গটগট পায়ে প্রস্থান করলো ফারিস। নিজের ঘরে ফিরে ফোন দিলো কাউকে। ফোন কানে ধরে হিসহিসিয়ে সুধালো সে;-
--" ফারিস কে চ্যালেঞ্জ করার পরিমাণ কি হয় , এই বার আপনি বুঝবেন!"
অপর পাশ থেকে কল উঠালো ফারিসের ডান হাত রিজভি। কল রিসিভ করেই রিজভি বললো;-
--" বলুন স্যার?"
--" দুটো নাম্বার পাঠাচ্ছি। যত কল আসবে, সব গুলো কল ট্রেস করবে। এবং কি কথা হয়, সেটাও রের্কোড করবে। একটা সিঙ্গেল মিসডকল ও মিস দিবে না।"
--" কেনো স্যার?"
--" লিটল গার্ল কে পাচ্ছি না। যে করেই হোক ও কে খুঁজে বের করতে হবে।"
রিজভি ফের প্রশ্ন করলো না। কারণ ফারিসের রাগ সম্পর্কে তার ধারণা স্পষ্ট। রাগের সময় ফারিস নিজেকে আঘাত করতে ও ছাড়ে না। সেখানে রিজভি তার কাছে চুনোপুঁটি। শুধু শুধু নিজের বিপদ বাড়ানোর মতো বোকা সে না।
--" ওকে বস। আর কিছু?"
--" কালকের ভেতর সময় করে, আমার হিপনোটিক পাথর টা এনে দিও। একটু জামাই আদর পেতে ইচ্ছে করছে। শাশুরি টা বড্ড জ্বালাচ্ছে।"
--" ওকে বস।"
--" হুম, জলদি কাজ শুরু করো। দ্বিতীয় বার যাতে বলতে না হয়।"
--" ওকে বস।"
--" হুমমম, শালা আমার ও কপাল।"
--" একটা কথা বলবো বস?"
--" বল?"
--" ম্যামের রিং এর ডায়মন্ডে জিপিএস সেট করা আছে। আপনি বললে আমি ট্রেস করবো।"
--" লাগবে না, আমি দেখছি।"
--" ওকে বস।"
--" ওকে বস , ওকে বস না করে কাজ কর।"
--" ওকে বস।"
----------
হাইওয়ে রোর্ডের বুক ছিঁড়ে শা শা করে চলছে বাস, ট্রাক, সহ বিভিন্ন গাড়ি। একেকটার থেকে একেকটার স্পিড দ্বিগুণ।
জানলার ফাঁক গলিয়ে ঠান্ডা বাতাস এসে উড়িয়ে দিচ্ছে; ইসরাহর ওড়নার কোনা। বাতাস টা ভালো ও লাগছে; শীত ও করছে তার। রাস্তার পাশ ধরে হেঁটে যাওয়া মানুষ জন দেখছে সে। শেষ বিকেল হওয়াতে কুয়াশা পড়তে শুরু করেছে। দূরের সব কিছু ঘোলা। ইসরাহর পাশের সিটে নাফি বসা। নাফি ইসরাহর কাজিন। তার খালার ছোটো ছেলে। গত মাসেই জবে জয়েন করেছে। ইসরাহ হাত উঠিয়ে বাসের জানালা টা বন্ধ করে দিলো।
কাঁধ ব্যাগ টা থেকে ফোনটা নিয়ে সময় দেখলো সে। অতঃপর ফারিসের মুখ টা বেসে উঠলো তার মন গহীনে। তীক্ষ্ম চোয়ালের মাঝে শুভ্র সুশীল, এক চিলতে হাসি। জিরো কার্টের বেয়ার্ড গুলো অসম্ভব সুন্দর লাগে ইসরাহর। লম্বা চওড়া ফারিসের পুরোটাই যেনো সৌন্দর্যের ভান্ডার। অসম্ভব সুন্দর মানবটির ভালোবাসা ও সমুদ্র সম। তাতে কোনো খাদ নেই। নিমেষেই মন খারাপ হয়ে উঠলো তার। ইসরাহর মনে হলো, সে ফারিস কে কষ্ট দিচ্ছে। মায়ের কথা রাখতে সে ফারিস কে জানায়নি। কিন্তু এখন নিজের কাছেই খারাপ লাগছে। একটা কল দিবে ভেবে ফোনটা বের করলো ইসরাহ।
নাফি চোখ বন্ধ করে বসে আছে। কানে তার ব্লুটুথ গোঁজা।
--" ভাইয়া?"
নাফি শুনলো না। বিরক্ত মুখে ইসরাহ আলতো হাতে ধাক্কা দিলো নাফি কে।
--" ভাইয়া ফারিস কে একবার কল দিলে হতো না?"
নাফি একই ভাবে বসে থেকেই জবাব দিলো।
--" দে, সমস্যা কোথায়?"
--" আম্মু নিষেধ করেছে।"
ইসরাহ কথায় কিছুক্ষণ ভাবলো নাফি। পর পর হুডির টুপি টা মাথায় দিয়ে সুধালো সে;-
--" তাহলে আন্টিকে জিজ্ঞেস কর ফারিস কোথায়।"
--" না, ফারিসকে একবার কল দিয়ে দেখি।"
--" তোর ইচ্ছে, আমার সমস্যা নেই।"
ইসরাহ কল লিস্টে ঢুকতেই আচানক ফোনটা বন্ধ হয়ে গেলো। সকাল থেকে চার্জ না দেওয়াতে ফোনের চার্জ শেষ। বিরক্তিতে দাঁত কিড়মিড় করে উঠলো ইসরাহ। ফোন টাও বন্ধ হওয়ার সময় পেলো না। এখন কি করবে সে!
--" ফোন বন্ধ হয়ে গেছে।"
--" নাম্বার মুখস্থ পারিস? আমার ফোন থেকে কল দে।"
--" না।"
--" তাহলে আন্টি কে কল দিয়ে কথা বল। বেশী প্রয়োজন হলে ফারিস কে ফোন দিতে বলিস।"
আসফা বেগম কে কল দিয়ে; নাফি ফোন টা ইসরাহ কাছে দিয়ে দিলো। ওপাশ থেকে আসফা বেগমের কন্ঠ শুনতেই ইসরাহ ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে বললো;-
--" ফারিস কোথায় আম্মু?"
চায়ের কাপ টা টেবিলে রেখে বিরস মুখে আসফা জিজ্ঞেস করলেন।
--" কেনো?"
--" ওনাকে তো বলে আসা হয়নি। একটু ফোনটা দিবে?"
আসফা দোতলার দিকে তাকালেন। কেউ নেই, ব্যালকনি আপাতত ঝাড়বাতির আলোয় আবছা আলো আঁধারিতে ছেয়ে আছে।
--" ফারিস ঘুমাচ্ছে, তোর কথা সে জিজ্ঞেস করেনি।"
--" একবার ও জিজ্ঞেস করেনি? সত্যিই ?"
--" না, তোর কি মনে হয়? আমি মিথ্যা বলছি!"
--" না মানে।"
--" সে দুপুরে খেয়ে ঘুমিয়ে ছিলো। এখনো ওঠেনি!"
এতক্ষণের সব ছটফটানি, আনন্দ নিমেষেই মিলিয়ে গেলো ইসরাহ। মুখের কোমল হাসি টা হারিয়ে গেলো। শান্ত কন্ঠে "ওহ" বলে ফোনটা কেটে দিলো সে।
একবার ও ফারিস তার কথা জিজ্ঞেস করেনি? একটা বার জিজ্ঞেস করতে পারলো না! কি এমন ক্ষতি হতো জিজ্ঞেস করলে?
ফারিস যেহেতু ঘুমাচ্ছে; তাহলে সে কেন মন খারাপ করবে।
---------
ল্যাপটপ সামনে নিয়ে সোফায় বসে আছে ফারিস। কপালের তার চিন্তার বিস্তর ছাপ। সন্ধ্যা হতে চললো কিন্তু এখনো ইসরাহর কোনো হদিস পায়নি সে। রিজভি ও কল ব্যাক করেনি।
অনেকক্ষণ ধরে ল্যাপটপে কিছু একটা করার চেষ্টা করে ও সফল হচ্ছে না ফারিস। শেষবার ‘নীল Connected’ লেখা অপশনটায় ক্লিক করতেই GPS-টা চালু হয়ে গেল। হাসির ঝলকে ফারিস শক্ত চোয়াল বাঁকা হয়ে এলো। তার মধ্যেই তার ফোনটা বেজে উঠলো। রিজভি কল দিয়েছে। ব্লুটুথে ক্লিক করলো ফারিস। রিজভি শান্ত কন্ঠে বললো;-
--" বস, দশ মিনিট আগে দ্বিতীয় নাম্বারে কল এসেছিলো। জায়গাটার আপনার ওখান থেকে দুই ঘন্টার ব্যবধানে। এখন বেরোলে বাস টা ধরতে পারবেন।"
--" কাম ইন ফ্রান্ট অব দা হাউস, উইথ দা কার। আই’ম গেটিং আউট।"
--" ওকে বস।"
ল্যাপটপ টা অফ করে; ফারিস শরীর ছেড়ে দিয়ে বসলো। অলিভ কালারের ওভার স্লিপ র্টি-শার্টের স্লিপ গুলো কনুই অব্দি গুঁজে নিলো সে। দু'হাতে অগোছালো চুল গুলো গুছিয়ে নিলো ফারিস। শান্ত মস্তিষ্কে চোখ বন্ধ করে রাখলো পাঁচ মিনিট।
--" আমাকে না বলে যাওয়ার মাশুল তোমাকে গুণতে হবে লিটল গার্ল। আমি যতো চাই, নিজের আসল চেহারা লুকিয়ে রাখতে। ততো তুমি আমায় পাগল করে ছাড়ছো। দিন দিন বয়স বাড়ার সঙ্গে আমার পাগলামো টাও বাড়ছে।"
গাড়ির হর্ণের শব্দে ফারিস উঠল। ল্যাপটপ টা হাতে নিয়ে ফোনটা পকেটে চালান করে নিলো সে।
-----------
রেস্টুরেন্টের ওয়াশরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ইসরাহ। চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে আয়নাতে নিজের প্রতিবিম্বে তাকালো সে।
সারাদিনের জার্নিতে চোখ মুখে ক্লান্তির চাপ। মাথার ওড়নাটার পিন গুলো খুলে ওড়না টা মাথায় পেঁচিয়ে নিলো ইসরাহ। ওয়াশরুম থেকে বেরোলো সে। নাফি সোফায় বসে আছে। তার সামনের সোফায় এসে বসলো ইসরাহ।
তাদের অর্ডার করা খাবার গুলো এখনো আসেনি। মাথা টেবিলে কাত করে শুয়ে পড়লো ইসরাহ।
----------
ফারিসের কালো মার্সেডিজ-মাইবা এক্সেল্যারো কার টা এসে থামলো রেস্টুরেন্টের সামনে। ফারিস ব্যস্ত হাতে কারের ডোর খুলে বেরোলো।
মাটির নরম ঘাস গুলো, শক্ত বুট জুতা দিয়ে মাড়িয়ে; ফারিস দৌড়ে রেস্টুরেন্টের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলো।
সাদা আর সোনালী বাতির আলোয় ঝলমল করছে পুরো রেস্টুরেন্ট। ফারিস আশেপাশে চোখ বুলাতেই তার চোখ আটকে গেলো কর্ণারের টেবিলটাতে। ইসরাহ কে চিনতে ফারিসের কাল বিলম্ব হলো না।
ইসরাহ আর একটা ছেলে সামনা সামনি বসে আছে। রাগে ফারিসের মস্তিষ্ক ধপ ধপ করে উঠলো। চুল টেনে ধরলো সে। তড়িৎ বেগে ছুটে গিয়ে ইসরাহ কে টান মেরে দাঁড় করিয়ে জড়িয়ে ধরলো ফারিস।
ঘটনা টা এতোটাই দ্রুত হয় যে ইসরাহ হকচকিয়ে উঠলো। অবাকের সপ্তম চূড়ায় পৌঁছে; ফারিসের পারফিউমের সুভাষ নাসারন্ধে লাগতেই বুঝলো মানুষটা কে। ইসরাহ আলতো হাতে ফারিসের পিঠে হাত রাখলো। ফারিসের শ্বাস দ্রুত বেগে চলছে। শরীর কাঁপছে, ইসরাহর কে এতোটাই জোরে চেপে ধরেছে; যেন এখনি তার দম ফুরিয়ে যাবে। ইসরাহ ফারিসের পিঠে আলতো চাপড় দিয়ে; ভর্য়াত কন্ঠে সুধালো;-
--" ফারিস?"
ফারিস জবাব দিলো না। ততক্ষণে রিজভি এসে দাঁড়িয়েছে ফারিসের পেছনে। নাফি ও উঠে দাঁড়ালো। সবার চোখ ওদের দুজনের দিকে। ইসরাহ লজ্জা পেলো; ফারিসের হাত ছাড়াতে চাইলো সে। কিন্তু ফারিস ছাড়লো না। বরং আরো জোরে চেপে ধরে শীতল কন্ঠে সুধালো সে:-
--" না বলে এখানে এসেছো কেনো? আমাকে পাগল করতে চাও নাকি?"
--" আমি সরি ফারিস। ফোনের চার্জ শেষ হয়ে গিয়েছিলো।"