সন্ধ্যার শেষ ভাগ।
আলাস্কা জুড়ে পিনপতন নীরবতায় ঢেকে গেছে। বড় বড় দালান গুলোতে বাতি জ্বলছে।
হাসপাতালের ফিনাইল আর ডেটলের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ নাসারন্ধে প্রবেশ করতেই চোখ মেলে তাকালো ইসরাহ। পিটপিট করে চোখ মেলে এদিক ওদিক তাকিয়ে নিজের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করলো সে। বাম হাতের শিরায় স্যালাইন চলছে। বিলাশ বহুল সাদা রংয়ের পর্দা দ্বারা আবৃত কেবিনের মাঝে একটা বেড। মাথার উপর সাদা আলোর টিমটিমে বাতি জ্বলছে।
তার পাশের দেয়ালে হিটার সেট করা। স্ট্রেনে স্যালাইন রাখা। পাশের দুজনের বসার মতো একটা সোফা। ইসরাহ হাতে ভর দিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করলো। কিন্তু পারলো না। মাথার পেছনে চিন চিনে ব্যথা করছে। মাথায় হাত দিয়ে বুঝলো কপালে ব্যান্ডেজ করা। ইসরাহ এদিক ওদিক তাকানোর মাঝেই ট্রে হাতে একজন নার্স প্রবেশ করলেন কেবিনে। ইসরাহ কে উঠতে দেখে মৃদ্যু ধমকে উঠলেন তিনি।
--" একি আপনি উঠছেন কেন? এই অবস্থায় নড়চড় করবেন না। স্যালাইনের পাইপে ব্লার্ড উঠে যাবে।"
ইসরাহ শুয়ে পড়লো।
--" আমার হাজবেন্ড কোথায়? ওনাকে একটু ডেকে দিবেন?"
ইসরাহর কথায় ভয় পেলো নার্স টা। টেবিলের উপর ট্রে টা রেখে নিচু স্বরে বললো সে;-
--" উনি বাইরে। বড় স্যার বহু কষ্টে ওনাকে বাইরে আটকে রেখেছিলেন এতক্ষণ। আপনার চেকাপ শেষ করে ওনাকে ভেতরে আসার অনুমতি দিবেন।"
--" কেনো কি করেছেন উনি?"
নার্স টা এগিয়ে এলো ইসরাহর দিকে। হাতে প্রেশারের মেশিনের ফিতে টা বেঁধে নিলো।
--" আমাদের একজন স্টাফের গায়ে হাত তুলেছেন। ওনার অবস্থা জড়সড়।"
ইসরাহর আঁতকে উঠলো।
--" কি বলছেন?"
--" জ্বি ম্যাম, পুলিশ কেস করতে বলায় উনি রিভলবারের বাট দিয়ে কপালে আঘাত করেছে।"
ওদের কথার মাঝেই ডাক্তার প্রবেশ করলেন কেবিনে।
--" এখন কেমন লাগছে মিসেস ফারিস?"
--" ভালো ডাক্তার।"
--" এই অবস্থাতে মাথায় চোট পেলেন কিভাবে? গড ব্লেসড ইউ। বড় সড় কোনো ক্ষতি হলে তো বাচ্চা আঘাত পেতো। ভাগ্য ভালো মেঝেতে পড়ে ও পেটে চোট পাননি।"
ইসরাহর নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারলো না। আচানক ছটপটিয়ে উঠে বসলো সে। ডাক্তার কি ভুল বলেছে? নাকি সে ভুল শুনেছে? বাচ্চা? কার বাচ্চা, কিসের বাচ্চা।
--" কি...বল..লেন ডাক্তার? বাচ্চা মানে?"
--" আপনি পাঁচ সপ্তাহের প্রেগন্যান্ট। জানতেন না?"
অবাকের চরম পর্যায়ে, নিজের পেটে হাত রাখলো ইসরাহ। তার চোখে জ্বালা করছে। কান্না পাচ্ছে। শরীরে অদ্ভুত এক শিহরণ বয়ে যাচ্ছে। এ কেমন অনুভূতি? ইসরাহর তো এর সাথে পরিচিতি নেই! উত্তেজনা আর আনন্দের অদ্ভুত মিশেলে ইসরাহ কথা হারিয়ে ফেললো। পেটে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে নিলো সে।
--" আপনার হেলথ আপাতত ঠিক আছে। আমি মিস্টার ফারিস কে ডেকে দিচ্ছি। ওনার সাথে কথা বলুন।"
ইসরাহ কেবল শুনে গেলো। ডাক্তার আর নার্স বেরিয়ে গেলো কেবিন থেকে। ইসরাহ এখনো তেমন ভাবে বসে আছে। সব কিছু তার কাছে স্বপ্নের মতো ঠেকছে। যেনো ঘুম ভাঙলে ই সব থেমে যাবে। দরজা ঠেলে রুমে প্রবেশ করলো ফারিস। ছিটকিনি দিয়ে দ্রুত পায়ে ইসরাহর শিউরে এসে হুট করে বক্ষবিভাজনের জাপ্টে ধরলো ইসরাহ কে। যেনো ছাড়লেই ইসরাহ হারিয়ে যাবে। বহু ঝড় ঝাপটার পর মেয়েটাকে সে নিজের করে পেয়েছে। মায়ের পর ইসরাহ ই একমাত্র মানুষ যাকে সে নিজের থেকে ও ভালোবাসে। ধীর লয়ে হিসহিসিয়ে ফারিস বললো;-
--" এতক্ষণ অজ্ঞান ছিলে কেন লিটল গার্ল? আমি ভয় পেয়ে ছিলাম তো জান। তুমি ছাড়া ফারিসের আর কে আছে বলো? নিজের যত্ন নিতে বলেছিলাম তো? আঘাত পেলে কি করে? কে ফারিসের কলিজায় হাত দিয়েছে লিটল প্রিন্সেস? জবাব দাও না লিটেল গার্ল?"
ফারিসের বাঁধন এতোটাই দৃঢ় হলো যে। ইসরাহ পিঠে ব্যথা পেলো। হুঁশে ফিরলো ইসরাহ। তড়িৎ বেগে ফারিসের পিঠের শার্ট খামছে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে। ফারিস ব্যতিব্যস্ত হলো। ভাবলো মেয়েটার মাথা ব্যথা করছে? তাই ইসরাহ পিঠে আলতো হাত বুলিয়ে। টপাটপ কটা চুমু খেলো তার মাথায়।
--" মাথা ব্যথা করছে লিটল গার্ল? ভয় পেয়েছো? কিচ্ছু হয়নি দেখো। তুমি তোমার ফারিসের বাহুডোরে আবদ্ধ। আর কোনো ভয় নেই ওয়াইফি। প্রিন্সেস ওপেন ইউর আইজ।"
ইসরাহ মাথা নাড়িয়ে না বোঝালো। যার অর্থ সে ভয় পায়নি। মাথা ও ব্যথা করছে না। কান্নার ধমক সামলে ধরা গলায় ইসরাহ আওড়ালো;-
--" কনগ্রেটস ফারিস জাওয়ান আপনি বাবা হতে চলে.ছেন । আমি ছাড়া ও আপনার জীবনে এমন কেউ আসতে চলেছে যে আপনাকে ভালোবাসবে।"
ইসরাহর আটকে আটকে বলা কথা গুলোই যেনো যথেষ্ট ছিলো ফারিস কে জমিয়ে দেওয়ার জন্য। তার শক্ত হাত জোড়া দুর্বল করার জন্য। ইসরাহর পিঠ থেকে খসে পড়লো ফারিসের হাত জোড়া। অনুভূতি হীন চোখে তাকিয়ে রইলো ফারিস। তার সাড়াশব্দ না পেয়ে ইসরাহ সোজা হয়ে বসলো। নিজের হাতের মুঠোয় নিলো ফারিসের হাত জোড়া। তির তির করে কাঁপছে ইসরাহর ফর্সা নাক।
অধর বৃন্ত টকটকে লাল বর্ণ ধারণ করেছে। ফারিসের এমন নির্লিপ্ততায় ভয় জমছে ইসরাহ মনে। ফারিস কি খবরটাতে খুশি না?
--" আপনি কী খুশি না ফারিস?"
ফারিস অধর কামড়ে বিস্তর হাসলো।
--" চাওয়ার থেকে ও বেশি যখন মানুষ পেয়ে যায়। তখন আনন্দ প্রকাশের সীমা থাকে না লিটল গার্ল। তুমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার। তোমার দেওয়া উপহার গুলো ও আমার কাছে তেমন। আমার জীবনের থেকে ও দামী।"
ফারিস থামলো। তার গলা কাঁপছে। চোখে মুখে অদ্ভুত প্রফুল্লতা। হাসি আর কান্নার মাঝের অবস্থা তার। ইসরাহ হেসে ফেললো।
--" তার মানে আপনি খুশি হয়েছেন?"
--" হু"
--" কতোটা?"
--" অনেকটা কুইন!"
ইসরাহ খিলখিলিয়ে হেসে সুধালো;-
--" আমি ও।"
--" শুয়ে পড়ো কুইন। স্যালাইন চলছে লিটল জান।"
ইসরাহ শুয়ে পড়লো বেডে। ফারিস কম্পোটার টা ওর গলা অব্দি টেনে দিলো। পর পর সে চেয়ার টেনে ইসরাহ বেডের পাশে বসলো।
--" খিদে পেয়েছে লিটল গার্ল?"
--" না। "
দু'হাতের মাঝে ইসরাহ ডান হাত নিয়ে ফারিস সুধালো;-
--" আরসালান তোমাকে কি করেছে লিটল গার্ল? অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে কেনো? ও কি তোমাকে ব্যাড টাচ করেছে?"
--" ওই লোকটা আমার গাল ছুঁয়েছিলো।"
--" তুমি কি করেছো তখন?"
--" আমি ওর তলপেটে দুটো লাথি দিয়েছি। আর চোখে জুস ছুঁড়ে মেরেছি।"
ফারিস শীতল কন্ঠে সুধালো;-
--" দ্যাটস মাই গার্ল! আরো একটা দুটো ঘুষি দিতেই পারতে। সুযোগ সব সময় আসে না জান। যখন যা ইচ্ছে করে, ইচ্ছে পূরণ করে নিবে লিটল প্রিন্সেস। তোমার হাজবেন্ড সব সামলে নিবে।"
--" ফারিস!"
--" বলো কুইন?"
--" উনি বলেছিলেন আপনি...আপনি নাকি...."
--" আমি কি বলো?"
--" উনি বলেছিলো, আপনি নাকি অন্য মেয়ে নিয়ে ওনার কেবিনে ফি...জিক্যাল হয়ে ছিলেন। আপনি নাকি আমাকে ছেড়ে দিবেন।"
কথা শেষে ইসরাহর চোখের কার্নিশ বেয়ে দু'ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। ফারিস বুঝলো, আরসালান তার লিটেল গার্ল কে ভুল বোঝানোর উদ্দেশ্যে তার কেবিনে গিয়ে ছিলো। ব্রেইন ওয়াশ করার চেষ্টা ও করেছে। ফারিস হাত বুলালো ইসরাহর মাথায়।
--" আমার ডিএনএর প্রথম থেকে শেষ বিন্দুটা অব্দি শুধু মাত্র তোর শরীরে প্রবেশ করবে লিটল গার্ল। তুমি ব্যতীত অন্য কোনো মহিলার সাধ্যি নেই যে কিনা আমার ডিএনএ গ্রহণ করার স্পর্ধা দেখাবে। আমি তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিবো। ফারিস জাওয়ানের শরীরের উপর একমাএ অধিকার খাঁটাতে পারবে তার লিটল গার্ল।"
ফারিসের কথায় চোখ নামিয়ে নিলো ইসরাহ। ফারিস যে এমন কথা বলবে তা সে বুঝতেই পারেনি। লোকটা বড্ড নির্লজ্জ হচ্ছে। দিন দিন তাকে লজ্জা দেওয়ার খেলায় মেতেছে সে। ফারিস চেয়ার টা টেনে ইসরাহর উদোরের কাছে এসে বসলো। ঝুঁকে ধীরে মাথা রাখলো তার চেপ্টা উদোরে।
--" জলদি মাম্মার পেট থেকে ল্যান্ড করো মামনি। পাপা তোমাকে খুব ভালোবাসবে। অনেক আদর দেওয়া বাকি তোমাকে।"