She is my Obsession

পর্ব - ২৫

🟢

সকাল দশটা বেজে পঁচিশ মিনিট। কিচেনের দক্ষিণের পাশের জানলা টা দিয়ে রোদ এসে পড়েছে কিচেন কাউন্টারে। ঠান্ডা ঝিরঝিরে বাতাসে দুলছে জানলার ফাঁকে রাখা পুদিনা পাতা, আর ধনিয়া পাতার গাছ গুলো। ধনিয়া পাতার গাছ গুলো সদ্য মাথা দুলিয়ে উঠেছে। আসফা বেগম প্রতিবছর এই খানে ছোটো ছোটো টবে করে ধনিয়া আর পুদিনা রোপন করেন। রান্নার সময় ধনিয়া পাতা না থাকলে এইখান থেকেই ব্যবহার করেন।

আসফা বেগম পোলাও রান্না করছেন। চাউল ভাঁজা শেষে, দুধ টুকু ঢেলে দিলেন পাতিলে। সায়মা খাতুন নিচে বসে চিংড়ি মাছ কাটছেন। এপ্রোণ পরিহিত ফারিস কিচেন কাউন্টারে চপিং বোর্ডে পাঁচ মেশালি সবজি কাটছে। সবুজ ক্যাপসিকেমটার বিঁচি গুলো বাদ দিয়ে সরু লম্বা করে কেটে নিলো সে। পর পর একই ভাবে গাজর, টমেটো, পেঁয়াজ গুলো ও কেটে নিলো ফারিস। হাত ধুয়ে ফারিসের দিকে তাকিয়ে আসফা বেগম সুধালেন;-

--" এবার তুমি যাও ফারিস। তোমার জন্য রান্না করছি। আর তুমি ই সবজি কাটছো। বিষয় টা বাজে লাগে।"

ফারিস তাকালো আসফা বেগমের দিকে। ক্ষীণ হেসে জবাব দিলো সে;-

--" নো প্রবলেম, ওনলি আ ফিউ ভেজিটেবলস আর লেফ্ট।"

ফারিসের মুখে ঝরঝরে ইংরেজি শুনে মুখ কুঁচকে নিলেন সায়মা। হাতের মাছ টা কাটতে কাটতে বললেন তিনি;-

--" এই ছেরা তুমি এহান থেইকা যাও তো। ছুরির খটখট আওয়াজে কানে তালা ধরে গেছে। এহন ধেন্ধা ধেন্ধা লাগে।"

ছুরি টা চপিং বোর্ডে রেখে। সবজি গুলো বল এ ঢেলে নিলো ফারিস।

--" একটু আগে আপনি যেনো কি বলেছিলেন!"

সায়মা খাতুন চুপ করে গেলেন। কতো কথাই তো তিনি বলেছেন। তাহলে এই ছেলে কোন টা জিজ্ঞেস করছে? গলা উঁচিয়ে সায়মা বললেন;-

--" কোন কতার কতা কও? আমি তো বহুত কতা কইছি।"

--" বাড়ির জামাই বাড়ির সম্মানীয় মানুষ। তাকে মাথায় করে রাখতে হয়।"

--" না, তোমার কতা ভুল। মাথায় রাখলে উঁকুনে খাইবো। তাই কোলে রাখতে হইবো।"

--" আচ্ছা আচ্ছা, এখন আবার আমার কাজ কে আপনি অসম্মান করছেন কেন?"

--" কিতা কইলাম তোমার কাম রে? তুমি বেশি হুনো।"

--" আমি কিন্তু বয়রা না।"

মাছ কাটা থামিয়ে দিলেন সায়মা। আসফা বেগমের দিকে আঙুল তুলে সুধালেন তিনি;-

--"দেহো বউ এই ছেরা কিতা করে। আমি কিন্তু কাম করুম না, কইলাম। ওরে দাও মাছ কুটতে।"

--" ফারিস তুমি ঘরে যাও। বাকি টা আমরা সামলে নিবো।"

অজ্ঞতা হাত ধুয়ে এপ্রোণ টা খুলে; সায়মা খাতুনের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে কিচেন থেকে বেরিয়ে গেলো ফারিস।

----------

ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকোচ্ছে ইসরাহ। পরণে তার কালো পাতলা জর্জেট শাড়ি। ফারিস দরজায় এসে থমকে দাঁড়ালো। ঘাড় বাঁকিয়ে ইসরাহ কে পরোখ করলো সে। পর পর উচ্চ স্বরে ইসরাহ কে ডাকলো ফারিস।

--" লিটল গার্ল?"

ফারিসের কন্ঠে, ইসরাহ হেয়ার ড্রায়ার টা অফ করলো। ড্রায়ার টা ড্রেসিং টেবিলে রাখার আগেই ফারিস এসে তার পেছনে দাঁড়ালো। শাড়ির ভাঁজ গলিয়ে ঠান্ডা হাত টা রাখলো ইসরাহ মেদবিহীন কোমল উদোরে। অপর হাত টা রাখলো গলায়। ইসরাহ কে আয়নাতে অবলোকন করে; হাত দিয়ে ধীরে ধীরে ইসরাহ পেটে টিজ করলো ফারিস।

--" লিটল গার্ল?"

--" বলুন"

--" রামেন খাও?"

--" হু!"

--" ইউ আর সামথিং টু মি, লাইক রামেনের। একদম হট এন্ড স্পাইসি। দেখলেই খেতে ইচ্ছে করে বাইটের পর বাইট।"

--" এহহ,"

--" ইয়েস মাই লিটল জান।"

ইসরাহ আয়নাতে নিজের পেছনে দাঁড়ানো ফারিসের দিকে তাকালো। যার চোখ - মুখ, হাসি জুড়ে একরাশ দুষ্টুমি এসে ভর করেছে। ফারিসের মনের ভাব বুঝতে পেরে সরে যেতে চাইলো ইসরাহ। কিন্তু ফারিস ছাড়লো না। বরং ইসরাহ কোমর জড়িয়ে তাকে ড্রেসিং টেবিলের উপর বসিয়ে দিলো। অপর হাতে ড্রেসিং টেবিলের উপর থাকা সমস্ত জিনিস মেঝেতে ফেলে দিলো সে।

--" আম্মু আপনার জন্য রান্না করছে ফারিস। প্লিজ এখন না , আমি মাত্র শাওয়ার নিয়েছি।"

--" সো হোয়াট? আমার প্রিয় খাবার তো তুমি লিটল গার্ল!"

--" আমি আর শাওয়ার নিতে পারবো না ফারিস। পানি ঠান্ডা!"

--" ওয়াটার হিটার আছে, নো অজুহাত লিটল গার্ল।"

ফারিস ইসরাহ কে আয়নার সাথে চেপে ধরলো। তার ছোঁয়া গভীর হতেই ইসরাহ চোখ বন্ধ করে নিলো। মুখ এগিয়ে ইসরাহর ওষ্ঠ জোড়া নিজের দখলে নেওয়ার আগেই উচ্চ শব্দে তার ফোন টা বেজে উঠলো। বিরক্তিতে মুখ তেতো হয়ে উঠলো ফারিসের। ইসরাহ কে ছেড়ে পকেট থেকে ফোনটা বের করলো সে। কলারের নামের জায়গাতে রিজভি নাম টা জ্বলজ্বল করছে। কল রিসিভ করে চিবিয়ে সুধালো ফারিস;-

--" বার্স্টাড, ডিস্টার্ব করার আর সময় পাসনি?"

--" আমাকে বললেন বস?"

--" না তোর শশুর কে বলেছি।"

থতমত খেলো রিজভি। ফোন টা কান থেকে সরিয়ে আবার কানে চাপলো সে। কোনো কারণে যে ফারিস তার উপর রেগে গেছে তা বুঝলো রিজভি। তাই কথা না বাড়িয়ে; আসল কথাটা বললো সে;-

--" বস, একুশ তারিখে রেস আছে ট্র্যাকে। আমাদের ফিরতে হবে। আজ আঠারো তারিখ। আলাস্কা পৌঁছাতে লাগবে, দেড় দিন। হাতে বেশি সময় নেই।"

মূহুর্তেই রাগী ভাব সরে; ফারিসের মুখশ্রী জুড়ে দেখা দিলো অদ্ভুত ছাপ। ইসরাহ বুঝলো না সেই মুখভঙ্গির মানে। অবাক কন্ঠে ফারিস প্রশ্ন করলো;-

--" কিন্তু রেস টা তো জানুয়ারির শুরুতে হওয়ার কথা ছিলো।"

--" আরসালান আতাকুল ডেট টা পিছিয়েছে বস। উনি জেনে গেছে আপনি আলাস্কায় নেই। তাই সুযোগ বুঝে ডেট পিছিয়ে এনেছেন, আপনাকে অপমান করতে।"

--" আই সি,"

--" মাঝ রাতের একটা ফ্লাইট আছে বস। টিকেট বুকিং দিবো?"

দু'আঙুলের সাহায্যে কপাল চুলকে কিছুক্ষণ ভাবলো ফারিস।

--" দাও"

--" ম্যামের জন্য টিকেট বুকিং করবো।"

--" হুম"

--" ওকে বস।"

রিজভি কল কেটে দিলো। ইসরাহ নেমে এসে ফারিসের পাশে দাঁড়ালো। ফোনের অপর পাশের ব্যক্তি টা যে খুব ভালো খবর ফারিস কে দেয়নি। তা তার মুখভঙ্গিই বলে দিচ্ছে।

--" কি হয়েছে ফারিস?"

--" আমাদের ফিরতে হবে।"

ফেরার কথা শুনেই মুখ কালো হয়ে উঠলো ইসরাহ। ছোটো মুখে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো ফারিসের পাশে। ফারিসের চিন্তিত মুখ দেখে কিছু বলার সাহস হচ্ছে না তার।

----------

যোহরের আজান পড়ে গেছে। রোদের জৌলুসে আলোকিত হয়ে আছে ধরনী। শীতের দুপুর হওয়াতে, রোদের তেমন তাপ নেই।

নামাজ আদায় করে মাত্রই দোতলা থেকে নেমেছেন আসফা বেগম। এবার রান্না গুলো একে একে এনে টেবিল জুড়ে সাজাতে শুরু করলেন তিনি। কিছুক্ষণ পর ইসরাহ উপর থেকে নেমে এলো। মায়ের পাশে ছুটে ছুটে বাকি খাবার গুলো এনে টেবিলে সাজিয়ে নিলো আসফা বেগমের সাথে। ওনাদের খাবার আনা শেষ হতেই আরহাম সিকদার সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেন। ক্লান্ত শরীরে এসে সোফায় বসে পড়লেন তিনি। বাবা কে বসতে দেখে ইসরাহ এগিয়ে এসে চিনি ছাড়া লেবুর শরবতের গ্লাস টা রাখলো আরহাম সিকদারের সামনে ট্রি টেবিলে।

--" তুমি শাওয়ার নিবে বাবা?"

--" না, হাত মুখ ধুয়ে আসছি আম্মু।"

--" আচ্ছা "

--" ইসু ফারিস কে ডেকে আন।"

ফারিস কে ডাকতে যাওয়ার আগেই সে নেমে এলো। ফোন স্ক্রল করতে করতে গিয়ে বসলো ডাইনিং টেবিলে। আসফা সবার জন্য প্লেটে পোলাও বেড়ে নিলেন। ফারিস ফোন টা স্ক্রল করা অফ করে পাশে রেখে দিলো। কিচেনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো সে;-

--" সায়মা আপা কই?"

ফারিসের প্রশ্নে আসফা বেগম তাকালেন ওর দিকে। হাতের কাজ করার মাঝেই জবাব দিলেন তিনি।

--" উনি ওনার ঘরে, কেনো?"

--" লিটল গার্ল, ওনাকে ডেকে নিয়ে আসো।"

বিনা বাক্যে ব্যয়ে সায়মা খাতুন কে ডেকে আনলো ইসরাহ। ইসরাহর পেছন পেছন এগিয়ে এলেন সায়মা।

--" আমারে ডাকছো কেরে?"

--" আমাদের সাথে বসুন আপা।"

--" কেরে?"

--" ও যখন বলছে, তখন বসুন খালা।"

সায়মা বসলেন ফারিসের অপর পাশের চেয়ারে। ততক্ষণে আরহাম সিকদার ফর্মাল ড্রেসাপ ছেড়ে; নরমাল লুঙ্গি আর ফতুয়া পরে এসে বসলেন। সবাই কে আসতে দেখে ফারিস গলা ঝেরে আওড়ালো;-

--" আব্বু"

--" বলো?"

--" আমি আর ইসরাহ ফিরো যাবো।"

ফারিসের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন আরহাম সিকদার। গম্ভীর কন্ঠে সুধালেন তিনি;-

--" কবে?"

--" আজ রাতের টিকেট বুকিং করেছি। পরশু ই আমার রেসিং ট্র্যাকে রেস আছে। আর রেস টা আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।"

হায় হায় করে উঠলেন আসফা বেগম।

--" কি বলছো এসব? তাই বলে আজ ই টিকেট বুকিং দিয়েছো?"

--" পরশু রেস, প্রস্তুতি বাকি।"

--" যা ভালো হয় করো।"

--" কিন্তু,"

--" কোনো কিন্তু না আসু। ওদের যাতে ভালো হয়; তাই করুক। এমনিতে ও ফারিসের ওই দেশেই সব। এখানে তার কিছুই নেই। শুধু শুধু আটকে রেখে লাভ কি।"

She is my Obsession গল্পটি নবনীতা চৌধুরী-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সাসপেন্স-এ মাতানো রোমান্টিক থ্রিলার