ব্যস্ত শহর ঢাকার অর্ধেক মানুষ ঘুমের দেশে তলিয়ে গেছে।
হাইওয়ে রোড আপাতত ফাঁকা। মাঝে মধ্যে রাস্তা কাঁপিয়ে হাওয়ার বেগে চলে যাচ্ছে গাড়ি গুলো। ড্রাইভিং সিটে বসে ড্রাইভ করছে রিজভি। ইসরাহর আর ফারিস পেছনের সিটে বসা। সচরাচর ফারিস ই ড্রাইভ করে। রিজভি তার পাশের সিটে বসে। কিন্তু আজ হাত কাটা থাকায় ইসরাহ তাকে ড্রাইভিং করতে দেয় নি। জোর করে পেছনের সিটে বসিয়ে রেখেছে।
জানলার কাঁচের বাইরে ইসরাহ চোখ জোড়া নিবদ্ধ। দেশ ছাড়ার আগে শেষ বার প্রিয় মাতৃভূমির সবুজে ঘেরা গাছ গুলো দেখে চোখ জুড়ানোর একটু খানি প্রয়াস। বিদেশ বিবুয়ে সব থাকলে ও মাতৃভূমির মায়া থাকে না। থাকে না কাদা মাটির সোঁদা গন্ধ। বাইরে তাকিয়ে থাকার মাঝেই হু হু করে কেঁদে উঠলো ইসরাহ। ফারিস ব্যস্ত হয়ে নিজের দিকে ফেরালো মেয়েটাকে। ইসরাহর দু'গাল হাতের আঁজলায় পুরে নিলো নিজের।
--" হোয়াটর্স হ্যাপেন্ড লিটল গার্ল? কাঁদছিস কেন জান?"
ইসরাহ এলো মেলো হাতে জড়িয়ে ধরলো ফারিসের কোমর। বুকে মুখ গুঁজে নাক টেনে সুধালো সে;-
--" আমার দেশ ছাড়তে ইচ্ছে করছে না ফারিস। ওখানে আমার কেউ নেই; কিচ্ছু নেই।"
--" কিন্তু আমাদের তো ফিরতে হবে লিটল জান। তোমার হাজবেন্ডের সাম্রাজ্য তো সুদূর আলাস্কাতে বেবি গার্ল।"
--" তাহলে আপনি একা ফিরে যান ফারিস।"
--" সত্যিই?"
--" না, আমি জানি না।"
ফারিস আর ইসরাহর এমন আদুরে মূহুর্ত দেখে নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারছে না রিজভি। বার কয়েক চোখের পাতা ঝাপটে লুকিং গ্লাসে তাকালো সে। তার গম্ভীর কাট্টা গোট্টা বস এতো নরম সুরে কথা বলছে? এতো আদুরে কথা ও ফারিসের গলায় আসতে পারে? মানুষ কে মেরে ছবি করা মানুষ টা ও এখন বউয়ের কাছে এসে বিড়াল হয়ে গেছে। হায় হায় করে উঠলো রিজভি।
সে ফের তাকালো। ইসরাহর দিক থেকে চোখ তুলে সামনে তাকাতেই লুকিং গ্লাসের আয়নাতে চোখাচোখি হলো ফারিস আর রিজভির। রিজভি তড়িৎ বেগে চোখ নামিয়ে নিলো। ফারিস হাত লম্বা করে গাড়ির ভেতরের লাইট টা বন্ধ করে দিলো। পর পর গমগমে কন্ঠে বললো সে;-
--" রিজভি অ্যাক্সিডেন্ট করলে তোমাকে জ্যান্ত পুতবো। আমার লিটল গার্ল আছে গাড়িতে।"
--" সরি সরি বস।"
--" গ্লাস টা ঘুরিয়ে দাও।"
--" ওকে বস।"
বাম হাতে স্টিয়ারিং ধরে, ডান হাতে লুকিং গ্লাস টা ঘুরিয়ে দিলো রিজভি। ফারিস ইসরাহ চুলে হাত বুলিয়ে চুমু খেলো মাথায়। ইসরাহ ততক্ষণে থেমে গেছে। নাক টেনে, ফারিসের শার্টের টপ বাটন গুলো খুলে নাক গুজলো তার প্রশস্ত বক্ষবিভাজনে। প্রেয়সীর মন কাননের ভাবনা বুঝতে পেরে; ফারিস ও আরেকটু কাছে টেনে নিলো ইসরাহ কে। সুতির কামিজটার খাঁজ হাতিয়ে চেপে ধরলো ইসরাহর সুঠোল বাঁকানো কোমর।
ফারিসের ঠান্ডা হাতের ছোঁয়াতে কেঁপে কেঁপে উঠলো ইসরাহ। পরমুহূর্তে নিজেকে সামলে ও নিলো সে। এটা ইসরাহর জন্য নতুন নয়। কিন্তু তবুও ফারিস প্রতিবার ছুঁলেই ইসরাহ লজ্জায় লজ্জাবতী গাছের ন্যায় কুঁচকে যায়।
----------
বিছানায় কম্পোটার জড়িয়ে শুয়ে আছেন আসফা বেগম। ফারিস আর ইসরাহ কে বিদায় দিয়ে ই জ্ঞান হারিয়ে ছিলেন তিনি।
সায়মা আর আরহাম সিকদার ঘরে এনে শুইয়ে দিয়ে ছিলো আসফা বেগম কে। কয়েক বার পানির ছাঁট দিলে ও চোখ খুলেন নি তিনি। অতঃপর আরহাম সিকদার ফ্যামিলি ডাক্তার কে কল করেছিলেন। ডাক্তার এসে বিপি আর প্রেশার চেক করে বলেছিলেন প্রেশার কমে গেছে। তাই হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেছে। চিন্তার কিছু নেই। কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলেই ঠিক হয়ে যাবেন। কিছু নির্দেশনা দিয়ে ডাক্তার চলে গিয়েছিলেন। সায়মা খাতুন বসে আছেন আসফা বেগমের কোলের কাছে। একটু পর পর প্যাঁচ প্যাঁচ করে কেঁদে উঠছেন তিনি।
পর পর আবার আচঁল টা টেনে চোখ মুছে নিচ্ছেন সায়মা। ফারিসের সাথে ঝামেলা করলে ও এখন ছেলেটা চলে যাওয়াতে ওনার কষ্ট লাগছে। ছেলে টা একা ফিরলে তাও কম কষ্ট হতো। কিন্তু সে তো বউয়ের অধিকার খাটিয়ে সঙ্গে করে ইসরাহ কে ও নিয়ে গেছে। সেখানে তাকে বাঁধা দেওয়ার ও ক্ষমতা ছিলো না কারো। বরের অধিকার আছে বউ কে সঙ্গে নেবার। বরং আটকানোটাই বেআইনি।
আরহাম সিকদার ঘরে নেই। একটু আগেই ড্রয়িং রুমে গিয়ে টিভিতে খবর ছেড়ে বসেছেন তিনি। চোখ জোড়া ফুলে আছে ওনার। এতোদিন তাও ইসরাহ ছিলো। আজ থেকে সে ও আর নেই। এতো বড় বাড়িতে একা দুজন মানুষ থাকবেন। এখন খুব করে আরহাম সিকদারের আপসোস হচ্ছে, তখন কেনো যে ফারিস কে বিদেশ পাঠিয়েছিলেন। একটু সামলিয়ে ছেলেটাকে কাছে রাখলেই হতো। কিন্তু সময় যাওয়ার পর কিছু আপসোস করে কপাল দ্বিখন্ডিত করলে ও তার ফয়সালা মিলে না। সময় প্রকৃতির নিয়মে চলে। আমরা কেবল তার সাক্ষী।
ধীরে ধীরে চোখ খুললেন আসফা। আসফা বেগম কে চোখ খুলতে দেখে কান্না থামিয়ে একটু হেসে উঠলেন সায়মা।
--" কি অজ্ঞান হইলা বউ? আমরা তো মেলা ডরাইছি। কানতে কানতে এমন অজ্ঞান হইছো; বাপ রে।"
গায়ের উপর থেকে চাদর টা সরিয়ে উঠে বসলেন আসফা। অবাক কন্ঠে প্রশ্ন করলেন সায়মা খাতুন কে।
--" কেনো কি হয়েছে খালা?"
--" কিতা ওইছে মানে?"
--" আমি ও তো আপনাকে তাই জিজ্ঞেস করছি।"
--" তোমার মাইয়া বিদাশ গেছে গা। এমন ভং ধরছো যেনে কিছু জানো না?"
--" ইসরাহ বিদেশ গেছে মানে? কি কথা বলছেন আপনি? আরহাম কোথায়?"
--" আব্বা তো নিচে।"
তড়িঘড়ি পায়ে বিছানা থেকে নামলো আসফা বেগম। হন্তদন্ত পায়ে আসফা করিডোরে আসতেই আরহাম সিকদারের সাথে ধাক্কা লাগলো ওনার।
--" সায়মা খালা কি বলছেন এসব আরহাম?"
--" কি বলছেন?"
--" ইসরাহ কোথায়?"
--" ইসরাহ কোথায় মানে?"
--" এই সহজ কথাটা বুঝতে পারছো না? আমার মেয়ে কোথায় বলো? বলতে পারবে না তো? আচ্ছা, সরো সামনে থেকে আমি ই খুঁজে নিবো আমার মেয়ে কে। তোমাদের বলা লাগবে না।"
আসফা বেগমের এহেন কথার মানে বুঝলেন না আরহাম সিকদার। ওনার কাছে আপাতত আসফা বেগমের কথা গুলো নিছক রসিকতা ভই কিছুই ঠেকছে না। গম্ভীর মুখে আরহাম সিকদার বললেন;-
--" রসিকতা বন্ধ করো আসফা। নিজে মেয়ে কে বিদায় দিয়ে এখন বলছো ইসরাহ কোথায়?"
করিডোরের কর্ণারে স্থান পাওয়া সোফাটায় এসে বসলেন আসফা। মাথা চেপে ধরে মনে করার চেষ্টা করে সুধালেন তিনি;-
--" কিন্তু আমার তেমন কিছুই মনে পড়ছে না আরহাম। আমার মনে হচ্ছে কেউ আমার স্মৃতি টা মুছে নিয়েছে।"
--" মানে?"
--" মানে ধরো , মনে হচ্ছে আমি আজ সারাদিন আমার মধ্যে ছিলাম না। আমার কিচ্ছু মনে পড়ছে না। কি হয়েছে না হয়েছে। বা আমি কি করেছি।"
আরহাম সিকদার এগিয়ে এলেন। আসফা বেগমের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন তিনি:-
--" একটু রেস্ট নাও। সব ঠিক হয়ে যাবে আসু।"
কথা শেষ করে রুমের দিকে চলে গেলেন আরহাম সিকদার। সেভাবেই আসফা বেগম সোফায় বসে রইলেন। মনে মনে ভাবলেন তিনি, এতো সকাল ওনার ভোলার রোগ হয়ে গেলো?
----------
প্ল্যানের উইন্ডর পাশের সিটে বসে আছে ইসরাহ।
তার পাশের সিটে ফারিস বসা। রিজভি মাঝখানের সারিতে তাদের পাশাপাশি সিটে বসেছে। প্ল্যান ভর্তি একগাদা অচেনা মানুষ। কেবিন ক্রুর এন্যাউজমেন্ট শুনে আশে পাশে তাকালো ইসরাহ; সবাই যার যার সিট বেল্ট বাঁধতে ব্যস্ত। নিজের কোমরের কাছে থাকা বেল্টের অংশ দুটো টেনে সামনে আনলো ইসরাহ। কখনো প্ল্যানে উঠার অভিজ্ঞতা না থাকায় বেল্ট টা লাগাতে পারলো না সে। অসহায় মুখ করে ইসরাহ ফারিসের দিকে তাকাতেই; ফারিস নিজের বেল্ট টা লাগিয়ে ঝুঁকে ইসরাহ বেল্ট টা ও লাগিয়ে দিলো।
--" সমস্যা হলে মুখ ফুটে বলতে হয় লিটল গার্ল। চুপ করে থাকা টা কোনো সমাধান নয়।"
ফারিসের কথার মাঝেই প্ল্যান মৃদ্যু ঝাঁকুনি দিয়ে আকাশে উঠতে শুরু করলো। ইসরাহ দু'হাতে চেপে ধরলো ফারিসের কব্জি আর হাতের উপরিভাগ। ইসরাহর বড় বড় নখ গুলো দেবে গেলো ফারিসের কাটা ক্ষততে। ফিনকি দিয়ে র*ক্ত ছুটলো হাতের নরম মাংসপিন্ড দিয়ে। চোখ বন্ধ করে নিলো ফারিস। ডান হাত বাড়িয়ে ইসরাহ হাতে আলতো চাপড় বসালো সে। ধীরে ধীরে স্থির হলো ইসরাহ। সে চোখ মেলার আগেই হাত সরিয়ে নিলো ফারিস।
--" আমি ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসছি।"
ফারিস উঠে যেতেই ইসরাহ সিটের হাতল চেপে বসলো। ল্যাভেটরি তে এসে ট্যাপ ছেড়ে দিলো ফারিস। সাদা পানির নিচে হাতের কব্জি ধরতেই চিন চিন করে জ্বলন ধরলো তাতে।