দুপুরের শেষ লগন। প্রকৃতি ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসছে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঠান্ডা। রেস ও শেষের পথে। গ্যালারির দর্শক সংখ্যা আগে থেকে কমে এসেছে।
আরসালানের কেবিনে মুখো মুখি বসে আছে ফারিস আর আরসালান। ফারিস তীক্ষ্ম চোয়াল শক্ত করে আরসালান কে পরোখ করছে। যে কিনা নিজ মনে ড্রিংক করতে ব্যস্ত। লিয়ানা পর্দা আড়ালে লুকিয়ে আছে। ওদের সামনের সেন্টর টেবিলে বিভিন্ন পদের বাদাম, চিপস আর দামী ব্যান্ডের আলকোহলের বোতল। সামনে গ্লাস দুটোতে অর্ধেক পরিমাণ আলকোহল পরিবেশন করা। আরসালানের গ্লাসের ড্রিংক শেষের পথে। কিন্তু ফারিস এখনো গ্লাস টা ছুঁয়ে ও দেখেনি। আরসালান নেশাক্ত কন্ঠে ফারিস কে বললো;-
--" তোমার ওয়াইফ জানে?"
আরসালানের প্রশ্নে পায়ের উপর পা তুলে বসলো ফারিস।
--" কি?"
--" তোমার সব অপকর্মের কথা। তুমি আজ পর্যন্ত কটা মা*র্ডার করেছো? জানে তো সে?"
ফারিসের ওষ্ঠ এইবারে কিঞ্চিত বাঁকালো।
--" আমার ওয়াইফ কে নিয়ে তোমার এতো মাথা ব্যথা কিসের? জ্বলছে নাকি কোথাও? পোড়া গন্ধ পাচ্ছি মনে হয়? তোমার বংশের বাতি কি তবে পুড়ে গেলো নাকি আরসালান আতাকুল?"
--" তোমার সুখ আমার সহ্য হয় না ফারিস জাওয়ান। তাই জ্বলা টা কি স্বাভাবিক না?"
--" ইয়াহ, ওকে, আমার অপকর্মের কথা বলে। একবার চেষ্টা করে দেখতে পারো। লিটল গার্ল তোমার কথা শোনে কি না।"
আরসালান এবার ফিচেল হাসলো। যেনো ফারিসের কথা গুলোয় সে বিনোদন পাচ্ছে।
--" তোমার লিটল গার্ল আমার কথা শুনলে কি করবে তুমি?"
ফারিস সোজা হয়ে বসলো। ঝুঁকে গ্লাস টা নিয়ে সম্পূর্ণ আলকোহল টা শেষ করে নিলো। ফের বোতল থেকে গ্লাসে ঢেলে জবাব দিলো সে।
--" তাহলে আমার রেসিং ট্র্যাক তোমার!"
--" আর ?"
--" কি চাও তুমি?"
--" তোমার জুনোর ফ্ল্যাট টা! ওটা আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। লাক্সারিয়াস এন্ড হাইকোয়ালিটির রুম গুলো।"
--" ওকে ডিল ডান।"
--" লিটল গার্লের উপর এতো ভরসা? মেয়ে মানুষ বুঝে কম লাফায় বেশি ফারিস জাওয়ান। তোমার একটা খুনের কথা শুনেই তোমার লিটেল গার্ল উড়ে পালাবে।"
--" হ্যাঁ, আমার লিটল জান এমন কিছু করবে না। চ্যালেঞ্জ করলাম!"
--" মানুষ পরিবর্তনশীল ফারিস!"
--" আমার লিটল গার্ল না।"
--" তুমি ধ্বংসের দ্বারস্থ ফারিস। একটা ভুল সিদ্ধান্তে তুমি শেষ। শেষ হবে তোমার তিলে তিলে গড়া সাম্রাজ্য।"
--" চ্যাল....লে...."
ফারিস পুরো কথা টা শেষ করতে পারলো না। তার আগেই সে সোফায় ঢলে পড়লো। এলোমেলো হাতে শার্টের উপরের দিকের বোতাম গুলো নিলো ফারিস। হঠাৎ এতো গরম লাগছে কেন তার বুঝলো না সে। দু' তিন বার মাথা ঝাঁকিয়ে সোজা হয়ে বসতো চাইলো ফারিস। কিন্তু আরসালান আর লিয়ানার কুৎসিত প্ল্যানের কাছে এইবারে ফারিস নুইয়ে গেলো। চিৎকার করে ঘোর লাগা কন্ঠে সুধালো সে;-
--" আমার ড্রিংসে কি মিশিয়েছিস কু*ত্তার বাচ্চা? এমন লাগছে কেন?"
আরসালান হাসলো, পর পর দু'আঙুলের সাহায্যে তুড়ি বাজালো সে। লিয়ানা বেরিয়ে এলো আড়াল থেকে। আরসালান আর লিয়ানা দুজনের চোখে মুখে বিজয়ের হাসি। খুশিতে গদগদ হয়ে লিয়ানা বললো;-
--" ফাইনালি ফারিস জাওয়ান ইজ মাইন।"
--" ইনজয় ইউর নাইট লিয়ানা।"
--" সেম টু ইউ ,"
আরসালান বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।লিয়ানা দরজায় লক দিয়ে ফারিসের পাশে এসে বসলো। আলতো হাত শার্টের কলারে রাখতেই নিভে আসা দৃষ্টিতে ফারিস চোখ তুলে তাকালো। লিয়ানার মুখ টা ঝাপসা তার চোখে। কিন্তু পারফিউমের ঝাঁঝালো সুভাষ ফারিসের নাসারন্ধ ছড়িয়ে তীক্ষ্ম মস্তিষ্কে পৌঁছাতেই সে বুঝলো মেয়ে টা তার লিটল গার্ল না। বাম হাতের সাহায্য লিয়ানা কে ধাক্কা মারলো ফারিস। লিয়ানা ছিটকে গিয়ে মেঝেতে পরলো।
--" দূরে সর! আমার লিটল গার্ল ছাড়া পৃথিবীর সব নারী ফারিস জাওয়ানের জন্য হারাম।"
--" তোমার ওয়াইফ তো বাঙালি। তোমার সাথে বেড পারফরমেন্স এ তাল মেলাতে পারে?"
থেমে থেমে ফারিস সুধালো,
--" তোমার মতো প্রস্টিটিউট নাকি ও? সে আমা...র ওয়াইফ। বেড পারফরমেন্স শব্দ টা ওর সাথে যায় না। ওসব শব্দ তোমাদের মতো প্রস্টি...টিউটদের জন্য নির্ধারিত।"
মেঝে থেকে উঠে ফের ফারিসের পাশে বসলো লিয়ানা।
--" বড় বড় জ্ঞান নিজের কাছে রেখে। এর থেকে ভালো বেডে আসো। আমার তোমাকে চাই মিস্টার ফারিস জাওয়ান।"
--" আমার চাবি এতোটা ও সস্তা না। যে, যে কোনো লকেই সেট হয়ে যাবে। It is very expensive. Which only my wife can handle."
--" রিয়েলি?"
লিয়ানার শেষের কথায় সোজা হয়ে বসলো ফারিস। সোফার পাশ থেকে পানির বোতল নিয়ে চিপি খুলে পুরো বোতলের পানি টুকু মাথায় ঢেলে দিলো সে। পানি দিয়ে চোখ মুখে ধুয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো ফারিস। পকেট থেকে রিভলবার টা বের করে নল চেপে ধরলো; পাশে বসা লিয়ানার কপালে। হুংকারের স্বরে আওড়ালো ফারিস;-
--" রিভলবার টা দেখেছিস? সাইলেন্সর ফিট করা। একটা বুলেট ভরে দেই জায়গা মতো? সারাজীবনের মতো উত্তেজনা চলে যাবে।"
এইবারে লিয়ানা ভয় পেলো,
--" রিভলবার নামাও ফারিস। সত্যিই সত্যিই গুলি লেগে যাবে। নামাও ফারিস, তুমি তোমার মধ্যে নেই এখন।"
ফারিস কথা শুনলো না। অপর হাতে পকেট থেকে ফোনটা নিয়ে কল দিলো রিজভি কে।
--" রি..রিজভি কোথায় তুই?"
--" গ্যালারি - তে বস। কোনো প্রয়োজন, আমি আসবো?"
--" আরসালানের কেবিনে আয়।"
কল কেটে দিলো ফারিস। রিভলভারের বাট দিয়ে লিয়ানার কপালে বাড়ি মারলো সে। সোফার হাতায় লুটিয়ে পড়লো লিয়ানা। বাঁকা হাসলো ফারিস।
----------
ফারিসের কেবিনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরসালান।
ডুপ্লিকেট কি চাবি টা দরজার লকের নবে ঢুকিয়ে ঘোরাতেই দরজা খুলে গেলো। চাবি টা আগে থেকেই তার কাছে ছিলো। রুমে ঢুকে চারদিকে চোখ বুলালো আরসালান। সারা কেবিন খালি। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে ব্যালকনিতে উঁকি দিলো সে। তার সন্দেহ ই ঠিক। ইসরাহ বারান্দায় বসে রেস দেখছে।
--" লিটল গার্ল!"
আরসালানের ডাকে ঘুরে তাকালো ইসরাহ। অপরিচিত এক পুরুষ কে ব্যালকনির দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দ্রুত দাঁড়িয়ে পড়লো ইসরাহ। অবাক চোখে আরসালানের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো সে;-
--" কে আপনি?"
--" গেস করো তো লিটল গার্ল?"
--" ফারিসের নামে ডাকছেন কেন? কে আপনি? উত্তর দিন, আমি কিন্তু ফারিস কে ডাকবো।"
--" ডাকবে প্রিন্সেস? ডাকো, "
--" আবার আমাকে এসব নামে ডাকছেন? পাগল হয়েছেন নাকি?"
আরসালান এগিয়ে এলো। হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিলো ইসরাহ কোমল গাল। আরসালানের ছোঁয়া শরীরে লাগতেই মৃদ্যু কেঁপে উঠলো ইসরাহ। ঘৃণায় হাতের জুসের ক্যানের সম্পূর্ণ জুস টুকু ছুঁড়ে মারলো আরসালানের চোখের দিকে। পর পর পিছিয়ে গিয়ে লাথি বসালো আরসালানের তলপেটে। কুঁকিয়ে উঠলো আরসালান। ব্যথায় চোখ মুখ কুঁচকে মেঝেতে বসে পড়লো সে।
--" ব্লাডি গার্ল, এটা কি করছো? আহহ আমার চোখ।"
আরসালানের পাশ কাটিয়ে ব্যালকনি থেকে বেরিয়ে রুমে এসে দাঁড়ালো ইসরাহ। উদভ্রান্তের ন্যায় এদিক সেদিক তাকালো সে। কি করবে এখন সে? ফারিস কোথায়? দরজার কাছে ছুটে গিয়ে লকের হ্যান্ডেলে চাপ প্রয়োগ করলো ইসরাহ। কিন্তু দরজা খুললো না। ততক্ষণে আরসালান উঠে দাঁড়িয়েছে।
টেবিলের উপর রাখা ফ্লাওয়ার বাস টা নিয়ে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো ইসরাহ ঠিক পিছনে। পেছনে আরসালানের অস্তিত্ব বুঝতেই ইসরাহ হাত জোড়া থেমে গেলো। আস্তে আস্তে ঘাড় ঘুরিয়ে সে পেছনে তাকানোর আগেই আরসালান বাস টা ছুঁড়ে মারলো ইসরাহ মাথার পেছনে। অতঃপর ছুঁড়ে দিলো কিছু বিষ বাক্যে;-
--" তোমার ফারিস জাওয়ান আমার কেবিনে লিয়ানা কে নিয়ে ফিজিক্যাল খেলায় মত্ত আছে। মেয়ে টা তোমার থেকে দ্বিগুণ সুন্দর। এন্ড প্রফেশনাল, ইউ নো। পুরুষ মানুষ পরিবর্তনশীল। যেই নারীর কাছে তারা শান্তি পায়। সেই নারীতেই ডুব দেয়।"
জ্ঞান হারানোর আগে আরসালানের তিক্ত কথা গুলো শুনে বিষিয়ে গেলো ইসরাহর মন। কিন্তু মস্তিষ্ক কেনো জেনো ফারিসের নামে বলা কথা গুলো মানতে পারলো না। আরসালান বেরিয়ে গেলো কেবিন থেকে।