She is my Obsession

পর্ব - ৩৮

🟢

তড়িৎ গতিতে পা ফেলে দোতলায় এলো ফারিস। রিজভি নিচতলার লাইব্রেরিতে ইসরাহ কে খুঁজতে গেলো। দোতলার সবকটা রুম খুঁজে; সিঁড়ির কাছে এসে থামলো ফারিস। রিজভি দুই সিঁড়ি করে লাফ দিয়ে উঠে এসে ফারিসের পাশে দাঁড়ালো। হয়রান কন্ঠে সুধালো সে;-

--" বস, ম্যামের কোথাও যাওয়ার ছিলো নাকি?"

রিজভির প্রশ্নে, ফারিস বন্ধ চোখে চুপ করে রইলো। তার কপালের রগ গুলো ফুলে ফেঁপে উঠেছে। বার বার ঢোক গিলছে। যার দরুন অস্থির গতিতে গলার কণ্ঠাস্থি নড়ছে। রিজভি দরদরিয়ে ঘেমে উঠলো। ফারিসের এমন নির্লিপ্ততা তার চিত্তে ভয় জমাচ্ছে। ফারিসের এমন চুপ থাকা মানে ভয়ংকর কিছু ঘটবে। আজ পর্যন্ত যতবার ফারিস বিপদে পড়ে চুপ থেকেছে। ততো বার চিলেকোঠার ঘরে নতুন একটা পেন্টিং যোগ হয়েছে। কিন্তু ইসরাহর ক্ষেত্রে তা হবে না। তবে?

রিভজির ভাবনার মাঝে ফারিস শান্ত স্বরে বললো;-

--" এদিকে এসো রিজভি।"

ভয় ভয় নিয়ে রিজভি জিজ্ঞেস করলো;-

--" কেনো বস?"

--" তোকে চুমু খাবো। আমার বউ তো পালিয়েছে তোর বেশি বোঝার চক্করে। তাই এখন আমার হট লাগছে। চল আয়?"

মুখ কুঁচকে লাফিয়ে সরে গেলো রিজভি। হাত চেপে ধরলো ঠোঁটে। ভয়াতুর চোখে বললো সে;-

--" ছিঃ বস আমি গে না। আমি পিউর ছেলে। আমার বউ ছাড়া আর কাউকে চুমু খাবো না। আপনাকে ও না।"

--" একটা লাথি মারলে বুঝবি তুই কি।"

--" রিল্যাক্সড ব..."

রিজভি পুরো কথাতে সমাপ্তি টানার আগেই ফারিস গর্জে উঠলো।

--" উপওয়ালার দোহাই লাগে রিজভি। তুই মুখ খুলিস না। খুন করে ফেলবো। তোকে বলেছিলাম গেটে লক করে যা। তুই শুনিস নি আমার কথা।"

মুখে আঙুল চেপে, চুপ করে রইলো রিজভি। ইসরাহর ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করার জন্য। পকেট থেকে ফোন বের করলো ফারিস। ইসরাহর ফোনের লোকেশন শো করতেই কপালে ভাঁজ সৃষ্টি হলো তার। ফোনের লোকেশন চিলেকোঠার রুমে দেখাচ্ছে। ফারিস দাঁড়ালো না। চার লাফে সিঁড়ি ছেড়ে নেমে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লো সে। রিজভি ঘটনার আকস্মিকতা বুঝতে না পেরে ফারিসের পেছনে ছুটলো।

--" কোথায় যাচ্ছেন বস?"

--" লিটল গার্ল সব জেনে গেছে রিভজি। ও পালিয়েছে।"

বড় কদমে, ফারিস ততক্ষণে ড্রাইভিং সিটে এসে বসেছে। গলায় ঝুলে থাকা কালো টাইয়ের বাঁধনটা আলতো করে ঢিলে করল সে। পর পর পরণের সাদা শার্টের হাতা দুটো কনুই অব্দি গুঁজে নিলো। সারা দিনের জমে থাকা ক্লান্তিটুকু নিঃসরণের একটু প্রচেষ্টা।রিজভি পাশের সিটে উঠে বসল। মুহূর্তে নীরবতা গাড়ির ভেতরটাকে ভারী করে তুলল। ফারিস চাবি ঘোরাতেই ইঞ্জিনের বিরক্তিকর শব্দ ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। ধীরে ধীরে গাড়িটা সামনে এগিয়ে গেল, বড় বড় গাছের আলো-ছায়া পেরিয়ে অজানা পথের দিকে।

ফারিস, রিজভি দুজনের মুখে চিন্তার ছাপ। রিজভি ফারিসের ভয়ে কিছু বলতে ও পারছে না। হিতে বিপরীত হতে পারে। রাগের মাথায় ফারিস গুলি ও চালাতে পারে। নীরবতা ভেঙে ফারিস নিজেই বললো;-

--" এই এরিয়ার মধ্যে আনুমানিক কয়টা বাড়ি আছে রিজভি।"

--" ম্যাম তো এইখানে কাউকে চিনে না বস।"

--" এন্সার মি,"

ফারিসের ধমকে রিজভি ছোট্ট ঢোক গিললো। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললো;-

--" পনেরো টা।"

--" বাঙালি অ্যাপার্টমেন্ট বা হোটেল?"

--" বাঙালি পরিবার দুই, একটা আছে। আর হোটেল এখানে নেই।"

--" বাঙালি বাড়ি গুলো চিনিস?"

--" জ্বি বস!"

রিজভির উত্তরে, গাড়ির স্পিট বাড়ালো ফারিস।

-------------

সন্ধ্যা পেরিয়ে সময়ের কাঁটা রাতে স্থানান্তরিত হয়েছে।

আলাস্কার তাপমাত্রা বর্তমানে মাইনাস ছাড়িয়েছে। ঘরের ভেতর হিটার চলছে। তবুও শীত বিদ্যমান। ক্ষণে ক্ষণে মৃদ্যু তুষার ঝরছে আকাশ থেকে। রওনাফের ফ্ল্যাটের ড্রয়িং রুমের সোফায় গুটিশুটি মেরে বসে আছে ইসরাহ। গায়ে সাদা চাদর জড়ানো। কিচেন থেকে টুকটাক চামচ নাড়ার শব্দ আসছে। ইসরাহ সেদিকে কিছু সময় তাকিয়ে আবার দরজার দিকে তাকালো। তার মনে হচ্ছে এখনি ফারিস চলে আসবে। এসে দরজায় কড়া নাড়বে। তারপর জোর করে তাকে তুলে নিয়ে যাবে।

রওনাফ দুই কাপ কফি হাতে ইসরাহর সামনের সোফায় এসে বসলো। এক কাপ কপি নিজের হাতে রেখে। অপর কাপ ইসরাহর সামনে রাখলো। কাপ রাখার মৃদ্যু শব্দে ইসরাহর শরীর কেঁপে উঠলো। রওনাফ তা সূক্ষ্ম চোখে পরোখ করলো।

--" মুনতাসীর কফি নাও। শীত কম লাগবে।"

হাতে কফির কাপ তুলে নিলো ইসরাহ। রওনাফ এক চুমুক কফি পান করে নিচু মস্তকে জিজ্ঞেস করলো;-

--" ভয় পাচ্ছো কেন?"

আচমকা রওনাফের প্রশ্নে, আড়ষ্টতায় ইসরাহর কায়াময় ভারী হয়ে উঠল। ফারিস যেমন ই হোক। সে বাইরের মানুষের কাছে তা বলতে চাইছে না। এটা তাদের ব্যক্তিগত বোঝাপড়া। কাউকে বলা মানে সিমপ্যাথি কুড়ানো। রওনাফ ও তার ব্যতিক্রম না। কন্ঠ স্বাভাবিক রেখে ইসরাহ বলে উঠলো;-

--" এমনি।"

--"এমনি নাকি আমাকে বলতে চাইছো না?"

--" দুটোই ধরতে পারেন।"

পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে মলিন হাসলো রওনাফ।

--" থাক বাদ দাও।"

ওদের কথোপকথনের মাঝে হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠল। শব্দটায় ইসরাহ চমকে উঠলো। বিস্ফোরিত চোখে এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল সে। অস্থিরতায় শীতের মাঝে ও তার হাতের তালু ঘেমে উঠল। মূহুর্তে হাত ফসকে কফির কাপটা মেঝেতে খসে পড়ল। উথলে ওঠা গরম কফি পায়ে ছিটকে পড়তেই ব্যথায় চাপা চিৎকার করে উঠল ইসরাহ।

রওনাফ সেকেন্ড ব্যয় না করে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠল। তড়িঘড়ি করে সামনের বোতলে থাকা সাধারণ তাপমাত্রার সবটুকু পানি ইসরাহর পায়ে ঢেলে দিল। যাতে আগুনের উত্তাপ দ্রুত কমে আসে। ব্যথা চেপে ইসরাহ রওনাফের হাত খামছে ধরলো।

--" দয়া করে দরজা খুলবেন না। ফারিস আমাকে নিয়ে যাবে।"

ইসরাহর অপ্রস্তুত ছোঁয়াতে রওনাফ ভড়কালো। সে যথেষ্ট শক্ত মনের পুরুষ। আবেগ, অনুভূতি সহজে তাকে ছুঁতে পারে না। কষ্ট ও চেপে রাখতে পারে। কিন্তু ইসরাহ সামনে এসে দাঁড়ালে রওনাফের কি জানি হয়। চিত্তে ছটফটানি ছড়িয়ে পড়ে। মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দেয়। তড়িৎ বেগে হাত ছাড়িয়ে নিলো রওনাফ।

--" দেখছি কে এলো।"

ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো সে। পিপ হোলে চোখ রেখে আগন্তুকের মুখাবয়ব অবলোকন করলো। অপরিচিত এক পুরুষ। পুরুষ না যুবক! দুটোর মাঝামাঝি। বয়স পঁচিশ কি ছাব্বিশ হবে। লম্বা, চওড়া, বলিষ্ঠ গড়নের শুভ্র এক মানব। রওনাফ ফিরে এলো ইসরাহ নিকট। আশ্বস্ত কন্ঠে বললো সে;-

--" ফারিস আসেনি। তুমি বসো, আমি দেখছি কে এসেছে।"

--" আপনি সিউর?"

--" হুমম।"

কিছুটা স্বস্তির শ্বাস ফেলে; পুনরায় মাথার উপর চাদর টেনে বসলো ইসরাহ। রওনাফ চলে গেলো। দরজা খুলে পুরুষটির উদ্দেশ্যে ইংরেজিতে প্রশ্ন ছুড়লো রওনাফ।

--" ক্যান আই হেল্প ইউ?"

--" আমি বাঙালি, বাংলা বলতে পারেন।"

রওনাফ মুচকি হাসলো। হাত বাড়িয়ে দিলো হ্যান্ডশেক করার নিমিত্তে।

--" আমি রওনাফ ভূঁইয়া।"

--" রিজভি, রিজভি মাহমুদ।"

--" কি সাহায্যে করতে পারি আপনাকে?"

দূর থেকে গাড়িতে বসে সাদা বাতির আলোতে রওনাফ মুখশ্রী দেখতে পেয়ে সোজা হয়ে বসলো ফারিস। দ্রুত গতিতে সিট বেল্ট খুলে গাড়ি থেকে নেমে পড়লো সে। ছুটে এসে বলিষ্ঠ মুঠোয় খাবলে ধরলো রওনাফের কলার। ঘটনার আকস্মিকতায় রওনাফ কয়েক পা পিছিয়ে গেলো। রিজভি ছিটকে পড়লো পাশের দেওয়ালে। হিংস্র কন্ঠে গর্জে উঠলো ফারিস।

--" আমার লিটল গার্ল কোথায় বার্স্টাড?"

রওনাফ ফারিসের হাতের উপর হাত রাখলো। হেচকা টানে সরাতে চাইলো তার হাত। ফারিস ছাড়লো না। বরং মুঠো শক্ত করলো সে। ওদের ধস্তাধস্তির শব্দে ইসরাহ দাঁড়িয়ে পড়লো। কম্পমান কদমে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো সে। কারো পায়ের শব্দ পেয়ে তড়িৎ বেগে রওনাফের পেছনে তাকালো ফারিস। ইসরাহ দাঁড়িয়ে।

ফারিস কে দেখামাত্রই ইসরাহর বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা যেন উন্মত্ত হয়ে উঠলো। ধড়ফড় শব্দে তার শ্বাস এলোমেলো হয়ে গেলো। এক মুহূর্ত ও দেরি না করে। তাড়াহুড়ো করে পাশের বেড রুমে ঢুকে পড়লো ইসরাহ। ভেতর থেকে দরজায় লক তুলে দিয়ে, দরজার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে ধীরে ধীরে ঠান্ডা মেঝেতে বসে পড়লো সে।

ঘরের নিস্তব্ধতার মাঝে তার কানে নিজের হৃদস্পন্দনের শব্দ বাজতে থাকলো। রওনাফ কে ছেড়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়লো ফারিস। তার পেছনে এলো রিজভি। নিজের রাগ দমিয়ে। আলতো হাতে দরজায় টোকা দিয়ে; আদুরে কন্ঠে ইসরাহ কে ডাকলো ফারিস।

--" লিটল কুইন, প্লিজ ওপেন দ্য ডোর।"

ভেতর থেকে ইসরাহর সাড়া শব্দ পাওয়া গেলো না। ফারিসের বিরক্তি বাড়লো।

--" লিটল গার্ল তোকে দরজা খুলতে বলেছি! আমার রাগ বাড়াস না।"

ফারিস অগ্নি কন্ঠে; বসা ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো ইসরাহ। আশ পাশে এলো মেলো দৃষ্টি নিক্ষেপ করে পালানোর পথ খুঁজলো সে। এই রুম থেকে বেরোনোর কেবল একটাই পথ। হঠাৎ মাথায় বুদ্ধি চাপলো ইসরাহর। এখানের বাড়ি গুলোর জানলা সাধারণত শিক ছাড়া হয়। যার দরুন জানলা টপকে পালানো সহজ। জানলার সাদা পর্দা সরিয়ে কপাটের ছিটকিনি খুললো ইসরাহর। এর মধ্যে আরেক বার ফারিস কন্ঠ ভেসে এলো দরজার ওপাশ থেকে।

--" লিটল গার্ল? দরজা খুলবে নাকি আমি ভেঙে ফেলবো?"

--" আমি আপনার সাথে যাবো না ফারিস।"

--" পাগলামো করো না, লিটল গার্ল। সারা বিকেল ধরে বরফের মধ্যে ছুটোছুটি করেছো। এই ঠান্ডায় বেবির সমস্যা হতে পারে। লক্ষীটি আমার, দরজা খোলো।”

ফারিসের কথায় ভ্রুক্ষেপ করলো না ইসরাহর। বাহিরে জানলার দিকে বরফ পড়ে অনেকটা উঁচু হয়ে আছে। লাফ দিলে ব্যথা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে বরফে শরীর অবশ হয়ে আসতে পারে। এই বরফের কারণে কি বাচ্চার ক্ষতি হতে পারে? তার জানা নেই। ভাবনা রেখে চেয়ারে উঠে জানলার কার্নিশে বসলো ইসরাহ। পর পর বরফের স্তূপে ঝাঁপ দিলো সে। অলক্ষ্যে ইসরাহর পায়ের ধাক্কা খেয়ে চেয়ার টা পড়ে গেলো মেঝেতে। কিছু পড়ার শব্দে ভয় বাড়লো দরজার বাইরে অপেক্ষারত ফারিসের।

মেরুদণ্ড জুড়ে শীতল স্রোত বয়ে গেলো তার। বোকা মেয়ে টা দরজা বন্ধ করে কি করছে কে জানে।

She is my Obsession গল্পটি নবনীতা চৌধুরী-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সাসপেন্স-এ মাতানো রোমান্টিক থ্রিলার