আলাস্কার বিলাস বহুল পিচ ঢালা রাস্তাময় ছুটে বেড়াচ্ছে এক রমণী। এই শীতের মধ্য তার পরণে নেই কোনো শীত বস্ত্র।
সাধারণ কালো গাউন পরিহিত মেয়েটির মুখ কালো ওড়নার দ্বারা আবৃত। যেনো কারো থেকে লুকানোর প্রচেষ্টা। ছুটার মাঝেই বরফের উপর পিচ্ছলে পড়ে গেলো সে। মুখ থেকে বেরিয়ে এলো ব্যথাতুর শব্দ। বরফের স্তূপে তার শরীর ধীরে ধীরে দেবে যেতে লাগল। নিজেকে সামলে উঠে বসলো মেয়ে টি।
রাস্তার ল্যাম্প পোস্টের নিয়ণ আলো এসে পড়লো মেয়েটির মুখে। হাত পায়ের বরফ ঝেরে উঠে দাঁড়ালো সে। আগে এই জায়গা থেকে অনেক টা দূরে পালাতে হবে তাকে। নয়তো...নয়তো বাকিটা ভাবতে পারলো না ইসরাহ।
বরফ মাড়িয়ে বহু কষ্টে উঠে দাঁড়ালো সে। পুরো শরীর জমে যাচ্ছে শীতের তোপে। এটা বাংলাদেশ না। এখানে সে কাউকেই চিনে না ফারিস ব্যতীত। কিন্তু সে তো ফারিসের সান্নিধ্য থেকে পালাতে চাইছে। ঘন্টা দুয়েক দৌড়ে ফারিসের প্যালেস থেকে অনেকটা দূরে চলে এসেছে ইসরাহ। এখানে আপাতত সমতল রাস্তা। ফারিসের প্যালেসের দিকটা পাহাড়ি ঢালু পথ। চোখের সামনে সব কিছু কালো হয়ে এলো ইসরাহর।
এদিকটাতে তেমন জন মানব নেই। বহু দূর পর এক দুটো বাড়ি দেখা যায়। শরীরের শেষ শক্তি টুকু জোগার করে উঠে দাঁড়ালো ইসরাহ। তিন মুখো রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে সে। দুই দিকে দুটো রাস্তা গেছে। রাত হওয়ার দরুণ সব কেমন ভুতুড়ে ঠেকলো তার কাছে। জড়তা কাটিয়ে ডান হাতের রাস্তার দিকে পা বাড়ালো সে। ভাগ্যে যা আছে তাই হবে। জাদু বিদ্যা রপ্ত করা এক মানবের কাছে বিলাসি জীবন যাপনের চেয়ে পালিয়ে যাওয়া শ্রেয়।
দৌড়াতে দৌড়াতে মাঝ রাস্তায় এসে দাঁড়ালো ইসরাহ। এখানের রাস্তায় বরফ কম। হাইওয়ে রোড হওয়াতে বরফ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সামনে থেকে দ্রুত গতিতে একটা গাড়ি এগিয়ে আসছে। গাড়ির হেড লাইটের তীক্ষ্ম আলো এসে পড়লো ইসরাহর চোখে। মূহুর্তে চোখ বুঁজে নিলো সে। পা জোড়া নাড়িয়ে পালানোর ক্ষমতাটুকু ও তার হলো না। মূহুর্তে সব কিছু শান্ত হয়ে গেলো। কালো রাস্তাটায় লুটিয়ে পড়লো ইসরাহ কোমল কায়া।
গাড়ির সামনে কাউকে পড়ে যেতে দেখে দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে এলো রওনাফ। মেয়েটির পাশ কাটিয়ে রাস্তায় হাঁটু গেড়ে বসলো সে। মেয়েটি কে নিজের দিকে ফিরিয়ে; মুখের উপর থেকে চুল সরাতে অবাকের তোপে হা হয়ে এলো রওনাফের ওষ্ঠ যুগল। আলগোছে ইসরাহর কে হাঁটুর উপর টেনে নিলো সে। আলতো হাতে গালে চাপড় দিয়ে ডাকলো।
--" মু...মুন..তাসীর?"
রওনাফ দিন দুনিয়া ভুলে ইসরাহর দিকে তাকালো। তার না হওয়া ভালোবাসা এই দূর দেশে তার কোলে শুয়ে আছে। এ যেনো বিশ্বাসের অযোগ্য। মেয়েটা সত্যিই তো? নাকি তার ভ্রম?
--" স্যার আপনি কি যাবেন?"
ক্যাব ড্রাইভারের ডাকে রওনাফের ধ্যান ভাঙলো। ইসরাহ কে নিজের দিকে টেনে নিতে নিতে ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে সুধালো রওনাফ।
--" প্লিজ ওপেন দ্য ডোর।"
ড্রাইভার গাড়ির পেছনের সিটের দরজা খুলে দিলো। রওনাফ দ্রুত পায়ে গাড়িতে চড়ে বসলো ইসরাহ কে নিয়ে। ইসরাহর মাথাটা রাখলো নিজের উরুতে। নিজের ওভারকোট খুলে ইসরাহর গায়ের উপর মেলে দিলো। অতঃপর অফিসিয়ালি ব্যাগ থেকে ছোটো পানির বোতল নিয়ে। পানির ঝাপটা দিলো ইসরাহর মুখে। ধীরে ধীরে চোখ মেললো ইসরাহ। মাথা চেপে আড়মোড়া ভেঙে। রওনাফের ওভারকোট টা আরেকটু টেনে নিলো গলার দিকে। তা দেখে কম্পমান স্বরে তাকে ডাকলো রওনাফ।
--" মুনতাসীর?"
খুব কাছ থেকে পুরুষালি কন্ঠ পেয়ে লাফিয়ে উঠলো ইসরাহ। ওভার কোট টা ইসরাহর গা ঘেঁষে গাড়িতে পড়ে গেলো। রওনাফের দিকে তাকালো ইসরাহ। এক প্রেমিক তার হারানো ভালোবাসার মানুষ কে হঠাৎ দেখে পুলকিত। অন্য জন অচেনা শহরে একটু আশ্রয় খুঁজে পেয়ে অবাক। অনাকাঙিক্ষত এই সাক্ষাত দুজনকেই নির্বাক করে দিয়েছে। নিজের অবাক ভাব লুকানোর চেষ্টা করলো ইসরাহ।
--" রওনাফ? আপনি এখানে?"
--" অফিস শেষে বাড়ি ফিরছিলাম। তখনি তুমি ক্যাবের সম্মুখে এসে পড়লে।"
--" ওহ,"
--" এই ভাবে ছুটছিলে কেন? তোমার, তোমার হাজবেন্ড কোথায়? আশেপাশে থাকো নাকি?"
কথা শেষে ঘাড় ঘুরিয়ে নিলো রওনাফ। চোখ জ্বালা করছে। কান্নারা গলা খামচে ধরেছে। ফারিসের কথা মনে পড়তে অন্তর আত্মা শুকিয়ে এলো তার। প্রশ্নের ধার এড়িয়ে ইসরাহ কথা ঘোরাতে চাইল।
--" আমাকে একটু সাহায্যে করবেন রওনাফ?"
গ্রীবা ঘোরাতে রওনাফের মুখে ফুটে উঠলো বিস্ময় মেশানো একখানা হাসি। সে তো সারাজীবন ইসরাহ কে সাহায্যে করতে চেয়েছিল। আলোর ছটা হয়ে অন্ধকারে ও পাশে থাকতে চেয়েছিলো। তবে আজ সেই সব কিছুই অতীত। দীর্ঘ শ্বাস চেপে বলে উঠলো সে।
--" একবার বলে দেখতেই পারো। তোমার জন্য জীবন কোরবান মুনতাসীর।"
--" আমাকে দেশে ফিরে যেতে সাহায্যে করবেন? আমি দেশে ফিরতে চাইছি। আমার দেশে ফেরাটা খুব জরুরী।"
ঢোক গিললো রওনাফ। ধীর কন্ঠে বললো সে।
--" তোমার হাজবেন্ড? সে কোথায়?"
--" আপনাকে পরে সব বললো রওনাফ। আপাতত আমাকে এইটুকু সাহায্যে করুন।"
--" কবে দেশে ফিরতে চাইছো?"
--" এক সপ্তাহের মধ্যে হলে ভালো হয়।"
--" আচ্ছা। আপাতত কোথায় যাবে?"
শুকিয়ে এলো ইসরাহ মুখ মলিন মুখে জবাব দিলো সে।
--" জানি না।"
--" তুমি চাইলে আমার সাথে যেতে পারো। এক্সট্রা রুম আছে।"
দুজনের মধ্যে আবার নীরবতা ভর করলো। গাড়ি নিজের গতিতে, রওনাফের ফ্ল্যাটের পথে চলেছে। ইসরাহর জানলার কাঁচের সাথে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে। রওনাফ আড় চোখে বার কয়েক ইসরাহ কে দেখে আবার সামনে তাকালো। মেয়ে টা আগের থেকে সুন্দর হয়েছে বেশ। গায়ের রং টা বরফের মতো চিকচিক করছে। রওনাফ মন গোপনে আওড়ালো;-
--" অসম্ভবের প্রতি আমাদের অসম্ভব এক টান। তুমি আমার কাছে মূল্যবান হিরের মতোই নিষিদ্ধ—যার সুরক্ষায় শত প্রহরী নিয়োজিত। তাদের শত প্রহরা ডিঙিয়ে সেই হিরে চুরি করা আমার সাধ্যের বাইরে।"