থেকে নিজের গাড়ি নিয়ে নিজের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলো। দশ মিনিটের দূরত্বে একটা জায়গায় এসে গাড়ি থামালো ফারিস। সূর্যের তাপ বেড়েছে আগে থেকে। ইতিমধ্যে ফারিস ঘেমে উঠেছে। গাড়ি থেকে নেমে সামনে অবস্থিত মসজিদের গেটে এসে দাঁড়ালো। বার বার চোখ ঝাপসা হয়ে উঠছে ফারিসের বেহায়া চোখ জোড়া।

আকাশের দিকে তাকালো সে, এই সংকটে উপওয়ালা ছাড়া কেউ তাকে সাহায্য করতে পারবে না। দ্রুত পায়ে উদভ্রান্তের ন্যায় ছুটে মসজিদের ভেতরে ঢুকে পড়লো ফারিস। বর্তমানে মসজিদের ভেতরটা ফাঁকা। চারপাশে না তাকিয়ে মসজিদের মেঝেতে হাঁটু ভেঙে বসে পড়লো সে। কান্নায় ভেঙে পড়লো শক্ত পোক্ত ফারিস। মাথা নুইয়ে নিজেকে লুটিয়ে দিলো রবের সেজদায়। এতক্ষণ নিজেকে সামলালে ও; এইবারে সেই চেষ্টা করলো না ফারিস। নিজের সমস্ত আবেগ মিশিয়ে বলে উঠলো সে।

--" আমি জানি না; কীভাবে তোমার কাছে চাইতে হয়। কিন্তু এটা জানি, এই পৃথিবীতে তোমার যতো বান্দা আছে। সবচেয়ে বড় পাপী আমি। এই ত্রিশ বছরের জীবনে কোনোদিন অন্তর থেকে তোমার ইবাদত মুখি হইনি। তবুও এই জীবনে তুমি আমাকে কোনো কিছুতে অভাব দাওনি। বরং, আমার লিটল গার্ল কে ও পাইয়ে দিয়েছো।"

ফারিস থামলো। বর্তমানে তার কথা গুলো অস্পষ্ট। কিন্তু উপরওয়ালা তো সব জানেন।

--" তোমার কাছে আমি শেষ বার হাত তুলে ছিলাম মায়ের জন্য। তুমি আমায় খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়েছিলে বিধাতা। অতঃপর আমি আর তোমার দরবারে হাত তুলিনি। কিন্তু এইবারে তেমন টা করো না। তোমার বান্দারা তো বলে; তুমি নাকি পরম করুণাময়, দয়ার সাগর, অন্তরজামী। তবে আমাকে একটু দয়া করো। তোমার নামে কসম করছি। আমার লিটল গার্ল আর আমার সন্তান বেঁচে গেলে আমি সব পাপ ছেড়ে দিবো। তোমার সালাত আদায় করবো। একটু করুণা করুন প্রভু। আমার লিটল গার্লের কষ্ট তুমি কমিয়ে দাও। আমার সন্তান কে সুষ্ঠু ভাবে ভূমিষ্ঠ করো।"

দশ মিনিটের মত সেজদা লুটিয়ে থেকে থেকে মাথা তুললো ফারিস। দু'হাতে মোনাজাত ধরে কাকুতি মিনতি করে বলে উঠলো সে।

--" ও রব, আপনি আমার লিটল গার্ল আর সন্তান দুজনকেই ফিরিয়ে দিন। আমার প্রথম সন্তান। আমার অংশ, আমি তাকে ছুঁয়ে দেখতে চাই। ভালোবাসতে চাই। আমাকে আপনি সন্তান হারানোর বেদনা দিয়েন না। আমার সন্তান এবং স্ত্রী দু'জনকেই আপনি সুস্থ রাখুন।"

মোনাজাত শেষ হতেই ফারিসের ফোনটা বেজে উঠলো। পকেট থেকে ফোন বের করে চোখের সামনে ধরলো সে। রিজভি কল করেছে। ভয়ে ভয়ে কল রিসিভ করে ফোন কানে চাপলো। ফোন কানে ধরতেই রিজভির প্রফুল্ল কন্ঠ স্বর ভেসে এলো ওপাশ থেকে।

--" বস, বস আমি চাচ্চু হয়েছি। আমার টুকটুকে একটা মামনি হয়েছে।"

--" আ..মার লিট..ল কুইন কেমন আছে?"

--" ম্যাম ও ভালো আছেন। বেবি প্রিম্যাচিউর হওয়া সত্ত্বে ও কোনো জটিলতা দেখা দেয়নি। চিন্তার কিছু নেই। সবকিছু মিলিয়ে অবস্থা সম্পূর্ণ স্থিতিশীল। আমাদের আয়ত্তের মধ্যে।”

চোখ বুঁজে নিলো ফারিস। দু'ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো তার গাল বেয়ে। মিনমিনে স্বরে আওড়ালো সে।

--" আলহামদুলিল্লাহ,"

--" আপনি কখন আসছেন বস? আংকেল - আন্টিকে ফোন দিয়ে বেবিকে দেখিয়েছি।"

--" দশ মিনিটের মধ্যে ফিরছি।"

**********

ইসরাহর কেবিনের সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে ফারিস। উত্তেজনায় তার বুক কাঁপছে। কেবিনের ভেতরে প্রবেশের মতো সাহস সে পাচ্ছে না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে অস্বস্তি নিয়ে দরজা ঢেলে কেবিনে প্রবেশ করলো ফারিস। ইসরাহর চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে ঘুমিয়ে আছে নাকি জাগ্রত সে বুঝতে পারলো না। ইসরাহর বেডের পাশেই একটা ছোট্ট বেবি কট। বেবি কট টা দেখতেই চোখ ঝাপসা হয়ে এলো ফারিসের। পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকালো সে। ছোট্ট একটা বাচ্চা চোখ বুঁজে ঘুমিয়ে আছে। শরীরটা বরফের মতোই ফর্সা। ফারিস অনুভব করলো তার বুক কাঁপছে অনবরত। হাত বাড়িয়ে বাচ্চাটাকে ছুঁতে গিয়েই মনে পড়ে গেলো সেদিনের কথা। ইসরাহর হাঁটু অবধি মাটির নিচে পুঁতে রাখার পর যখন তাকে পুনরায় মুক্তি দিয়ে জিলো ফারিস। তখনি মেয়েটা নিজের পেট ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিলো। অবিচল কন্ঠে ঘৃণিত নজরে সে বলেছিলো।

--" আপনি যদি আমার বাচ্চাকে ভুলেও ছুঁয়ে দেন। তবে আমার মরা মুখ দেখবেন ফারিস। আপনার ওই পাপিষ্ঠ হাতে আমার পবিত্র সন্তান কে ভুলে ও স্পর্শ করবেন না।"

বাচ্চাটার নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু শব্দে বলে উঠলো ফারিস।

--" পাপা তোমাকে ভালোবাসে মাম্মা। তবে তোমার মাম্মার থেকে বেশি নয়। সে আমার অনহেলদি অবসেশন। ভালোবাসা আর আসক্তি এক নয় মা। তোমাকে না ছুঁয়ে আমি থাকতে পারবো। কিন্তু তোমার মাম্মা কে আমি হারিয়ে ফেলতে পারবো না। আমার লিটল গার্লের জন্য আমি সব করতে পারবো।"

--" পাপিষ্ঠ পুরুষ হয়, বাবারা পাপিষ্ঠ হয় না ফারিস। আপনি আপনার সন্তান কে কোলে নিতে পারেন। আমার আপত্তি নেই।"

ফারিসের কথা শেষ হওয়া মাত্র, পেছন থেকে ইসরাহর কথা গুলো ভেসে এলো। অতর্কিতে ঘুরে দাঁড়ালো ফারিস। ইসরাহ চোখ মেলে তার দিকে তাকিয়ে আছে। ইসরাহর দৃষ্টির মানে বুঝলো না সে। কিন্তু সহসা ইসরাহকে মুচকি হাসতে দেখে যা বোঝার বুঝে গেলো ফারিস। ফের ঘুরে কাঁপা কাঁপা হাতে দোলনা থেকে ছোট্ট প্রাণটাকে হাতে তুলে নিলো সে। চোখ টলমল করছে তার। তার সন্তান, এই বাচ্চা ফারিস জাওয়ানের। ফারিসের ইচ্ছে করলো চিৎকার করে পৃথিবীকে জানাতে।

--" রব ফারিসের এক মা কে নিয়ে অপর মা কে দান করেছেন। ফারিসের দুটো আপন মানুষ হয়েছে। তার সন্তান আছে। ছন্নছাড়া বদমেজাজি ফারিসের সংসার হয়েছে।"

লাল চোখে ইসরাহর দিকে তাকালো ফারিস। কম্পমান কন্ঠে সে প্রশ্ন করলো;-

--" আমি ওর নাম রাখি?"

--" রাখুন।"

--" ওর নাম ফারিস্তা জাওয়ান সিকদার। আমার জান বাচ্চা। বাবা তোমাকে খুব ভালোবাসে মা।"

এলোমেলো ভাবে নিজের সন্তানের মুখে স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিলো সদ্য বাবার হওয়ার সাধ পাওয়া এক বলিষ্ঠ পুরুষ। হসপিটালের বেডে শুয়ে মুদির চোখে সেই মূহুর্ত উপভোগ করলো ইসরাহ। ফারিসের অশ্রুসজল অক্ষিযুগল দেখে নিজেকে সামলাতে পারলো না ইসরাহ। তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দু'ফোঁটা তপ্ত জল।

--" এদিকে আসুন ফারিস জাওয়ান।"

ইসরাহর গমগমে কন্ঠের ডাকে ফারিস থতমত খেলো। পর পর কৈফিয়তের স্বরে জবাব দিলো সে;-

--" আমাকে শেষ বারের মতো ক্ষমা করো লিটল জান। তোমার রব তো আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। তবে তুমি কার্পণ্য করছো কেন কুইন।"

--" আপনাকে আমি এদিকে আসতে বলেছি।"

বেবি কটে বেবিকে রেখে নত মস্তকে ইসরাহ কাছে এসে দাঁড়ালো ফারিস। ফারিস এমন দশা থেকে ঠোঁট টিপে হাসলো ইসরাহ।

--" আমাকে বসিয়ে দিন তো। তারপর চোখ বন্ধ করে দাঁড়ান।"

ইসরাহর কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করলো ফারিস।

--" ফারিস্তার পাপাকে তার মা অপরিসীম ভালোবাসায় আঁকড়ে রেখেছে। তার সমস্ত ভুল, সমস্ত পাপ, সবই সে নির্দ্বিধায় মেনে নিয়েছেন। আমি মিসেস জাওয়ান, মিস্টার ফারিস জাওয়ানকে ভালোবেসেছি এক নিঃশর্ত, অতল গভীরতায়। সে জাদু বিদ্যায় পারদর্শী হোক কিংবা র*ক্তে হাত রঞ্জিত অপরাধী তার প্রতিটি সত্তা, প্রতিটি রূপ আমি সাদরে কবুল করে নিলাম।"

হঠাৎ নিজের কোমরে ইসরাহর হাতের বাঁধনের অস্তিত্বের পাশাপাশি; বুকে মাথা ঠেকিয়ে উপরোক্ত কথা গুলো বলতে শুনে ভীষণ চমকে উঠলে ও চোখ মেললো না সে। বরং ইসরাহ কে চেপে ধরলো নিজের সাথে।

--" তুমি আমার র*ক্ত ধারায় অজান্তেই মিশে যাওয়া এক অনিবার্য আসক্তি, লিটল কুইন। তাই তোমাকে ভালোবাসার ইচ্ছা কোনোদিন লালন করিনি আমি। কারণ এ জন্ম হোক কিংবা অনন্ত পরকাল, তুমিই ফারিস জাওয়ানের অস্তিত্বে অনিবার্য।"

She is my Obsession গল্পটি নবনীতা চৌধুরী-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সাসপেন্স-এ মাতানো রোমান্টিক থ্রিলার