--" আমি এতোটা অপমান আশা করিনি বস। আপনি আজ থেকে ডাক্তারকেই রেখে দিন আমার জায়গায়। এই অপমান সহনীয় নয়।"
সোফা থেকে কুশন তুলে রিজভির দিকে ছুঁড়ে মারলো ফারিস।
--" রিজভি!"
ফারিসের ধমকে, মলিন মুখে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো রিজভি।
--" ডাক্তার কে জাগা।"
কথা শেষে ইসরাহ পাশের সোফায় গিয়ে বসে পড়লো ফারিস। ক্লান্তিতে মাথা এলিয়ে দিলো সোফার পিঠের সঙ্গে। চোখ জোড়া আবার ও বন্ধ করে নিলো সে। ইসরাহ চুপটি করে বসে আছে। মাথার ভেতর ফারিসের বলা কথা গুলো ঘুরপাক খাচ্ছে তার। ফারিসের সেই র*ক্তিম চক্ষু মিথ্যা বলতে পারে না। এই বিশ্বাস তাকে বার বার নাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু যে পুরুষ জাদুবিদ্যায় পারদর্শী, সে কি সত্যিই সৎ হতে পারে?
বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দোলাচলে তার মন-মস্তিষ্ক দুই ই যেন অবশ হয়ে এসেছে।
ঘুম থেকে উঠে এসে ইসরাহর নার্ভ পরীক্ষা করা শুরু করলো ডাক্তার। একে একে শরীরের তাপমাত্রা, চোখ, জিভ — সব দেখা শেষে। ডাক্তার কিছু ভিটামিন ক্যাপসুল লিখে দিলো তাকে। চেকআপ শেষে, ডাক্তার কে সাথে নিয়ে রিজভি তাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে বেরিয়ে গেল। ওরা দুজন বের হতেই সোফা ছাড়লো ফারিস। উপরে যাওয়ার আগে নিরেট কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো সে—
--" কি ঠিক করেছো? আবার পালাবে নাকি লিটল গার্ল?"
ফারিসের কথায় চোখ তুলে তাকালো ইসরাহ। তার গাল সাদা হয়ে গেছে। যেনো র*ক্তহীনা কোনো প্রাণী বসে আছে ফারিসের সামনে। সব টা দেখে ও আগ বাড়িয়ে কিছু বললো না সে।
--" আমার থেকে আর কি কি লুকিয়ে রেখেছেন আপনি, ফারিস?"
--" তুমি আর কি জানতে চাও?"
--" এতো গুলো মানুষ খুন করে ছিলেন কেন?"
নিস্তব্ধ রুমে ইসরাহর কণ্ঠ স্বর অস্বাভাবিক কঠিন শোনালো। কথা গুলো দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এলো। তবুও ফারিসের চোখে অস্বস্তির চিহ্ন দেখা গেলো না। আগের মতোই নির্বিকার মুখে জবাব দিলো সে;-
--" তারা সবাই অপরাধী ছিলো।"
--" তাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য আইন ছিলো।"
--" ফারিস জাওয়ানের ডিকশনারিতে আইন বলতে কোনো শব্দ নেই। সে যা তৈরি করে তা ই আইন।"
--" অপরাধী নিজে আইন সৃষ্টি করে? হাসালেন ফারিস। বাবা আপনার এই রূপ দেখলে সহ্য করতে পারবেন?"
--" আমি ভুল কিছু করিনি লিটল গার্ল। ওরা সবাই কোনো না কোনো পাপের সাথে জড়িত ছিলো। শাস্তি দিয়েছি ব্যস।"
--" আপনি ও ভালো কেউ নন।"
ফিচেল হাসি ফুটলো ফারিসের ঠোঁটে। এক হাতে সামনে থাকা সোফাটা টেনে এনে ইসরাহর মুখোমুখি বসে পড়লো সে। ধীর ভঙ্গিতে ইসরাহর থুতনিতে আঙুল ছুঁইয়ে চোখে চোখ রাখলো ফারিস।
--" আজ - কাল বেশ নীতি কথা আওড়াচ্ছো যে। ফারিস জাওয়ান যাদু বিদ্যা ভুলে যায়নি লিটল গার্ল। আমি খুনি হই বা যাদুকর। তোমাকে আমার সাথেই থাকতে হবে। ইচ্ছে হোক কিংবা অনিচ্ছাকৃত ভাবে। তুমি আমার মানে আমার ই।"
নিজের মত স্পষ্ট করে জানিয়ে, উঠে দাঁড়ালো ফারিস। কপালে হাত চেপে কিছুক্ষণ চুপ থেকে; রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সামনে থাকা সিঙ্গেল সোফাটায় সজোরে লাথি মারলো সে। সোফাটা ছিটকে গিয়ে আছড়ে পড়লো টেবিল ল্যাম্পের উপর। মুহূর্তেই কাঁচের ল্যাম্প টা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কাঁচের ছোটো ছোটো টুকরো গুলো ছড়িয়ে পড়লো সাদা টাইলসের মেঝে জুড়ে। মূহুর্তে রুদ্র রূপ ধারণ করলো ফারিস। চোখে ফুটে উঠলো রাগের আভার।
--" তুমি আমার লিটল গার্ল! তুমি চাইলে ও এটাই সত্যি, না চাইলে ও এটাই।"
ইসরাহ চুপ করে রইলো। ফারিসের সঙ্গে এখন কথা বললে। হয়তো হিতে বিপরীত হবে। সেই ভয়ে সে ধীর পায়ে দোতলায় উঠে গেলো। নিজের রুমে ফিরে কার্বাড থেকে পোশাক তুলে শাওয়ারে ঢুকে পড়লো ইসরাহ। প্রায় ঘণ্টা আধেক পর বের হয়ে এলো সে। চুলের টাওয়াল খুলে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুল গুলো শুকিয়ে নিলো। চুল শুকানোর পর পনিটেল জুটি বেঁধে নিলো ইসরাহ।
লাল লং গ্রাউনটার হাতের হুক গুলো লাগিয়ে পিঠের ফিতে বাঁধতে চেষ্টা চালালো সে। কিন্তু প্রতিবারেই ব্যর্থ হলো ইসরাহ। বিরক্তিতে বিষিয়ে উঠলো তার মন। আজ সব কিছুই অসহ্য লাগছে ইসরাহর। মা কে জড়িয়ে ধরতে খুব ইচ্ছে করছে তার। কিন্তু চাইলেই কিছু কিছু ইচ্ছে পূরণ করা যায় না। জামার ফিতে না বেঁধেই জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো ইসরাহ। ভয়হীন ভাবে জানলার কপাট টা খুলে দিলো সে। শীতের এক পশলা হাওয়া এসে ছুঁয়ে দিলো ইসরাহ কে। আবেশে চোখ বুঁজে নিলো সে।
র*ক্তা*ক্ত হাতে রুমে প্রবেশ করলো ফারিস। জানলার কাছটায় চোখ পড়তেই কপাল কুঁচকে নিলো সে। দ্রুত কদমে এগিয়ে এসে ইসরাহ কে সরিয়ে জানলা বন্ধ করে দিতে উদ্যত হলো সে। ইসরাহ বেশ বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো;-
--" এখন কি জানলা খোলাতে ও আপনার অনুমতি লাগবে ফারিস? এইটুকু স্বাধীনতা ও আপনি আমাকে দিবেন না? আপনার এই বিষাক্ত ভালোবাসায় আমি পাগল হয়ে যাবো।"
অকপটে সুধালো সে;-
-- "তোমার ভালোর জন্য যদি তোমাকে পাগল হতে হয়, আমার কোনো সমস্যা নেই। পাগল বউ নিয়েই থাকতে পারবো আমি। শুধু তুমি থাকলেই হবে।"
ইসরাহ মাথা শক্ত করে ধরলো। ফারিসের এত যত্ন তার গলায় কাঁটা হয়ে লাগছে। মনে হচ্ছে কেউ তার শ্বাসনালিতে ভালোবাসার ফাঁস বেঁধে দিয়েছে।
-- "আপনি পাগল হয়ে গেছেন, ফারিস জাওয়ান। আপনার অন্ধ ভালোবাসা আপনাকে পাগল করে তুলেছে।"
ইসরাহর কথায় ফারিসের মন গললো কিনা কে জানে। ফারিস জবাব দিলো না। নীরবতা পালন করে বেডের কাছে এসে; বেড সাইড টেবিলের ড্রয়ার থেকে ফাস্টএইড বক্স টা বের করলো সে। ফারিসের হাতে র*ক্ত দেখে দ্বিতীয় দফায় উন্মাদ হয়ে উঠলো ইসরাহ।
--" আবার কাকে খুন করেছেন ফারিস?"
ডান হাতে তুলোতে এনটিসেপ্টিক নিয়ে বাম হাতের ক্ষত স্থান পরিষ্কার করাতে মনে নিবেশ করলো ফারিস। যেনো ইসরাহর কথা তার কর্ণপাত হচ্ছে না। এখন পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হাত ব্যান্ডেজ করা।
--" উত্তর দিচ্ছেন না কেন ফারিস। কাকে খুন করেছেন? কার র*ক্ত লেগে আছে আপনার হাতে। ছিঃ,"
এইবারে ও ফারিসের নির্লিপ্ততাতে ইসরাহর মাথায় রাগ চড়ে বসলো। মূহুর্তে সে করে বসলো এক অভাবনীয় কাজ। জানলার পাশ থেকে ফ্লাওয়ার বাস টা নিয়ে কপালের এক পাশে আঘাত করে বসলো সে। ক্ষণ বিলম্ব না হয়ে গলগলিয়ে র*ক্ত প্রবাহিত হতে শুরু করলো তার কপাল বেয়ে। ইসরাহর এমন কাজে হতভম্ব চোখে তাকিয়ে রইলো ফারিস। হুঁশ ফিরতেই ইসরাহ কাছে ছুটে এলো সে। দ্রুত তার হাত থেকে ফ্লাওয়ার বাস টা কেড়ে নিয়ে নিজের বাহুতে টেনে নিলো ইসরাহ কে।
--" লিটল গার্ল, এই জান? তুমি কি করলে এটা?"
কপাল গড়িয়ে নাসারন্ধে র*ক্তের গন্ধ পৌঁছাতেই পেট চেপে বমি করে দিলো ইসরাহ। ফারিসের শরীর ভরে গেলো ইসরাহর বমিতে। তবুও সে ছাড়লো না মেয়েটাকে। বরং আগের থেকে দ্বিগুণ শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তাকে। সময় ব্যয় না করে ইসরাহ কে পাঁজা কোলে তুলে নিলো সে। ওয়াশরুমে ঢুকে বার্থটাবে ইসরাহ কে শুইয়ে দিয়ে। গিজারের ট্যাপ ছেড়ে রুমে ফিরলো ফারিস। ফাস্টএইড বক্স নিয়ে ফিরে গেলো সে। ইসরাহ ততক্ষণে অচেতন হয়ে পড়েছে। বার্থটাবের পানিতে ডুবে গেছে ইসরাহর গলা অবধি।
ফারিস সাবধানে ইসরাহর পাশে গিয়ে বসলো। আলতো হাতে এনটিসেপ্টিক দিয়ে কপালের কাঁটা অংশ পরিষ্কার করে। ইসরাহর মুখে পানির ঝাপটা দিলো সে। পিটপিট করে চোখ মেলে তাকালো ইসরাহ। ক্লান্তিতে ঝাপসা চোখে ফারিস কে দেখে হু হু করে কেঁদে উঠলো সে। ঘোরের মাঝে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলো ফারিসের গলা।
--" আপনি আমাকে এখন আর ভালোবাসেন না ফারিস। আপনি বদলে গেছেন। আপনি....."