ওয়াশরুমের জানালার ফাঁক গলিয়ে সূর্যের আলো ইসরাহর চোখে পড়তেই জেগে উঠলো সে। হাত পা নাড়াতে চেয়ে ও নাড়াতে পারলো না ইসরাহ। প্রচন্ড মাথা ব্যথা নিয়ে চোখ খুলতেই ভয় পেলো।
এখনো বাথটাবে শুয়ে আছে সে। ফারিস তার পাশেই বাথটাবের সাথে ঢেল দিয়ে বসা। তার মাথার সাথে মাথা ঠেকানো। ফারিস থেকে চোখ ফিরিয়ে; নিজের দিকে তাকাতেই ইসরাহর চক্ষু চড়কগাছ হয়ে উঠলো।
র*ক্ত পড়াতে পানি গুলো ঘোলা হয়ে আছে। শুভ্র পানি ঘোলাটে কালো বর্ণ ধারণ করেছে। রশিতে বাঁধা হাত উঠিয়ে চোখের সামনে ধরলো সে। তার হাতের শুভ্র চামড়ার মধ্যে র*ক্তের ফোঁটা লেগে আছে। দীর্ঘ ক্ষণ পানিতে থাকার দরুন শরীর সাদা হয়ে উঠেছে। পা দিয়ে পানিতে শব্দ করে চেঁচিয়ে উঠলো ইসরাহ;-
--" ফারিস, আ...মাকে ছাড়ুন। আ..মি আর পার.. ছি না এই.. এই পানিতে ডুবে থাকতে। আপনার র*ক্তের স্পর্শ, গন্ধ আমার হৃদয় নাড়িয়ে দিচ্ছে। আমার গা গুলোচ্ছে। আমি পাগল হয়ে যাবো।"
ইসরাহর চিৎকারে ফারিস ধড়ফড়িয়ে উঠে, লাল চোখে ইসরাহর দিকে তাকালো। চোখ ডলে পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করলো সে। কাল রাতের ঘটনা তার মনে পড়তেই; তড়িঘড়ি করে ইসরাহ কে কোলে তোলে নামিয়ে বসালো ওয়াশরুমের মেঝেতে।
ব্যস্ত হাতে রশির বাঁধন গুলো খুলে নিলো ইসরাহর শরীর থেকে। বহুক্ষণ পর ছাড়া পেয়ে হাত পা নাড়াতে চেয়ে ও নাড়াতে পারলো না ইসরাহ। অবশ পা নাড়াতে গিয়ে ব্যথায় কুঁকিয়ে উঠলো সে। রশির বাঁধনের জায়গা গুলোতে চোপ চোপ দাগ বসে গেছে। ফারিস উঠে গিয়ে হ্যাঙ্গার থেকে টাওয়াল এনে; টাওয়াল পেঁচিয়ে জড়িয়ে ধরলো ইসরাহ কে। নিজের কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে আক্ষেপের স্বরে সুধালো ফারিস;-
--" লিটল গার্ল, আই'ম সরি প্রিন্সেস। শিট শিট, হোয়াট ডিড আই ডু টু ইট?"
বিরক্তি ভঙ্গিমায় ইসরাহ বললো;-
--" ফারিস ছাড়ুন আমাকে।"
ইসরাহর হাতের ধাক্কায় মেঝেতে গিয়ে পড়লো ফারিস। ফারিস কে সরিয়ে দাঁড়াতে নিতে, পা পিছলে পড়ে গেলো সে। মেঝেতে পড়বার আগেই ফারিস ধরে নিলো তাকে। ইসরাহর মনে হলো, তার শরীরে এক ফোঁটা শক্তি ও আর অবশিষ্ট নেই। দাঁড়ানোর মতো ক্ষমতা ও নেই যেনো। ফারিস ফের ইসরাহ বাহু চেপে ধরলো। জবরদস্তি করে ধরে শাওয়ারের নিচে দাঁড় করিয়ে দিলো তাকে। ফারিস কে ছেড়ে দেওয়াল ধরে দাঁড়ালো ইসরাহ।
গরম পানির হিটার অন করে, শাওয়ার ছেড়ে দিলো ফারিস। শাওয়ারের মৃদ্যু গরম পানি শরীরে পড়তেই কেঁপে উঠলো ইসরাহ। পানির প্রতিটা ফোঁটা সুচের মতো গাঁথছে তার শরীরে। ঘাড় সহ কোমর ব্যথা করছে। ফারিস শ্যাম্পু নিয়ে ইসরাহ চুলে মাখতে নিতেই ইসরাহ তার হাত চেপে ধরলো। করুণ চোখে তাকিয়ে কেঁদে উঠলো ইসরাহ। কান্নার মাঝে সে এলোপাতাড়ি কিল - বসালো ফারিসের প্রশস্ত বুকে।
--" আপনি উন্মাদ ফারিস। আপনার ভালোবাসার ধরন মোটে ও ভালো না।"
চোখ বন্ধ করে নিলো ফারিস। ইসরাহর কোমর পেঁচিয়ে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো তাকে। কানের লতিতে হালকা কামড় বসিয়ে আওড়ালো ফারিস,-
--" লাভ ইউ লিটল গার্ল। ইউ আর রাইট। আমার ভালোবাসার ধরন মোটে ও ভালো না। ভালো ভাবে ভালোবাসলে মানুষ পাগল বানিয়ে দেয়। কিন্তু পাগলের মতো ভালোবাসলে ছেড়ে যাওয়ার আগে দশবার ভাববে। কারণ, পাগল কে সামলানো সহজ কথা না।"
--" আমাকে ছাড়ুন। আমার ভালো লাগছে না।"
ফারিস ইসরাহর কে নিজের সাথে আরেকটু চেপে ধরলো। রাগে নাকের ডগা কাঁপছে ইসরাহর। শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে সে ফের ধাক্কা বসালো ফারিসের বুকে। কিন্তু চিকন গড়নের ইসরাহর ধাক্কাতে একটু ও সরলো না ফারিস। বরং অনড় দাঁড়িয়ে রইল সে।
--" ভালো না লাগলে ও তোমাকে থাকতে হবে। তোমার ইচ্ছেতে অথবা অনিচ্ছায়।"
--" আবার বেঁধে রাখবেন? রাখুন, এইবার আমি নিজে পালাবো।"
ফারিস বাঁকা হাসলো। ফিচেল কন্ঠে হিসহিসিয়ে সুধালো সে;-
--" আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলো তো লিটল গার্ল।"
--" ওকে ফাইন, বলছি।"
--" ইয়েস মাই গার্ল, প্লিজ সে।"
ইসরাহ রাগী চোখে তাকালো ফারিসের চোখের দিকে। ততক্ষণাত ফারিস কিছু একটা পড়ে ফু বসালো ইসরাহ চোখে। মূহুর্তে ফারিসের বাহুতে ঢলে পড়লো সে। বলিষ্ঠ বাহুতে ইসরাহ কে ধরে নিলো ফারিস। সময় নিয়ে কয়েকটা মন্ত্র পড়লো সে। ইসরাহ মাথায় ফু দিয়ে ফের তাকে বাথটাবে শুইয়ে দিলো ফারিস। বাথটাবের নোংরা পানি গুলো ছেড়ে, আবার ট্যাপ ছাড়লো। বাথটাবটাতে পানি ভর্তি হওয়ার সময়টুকুতে, গভীর চোখে পানিতে ভেসে ডুবে থাকা ইসরাহ কে দেখলো ফারিস।
--"কুইন অব মাই হার্ট!
হোয়াই ডোন্ট ইউ লিসেন লিটল গার্ল?
টেল মি টু ডু ইট ইফ ইউ লাইক।"
---------
বেডে ঘুমিয়ে আছে ইসরাহ। ফারিস তার পাশেই শোয়া। সামনে ফাস্টএড বক্স আর স্যাভলন দেওয়া বল ভর্তি কুসুম গরম পানি। তুলোতে স্যাভলন পানি নিয়ে জায়গা গুলো পরিষ্কার করে নিলো ফারিস। ইসরাহর পায়ে আর হাতে ক্রিম লাগিয়ে ফারিস উঠলো।
পানির গ্লাস থেকে মুঠো ভর্তি পানির ঝাপটা দিতেই ইসরাহ চোখ মেললো। ফারিস তাকে ধরে পিঠের পিছনে বালিশ দিয়ে বসিয়ে দিলো।
--" কি খাবে লিটল গার্ল?"
--" জানি না, নিচে যাবো।"
--" ওকে।"
ফারিসের হাত ধরে বিছানা থেকে নামলো ইসরাহ। গুটি গুটি পায়ে দরজা পর্যন্ত যেতেই ; ইসরাহ অনুভব করলো সে শূন্য ভাসছে। তড়িৎ বেগে ফারিসের বুকের পাশের র্টি - শার্ট খাবলে ধরলো সে।
--" আমার পা থাকতে তুমি আবার হাঁটবে কেন? আমার চোখে সহ্য হয় না লিটল জান।"
লজ্জায় আমতা আমতা করে উঠলো ইসরাহ। এই অবস্থায় সায়মা আপার সামনে পড়লে তিনি হাজার টা প্রশ্ন করে লজ্জা দিবে তাকে। আর মায়ের সামনে পড়লে তো কথাই নেই।
--" কি করছেন নামান। নিচে আম্মু আব্বু সবাই আছে। কেউ দেখে ফেললে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।"
ভরাট কন্ঠে সুধালো ফারিস;-
--" সো হোয়াট? অন্যের ওয়াইফ কে কোলে নিয়েছি নাকি? ইউ আর মাইন।"
ফারিসের এমন উদাসীনতায় দাঁত কিড়মিড় করে উঠলো ইসরাহ। সিঁড়ি বেয়ে নামতেই সে ছটপটিয়ে নেমে পড়লো কোল থেকে। ক্রিম লাগানোর দরুন পায়ের ব্যথা টা কমে এসেছে। জোরে হাঁটলেই ব্যথা টা বোধ হচ্ছে শুধু।
----------
ড্রাইনিং স্পেস এ আরহাম সিকদার বসে আছেন। পরণে তার ফর্মাল ড্রেসাপ। সামনে কাপ ভর্তি লেবু চা।
--" আসফা নাশতা হয়েছে?"
--" দাঁড়াও আনছি।"
তিতিক্ষ মেজাজে সংবাদ পত্রে চোখ বুলালেন আরহাম। ইসরাহ এসে দাঁড়ালো বাবার পাশে। টেবিলে সাজিয়ে রাখা মধু আর সিয়া সিডের বোয়াম নিয়ে; গ্লাসে পানি ঢেলে নিলো সে। দু"চামচ সিয়া সিডে এক চামচ মধু মিশিয়ে নেড়ে ঢেকে রাখলো ইসরাহ। মেয়ের কার্যকলাপ দেখে অমায়িক হাসলেন আরহাম। ফারিসের জন্য ই যে এসব তা বুঝতে বাকি রইলো না ওনার। অবশেষে ওনার ছেলেটার কেউ তো হলো।
যে কিনা দু'হাতে সামলাতে পারবে ছেলেটাকে। অবাধ্য ফারিসের বাধ্যতার কারণ হবে। খারাপ সময়ে পিঠে হাত বুলিয়ে স্বাত্বনা দিতে পারবে। মায়ের পর নিঃস্বার্থে তাকে ভালোবাসবে। দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লেন আরহাম। কেবল আসফার সাথে চিরকাল ফারিসের সাপে - নেউলের সম্পর্ক থেকে গেলো।
রুটির হটপট টা এনে টেবিলে রাখলেন আসফা। ইসরাহর দিকে একবার তাকিয়ে, আশে পাশে চেয়ে ফারিস কে খুঁজলেন তিনি। কিন্তু ছেলে টা নেই।
--" আমাকে খুঁজছেন শাশুড়ি মা? আপনার পিছনে, তাকান।"
--" তোমাকে খুঁজতে যাবো কোন দুঃখে? আমার এতোটা ও খারাপ দিন আসেনি।"
--" মেয়ের জামাই কে মানুষ খারাপ দিন ছাড়া ভালো দিনে ও স্মরণ করে শাশুড়ি আন্টি। আপনার বোকা বোকা বুদ্ধি গুলো একটু কম ইউজ করলে ও তো পারেন।"
--" বেয়াদপ ছেলে।"
--" ভুল হয়েছে; শব্দ টা হবে জামাই।"
কথা বাড়ালো না আসফা। ব্যস্ত পায়ে কিচেনে ঢুকে পড়লেন তিনি। ফারিস ও তার পিছু নিলো। পর পর ফিরে ও এলো মিনিট দুয়েক পর। মিষ্টি হেসে ইসরাহর পাশের চেয়ারে গিয়ে বসলো সে। ফারিসের বসার পর আসফা বেগম এলেন। মৃদু হেসে ফারিসের উদ্দেশ্যে বললেন তিনি;-
--" তোমার জন্য দুপুরে কি রান্না করবো ফারিস।"
সিয়া সিডের সম্পূর্ণ পানি টুকু দু'ঢোকে শেষ করলো ফারিস। ঘাড় নামিয়ে ফিচেল হাসলো সে। ঠোঁটে হাসির রেখা টেনেই ফারিস সুধালো;-
--" আপনার হাতের স্পেশাল ডিশ গুলো করতে পারেন। লাইক; জামাই আদরে যেগুলো প্রয়োজন।"
ফারিসের জবাবে কিছুক্ষণ চুপ থেকে, চিন্তিত কন্ঠে আসফা বললেন;-
--" তুমি তো ডায়েট ম্যানটেইন করো। খাবে তেল মশলা যুক্ত খাবার?"
--" একদিন খেলে কিছুই হবে না। আফটার অল, শাশুড়ি মায়ের রান্না বলে কথা। কয়জনের ভাগ্য জোটে বলুন?"
চোয়াল ঝুলিয়ে, আরহাম সিকদার আর ইসরাহ একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলো। এদের আবার কি হয়েছে। এতো মিষ্টি কথা বলছে। কৌতূহল না দমিয়ে প্রশ্ন করে বসলেন আরহাম;-
--" তোমার শরীর ঠিক আছে আসফা?"
--" তোমার কি প্রেশার বেড়েছে আম্মু? না কি কিছু স্বপ্ন দেখেছো?"
বাবা - মেয়ের কথায় চোখ পাকিয়ে ঝাঁঝালো কন্ঠে আসফা উত্তর দিলেন;-
--" মানে?"
--" ফারিসের যত্ন নিচ্ছো যে?"
--" ফারিসের যত্ন নিবো না তো কি তোমার যত্ন নিবো? ও আমার একমাত্র ছেলে। আবার মেয়ের জামাই ও বটে।"
ফারিস অবাক হয়ে ইসরাহ আর বাবার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপুনী কেটে আওড়ালো;-
--" সেটাই তো শাশুড়ি আম্মু। ওনাদের কথায় কান দিবেন না তো। বাবা মেয়ের চোখে সহ্য হচ্ছে না আমার সুখ।"