--" এক তরফা ভুল বুঝো না লিটল গার্ল। আমার কথাটা শোনো প্লিজ!"
কথা শেষ করে দু’হাতে ইসরাহর বাহু চেপে ধরল ফারিস। সযত্নে তাকে কাঠের চেয়ারে বসিয়ে দিল। নিঃশব্দে উপবিষ্ট হলো ইসরাহ। ফারিস ও হাঁটু গেড়ে বসল তার সামনে।
অবাক লোচনে ইসরাহ পরখ করতে লাগল ফারিস কে। নিত্যদিনের ফারিস আর আজকের ফারিসের মাঝে যেন বিস্তর ফারাক। চোখ দুটি লালাভ, কণ্ঠ স্বর ভাঙা — বারবার শুকনো ঢোক গেলার কারণে। গলার কণ্ঠ নালির উঁচু অংশ কাঁপছে অস্থির ভাবে।
মোহাচ্ছন্নের মতো কাঁপা হাত টা ফারিসের চুলের ভাঁজে ডুবিয়ে দিল ইসরাহ। নিজের চুলে ইসরাহর আঙুলের কোমল বিচরণ টের পেতেই চোখ তুলে তাকাল ফারিস। শক্ত, পোক্ত, গম্ভীর চোয়ালের সেই মানুষটিকে এমন ভঙ্গুর রূপে। অসম্ভব লালাভ বর্ণের অক্ষি যুগল দেখে ইসরাহর বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। টপটপ করে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার গাল বেয়ে। মলিন হাসলো ফারিস। ধরা গলায় সুধালো সে;-
--" কাঁদছো কেন লিটল কুইন?"
--" আপনার কি হয়েছে ফারিস?"
--" আমি কবে নাগাত দেশ ছেড়ে ছিলাম তোমার মনে আছে লিটল গার্ল?"
ফারিসের প্রশ্নে ইসরাহর ভ্রু জোড়া সংকুচিত হয়ে এলো। সত্যি বলতে তার মনে নেই ফারিসের দেশ ছাড়ার বছরের কথা। তখন সে স্রেফ বাচ্চা। ফারিসের সাথে কাটানো দু, একটা স্মৃতি ছাড়া সব কিছুই ঝাপসা। ইসরাহ কে ভাবতে দেখে ফারিস বলে উঠলো।
--" আমি বলছি, দুই হাজার তেরো সালে আমি বাংলাদেশ ছেড়ে ছিলাম। ছেড়েছি বললে ভুল হবে। আমার বাবা আর তোমার মা জোর করে আমেরিকা পাঠিয়ে দিয়ে ছিলেন। অতঃপর আবার ফিরে ছিলাম পঁচিশ সালে। তেরো সাল থেকে পঁচিশ সালে কতোটা বছর হয় জানো লিটল কুইন? বারো বছর। পাক্কা বারো বছর তোমার থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিলাম।"
ফারিস থামলো, মেঝে থেকে উঠে পড়লো। ফের চিলেকোঠার জানলাটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো সে। কাঁচের জানলাতে কুয়াশা জমেছে। কুয়াশার আবরণে বাহিরের সব কিছু ঝাপসা হয়ে উঠেছে গ্লাসে। স্নোফল হচ্ছে বোধ হয়। কে জানি!
--" আমি যখন তোমার চোখের আড়াল হয়েছিলাম। তখন তুমি কেবল মাত্র আট বছরের একটা বাচ্চা মেয়ে। এসব বিয়ে, স্বামী সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণাই ছিলো না। এমনকি বিয়ের কাবিননামাতে ও তোমাকে চকলেটের লোভ দেখিয়ে সাইন নিয়েছিলাম আমি। বড় হওয়ার তালে তালে স্মৃতির পাতা থেকে ফারিস নামক পুরুষটির কথা ভুলে যাওয়াটাই ছিলো স্বাভাবিক।"
ইসরাহ মনোযোগী শ্রোতার ন্যায় চুপটি করে ফারিসের কথা শুনছে।
--" আমি ব্ল্যাক ম্যাজিক চর্চা করি। এটা নিশ্চয়ই জেনে গেছো?"
--" হ্যাঁ,"
ইসরাহর স্পষ্ট উত্তরে ফারিস ঘুরে দাঁড়ালো। লাফিয়ে জানলার কার্নিশে উঠে বসল সে। লাফের ঝোঁকে জানলার ভাঙা কাঁচের অংশে লেগে পিঠ কেটে গেলো তার। ভাঙা কাঁচের খোঁচা উদম পিঠে লাগতেই রক্তিম দাগ ফুটে উঠলো শুভ্র পিঠে। তীব্র যন্ত্রণায় চোখ শক্ত করে বুজে নিলো ফারিস। ফারিসের মুখ ভঙ্গিমা দেখে দ্রুত পায়ে উঠে এলো ইসরাহর।
--" কোথায় ব্যথা পেয়েছেন দেখি? ঘুরুন তো।"
--" কিছু হয়নি। জায়গা মতো বসো গিয়ে।"
ফারিসের গমগমে কন্ঠের কথায় ইসরাহ জেদ ধরলো।
--" দেখান আমাকে। না হলে আপনার কথা আর শুনবো না।"
অগত্যা ফারিস ঘুরে বসলো। ফারিসের পিঠের কাঁটা অংশ দেখতে আঁতকে উঠলো ইসরাহ।
--" কতটা কেটে গেছে দেখুন। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবেন না। অ্যান্টিসেপটিক লাগাতে হবে। নিচে চলুন।"
--" আমার কথা শেষ না করে। আমি কোথাও যাবো না। চেয়ারে গিয়ে বসো লিটল গার্ল।"
--" ফারিস...."
--" বললাম তো। যতো জলদি কথা শেষ হবে। ততো তাড়াতাড়ি নিচে যাবো।"
আগের জায়গায় গিয়ে বসে পড়লো ইসরাহ। তা দেখে ফারিস আবার বলতে শুরু করলো।
--" কতো কতো রাত তোমার জন্য কেঁদেছি জানো লিটল গার্ল। ভালোবাসার মানুষ কে শত, শত মাইল দূরে ফেলে এসে একাকি জঙ্গলে থাকা মুখের কথা না। আমি একটু একটু করে নিজেকে ভেঙে গড়েছি। সেই ভাঙনে আমার মন থেকে এক ইন্ঞি ও বিলীন হতে দেইনি তোমাকে। বরং সে সব দিনে তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা দ্বিগুণ বেড়ে গিয়ে ছিলো। ভালোবাসা থেকে অবসেশনে রূপ নিয়ে ছিলো তা। আর আমি বেঁচে থাকতে আমার অবসেশন কে কি করে অন্য কারো হতে দেইনি? বারো বছর পর হুট করে গিয়ে স্বামীর অধিকার দাবী করলেই তুমি আমাকে মেনে নিতে না। তখন তোমার মা আবার আমাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে চাইতেন। এমনকি আমি ও ফিরতাম না তোমাকে ছাড়া। জোর করে নিয়ে আসতাম আমার সাথে। তা তোমার জন্য ট্রমাটিক হতো।"
ফারিস শেষের কথা গুলো বেশ ধারালো কণ্ঠে বললো। তার চোখে চোখ রাখতেই ইসরাহর শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল।
--" আমি চাইনি তুমি কষ্ট পাও।"
--" আপনি জাদু বিদ্যা শিখে ছিলেন কীভাবে ফারিস?"
--" ওসব বাদ দেই। চলো নিচে যাই।"
ফারিস এগিয়ে এসে ইসরাহ কে কোলে তুলে নিলো। ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে। এক হাতে ইসরাহ কে ধরে, অপর হাতে হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে চিলেকোঠার ঘর থেকে বেরিয়ে এলো দুজনে। সাবধানী পায়ে সিঁড়ি মাড়িয়ে ইসরাহ সুদ্ধু নিচ তলায় নেমে এলো ফারিস। পুরো ড্রয়িং রুমে চোখ বুলিয়ে ডাক্তার আর রিজভি কে খুঁজলো সে। অতঃপর ড্রয়িং রুমের লম্বাটে সোফার দুই কর্ণারে দেখতে পেলো দু'জনের মাথা।
ইসরাহ কে সিঙ্গেল সোফায় বসিয়ে দিয়ে রিজভিদের দিকে এগিয়ে গেলো ফারিস। লং সোফাটার দুই হাতলে মাথা ঠেকিয়ে ঘুমাচ্ছে রিজভি আর ডাক্তার। ওদের এভাবে শুয়ে থাকতে দেখে বিরক্তিতে মুখ দিয়ে ' চ ' সূচক উচ্চারণ করে উঠলো ফারিস।
--" রিজভি উঠো!"
ফারিসের ডাকে ও হেলদোল দেখা গেলো না রিজভির মধ্যে। আগের মতোই শুয়ে রইলো সে। বিরক্তির পরিমাণ বাড়লো ফারিসের। না পারতে নিজেকে সামলে ফের ডাকলো সে।
--" রিজভি? এই উঠবি নাকি লাথি দিবো?"
ফারিসের মৃদু চিৎকারে নড়লো রিজভি। ঘুম ঘুম কন্ঠে বলে উঠলো সে।
--" একটু ঘুমাই না বস। ম্যাম কে খুঁজতে গিয়ে আমি আজ ঘুমাতে পারিনি। ডাক্তার মোটকাটাকে তুলে নিন। আমি উঠছি।"
--" বার্স্টাড উঠবি? না পশ্চাদেশে লাথি বসাবো!"
মূহুর্তেই রিজভির ঘুম উধাও হয়ে গেলো। লাফিয়ে উঠে বসলো সে। উঠে বসে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে ভোঁতা মুখে রিজভি আওড়ালো;-
--" বস! ডাক্তারটাকে ও এমন একটা হুমকি দিন। নয়তো আমি নড়ব না আজ। ওই শালা ও আমার সাথে ঘুমিয়েছে। তাই হুমকি দুজনেরই প্রাপ্য।"
রিজভির বোকা বোকা কথায় কপাল চেপে ধরলো ফারিস। এই ছেলেকে নিয়ে আর পারছে না সে। বয়স চলছে সাতাশ। কিন্তু আচরণ তার সাত বছরের বাচ্চার ন্যায়।
--" ডাক্তার কি তোর সতিন হয়? যে সমান সমান বকা না দিলে তুই উঠবি না? মাস শেষে ডলার নিতে কি ডাক্তার কে ভাগ দিস?"
রিজভির ভোঁতা মুখ চুপসে এইটুকুনি হয়ে গেলো। সে ক্ষুণাক্ষরে ও ভাবেনি ফারিস তার সেলারি নিয়ে খোঁটা দিয়ে বসবে।
--" আমি এতোটা অপমান আশা করিনি বস। আপনি আজ থেকে ডাক্তারকেই রেখে দিন আমার জায়গায়। এই অপমান সহনীয় নয়।"
সোফা থেকে কুশন তুলে রিজভির দিকে ছুঁড়ে মারলো ফারিস।
--" রিজভি!"