জড়োসড়ো অবস্থায় সোফায় বসে আছে ইসরাহ। বিকেল পাঁচটা বাজে। কিছুক্ষণ পরেই মাগরিবের আজান পড়বে। ইসরাহর সামনে ট্রি-টেবিলের উপর আতিফা বেগম বিয়ের শাড়ি আর গহনা গুলো মেলে রেখেছেন। ওনার পাশে বসেই আসফা বেগম বেনারসি শাড়ি টা উল্টে পাল্টে দেখছেন। দেখা শেষে গদগদ হয়ে তিনি সুধালেন;-
--" মেরুন রঙটাতে ইসু কে দারুন মানায় আপা। আর রওনাফের শেরওয়ানি টা কি রঙের?"
আতিফা হাসলেন। গর্বের সহিত বললেন তিনি;-
--" সাদা রঙের, শাড়ি টা আপনার সত্যিই পছন্দ হয়েছে আপা?"
--" জ্বি।"
আতিফা বেগম ঘুরে এবার ইসরাহর দিকে ফিরলেন। ওনার মুঠোয় ইসরাহর হাত জোড়া নিয়ে অমায়িক হেসে বললেন:-
--" তোমার সব পছন্দ হয়েছে মা? তোমার মা কল দেওয়ার পর, রওনাফ নিজে সকালে শপিং এ গিয়ে সব দেখে দেখে , পছন্দ করে কিনে এনেছে। আমাকে যেতে বলেছিলো; কিন্তু আমার ওতো সময় কই।"
আসফা বেগম হেসে সুধালেন;-
--" রওনাফের পছন্দ আছে বলতে হয়।"
--" ভাই সাহেব কে একটু ডাকেন আপা। বিয়ের দিন , তারিখ টা নিয়ে কথা বললে, এর পর আমার উঠতে হবে। সন্ধ্যা পড়ে এলো বলে।"
ইসরাহর দাঁড়িয়ে পড়লো। মাথা টা ধরে এসেছে তার। এখানে বসে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে না। ইসরাহ নম্র কন্ঠে বললো;-
--" তুমি বসো মা, আমি বাবা কে ডেকে দিচ্ছি।"
ইসরাহ যেতেই আবার গয়না দেখায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন আতিফা আর আসফা। কোন শাড়িটা কোনদিন পরবে সেটাও ঠিক করে নিলো তারা।
----------
রাত একটা! নিস্তব্ধ প্রকৃতি, দূরে কোথাও বন্য নেকড়েরা ডেকে চলেছে দল বেঁধে। বরফের আস্তরণে পথ ঘাট সব অস্পষ্ট।
লাল , নীল , হলুদ সহ বিভিন্ন রঙের আলোয় মুখরিত হয়ে আছে বার। সাউন্ড সিস্টেমে মাঝারি সাউন্ডে ইংলিশ গান বাজছে। তার তালে তালে , অশালীন পোশাক পরে; কোমর দুলোচ্ছে কিছু আমেরিকান তরুণী বার ডান্সার। আর তা উপভোগ করছে বারের সকলে।
বারে শেষ কর্ণারে সামনা সামনি বসে আছে ; ফারিস জাওয়ান আর আরসালান আতাকুল। আরসালানের পেছনে দু'জন গার্ড দাঁড়িয়ে। দুজনের হাতেই বন্দুক ধরা। আরসালান আর ফারিসে হাতে দু'গ্লাস ড্রিংস। সামনে সেন্টার টেবিলের উপর চিপস আর বার-বি-কিউ চিকেন রাখা। বাম হাত বাড়িয়ে আরসালান এক চুমুক অ্যালকোহল পান করে, তাকালো ফারিসের দিকে। যে কিনা মনযোগ সহকারে বারের চার পাশটা পরোখ করছে। ফারিসের উদ্দেশ্যে আরসালান অফার করলো;-
--"গিভ মি দ্য রেসিং ট্র্যাক। ইন রিটার্ন, অ্যাজ ম্যানি ডলার্স ; অ্যাজ ইউ ওয়ান্ট উইল এন্টার ইউর অ্যাকাউন্ট।"
ফারিস অকপটে বললো;-
--" গিভ মি ইউর ব্লা*ড?"
ফারিসের কথায় শব্দ করে হাসলো আরসালান। আরসালান আতাকুলের সাথে ফাজলামি? ইন্টারেস্টিং, আরসালান দৃঢ় স্বরে বললো;-
--" মজা করছো?"
--" একদম ই না, আমার র*ক্ত প্রচুর পছন্দ। আর্টের কাজে কালারের বিপরীতে ব্যবহার করা যায়। অনেকটা কালার বেঁচে যাবে।"
এক ঢোকে পুরো গ্লাস অ্যালকোহল শেষ করে ফেললো ফারিস। পকেট থেকে সাইলেন্সর ফিট করা রিভলবার টা নিয়ে গুলি চালালো আরসালানের পিছনের গার্ড দুটোর বুকে। পর পর দুটো গার্ড পড়ে গেলো। ফারিস দাঁড়িয়ে পড়লো। শান্ত চোখে আরসালান সবটা পরোখ করলো।
--" র*ক্ত আমার অ্যালকোহলের থেকে বেশি পছন্দ মিস্টার আতাকুল। দুটো কুকুর মারার জন্য সরি।"
বারের গার্ড গুলো ছুটে আসলো ফারিস কে ধরতে। তাদের হাতের ইশারায় থামিয়ে দিলো সে। ব্লেজারের পকেট হাতড়ে দু'বান্ডিল ডলার ছুঁড়ে দিলো ওদের দিকে। শক্ত কন্ঠে বললো;-
--" আই গিভ অফ মানি! কাভার ইট অল আপ। আদারওয়াইজ, আই উইল মেক আ পিকচার অফ অল দ্য পিসেস অ্যান্ড হ্যাং দেম অন দ্য ওয়াল।"
বড় বড় পায়ে বার থেকে বেরিয়ে গেলো ফারিস। গার্ড গুলো ছুটে এসে লা*শ দুটো সরিয়ে ফেললো। অন্য একজন গার্ড গিয়ে সিসি টিভি ফুটেজ টা ডিলেট করে দিয়ে এলো। সব ঠিক হতেই আবার গান বেজে উঠলো সাউন্ড বক্সে। রমরমা হয়ে উঠলো মিড নাইট বার টা। যেনো এই মাএ এখানে কিছুই হয়নি।
-----------
পাহাড়ের শুনশান নীরবতার বুক ছিঁড়ে দাঁড়িয়ে থাকা কালো প্যালেসটার সামনে এসে থামলো একটা কালো মার্সিডিজ। ফারিস দরজা খুলে বেরোলে গাড়ি থেকে। প্যালেসের গেইট টা খুলে গাড়ি টা ঢুকিয়ে ফের তা বন্ধ করে দিলো। গাড়িটা গ্যারেজে রেখে ; ফারিস শিষ বাজাতে বাজাতে এগোলো প্যালেসের ভেতরে। তার মধ্যেই তার ফোনটা বেজে উঠলো। রিসিভ করতেই অপর পাশ থেকে আরহাম সিকদারের কন্ঠ টা শোনা গেলো;-
--" হ্যালো!"
বাবার কন্ঠ পেয়ে তীক্ষ্ম কন্ঠে ফারিস বললো;-
--" বলো?"
চেঁচিয়ে উঠলেন আরহাম সিকদার। গম্ভীর কন্ঠে রাগী গলায় সুধোলেন:-
--" তোমার কি মনে হয় না ফারিস, এইবারে তোমার দেশে ফেরা উচিত।"
বাবার রাগী কন্ঠে পাত্তা দিলো না ফারিস। তাচ্ছিল্যের কন্ঠে উত্তর দিলো সে;-
--" আমি ফিরবো , কি ফিরবো না। তা আপনি জেনে কি করবেন?"
--" আমি তোমার বাবা হই ফারিস। যথেষ্ট অধিকার আছে তোমার ব্যাক্তিগত বিষয় সম্পর্কে জানার।"
--" তাহলে কি, তোমাকে বাসর রাতের কথা ও বলা লাগবে নাকি। ছিঃ মিস্টার সিকদার। আপনার লজ্জা করবে না? যতোই হোক আপন ছেলে আর সৎ মেয়ের বাসরের কাহিনী শুনবেন। ওসব বলতে পারবো না আমি। এইটুকু লজ্জা আমার অবশিষ্ট আছে।"
থতমত খেলেন আরহাম সিকদার। এই নির্লজ্জ ছেলেটা নাকি তার। ফারিসের মা থাকলে আজ ঘরে ফিরে তিনি সত্যিই এই প্রশ্ন করতেন। এমন ইতর ছেলে কোথা থেকে ধরে এনেছে? নাকি ডেলিভারির সময় হাসপাতালে বদলা বদলি হয়ে গেছে। ভাবনা রেখে আরহাম বললেন;-
--" ফাজলামি বাদ দাও। কবে দেশে ফিরবে? যদি সত্যিই ইসরাহ কে চাও! তবে এই সপ্তাহের মধ্যে টিকেট বুকিং দাও। আজ বৃহস্পতিবার, সোমবারে ইসরাহর বিয়ে। সময় মাএ চারদিন।"
উত্তর দিলো না ফারিস। কলটা কেটে দিলো সে। মিনমিনিয়ে ফারিস বললো;-
--" কখন না আবার আবদার করে বসো। আমার বাসর রাতের কথাও তোমাকে বলা লাগবে। তোমার আর তোমার বুড়ো বউয়ের কারণে আমার বাসর টা ঝুলে আছে।"
ব্লেজার টা গা থেকে আলগা করে বিছানায় নিক্ষেপ করলো। ব্যস্ত হাতে এয়ার টিকেট টা কনর্ফাম করে সটান শুয়ে পড়লো ফারিস। কালকের টিকেট বুকিং করেছে সে। বাংলাদেশ পৌঁছাতে পৌঁছাতে শনিবার।
মাথার ভেতরে সবটা গুছিয়ে পরম শান্তিতে চোখ বুঁজলো ফারিস। আর অল্প সময়ের ব্যবধান। তার পর তার লিটল গার্ল তার বুকে থাকবে। বারো বছর ধরে জমা হওয়া সব অভিমান , অভিযোগ এই বুকে মুখ গুঁজে কেঁদে উসুল করবে।
ভাবতে শরীর শিউরে উঠলো ফারিসের। বুক পাঁজর টা ধড়ফড়িয়ে উঠলো।
--"তার লিটল গার্ল , কেবল ফারিস জাওয়ান সিকদারের ওয়াইফ ইসরাহ জাওয়ান।"
-----------
সূর্যের আলোর রশ্মি চোখে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেলো ফারিসের।
বেড হাতড়ে ফোনটা নিয়ে দেখলো কয় টা বাজে। সবে সাতটা বাজে। দুপুর বারোটায় তার ফ্লাইট! বেড থেকে নেমে পড়লো ফারিস। কার্বাড থেকে টাওয়াল আর ট্রাউজার নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো সে।
ওয়াশরুমের আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালো ফারিস। ডান হাতে বেসিনে চেপে, বাম হাতে থুতনির টা ধরে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে মুখ টা পরোখ করলো সে। নাকের উপর কিছুটা ব্ল্যাকহেডস জমেছে। ড্রয়ার থেকে ব্ল্যাকমাস্ক টা নিয়ে নাকে আর কপালে মাখলো ফারিস। পর পর ইলেকট্রনিক ব্রাশটাতে পেস্ট নিয়ে দাঁত মেজে। মাস্ক টা উঠিয়ে শাওয়ারে গেলো সে।
ঘন্টা খানেক সময় নিয়ে শাওয়ার নিলো ফারিস জাওয়ান। পায়ের নখ থেকে শুরু করে মাথার প্রতিটি চুল ; খুব ভালো ভাবে পরিষ্কার করে তবেই থামলো সে। কালো ট্রাউজার টা পরে বেরিয়ে এলো রুমে।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুল গুলো শুকিয়ে নিলো। ফের কার্বাড থেকে পোশাক আর ট্রলি ব্যাগ টা বের করে নিলো। বেডের উপর জিনিস গুলো রেখে; বইয়ের বড় সেল্ফটার দিকে এগিয়ে গেলো ফারিস। সেল্ফ জুড়ে থরে থরে ইংরেজি , বাংলা , উর্দু ভাষার উপন্যাস , সাইকোলজিক্যাল, প্যাথলজিক্যাল সহ বিভিন্ন যাদু বিদ্যার বই।উপরের তাকটাতে হাত বাড়িয়ে, উর্দু আর ইংরেজি কটা উপন্যাসের বই নিয়ে নিলো ফারিস।
আর্টের পাশাপাশি বই পড়াটাও ফারিসের ফ্যাশন। মাঝে মাঝে ই নদীর ধারে বসে বই পড়ে সে।