দীর্ঘ এক সফরের পর দেশের মাটিতে পা রেখেছে ফারিস জাওয়ান সিকদার। বর্তমানে এয়ারপোর্টের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে। গরমের তোপে শার্টের সাথে মিল রেখে পরা ব্লেজার খুলে হাতে ঝুলিয়েছে ফারিস।
হাতে গোনা ছয় মাস পর সে আবার দেশে ফিরেছে। প্রথম বার যখন ফিরেছিলো। তখন সেপ্টেম্বর মাস চল ছিলো। বর্তমানে মার্চ মাস শেষের দিকে। বেশ ভালোই গরম পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশে। এখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের প্রহরে পড়েছে। তাই মিষ্টি হাওয়া বইছে। তবুও এয়ারপোর্টের ভীড়ের মাঝে বেশি একটা সুবিধা করতে পারলো না সেই মিষ্টি বাতাস। ব্যাগ পত্তর সমেত ফারিসের পাশে এসে দাঁড়ালো রিজভি। তাকে দেখতেই পাশ ফিরলো ফারিস।
--" ক্যাব আসবে কখন?"
--" কাছেই চলে এসেছে বস। আর পাঁচ মিনিট লাগবে। জ্যামের কারণে এগোতে পারছে না।"
রিজভির জবাবে হাত ঘড়িতে চোখ বুলালো ফারিস। সাড়ে আটটা বাজে। এয়ারপোর্ট থেকে সিকদার ভিলার দূরত্ব ঘন্টা আধেকের। জ্যামে পড়লে সময়ের কাঁটা এক ঘন্টা ছাড়াবে। ফারিস সামনে তাকাতেই দেখলো সাদা রঙের একটা ক্যাব এসে দাঁড়ালো ওদের সামনে। ইতি মধ্যে ড্রাইভার নেমে গাড়ির ডিগি খুলে দিয়েছে। ব্যাগ তোলার জন্য। রিজভি এগিয়ে গেলো। হাতের ট্রলি দুটো ডিগিতে তুলে ব্যাক সিটের ডোর খুলে দাঁড়ালো।
--" বস আসুন।"
কথা না বাড়িয়ে বড় বড় পদক্ষেপে ক্যাবের কাছে এসে ক্যাবে উঠে বসলো ফারিস। পর পর রিজভি ও উঠে বসলো। ওরা বসতেই গাড়ির জানলা বন্ধ করে এসি অন করে দিলো ড্রাইভার। রিজভির নির্দেশে গাড়িটি চলতে শুরু করলো। ফারিস শিরদাঁড়া সোজা করে বসে জানলার বাইরে চোখ রাখলো। রাতের শহরে রঙিন বাতির ছড়াছড়ি। কত শত রঙিন বাতি দিয়ে সাজানো হয়েছে রেস্টুরেন্ট গুলোর ভেতরে বাইরে। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই গাড়ি এসে থামলো গন্তব্য।
--" বস, আমরা এসে পড়েছি। নামুন।"
রিজভির ডাকে ধ্যান ভাঙলো ফারিসের। অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে গাড়ি থেকে নেমে পড়লো সে। নেমেই হাঁটা দিলো বাড়ির ভেতরের দিকে। ফারিস কে দেখতে পেয়ে দারোয়ান গেট খুলে দিলো। রিজভি ততক্ষণে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে তার পেছন পেছন পা বাড়িয়েছে। বৃদ্ধ দারোয়ান কিছু বলবে ফারিস কে। তার আগেই সে ঝড়ের বেগে চলে গেলো। দরজায় এসে থামলো ফারিস। কলিং বেল বাজাতেই ভেতর থেকে বৃদ্ধ এক কন্ঠ ভেসে এলো।
--" কে রে? আইতাছি বাপ। কান গেলো রে।"
কন্ঠ টা কানে আসতেই ফারিস বুঝলো; মানুষটা সায়মা খালা। মিনিট দুয়েক পর দরজা খুলে গেলো। ফারিস কে দেখতেই খুশিতে সায়মা খালার চোখ চিকচিক করে উঠলো।
--" আরে সোন্দর ভাই রে। ওমা গো আম্নে কইতে আইলেন ভাই? বৌ...."
--" থামুন আপা। কাউকে ডাকবেন না প্লিজ।"
--" কেরে?"
--" সিক্রেট!"
--" সিগারেট? তুমি সিগারেট খাইবা? তাই সবাই রে না কইতে কইতাছো?"
--" না আপা, সিক্রেট মানে গোপন কথা।"
সায়মা খালা বোকা বোকা হাসলেন। ইতি মধ্যে তিনি কেঁদে দিয়েছেন। যা দেখে ফারিস মুচকি হাসলো।
--" তোমারে আর ইসরাহ আপারে মিসিং করছি।"
--" ভেতরে যাই। রিজভি কে ওর থাকার রুমটা দেখিয়ে দিন।"
--" হ, হ যান। দেখাই দিতাছি ওনারে।"
ফারিস ভেতরে চলে গেলো। ড্রয়িং রুম পেরিয়ে সিঁড়ির টপকে মূহুর্তেই চোখের আড়াল হয়ে গেলো সে। রিজভি পুনরায় ট্রলি দুটোর হাতল মুঠোয় নিয়ে নিলো। সায়মা খালা সামনে সামনে এগিয়ে গেলেন। ওনাকে পেছন পেছন অনুসরণ করলো সে। তিনি দোতলায় এসে ফারিসের পাশের রুমটা দেখিয়ে দিলো রিজভি কে। রুম দেখিয়ে দিয়ে সায়মা খালা নিচে চলে গেলেন রান্নার জোগাড় করতে। ওনাদের জন্য রাতের রান্না হয়ে গেলে ও রিজভি আর ফারিস উপরন্তু এসে উপস্থিত হয়েছে। খাবার বেশি থাকলে ও; ওদের জন্য তিনি আবার আলাদা করে রান্না বসাবেন। ট্রলি গুলো নিয়ে রুমে ঢুকে দরজা ভেজিয়ে দিলো রিজভি।
লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে জম্বেশ ঘুম দিতে হবে। ফ্লাইটে তার ঘুম হয় না। ফারিস ও তার ব্যতিক্রম নয়। দুজনেরই জেগে ছিলো পুরো জার্নিতে। এয়ারপোর্টে অবশ্য কিছুক্ষণ রেস্ট রুমে শুয়ে ছিলো তারা। তাও ঘন্টা দু'য়েকের মতো। না হলে এখন পর্যন্ত শরীর চলত না। মানুষ কিনা।
*********
ইসরাহ গভীর ঘুমে। নকশী কাঁথা টা কোমর অব্দি টানা। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকার ফলে তার মুখশ্রী জুড়ে বিচরণ করে শীতলতার ছোঁয়া।
চিত হয়ে শুয়ে থাকার দরুন তার পেট উঁচু হয়ে আছে। ফারিস নিঃশব্দে রুমে প্রবেশ করলো। রুমে কেবল টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। সোনালী আলোয় ইসরাহ কে দেখে, ফারিসের মনে পড়ে গেলো সেই প্রথম দিনের কথা। পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে ইসরাহ নিকটে বসে পড়লো সে। প্রথম যেদিন বারান্দার দেয়াল টপকে সে ইসরাহর সাথে দেখা করতে এসেছিলো। সেদিন ও সে এইভাবেই ঘুমিয়ে ছিলো। তখন ছিলো নতুন বউ, আজ সে ফারিসের সন্তানের গর্ভধারিণী।
ভাবতে ভাবতে হাসি ফুটে উঠলো তার মেরুন রঙা অধরে। ঘাড় ঘুরিয়ে ইসরাহর উদোর পানে চাইলো ফারিস। দক্ষিণের জানলা দিয়ে সিগন্ধ বাতাস এসে ছুঁয়ে দিলো ফারিস আর ইসরাহ কে। বাতাসের তালে ফারিসের সিল্কি চুল গুলো এলোমেলো হয়ে গেলো। সেদিকে আপাতত খেয়াল নেই তার। তার সম্পূর্ণ ধ্যান, জ্ঞান ইসরাহর উপর। কিঞ্চিত পিছিয়ে বসে মাথা নামিয়ে নিলো সে। ধীরে ধীরে ফারিসের অধর ছুঁয়ে দিলো ইসরাহর উঁচু উদর।
নিজের ঠোঁটের স্পর্শ দিয়ে ফারিস হালকা বিস্ময়ে থমকে গেল। যেন ভেতর থেকে কেউ আলতো করে জানান দিচ্ছে নিজের অস্তিত্ব।
--" পেটের চামড়াটা অতি সূক্ষ্ম ভাবে নড়ে উঠলো না মাত্র?"
নিজ মনে কথা গুলো আওড়ে ইসরাহ দিকে তাকালো সে। শীতল চোখ-মুখ মুহূর্তেই কুঁচকে এলো। ব্যথার হালকা রেখা ছড়িয়ে পড়লো তার অভিব্যক্তিতে। দ্রুত চোখ মেলে তাকালো ইসরাহ। সে নিঃশ্বাস আটকে রেখে পেটের উপর হাত রাখলো, অচেনা অনুভূতিটাকে বুঝতে। ফারিস তৎক্ষণাৎ সোজা হয়ে বসলো, চোখে উদ্বেগ আর বিস্ময়ের মিশেল। তার কণ্ঠ নরম করে জিজ্ঞেস করলো;-
--" ব্যথা পেয়েছো?”
ইসরাহ ধীরে মাথা নেড়ে ফের চোখ বন্ধ করলো। ব্যথাটা খুব গভীর না, কিন্তু অচেনা… নতুন। পেটে সামান্য লেগেছে। তবুও সেই ব্যথার মাঝেই কোথাও যেন এক অদ্ভুত উষ্ণতা, আর অবর্ণনীয় সুখ সুখময় অনুভূতি হচ্ছে তার। সহসা ব্যথা কমতেই ইসরাহর হুঁশ ফিরলো। ধড়মড়িয়ে বিছানায় উঠে বসে পড়লো সে।
--" ফা.....রিস?"
--" ইয়েস লিটল গার্ল?"
--" আপ..নি সত্যিই এখানে বসে আছেন?"
ফারিস স্মিত হাসলো। ইসরাহর হাত টেনে নিজের কোলের কাছে টেনে নিলো তাকে। তার খোলা চুল গুলোতে মুখ গুঁজে দিলো ফারিস। শ্যাম্পু আর কন্ডিশনারের তীব্র মোহিত ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে।
--" একটু আগে শ্যাম্পু করেছো নাকি লিটল কুইন?"
ইসরাহর মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল এক স্রোত নেমে গেল। ফারিসের মায়া, মায়া কথা গুলো তাকে স্বস্তি দেওয়ার বদলে অদ্ভুত এক অস্বস্তিতে ফেলছে। যে মানুষটিকে দূর দেশে বেঁধে রেখে, সে দেশে পালিয়ে এসেছে। তার কাছ থেকে এমন কোমল আচরণ যেন ঠিক মানা যাচ্ছে না। ওর তো রাগ হওয়াটাই তো স্বাভাবিক ছিল। অন্তত কণ্ঠে কিছুটা কঠোরতা থাকা উচিত। সেটাই তো ফারিসের স্বভাব। অথচ সে কিছুই করছে না, অকারণ শান্ত হয়ে আছে। ফারিস এমনই— রাগ যখন চূড়ায় ওঠে, তখনই সে সবচেয়ে বেশি নিস্তব্ধ হয়ে যায়। আর সেই নিস্তব্ধতাই ইসরাহর মনে অস্বস্তির ভার আর ও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
--" উত্তর দিচ্ছো না যে? গলায় জোর পাচ্ছো না বুঝি লিটল গার্ল? পালিয়ে আসার সময় তো বেশ ছুটোছুটি করছিলে!"
ইসরাহ জবাব দিলো না। তার হৃদস্পন্দন দ্রুত গতিতে চলছে। ক্রমেই ফারিসের ছোঁয়া গাড়ো হলো। সহসা ইসরাহ কে কোলে তুলে নিলো ফারিস। ভয়ে ভয়ে ফারিসের পিঠের শার্ট আঁকড়ে ধরলো সে। হাঁটার মাঝে ইসরাহর চোখে চোখ রাখলো ফারিস জাওয়ান। তার সূর্যের অনুরূপ তীক্ষ্ম মণির চোখে দৃষ্টি মেলাতে পারলো না ইসরাহ। গভীর কন্ঠে সুধালো সে;-
--" আমার এখন কি ইচ্ছে করছে জানো লিটল কুইন?"
ভয়ার্ত চোখে ইসরাহ তাকালো।
--" কি....?"
--" তোমার বুক ছিঁড়ে কলিজা টা একটু হাতে নিয়ে দেখতে। আমার লিটল গার্লটার এতো বড় কলিজা হয়েছে যে সে এখন আমার বাচ্চা কে গর্ভে নিয়ে পালাতে ও পারছে??"
অবিলম্বে ইসরাহর গলা শুকিয়ে কাঠ। ফারিস কে এখন তার বেশ ভয় করছে। কাঁদো কাঁদো গলায় ইসরাহ অনুনয় করলো;-
--" আ...আই'ম সরি ফারিস।"
ফিচেল হাসলো ফারিস। ইসরাহর মধ্য ললাটে চুম্বন করে সুধালো সে।
--" তোমাকে একটু মাটির নিচে পুঁতে রাখি প্রিন্সেস? বেশি ব্যথা পাবে না। তোমার উপওয়ালার কসম।"
ইসরাহ এদিক ওদিক তাকালো। বর্তমানে তারা বাগানে অবস্থা করছেন। চাঁদের আলোয় প্রকৃতি ধুয়ে মুছে চকচক করছে। সেই আলোয় ফারিসের ছায়া দৈত্যাকৃতির মনে হচ্ছে। ছাড়া পাওয়ার নিমিত্তে ধস্তাধস্তি শুরু করলো ইসরাহ। ফারিস হাতের বাঁধন শক্ত করলো। এতোটাই শক্ত করে ধরলো সে। যেনো, ইসরাহর হাত অবশ হয়ে এলো।
*******
পায়ের পাতা থেকে হাঁটু পর্যন্ত মাটির নিচে পুঁতে রাখা ইসরাহর। তার কোলেই শুয়ে আছে ফারিস।
দৃষ্টি ইসরাহর মুখের উপর নিবদ্ধ। মিনিট পাঁচেক ধরে তারা এভাবে বসে, শুয়ে আছে। ইসরাহর চোখ টলমল করছে। গাল বেয়ে পানি পড়বে পড়বে করে ও পড়ছে না। ফারিস বেশ উপভোগ করছে বিষয়টা। তার এর থেকে ও বেশি কষ্ট হয়েছিলো। যখন তার লিটল গার্ল তাকে বেঁধে পালিয়ে এসেছিলো। মেয়েটা তাকে বুঝলো না। নিজের সবটুকু দিয়ে, পাগলের মতো ভালোবাসলো বলে। পাগল বলে পালিয়ে এসেছিলো।
মাটির শীতল তোষ ইসরাহর শরীর হিম করে তুলেছে। ফারিস খেয়াল করলো ক্রমশ ইসরাহর হাতটা ঠান্ডা হয়ে আসছে। লাফিয়ে উঠে বসলো সে। উন্মাদের ন্যায় তড়িঘড়ি করে দুই হাতে ইসরাহর পায়ের কাছের মাটি গুলো সরিয়ে নিলো সে। পা ছাড়া পেতে থড়ে প্রাণ ফিরলো ইসরাহর।