She is my Obsession

পর্ব - ৪৩

🟢

--" আপনি আমাকে এখন আর ভালোবাসেন না ফারিস। আপনি বদলে গেছেন। আপনি....."

ইসরাহর নিভে আসা কণ্ঠের কথা গুলো ফারিসের কানে পৌঁছালে ও সে কোনো প্রতিক্রিয়া করল না। সাবধানী হাতে ইসরাহর কপালের কাটা অংশ থেকে কাঁচের টুকরো গুলো বের করে নিল সে। তারপর জায়গা টা অ্যান্টিসেপটিক দিয়ে পরিষ্কার করে। দুটো ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ আড়াআড়ি ভাবে লাগিয়ে দিল কপালে। ইসরাহ ততক্ষণে অচেতন হয়ে পড়েছে।

ইসরাহর পোশাক পাল্টাতে ফারিসের ঘণ্টা আধেকের মতো সময় লেগে গেল। শেষ পর্যন্ত বার্থটাব থেকে আলতো হাতে তাকে তুলে এনে বিছানায় শুইয়ে দিল ফারিস। এই অল্প সময়টুকুতেই যেন বেশ নাকাল হতে হলো তাকে। অচেতন অবস্থাতে ও ইসরাহ কম ঝামেলা করেনি। কখনো হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিয়েছে ফারিস অপ্রত্যাশিত অঙ্গ। কখনো অস্পষ্ট ভাবে কিছু বিড়বিড় করেছে সে। তবুও ধৈর্য হারায়নি ফারিস। সবটা সামলে শেষ পর্যন্ত মেয়েটাকে এনে শুইয়ে দিল।

তারপর নিজেও পোশাক বদলে নিল দ্রুত। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে দেখল ঘুমন্ত ইসরাহর দিকে। অতঃপর নিঃশব্দ পায়ে ঘর ছেড়ে রান্না ঘরের দিকে চলে গেল সে, রাতের খাবারের ব্যবস্থা করতে। আজ সারাদিনে ইসরাহর কিছুই খাওয়া হয়নি।

শেষ বার সকালে ফারিস নিজে বসে তাকে ব্রেকফাস্ট করিয়ে গিয়েছিল।

__________

টিপটিপ করে চোখ মেলল ইসরাহ। চৈতন্য ফিরতেই যেন মাথার ভেতর তীব্র ব্যথার ঢেউ উঠল।

কপালের একাংশ চেপে ধরে চোখ কুঁচকে আবার বন্ধ করে ফেলল সে। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে, নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা চালালো ইসরাহ। ধীরে ধীরে চোখ খুলে উঠে বসল সে। বেড সাইড ল্যাম্পের মৃদু আলোয় রুম জ্বল জ্বল করছে। হলদেটে নিয়ন আলোয় ঘরের কালো রঙের ফার্নিচার গুলো মৃদু চকচক করছে। যেন নিস্তব্ধতার মাঝে ও তাদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে ফার্নিচার গুলো।

পাশ ফিরে তাকিয়ে ফারিস কে কোথাও দেখতে পেল না ইসরাহ। মাথার যন্ত্রণা সামলাতে কপাল চেপে ধরল সে। পায়ের উপর থেকে কমফোর্টার সরিয়ে ধীরে পায়ে বিছানা থেকে নেমে পড়ল ইসরাহ। দরজার দিকে এগোতেই বেড সাইড টেবিলে রাখা ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠলো। ফোনের তীক্ষ্ণ রিংটোনে থমকে দাঁড়ালো ইসরাহ। পেছন ফিরে তাকালো সে। ফোনটা অবিরাম কেঁপে কেঁপে বেজে উঠছে।

তবুও এগিয়ে গেলো না। প্রথমবারে কলটা নিজে থেকেই কেটে গেল। ইসরাহ আবার দরজার দিকে পা বাড়ালো। তখনই পুনরায় বেজে উঠলো ফোনটা। রুমের নিস্তব্ধতায় রিংটোনের শব্দ তাকে ফের থামতে বাধ্য করলো। বিরক্তি নিয়ে পিছিয়ে এসে ফোন হাতে নিলো ইসরাহ। আননোন নাম্বার, কৌতূহল নিয়ে কল রিসিভ করে কানে ধরলো সে।

--" হ্যালো মুনতাসীর?"

ফোনের অপর প্রান্তে থেকে রওনাফের মলিন কন্ঠ পেতেই আঁতকে উঠলো ইসরাহ। অতর্কিত নয়নে দরজার দিকে তাকিয়ে গলার স্বর ছোটো করে জবাব দিলো ইসরাহ।

--" রওনাফ আপনি? আমার নাম্বার পেলেন কোথায়? কল দিয়েছেন কেনো?"

--" সেই কথা পরে বলবো। আগে বলো তোমার হাজবেন্ড কোথায়?"

--" ফারিস নিচে মনে হয়।"

সস্থির শ্বাস চাপলো রওনাফ। কিছুক্ষণ চুপ থেকে পুনরায় বললো সে।

--" তুমি কোন ফ্লোরে আছো এখন?"

--" সেকেন্ড ফ্লোরে।"

--" কোন রুমে?"

--" কেনো?"

শুকনো ঢোক গিললো রওনাফ। নার্ভাসনেসে বারবার গলা শুকিয়ে আসছে তার। ইসরাহর সঙ্গে কথা বলতে গেলেই এমন হয় — বুকের ভেতর হৃদযন্ত্র টা যেন অকারণে দ্রুত ধুকপুক করতে থাকে। হয়তো মনের কোনো গোপন কোণে এখনো রয়ে যাওয়া সূক্ষ্ম ভালোবাসার কারণেই এমনটা হয়। তার ভালোবাসায় তো কোনো খুঁত ছিল না। সে সত্যিই ইসরাহ কে ভালোবেসে ছিল। কিন্তু ভালোবাসার মানুষটির যে এমন এক অতীত আছে। তা কখনো কল্পনা ও করেনি সে।

ভাবনার জগৎ থেকে নিজেকে টেনে বের করে আনলো রওনাফ। আর কথা না পেঁচিয়ে ধীর স্বরে জিজ্ঞেস করলো;-

--" বাংলাদেশে ফিরে যাবে?"

রওনাফের কথায় চমকে উঠলো ইসরাহ। সর্তক চোখে আরেক বার দরজার দিকে তাকালো। কখন না ফারিস এসে যায়। তবে যে রওনাফের রক্ষা থাকবে না।

--" হ্যালো?"

--" ফারিস জানতে পারলে আপনাকে মেরে ফেলবে রওনাফ।"

মলিন হাসলো রওনাফ,

--" তোমাকে ভালোবেসে কবেই আমি মরে গেছি মুনতাসীর। সেই খবর কি তুমি রেখেছো? তবে দেহের মৃত্যুতে ভয় কিসে?"

মনে মনে আওড়ানো কথা গুলো ইসরাহ কে বলা হলো না তার। যদি অস্বস্তি বোধ হয় ইসরাহর! তখন তো কণ্ঠস্বর ও শোনা হবে না আর রওনাফের।

--" ভেবো না। আমার কিছু হবে না।"

--" আমি ভেবে বলবো।"

--" রাখছি তবে, ভেবে আমাকে জানিও। যদি ফিরে যেতে চাও! তবে তোমার পার্সপোট, ভিসা সব খুঁজে নিও। আমি রাতে এসে তোমাকে নিয়ে যাবো।"

--" টিকেট?"

--" দুটো টিকেট কেটে নিয়েছি।"

কথা শেষ হতেই কল কেটে দিলো রওনাফ। ফোনটা ধীরে ধীরে কান থেকে নামিয়ে হাতের মুঠোয় নিলো ইসরাহ। চোখ দুটো বন্ধ করে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইলো সে। সদ্য শেষ হওয়া কথোপকথনের শব্দ গুলো এখনো তার কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

--" উঠে পড়েছো, লিটল কুইন?"

পরিচিত কণ্ঠ স্বর শুনে চমকে চোখ খুলে তাকালো সে। অদূরে দাঁড়িয়ে আছে ফারিস। হাতে খাবারে ভরা ট্রে। ইসরাহর চমকে ওঠা মুখশ্রী দেখে মৃদু হেসে এগিয়ে এসে, সেন্টার টেবিলের উপর ট্রে-টা রেখে দিলো সে। অতঃপর, এক মুহূর্ত দেরি না করে ইসরাহর কাছে এগিয়ে গেল ফারিস। ঠোঁটে সেই চিরচেনা মায়াময় হাসি টেনে আলতো করে তাকে নিজের বাহু বন্ধনে টেনে নিলো ফারিস।

--" ভয় পেয়েছো? হঠাৎ, কথা বলায়?"

ইসরাহর জবাব দিলো না। তবে তার হাত জোড়া ইতিমধ্যে ফারিসের পিঠে উঠে এসেছে। ফোনটা হাত থেকে ছেড়ে দিয়ে শক্ত করে ফারিসের পিঠ খামছে ধরলো ইসরাহ। নাক ডুবিয়ে দিলো ফারিসের উদোম বক্ষবিভাজনে। মেয়েটা কি ফারিসের বক্ষ কপাটে লুকিয়ে পড়বার ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে নাকি? কে জানি! ইসরাহর হাতের শক্ত আলিঙ্গনে ফারিস চমকালো। তাদের মধ্যকার শেষ দূরত্বটুকু গুছিয়ে দরদ মেশানো কন্ঠে ইসরাহ বললো;-

--" একবার ভালোবাসি বলবেন ফারিস?"

প্রফুল্ল হেসে ফারিস সুধালো;-

--" তোমার সঙ্গে ভালোবাসা শব্দটা ঠিক মানায় না, লিটল গার্ল। তুমি আমার জন্য ভালোবাসা নও — তুমি আমার এক অস্বাস্থ্যকর আসক্তি… my unhealthy obsession।"

--" তবুও বলুন, একবার বলুন শুধু।"

ইসরাহ যে শব্দটি শোনার নিমিত্তে অন্তর ভরে অপেক্ষা করছিল, সেই শব্দটি ফারিসের ঠোঁট ছুঁয়ে আর বেরোল না। নীরবতার আবরণে ঢেকে রেখে সে অলগোছে ইসরাহ কে সোফায় এনে বসিয়ে দিলো। তারপর স্যুপের বাটিটা হাতে তুলে নিলো ফারিস। চামচে সামান্য স্যুপ তুলে আলতো করে ফুঁ দিলো গরমটা কমিয়ে নিতে। পরক্ষণেই সেই চামচ এগিয়ে ধরলো ইসরাহর মুখের সামনে।

ইসরাহ টলমলে চোখে তাকিয়ে রইলো তার সামনে মেঝেতে বসে থাকা সুদর্শন পুরুষের দিকে। সেই দৃষ্টিতে ছিল অভিমান, আকাঙ্ক্ষা আর অসহায়তা। তবু কিছু না বলে ধীরে মুখ বাড়িয়ে স্যুপটা গ্রহণ করলো সে। খাওয়ার মাঝেই আচমকা চোখের কোণে জমে উঠলো জল। মুক্তোর দানার মতো স্বচ্ছ দু’ফোঁটা অশ্রু নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়লো তার গাল বেয়ে ভালোবাসার এক অব্যক্ত ভাষা হয়ে।

-------------

অন্ধকারের মাঝে ড্রিম লাইটের মিটিমিটি আলোয় ফারিসের মুখাবয়ব অবলোকন করছে ইসরাহ।

ঘুমন্ত ফারিস কে বড্ড নিষ্পাপ লাগছে। পিঠ উপরের দিকে দিয়ে কোমর অব্দি কমর্ফোটার টেনে ঘুমাচ্ছে ফারিস। মুখটা ইসরাহর দিকে রাখা। ফারিসের সব সময় কুঁচকে থাকা ভ্রু-দ্বয় বর্তমানে সমান হয়ে আছে। হাত এগিয়ে ফারিসের চুলে বিলি কেটে দিলো ইসরাহ। পর পর কমর্ফোটার সরিয়ে ঠান্ডা মেঝেতে পা রাখলো সে। মূহুর্তে ঠান্ডায় শির শির করে উঠলো ইসরাহর পুরো শরীর। ঠান্ডার পরোয়া না করে নিঃশব্দে দরজা খুলে রুম থেকে বেরিয়ে এলো।

এখন প্রায় শেষ রাত। পাশের জঙ্গল থেকে অচেনা জন্তু, জানোয়ারের ডাক ভেসে আসছে। সেসব শব্দে ও আজ তার ভয় করছে না।

লম্বা বারান্দার শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়াল ইসরাহ। এক মুহূর্ত দেরি না করে নিঃশব্দে দরজা খুলে ঢুকে পড়ল ফারিসের পেইন্টিং রুমে। বিশাল রুমটা অন্ধকারে চেয়ে আছে। বাতি জ্বালানোর প্রয়োজন ও অনুভব করল না সে। অন্ধকারের মধ্যেই অভ্যস্ত ভঙ্গিতে হাতড়ে হাতড়ে দরজার পাশের ঝুড়িটা খুঁজে নিলো ইসরাহ। অতঃপর সেখান থেকে বের করল একগুচ্ছ শক্ত রশি।

গাঢ় লাল রঙের রশিটা হাতে নিয়েই বোঝা যায়—এটা সাধারণ কোনো রশি নয়। জাইলন ফাইবারে তৈরি, পৃথিবীর সবচেয়ে শক্ত রশি গুলোর অন্যতম। বেশ মোটা, এবং দৃঢ়; তবু ছোঁয়ায় অদ্ভুত রকম মসৃণ। যেন শক্তির ভেতরেও কোথাও লুকিয়ে আছে নিখুঁত কারুকার্য। ফারিসের সংগ্রহে এমন আরও কয়েক গুচ্ছ রশি আছে বটে। আলাদা আলাদা রঙ, গঠন আর বুননে তৈরি সেগুলো। কিন্তু শক্তি আর দামের দিক দিয়ে এই লাল রশিটাই সবচেয়ে ব্যতিক্রমী।

তবে একটা প্রশ্নের উত্তর এতোদিনে ও ইসরাহর জানা হয়নি। ফারিস কেন এমন রশি সংগ্রহ করে? শখ, নাকি এর পেছনে ও লুকিয়ে আছে অন্য কোনো কারণ! বরাবর এই প্রশ্ন ফারিস এড়িয়ে গেছে। রশির গুচ্ছটা হাতে নিয়ে রুমে ফিরলো ইসরাহ। বিছানায় চোখ রেখে এগিয়ে এলো সে। ফারিস এখনো সেভাবেই ঘুমিয়ে আছে। বহু কষ্টে ফারিস কে চিত করে শুয়ালো ইসরাহ। নড়চড়ে একবার চোখ খুললো ফারিস। তা দেখে বিছানার পাশে ঝুঁকে বসে পড়লো ইসরাহ।

ফারিস উঠলো না। তা দেখে দীর্ঘ শ্বাস চেপে দ্রুত হাত চালালো ইসরাহ। কাঁচি দিয়ে রশির গুচ্ছটাকে দু'ভাগ করে। প্রথম অংশ দিয়ে ফারিস হাত বেঁধে, দ্বিতীয় ভাগ দিয়ে পা বাঁধায় উদ্ধত হলো ইসরাহ।

রশিতে শেষ গিঁট টা দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো সে।

--" আপনাকে বাঁধার জন্য, আমাকে ক্ষমা করবেন ফারিস। আমি ও আপনাকে ভালোবাসি। তবে আপনার এমন পাপিষ্ঠ মন মানসিকতা নিয়ে আমি আপনার সাথে থাকতে পারবো না। আমাদের সন্তান এমন পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারবে না ফারিস। তার জন্য এই পরিবেশ সঠিক নয়।

She is my Obsession গল্পটি নবনীতা চৌধুরী-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সাসপেন্স-এ মাতানো রোমান্টিক থ্রিলার