--" এক জীবনে কতো ইচ্ছে পূরণ করতে চাও? যখন একা ছিলে, তখন আমাকে ফাঁকি দিতে পারোনি। তবে আমার সন্তান গর্ভে নিয়ে পালাবে কিভাবে?"
ফারিসের শান্ত কন্ঠের হুমকিতে ও ধমলো না ইসরাহ। বরং ধস্তাধস্তির পরিমাণ বাড়িয়ে দিলো সে। তা দেখে ফারিস পেছনে সরে দাঁড়ালো। চেয়ারের হাতলের সাথে ইসরাহর হাত - পা বাঁধা। রশি গুলো বেশ শক্ত। চামড়া কামড়ে ধরে রেখেছে। নড়াচড়া করতেই হাত পায়ের চামড়ার সাথে টান লাগলো। শরীর আর মনের ব্যথায়। গাল বেয়ে কয়েক ফোঁটা পানি গড়ালো ইসরাহর। ফারিস তা দেখে ও নির্লিপ্তত ভঙ্গিতে জানলার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।
বর্তমানে ঘড়ির কাঁটা বারো টা ছাড়িয়ে গেছে। আলাস্কা জুড়ে পিনপতন নীরবতা। জনবসতি কম তার মধ্যে শীত থাকায় মানুষ নেই রাস্তায়। প্রয়োজনের তাগিদে দিন ছাড়া মানুষ বের ও হয় না ঘর থেকে। তার মধ্যে ফারিসের প্যালেস পাহাড়ের বুকে অবস্থিত। এদিকে তেমন মানুষ আসে না। বরফ পড়ে পাহাড়ি রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে থাকে। ফারিস প্রতিদিন বরফ পরিষ্কার করে ফেলে। আজ তা করা হয়নি। ইসরাহর পেছনে ছুটতে ছুটতে দিন শেষ।
পকেট থেকে ফোন নিয়ে রিজভির নাম্বার কল দিলো ফারিস। দ্বিতীয় বার রিং হতেই কল রিসিভ করলো রিজভি। ডান হাতে ফোন নিয়ে। বাম হাতে স্টিয়ারিং ধরে রিজভি সুধালো;-
--" বলুন বস?"
--" কোথায় তুই? ডাক্তার আনতে গিয়ে কি নিজেই ডাক্তারি পড়া শুরু করেছিস?"
--" আর পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করুন বস। ডাক্তার শালা কে বহুত কষ্টে রাজি করিয়েছি।"
ফোস করে শ্বাস ছাড়লো ফারিস। মাঝে মধ্যে রিজভির এই ভদ্র রূপে সে যারপরনাই বিরক্ত এবং অতিষ্ঠ হয়। নিরুত্তাপ স্বরে ফারিস জবাব দিলো।
--" তোকে কি নতুন করে আবার সব ট্রেনিং দিতে হবে?"
রিজভি পাশে বসা ডাক্তারের দিকে তাকালো। চুল বিহীন পেট মোটা ডাক্তারটাকে গাড়ির হলদেটে বাতির নিচে বড্ড বাজে দেখাচ্ছে। গোল গোল চোখে কান খাড়া করে রিজভি কর ফারিসের কথোপকথন শোনার ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে লোক টা। টাক মাথা টা ঝলঝল করছে হলুদ আলোর সান্নিধ্যে এসে। রিজভির ইচ্ছে করলো ডাক্তারের মাথা টা ফাটিয়ে দিতে। তাহলে যদি একটু ঝলঝলানি কমে।
মনের ইচ্ছে মনে চেপে ডাক্তার কে ধমক দিলো রিজভি।
--" কি শুনছেন এদিকে তাকিয়ে? সোজা চুপচাপ সামনে তাকিয়ে বসুন।"
বিদেশী ডাক্তার টা রিজভির বাংলা ভাষা বুঝলেন না। তিনি তাকিয়ে রইলেন অবাক চোখে।
--" হোয়াট ডিড ইউ সে?"
রিজভি দাঁতে দাঁত চাপলো। ফারিস ফোনের ওপাশ থেকে গমগমে কন্ঠে বলে উঠলো;-
--" আমাকে কলে রেখে ডাক্তারের সাথে খেজুরে আলাপ জুড়েছিস কেন? পাঁচ মিনিট মধ্যে ডাক্তার নিয়ে আয়। নয়তো দুটোকেই মাটিতে পুঁতে দিবো, মাইন্ড ইট!"
--" বস এখানে তো মাটি নেই। সব বরফের তলায় চাপা পড়ে গেছে।"
রিজভির বোকা বোকা কথায় ফারিসের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।
--" পুঁতলে বুঝবি। মাটি আছে নাকি নেই। ইডিয়েট কল রাখ।"
ফারিস কল কেটে দিলো। তা দেখে ভোঁতা মুখে গাড়ির স্পিড বাড়ালো রিজভি। বসের যে মেজাজ বেশ চটেছে। তা ভালোই বুঝেছে রিজভির সরল মন।
___________
কল কেটে ইসরাহর মুখোমুখি চেয়ার টেনে বসলো ফারিস।
আড়মোড়া ভেঙে পরণের সাদা শার্টের সবগুলো বোতাল খুলে নিলো সে। ইসরাহ ছলছল চোখে ফারিসের কাজ দেখছে। ক্ষণ বিলম্ব না করে সাদা শার্ট টা মেঝেতে ছুঁড়ে ফেললো ফারিস। উদোম শরীর চেয়ার ছেড়ে মাথা টা পেছনে হেলিয়ে দিলো সে। ওভাবে থেকেই ফারিস বললো;-
--" কি দেখছো ওভাবে?"
--" দেখছে আমার পেটে থাকা ছোট্ট বাচ্চাটার বাবা কে। আমার বিশ্বাস কে কাঁচের ন্যায় গুড়িয়ে দেওয়া মানুষ টা কে।"
--" দেখে কি বুঝলে?"
ফারিসের অবুঝ কন্ঠের প্রশ্নে কান্না চোখে তাচ্ছিল্যে হাসি ফুটলো ইসরাহর অধরে।
--" সে পাপিষ্ঠ পুরুষ। পাপে তার মন, মস্তিষ্ক সব কালো হয়ে গেছে।"
ইসরাহ থেমে গেল। কয়েক দিন ধরেই সে একটানা বেশি কথা বলতে পারে না— অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। বড় বড় করে শ্বাস নিতে লাগলো সে। ফারিস এবার সোজা হয়ে বসলো। ঝুঁকে হাঁটুতে হাত রেখে, থুতনিতে ভর দিয়ে ইসরাহর চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে বললো;-
--" এতো কিছু দেখলে লিটল কুইন। তোমার জন্য ভালোবাসা দেখোনি?"
দাঁতে দাঁত চেপে ইসরাহ বললো;-
--" আপনি আমাকে ভালোবাসেন? ভালোবাসলে, এই অবস্থায় বাঁধতে পারতেন?"
তার লিটল গার্লের প্রশ্নে ফারিস মুচকি হাসলো।
--" ভালোবাসি বলেই তোমাকে আষ্টে পৃষ্ঠে বাঁধতে চাই লিটল গার্ল। নয়তো আমার একা জীবনে তোমাকে জায়গা দিতাম না।"
--" আমার এই রূপ আছে বলেই ভালোবাসেন?"
--" তোমার যখন আট বছর ছিলো। তখন কি তোমার এই রুপ, যৌবন ছিলো? না এমন ঘন কেশ রাঁশি ছিলো লিটল গার্ল?"
ইসরাহ থমকালো, ফারিসের প্রশ্নের কি জবাব দিবে বুঝতে পারলো না সে।
--" উত্তর নেই তো তোমার কাছে? থাক আমিই বলি।"
--" আমি শুনতে চাইনি।"
হঠাৎ ফারিস দাঁড়িয়ে পড়লো। চেয়ার ছেড়ে ইসরাহর সামনে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো সে। ধীরে ধীরে ইসরাহর কোলে নিজের মাথাটা রাখলো। গভীর দৃষ্টিতে তাকালো তার উদরের দিকে। কালো গাউনের পেটের অংশটা সামান্য ফুলে উঠেছে— স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, তাদের ছোট্ট অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে তার আগমনের খবর। ফারিসের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো। আলতো করে ঝুঁকে জামার ওপর দিয়েই ইসরাহর পেটে এক চুমু এঁকে দিলো সে।
--" তোমাকে শুনতে হবে লিটল কুইন। তোমার জন্য নিজেকে তৈরি করতে এই ফারিস জাওয়ান কে কতো টা কাঠ খড় পোড়াতে হয়েছে। তা তোমাকে জানতে হবে।"
ফারিসের কথা শেষ হতেই দরজায় শব্দ হলো। ফারিস সেদিকে তাকিয়ে ফের ইসরাহর দিকে তাকালো।
--" একটু দেখে আসি কে এসেছে। তুমি বসো লিটল কুইন।"
ফারিস উঠে এসে দরজা কিঞ্চিত ফাঁক করে; দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পড়লো। বাইরে রিজভি দাঁড়িয়ে। তার পেছনে টাক, মোটা সাদা এপ্রোন পরিহিত এক লোক দাঁড়ানো। ফারিস বুঝলো লোকটা ডাক্তার। ভ্রু-দ্বয় কুঁচকে নিলো সে। রিজভি নিচু স্বরে বললো;-
--" বস উনি ডাক্তার।"
--" হুমমমম।"
রিজভি জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে আবার বললো।
--" ম্যাম কোথায় বস? এখানে আছেন? নাকি আপনার রুমে।"
--" এখানে ,"
--" তাহলে জায়গা দিন। ভেতরে যাই।"
--" কেনো?"
ফারিসের প্রশ্নে হকচকিয়ে উঠলো রিজভি। চোখ বড় বড় করে সে তাকিয়ে রইলো ফারিসের মুখ পানে।
--" এখন মুড নেই লিটল গার্ল কে ডাক্তার দেখানোর। নিচে গিয়ে অপেক্ষা কর।"
কথা শেষে, রিজভির মুখের উপর। ধপাস করে দরজা বন্ধ করে দিলো ফারিস। রিজভি বোকা বোকা চোখে তাকিয়ে রইলো দরজার দিকে। অতঃপর, ঘুরে ডাক্তারের উদ্দেশ্যে সুধালো।
--" বস এখন ম্যামের সাথে ব্যস্ত। নিচে চলুন।"
--" হোয়াট?"
--" শালা নিচে চল বোঝাচ্ছি।"
__________
ফিরে এসে ইসরাহর বাঁধন খুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো ফারিস। ইসরাহর টলমলে চোখে সেই দৃশ্য অবলোকন করে বলে উঠলো;-
--" আপনি জাদুকর ফারিস! আপনি শিরকি করেন?!"
ফারিস জবাব দিলো না। ইসরাহ উত্তরের আশায় তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। কিন্তু ফারিসের মধ্যে কোনো হেলদোল দেখা গেলো না। হাতের বাঁধন ছাড়া পেয়ে। রশিতে বাঁধা জায়গাটাতে অপর হাত দিয়ে আলতো স্পর্শ করলো ইসরাহ। ফারিস তারসামনে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে। চোখ জোড়া মেঝেতে নিবদ্ধ। ব্যথা ভুলে উঠে দাঁড়ালো ইসরাহ। কঠিন স্বরে বলে উঠলো সে;-
--" আমাকে ঠকালেন ফারিস? এতোটা নিখুঁত ভাবে? আরে, আপনি বরের অধিকার নিয়ে আমার সামনে দাঁড়ালে; নিদ্বির্ধায় আপনাকে গ্রহণ করতাম। তবে কেন মিথ্যা ছলনার পথ বেছে নিলেন? খুব প্রয়োজন ছিলো?"
দু'হাতের মুঠোয় নিজের চুল গুলো টেনে ধরলো ইসরাহ। চিৎকার করে মেঝেতে বসে পড়লো সে।
--" কেন ফারিস? আমাকে ধ্বংস করার আর কোনো মাধ্যম ছিল না? ভালোবাসার তলোয়ারের আঘাতে এভাবে চিহ্ন বিচ্ছিন্ন করে দিলেন?"
ফারিস চোখে দেখা দিলো পানির অস্তিত্ব। ইসরাহর কষ্ট তার সহ্য হচ্ছে না।