সকাল আট টা বাজে। মুখ কালো করে কিচেনে রান্না করছেন আসফা। আজ নিচের কিচেনেই রান্না বসিয়েছেন তিনি। পরোটা গুলো বেলে দিচ্ছেন সায়মা খালা। একে একে সব পরোটা বেলা শেষ হতেই; তিনি দুপুরের রান্নার জন্য সবজি কাটতে বসলেন। আসফা বেগম পরোটা গুলো ঘি দিয়ে ভেজে গরুর মাংস টা নেড়ে দিলো।
আরহাম সিকদারের কড়া আদেশ, আজ সকালের নাশতাতে ভালো করে ঘি-য়ে ভাজা পরোটা আর ভুনা মাংস যাতে তৈরি করেন। ছেলে টা এতো বছর পর দেশে ফিরেছে। কি না কি খেয়েছে ওখানে। তাই খাঁটি ঘিয়ের পরোটা ভাজা আর মাংস ভুনা করতে বলেছিলেন। বিরক্তি লাগলে ও কিছু বলেননি আসফা। ফারিস এই বাড়িতে ফেরার পর থেকে কিছুই আর ভালো হচ্ছে না। আরহাম আর ইসরাহ দুজনেই বদলে গেছে। শুধু শুধু কথায় কথা বাড়ে। ভাবনা ছেড়ে মাংস টা নামিয়ে, চায়ের পানি বসালেন আসফা।
--" এখন কি করবা বউ?"
বৃদ্ধা সায়মা খাতুনের কথায় ওনার দিকে ফিরে তাকালেন আসফা। চা পাতা পানিতে ছেড়ে শান্ত কন্ঠে তিনি বললেন;-
--" কি করবো মানে?"
--" বিয়াডা মাইনা নেওয়া ছাড়া তো উপায় নাই। মাইডা হারা রাইত পোলাডার লগে এক ঘরে ছিলো। তোমার কি মনে হয়, পোলাডা ছোঁয় নাই ইসরাহ রে। গিয়া দেখো ওগো মইধ্যে সব হইয়া গেছে। তার উপরে এতো দিন বিদাশ ছিলো পোলাডা। এমন ডাগ্গর ছেরি পাইয়া সভ্য থাকবো?"
বিরক্ত নিয়ে আসফা বললেন;-
--" আহ খালা! এসব কথা রাখো তো।"
--" হাছা কথা কইলাম বউ। ছেরি ডা ঘর থেইক্কা বাহির হইলে গলা, হাত গুলো উল্টোই পাল্টাই দেইখো।"
--" কেনো?"
--" তুমি কি দিন দিন বাইচ্চা হইয়া যাইতেছো? ওগোর মধ্যে কিছু হইলে ইসরাহ বইনের শরীলে দাগ থাকবো না।"
লজ্জায় আমতা আমতা করে উঠলেন আসফা। মা হয়ে মেয়ের সম্পর্কে এসব শোনা বড্ড লজ্জার ওনার কাছে। কিছু না বলে পরোটা গুলো হট বক্সে পুরে টেবিল গোছাতে চলে গেলেন তিনি।
------------
সদ্য ঘুম ভেঙেছে ইসরাহর।
শরীর নাড়াতে গিয়ে বোধ করলো পুরোটা শরীর ব্যথায় জড়জরিত হয়ে আছে। তার মধ্যে ফারিস তাকে আষ্টে পৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে। ইসরাহ ফারিসের উন্মুক্ত বক্ষ থেকে মুখ তুলে; ফারিসের হাত ছাড়িয়ে উঠবার চেষ্টা করলো সে। কিন্তু পারলো না। ইসরাহর নড়াচড়া তে আধো ঘুম আধো জাগরণে চোখ খুলে তাকালো ফারিস। ঘুম ঘুম কন্ঠে প্রশ্ন করলো সে;-
--" হোয়াট হ্যাপন্ড টু ইউ এঞ্জেল’স ট্রাম্পেট? এভাবে নড়চড় করছো কেনো?"
--" কতো বেলা হয়েছে। উঠতে হবে।"
--" কিন্তু আমার ঘুম ফুল ফিল হয়নি লিটল গার্ল।"
--" আপনি ঘুমান, নিষেধ করেছে কে? আমাকে উঠতে দিন ফারিস।"
--" ওকে।"
ফারিস ছেড়ে দিলো ইসরাহ কে। নরম বিছানায় শরীর নাড়িয়ে উঠে বসলো ইসরাহ। ততক্ষণে ফারিস উঠে, বেডের হেডর্বোডের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে বসেছে। ইসরাহ পা নামিয়ে দাঁড়াতে নিয়ে ও ফের বসে পড়লো বিছানায়। ফারিস আড়মোড়া ভেঙে সুধালো;-
--" এনি থিংক রং সুইট হার্ট?"
ইসরাহ দু'হাতে পেট চেপে ধরে মুখ কুঁচকে নিলো।
--" তল পেটে ব্যথা করছে। পুরো শরীর ব্যথা করছে ফারিস।"
--" ওয়াশরুমে যেতে হেল্প লাগবে?"
--" উমম।"
ফারিস লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়লো। এগিয়ে এসে কোলে তুলে নিলো ইসরাহ কে।
--" বেশি ব্যথা করছে সুইট হার্ট? মেডিসিন নিবে?"
--" লাগবে না।"
--" সত্যি?"
--" হুমমম।"
ওয়াশরুমের দরজায় এনে ইসরাহ কে দাঁড় করিয়ে দিলো ফারিস। ইসরাহ দরজা বন্ধ করতেই ফারিস ট্রলি গুলো নিয়ে বেডের পাশে এসে দাঁড়ালো। ট্রলি থেকে সাদা র্টি-শার্ট আর কানালি ব্যান্ডের কালো ট্রাউজার টা নিয়ে নিলো। পর পর কার্বাড মেলে বাকি পোশাক গুলো কার্বাডে সাজিয়ে রাখলো সে। পোশাক গোছানো শেষে; ফারিস ঘড়ি আর পারফিউম গুলো ড্রেসিং টেবিলে সাজিয়ে রাখলো। তার কাজ শেষের দিকে আসতেই সাদা টাওয়াল টা বুক থেকে হাঁটু অব্দি পেঁচিয়ে বেরিয়ে এলো ইসরাহ। ফারিস "আমোয়াজ ব্যান্ডের" শেষ পারফিউম টা রেখে। এগিয়ে গেলো ইসরাহ সম্মুখে। অন্য আরেকটা টাওয়াল নিয়ে ইসরাহর চুল শুকোনোতে মন নিবেশ করলো সে। হাতের কাজ করার মাঝেই ফারিস আদুরে কন্ঠে সুধালো;-
--" বেটার ফিল করছো লিটল গার্ল?"
--" হুমম।"
--" তোমার ড্রেস রাখা আছে কার্বাডের লেফট সাইডে। সালোয়ার - কামিজ এনেছি আপাতত। সাইজ ঠিক আছে! পছন্দ হয় কি না দেখে নাও।"
--" সাইজ ঠিক আছে মানে?"
--" তোমার সব পোশাকের সাইজ আমার জানা আছে সুইট হার্ট। সব মানে সব পোশাকের। মিলিয়ে দেখতে পারো।"
রহস্যময় হাসি হাসলো ফারিস।
লাজুক হেসে, মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো ইসরাহ। পর পর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কার্বাডের দিকে এগিয়ে এলো সে। ইসরাহ কে খোঁড়াতে দেখে ফারিসের মেরুন অধর জুড়ে দেখা দিলো প্রাপ্তির হাসি। তার দেওয়া ভালোবাসার কষ্টে তার লিটল গার্ল খুঁড়িয়ে হাঁটছে। এই দৃশ্য টা দেখার জন্য একটা যুগ তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে তাকে।
এইবার থেকে তার প্রতিদিন কাজ হচ্ছে, তার লিটল গার্লের মিষ্টি যন্ত্রণার কারণ হওয়া। কোমল শরীরের ভালোবাসার চাপ লেপ্টে দেওয়া।
---------
নাশতার টেবিলে বসে বসে সংবাদ পত্র পড়ছেন আরহাম সিকদার। আসফা বেগম চায়ের কেটলি টা নিয়ে এসে বললেন;-
--" তোমাকে নাশতা দিবো?"
সংবাদ পত্রে চোখ বুলোতে বুলোতে গম্ভীর কন্ঠে আরহাম সিকদার সুধোলেন;-
--" না, ফারিস আর ইসু আম্মু আসুক।"
--" নয়টা বাজতে চলেছে আরহাম। তোমার সকালের ওষুধ খাওয়ার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে।
--" একদিন দেরী হলে কিছু হবে না আসু। তুমি যাও।"
ওনাদের কথার মাঝে উপর থেকে নেমে এলো ইসরাহ। বহু কষ্টে বাবার সামনে দিয়ে সোজা হয়ে হেঁটে এলো সে। কিচেনের সামনে আসতেই ফের খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কিচেনে প্রবেশ করলো ইসরাহ। সায়মা খাতুন তখন ভাতের মাড় গালছেন। ইসরাহ কে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখে তিনি দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে ইসরাহ হাত চেপে ধরলেন। ইসরাহ ওনার দিকে তাকাতেই; অবাক কন্ঠে প্রশ্ন করলো সায়মা খালা;-
--" তোমাগো মধ্যে সব হইয়া গেছে ইসরাহ বইন?"
ওনার এমন প্রশ্নে থতমত খেলো ইসরাহ। ভেবে ফেলো না সে কি উত্তর দিবে।
--" মানে কি আপা?"
--" মানে বুঝো নাই? ওই যে স্বামী - স্ত্রীরীর মধ্যে যা হয় তা।"
--" এসব কেমন প্রশ্ন করছেন আপা। আমি গরম পানি নিবো। চুলোতে আছে? নাকি বসাতে হবে?"
--" আগে আমার কথার উত্তর দাও। আমি পানি দিতাছি তোমারে।"
--" কি উত্তর দিবো আপা। এসব কি বলে বেড়ানোর কথা?"
--" দূর, তুমি থামো। আমারে দেখতে দাও; দেখি!"
সায়মা খাতুন ইসরাহর ওড়না সরিয়ে উৎসুক চোখে তার গলা দেখতে ব্যস্ত হলেন। অস্বস্তিতে জমে গেলো ইসরাহ। সে কিছু বলার আগেই সায়মা বললেন;-
--" পোলাডা রাক্ষস নাকি। তোমার গলা তো খাইয়া ফেলছে গা। দেখো, পুরা ধবধবা সাদা গলা খানিতে কালশিটে দাগ পইড়া গেছে।"
ওনার থেকে এমন কথা শুনে আরেকটু গুটিয়ে গেলো ইসরাহ। এসব কথা এতো সহজে কিভাবে বলছে সায়মা আপা? মাথায় এলো ইসরাহর।
--" আমি আসছি।"
ওড়না টা কোনো মতে পরে ছুট লাগালো সে। ইসরাহ কে লজ্জা পেতে দেখে পান খাওয়া লাল দাঁত নিয়ে মিটি মিটি হেসে উঠলেন সায়মা খাতুন। হাসি থামিয়ে আপসোসের স্বরে তিনি মিনমিনিয়ে বললেন;-
--" আমার জাওরা ডা জীবনে এমন সোহাগ দিলো না। শালা কবরে গিয়া এহন হুইতা আছোছ। আল্লাহ তোর বিচার করুক।"
---------
ড্রাইনিং টেবিলে, আরহাম সিকদারের পাশের চেয়ারে ফারিস বসেছে। পরের চেয়ারটাতে ইসরাহ। আসফা বেগম পরোটা আর মাংস দিয়ে প্লেট সাজিয়ে সবাই কে দিয়ে; উনি কিচেনের দিকে যেতে নিতেই আরহাম সিকদার ডাকলেন;-
--" কোথায় যাচ্ছো আসফা? নাশতা করতে বসো।"
--" খাওয়ার ইচ্ছে নেই।"
ওনার কথায় মুচকি হাসলো ফারিস। সে থাকাতেই যে আসফা বেগম খেতে বসছেন না। তা ভালোই বুঝেছে সে। আসফা বেগম কে আরেকটু রাগিয়ে দিতে মুখ খুললো ফারিস;-
--" একি শাশুড়ি আম্মু! জামাই কে এভাবে খাবার দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছেন কেন আম্মুউউ? কেন?"
ফারিসের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন আসফা। তাচ্ছিল্যের স্বরে জবাব দিলেন তিনি;-
--" আমাকে আবার কবে থেকে আম্মু বলা ধরেছো তুমি?"
চোখ বড় বড় করে অবাক হয়ে সুধালো ফারিস;-
--" ওমা শাশুড়ি মাকে আম্মুউউ বলবো না, তো কি আব্বু বলবো নাকি?"
--" হেয়ালি করছো আমার সাথে?"
--" একদম না আম্মাজান। আপনার ওই সাদা চুল গুলোর কসম।"
--" আরহাম দেখো, বেয়াদপ ছেলেটা কি বলছে।"
--" বাড়ির জামাই কে আপনারা এভাবে ট্রিট করেন আম্মুউ? আব্বু, আপনার ওয়াইফ কি করছে দেখুন।"