She is my Obsession

পর্ব - ১৩

🟢

যোহরের আজান পড়ছে চারদিকে। বাড়ির পুরুষেরা মসজিদের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে। নামাজ পড়ে রওনাফরা রওনা দিবে। তাই বাকি কাজ রেখে আগে সবাই নামাজে গিয়েছে।

মাথার অর্ধেক অব্দি ঘোমটা টেনে, বউ সাজে নিজের ঘরে বসে আছে ইসরাহ। রুমটাতে এখন তেমন মানুষ নেই জাইমা আর রিতা ছাড়া। দুজনেই ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সাজতে ব্যস্ত। জাইমার সাজ শেষের পথে। সে এখন রিতার চুলে গোলাপ ফুল গুলো গুঁজে দিচ্ছে। সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিজের হাতের উপর দৃষ্টি নিবেশ করলো ইসরাহ। দু'হাতের কবজি পর্যন্ত লাল টকটকে মেহেদী জ্বলজ্বল করছে। মেহেদীর লাল রঙটা বড্ড বাজে লাগলো ইসরাহ।

কোলের পার্স টা বিছানায় রেখে রুমের সাথে লাগোয়া বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো ইসরাহ। নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। শীতের দুপুর হওয়াতে আকাশ একদম পরিষ্কার। দীর্ঘক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে বাড়ির সামনের রাস্তায় চোখ রাখলো ইসরাহ। একেবারে নতুন একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।গাড়ির কালো গ্লাস গুলো উপরে তোলা। তাই ভেতরের সবকিছু ই অস্পষ্ট। গভীর চোখে গাড়িটার দিকে তাকালো ইসরাহ। এই গাড়ি টা আগে কখনো এখানে দেখেনি সে।

--" ওখানে কি করছিস ইসু?"

জাইমার ডাকে পেছনে ফিরে তাকালো ইসরাহ। ইসরাহর এমন তাকানোতে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে এগিয়ে গেলো জাইমা।

--" কি হয়েছে ইসু? এমন ভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো?"

--" আমার ভালো লাগছে না জাইমা। মনের ভেতরে অদ্ভুত এক অস্বস্তি ঝাঁকিয়ে বসেছে।"

ইসরাহ কথায় ঢোক গিললো জাইমা। সে নিরুপায়, সব জেনেও ইসরাহ কে কিছু বলতে পারছে না। তবে জাইমা বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছে; যে আজ বিয়ের সময় বিশাল এক গন্ডগোল হবে। এই বিয়ে ও টা হবে না। সব কিছু উল্টো পাল্টা করে দিবে ফারিস জাওয়ান। নিজের মনের কথা মনে চেপে জাইমা সুধালো;-

--" কারো জন্য কষ্ট হচ্ছে তোর, ইসু?"

জাইমার প্রশ্নের কিঞ্চিত অবাক হলো ইসরাহ। ভ্রু - দ্বয় কুঁচকে ইসরাহ বললো;-

--" তুই কিভাবে জানলি?"

--" কি?"

--" আমার কারো কথা মনে পড়ছে?"

--" জানি না, হঠাৎ কেন যেনো মনে হলো। তবে কি আমার কথাই সত্যি?"

--" হ্যাঁ।"

ইসরাহর কথায় আরেকটু সাহস পেলো জাইমা। ইসরাহর আরেকটু পাশাপাশি গিয়ে দাঁড়ালো সে। চোখ জোড়া বড় বড় করে উৎসুক কন্ঠে জাইমা প্রশ্ন করলো;-

--" কে সে? তাহলে তুই এই বিয়ে কেন করছিস?"

--" যার জন্য আমার মন খারাপ। সে আমার অস্তিত্বের কথা ও জানে না জাইমা। আর এক জীবনে জানবে ও না। কোন মুখে তাহলে বিয়ে ভাঙার কথা বলবো।"

জাইমা কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো;-

--" ওনার জন্য রীতি মতো যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিচ্ছে সে। আর ওনি বলছেন, সে নাকি তার অস্তিত্বের খোঁজ ও জানে না। একজন মরে শোকে, আরেক জন চড়ে রোলস রয়েসে। বাহ রে ভালোবাসা।"

জাইমার বিরবির করে বলা কথা গুলোর কিছুই বুঝলো না ইসরাহ। আলতো ভাবে জাইমার হাতে ঝাঁকি দিয়ে সুধালো সে;-

--" কি বিরবির করছিস জাইমা?"

--" তোর কথা শুনে কষ্ট পেলাম। তা ছেলেটা কে?"

--" ফার....."

--" এই জিজুরা এলো বলে। বারান্দা থেকে জলদি আমার বোনকে নিয়ে ঘরে আয় জামি।"

পেছন থেকে রবিনের গলা পেয়ে বাকি কথা শেষ করতে পারলো না ইসরাহ। দুজনে ফিরে তাকালো রবিনের দিকে। জাইমা প্রশ্ন করলো রবিন কে;-

--" ওরা এসে পড়েছে?"

--" হুম।"

----------

স্টেজে পাশাপাশি বসে আছে রওনাফ আর ইসরাহ। সামনেই কাজি সাহেব বসে আছেন। মোটা নীল কাগজটাতে, বর আর কনের নাম লিখছেন উনি। সব শেষে কাবিন লেখার জায়গায় এসে থামলো কাজি সাহেবের কলম। রওনাফের দিকে তাকিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন;-

--" কাবিন কতো লিখবো বাবা?"

--" আমি ফারিস জাওয়ান সিকদারের, সকল স্থাবর অস্থাবর সব সম্পত্তি সহ, আমার জান টা লিখুন কাজি সাহেব।"

সবার পেছন থেকে উচ্চস্বরে গম্ভীর কন্ঠে বলা, কারো কথা গুলো কানে পৌঁছাতেই চমকে উঠলো উপস্থিত সকলে। মানুষটাকে দেখার জন্য স্টেজ থেকে চোখ সরিয়ে পেছনে তাকালো সকল গেস্ট। ততক্ষণে রওনাফ, ইসরাহ, আসফা , আরহাম সিকদার সহ স্টেজে বসা সবাই দাঁড়িয়ে পড়েছে। ছেলের কন্ঠে কেঁপে উঠলো আরহাম সিকদারের বৃদ্ধ হাত জোড়া। তার ফারিস সত্যিই এসেছে।

এতো বছর পর তাহলে মেয়েটার টানে তার ছেলে ঘরে ফিরলো। ছলছল চোখে সামনে তাকালেন আরহাম সিকদার। আসফা বেগম ভর্য়াত চোখে তাকালো ইসরাহ আর আরহাম সিকদারের দিকে। এগিয়ে এসে মেয়ের হাত খানা খপ করে মুঠোয় পুরে নিলো আসফা।

--" সাইড প্লিজ?"

ফারিসের কথায় গেস্টরা সরে দাঁড়িয়ে; ফারিস কে সামনে আসতে দিলো। বড় বড় কদমে রাজকীয় ভঙ্গিমায় লাল কার্পেট মাড়িয়ে স্টেজে উঠে এলো ফারিস। ফারিসের প্রতিটা কদম অবাক চোখে পরোখ করলো ইসরাহ। পর পর তার মনে বেজে উঠলো এক কলি গান;-

--" সে যে পথ চলে,

বুকে ঝড় তোলে,

জেগে উঠে ঘুমোনো আশা।"

চোখ বন্ধ করে নিলো ইসরাহ। অবাধ্য মন কে টেনে গান ভাবা বন্ধ করলো সে। তার পায়ের নিচের মাটি সুদ্ধু কেঁপে উঠলো ফারিস কে দেখে। লম্বা চওড়া গড়নের মানুষটার পরণে ফরর্মাল সাদা শার্টের উপর কালো ব্লেজার। হাতের কব্জিতে দামী ব্যান্ডের একখানা ঘড়ি। চুল গুলো জেল দিয়ে সেট করা। তীরের মতো খাড়া নাক। মুখে সুন্দর করে ছাঁটাই করা এক গুচ্ছ বিয়ার্ড। ফর্সা গায়ের রঙ, একদম বিদেশীদের মতো। বলিষ্ঠ দেহ জুড়ে আভিজাত্যের ছোঁয়া। যেনো খুব দক্ষ হাতে মানুষটার প্রতিটা অঙ্গ - প্রত্যঙ্গ সৃষ্টি করে উপওয়ালা।

ইসরাহর মন গোপনের ভাবধারা হানা দিলো, এই সেই ফারিস জাওয়ান সিকদার। যার নামের সাথে; বারো বছর আগে চকলেটের বিনিময়ে তার নাম জুড়তে চেয়ে ছিলো মানুষটা। মুনতাসীর থেকে তার নাম করতে চেয়ে ছিলো মিসেস জাওয়ান।

ফারিস স্টেজে উঠেই ডিরেক্ট তাকালো ইসরাহ চোখের মণির দিকে। ফারিস তাকাতেই চোখাচোখি হলো ওদের দুজনের। এক দৃষ্টিতে ইসরাহর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলো ফারিস। ফারিসের এমন সরু দৃষ্টি দেখে চোখ নামিয়ে নিলো ইসরাহ। তার এতটা সাহস নেই। থাকলে চোখের তৃষ্ণা মিটিয়ে নিতো সুন্দর মানবটাকে দেখে।

ফারিস মুগন্ধ চোখে চাইলো তার লিটল গার্লের পা থেকে মাথা অব্দি। তার মায়ের শাড়িতে কি সুন্দর লাগছে তার লিটল গার্ল কে। রওনাফ কে ডিঙিয়ে ইসরাহর পাশে এসে দাঁড়ালো ফারিস। ফারিস কে ইসরাহর পাশে দাঁড়াতে দেখে টনক নড়লো রওনাফের। এতক্ষণ আগন্তুকটার সৌন্দর্য দেখে সবাই মুগন্ধ হলেও এবার মূল ঘটনা জানতে উৎসুক দৃষ্টিতে সবাই তাকালো। ফারিসের বাহু খামছে ধরে, শক্ত কন্ঠে রওনাফ সুধালো;-

--" কে আপনি? আর আমার ওয়াইফের পাশে এসে দাঁড়ালেন কোন সাহসে?"

রওনাফের কথায় সহসা ঠোঁট কামড়ে হাসলো ফারিস। রওনাফের ধরে রাখা নিজের হাতের জায়গাটাতে একবার তাকিয়ে বললো সে;-

--" হু দ্য হেল আর ইউ?"

--" বাংলা বুঝতে পারেন না? আ'ম রওনাফ ভূঁইয়া। ইসরাহর উড'বি হাজবেন্ড।"

--" আমি? লিটল গার্লের লিগ্যাল হাজবেন্ড।"

--" ফাজলামো করছেন? বিশ্বাস করি না এসব ফালতু কথা। বিয়েতে বাগড়া দেওয়ার ইচ্ছে হলে। আপনি আসতে পারেন!"

রওনাফের কথায় বিস্তর হাসলো ফারিস। ইসরাহ সিগন্ধ নয়নে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো ফারিসের হাসি টা। হাত বাড়িয়ে ইসরাহর বাম হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে মনে মনে কিছু একটা পাঠ করলো ফারিস। পর পর ইসরাহর চোখের দিকে তাকিয়ে হালকা করে ফুঁ দিলো সে।

--" ডোন্ট বিলিভ মাই ওয়ার্ডস? ওকে, নো প্রবলেম। লিটল গার্ল ইউ টেল মি, হোয়াট ডু আই ডু টু ইউ?"

--" ফারিস আমার বর।"

ইসরাহ কথায় ফিচেল হাসি দেখা দিলো ফারিসের অধর জুড়ে। পিছিয়ে গিয়ে ইসরাহ কে নিয়ে সোফায় আয়েশি ভঙ্গিমায় বসলো ফারিস। তার আর চিন্তা নেই। বাকিটা লিটল গার্ল সামলে নিবে। পরের টা সে সামলাবে, শান্তি। ইসরাহর এক কথায়, মূহুর্তেই কোলাহল শুরু হলো গোটা বাগান জুড়ে। একে অপরের মুখ চাইলো আরহাম সিকদার আর আসফা বেগম। আরহাম সিকদারের মুখ দেখে কিছুই বুঝলেন না আসফা। তিনি এগিয়ে গেলেন ইসরাহর পাশে।

হাত টেনে ইসরাহ কে উঠাতে নিতেই মায়ের হাত ছাড়িয়ে নিলো ইসরাহ।

She is my Obsession গল্পটি নবনীতা চৌধুরী-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সাসপেন্স-এ মাতানো রোমান্টিক থ্রিলার