উত্তরের হিমেল বাতাস ইতিমধ্যে জানান দিতে শুরু করেছে যে, শীত আসছে।
কখনো হাড় কাঁপানো শীতে জনজীবন বিপর্যস্ত করতে; তো কখনো খেজুর গাছের রস দিয়ে পায়েস খাওয়ার জন্য শীতের প্রয়োজন। শিশির ভেজা কুয়াশায় ঢেকে আছে চারপাশ।
সকাল সাড়ে ছয়টা বাজে।
সিকদার ভিলার সকলে এখনো ঘুমে। পাখির কিচিরমিচির ডাকে ঘুম ভেঙে গেলো ইসরাহর। শরীর থেকে কম্পোটার টা সরিয়ে অলস ভঙ্গিমায় বিছানায় উঠে বসলো সে। এলো মেলো হাতে কোমর সমান চুল গুলোকে খোঁপা বেঁধে বিছানা ছেড়ে নেমে পড়লো ইসরাহ। ওয়াশরুম থেকে ব্রাশে পেস্ট নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো সে। চারদিকে কুয়াশার আস্তরণে অস্পষ্ট। বাগানে চোখ রাখলো ইসরাহ। ফুল গাছ গুলোর আশপাশে আগাছায় ভরে গেছে। কয়দিনের অযত্নে গাছ গুলোর দশা বেহাল। গাঁদা ফুল গুলো পাপড়ি ছেড়ে দিয়েছে। গোলাপ গুলোর ও একি দশা।
ওয়াশরুম থেকে কুলিকুচি করে,চাদর টা পেঁচিয়ে রুম থেকে বেরোলো ইসরাহ। সিঁড়ির দিকটাতে পা বাড়িয়ে ও থেমে গেলো সে। ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো ডানে।
এখান থেকে দেখে যাচ্ছে ফারিসের রুমটা। দরজার বাহির থেকে ছিটকিনি দেওয়া। আবার বামে তাকালো সে। বাবা - মায়ের রুমের দরজা টা এখনো বন্ধ। সাহস করে ফারিসের রুমের দিকে পা বাড়ালো ইসরাহ। আলতো হাতে শব্দ ছাড়া ছিটকিনি টা খুললো সে। দরজা টা ধাক্কা দিতেই মড়মড়িয়ে শব্দ হলো। শব্দটাকে উপেক্ষা করেই; বিসমিল্লাহ বলে, রুমের ভিতরে ইসরাহ পা বাড়াতেই হাতে টান পড়লো। ভয়ে চোখ খিচেঁ নিলো সে।
মিনিট পরেই পেছন থেকে শোনা গেলো আসফা বেগমের রাগমিশ্রিত কন্ঠ;-
--" কতো বার তোকে এই ঘরে আসতো বারণ করেছি ইসু?"
ঘুরে দাঁড়ালো ইসরাহ। অপরাধী কন্ঠে, একটু মিথ্যা বানিয়ে বললো সে:-
--" কিছুর শব্দ আসছিলো এই রুম থেকে। তা দেখতেই এসেছিলাম।"
--" তাতে তোর কি?"
আসফা বেগমের চিৎকারে নিজের ঘর থেকে বেরোলেন আরহাম সিকদার। ঘুম ঘুম চোখে চশমা টা পরে বললেন;-
--" সকাল সকাল কি শুরু , করলে আসফা?"
আরহাম সিকদারের কন্ঠ পেয়ে দ্বিগুণ তেঁতে উঠলেন আসফা।
--" হ্যাঁ এখন তো সব দোষ আমার! তোমার মেয়ে সাধু।"
--" হয়েছে টা কি? না বললে বুঝবো কিভাবে, যে কে সাধু আর কে অসাধু।"
আরহাম সিকদারের কথায় হেসে উঠলো ইসরাহ। ফের মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সে গম্ভীর হয়ে উঠলো। অবাক কন্ঠে প্রশ্ন করলো;-
--" কিন্তু,ফারিস জাওয়ান তো এই ঘরে এখন আর থাকে না আম্মু। উনি চলে গেছেন যে আজ বারো বছর পেরিয়েছে। তবুও এতো সাবধানতার কারণ কি?"
--" ইসরাহ!"
--" আম্মু আমি সত্যিই ক্লান্ত, তোমার এতোসব বাঁধা নিয়মে। যে নেই , তার ঘরে আসা ও নাকি নিষেধ! ফারিস থাকলে এক কথা ছিলো।"
কৌতূহলী চোখে মেয়ে কে পরোখ করলেন আসফা। মেয়ের হঠাৎ এমন পরিবর্তন? এতোটা, যে ফারিস জাওয়ানের পক্ষ পাতিয়ে কথা বলছে। এতো সাহস কবে বাড়লো ইসরাহর?আসফা বেগমের অবচেতন মনে কাঁটা বিঁধলো। ছেলে টা না থেকে ও,যেনো ওনার সংসারের সব টা গ্রাস করে বসে আছে। আরহাম সিকদার আর ইসরাহ দুজন ই যেনো ফারিস জাওয়ানের বিশ্বস্ত সৈন্য। প্রভুর ভক্তি তাদের শিরায় শিরায়। কথা বাড়ালেন না আসফা।এখানে কথা বাড়িয়ে ও লাভ নেই। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলেন নিজের ঘরের দিকে। পেছনে রেখে গেলেন দুটো অবাক সত্তা কে।
আসফা বেগমের রওনাফের মায়ের সাথে একবার কথা বলা প্রয়োজন। সব কিছু ওনার হাত থেকে ফসকে যাওয়ার আগেই মুঠো শক্ত করতে হবে।
----------
ভার্সিটির ব্যালকনিতে মন মরা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রবিন আর ইসরাহ। জাইমা আজ আসেনি। সে নাকি গ্রামের বাড়িতে বিয়ে খেতে গেছে।
রবিন আর ইসরাহর ক্লাস শেষ হয়েছে যে দশ মিনিট হবে। ক্লাস থেকে বেরিয়েই তড়িঘড়ি পায়ে করিডোরের শেষ মাথায় এসে দাঁড়িয়ে ছিলো ইসরাহ। তার দেখা দেখি রবিন ও ব্যাগ টা কাঁধে চাপিয়ে দৌড় দিয়ে ছিলো, ইসরাহর পিছু পিছু। অনেক্ষণ সময় পেরোলেও ইসরাহ এখনো টু শব্দটি করেনি। ইসরাহর এমন শান্ত রুপ সহ্য হলো না রবিনের। মিনিটে বিশটা কথা বলা মেয়ে এতক্ষণ ধরে চুপচাপ? বিশ্বাস হচ্ছে না তার। রবিন বিরক্তি মেশানো কন্ঠে সুধালো;-
--" ভাই তুই কি মনব্রত করেছিস নাকি?"
প্রতিউত্তর করলো না ইসরাহ।ব্যালকনির পাশ ঘেঁসে থাকা বরই গাছটার দিকে চাইলো সে।সবে ফুল আসতে শুরু করেছে গাছটাতে। তবুও কি সুন্দর লাগছে বরই গাছটা। শীতের রোদে সবুজ পাতা গুলো জ্বলজ্বল করছে। নীরবতা ভেঙে ইসরাহ বললো;-
--" আচ্ছা রবিন, তোর কাছে ভালোবাসা মানে কি?"
--" জানি না ভাই, আমি এতো কঠিন বিষয় বুঝি না।"
--" একটু সহজ করেই বল তাহলে।"
--" আচ্ছা, যেমন ধর আগলে রাখা, পাশে থাকা। অসুস্থতায় মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া; আর বলতে পারছি না।"
আনমনা ইসরাহ সুধালো;-
--" কিন্তু ফারিসের সাথে আমার তেমন কোনো স্মৃতি ই নেই। তবুও ওনার কথা আমার মনে পড়ছে , মন ও পুড়ে।"
ইসরাহর কথা শুনে চক্ষু ছানাবড়া করে তার দিকে তাকালো রবিন। ইসরাহর মুখে এই নাম আর জীবনে শুনেনি সে। তার জানামতে ইসরাহর ডিকশনারিতে প্রেম ঘটিত কোনো বিষয় নেই। কৌতূহল না দমিয়ে প্রশ্ন করলো রবিন;-
--" এই ফারিস আবার কে? তোর মুখে এই নাম তো এর আগে কখনো শুনিনি।"
রবিনের প্রশ্নে চুপ হয়ে গেলো ইসরাহ। সৎ ভাই বলবে নাকি স্বামী? কি তার পরিচয়! দ্বিধায় পড়ে গেলো ইসরাহ। হাশপাশ করে উঠলো সে। তাদের সম্পর্কের সমীকরণ টা এতো জটিল হতে গেলো কেন? সবার মতো সহজ হলে পারতো না। ফারিস জাওয়ান দেশে থাকলে কি এমন ক্ষতি হতো? সে কি পারতো না ফিরতে? আক্ষেপে বুকে জ্বালা ধরলো ইসরাহর।
--" বল?"
তাড়া দিলো রবিন।
--" জানি না, এমনিই বললাম।"
--" এমনি এমনি তুই মানুষের নাম বলছিস? বিষয়টা হজম হচ্ছে না ঠিক।"
--" গোয়েন্দা গিরিতে নাম লেখালি নাকি?"
--" দূর , আচ্ছা বাদ দে। চল যাই , অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি।"
--" হুমমম।"
ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে পড়লো রবিন আর ইসরাহ। দুপুরের মধ্যে ভাগ। বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিকেল গড়াবে। তাই, দুজনে ঠিক করলো সামনের রেস্টুরেন্ট থেকে খেয়ে একসাথে বাড়ি ফিরবে।
----------
ইসরাহর ভার্সিটির সামনে গাছের ছায়ায় গাড়িতে ঢেল দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রওনাফ। পরণে তার কালো শার্ট আর ক্রিম কালারের প্যান্ট। এই দুই রঙের মিশেলে অদ্ভুত সুন্দর ঠেকছে ছেলেটাকে। শুভ্র সুন্দর হওয়াতে সবেতেই মানায় রওনাফ কে।
শার্টের পিঠের অগ্রভাগ ঘামে ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে। পকেট থেকে রুমাল টা বের করে মুখ টা মুছে নিলো রওনাফ। মেয়ে টা আজ আর ভার্সিটি থেকে বেরোবে না নাকি? কতোক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে সে। আকাশের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ কন্ঠে রওনাফ সুধালো:-
--" ও রব,আপনার মুনতাসীর বান্দি কে আল্লাহ্ ওয়াস্তে আমার সাথে দেখা করিয়ে দিন। আর যে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না।"
আকাশ থেকে চোখ নামিয়ে সামনে তাকাতেই চোখাচোখি হলো ইসরাহ আর রওনাফের। খুশিতে চিকচিক করে উঠলো রওনাফের দু'চোখ। রাস্তা ক্রস করে সোজা ইসরাহর সামনে এসে দাঁড়ালো সে। রওনাফ দাঁড়াতেই ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো ইসরাহ। সে কিছু বলবে তার আগেই রওনাফ সুধালো;-
--" কেমন আছেন সাহেবা?"
অপ্রস্তুত কন্ঠে ইসরাহ জবাব দিলো।
--" ভা...লো ভালো, আপনি?"
--" আলহামদুলিল্লাহ।"
--" তা আপনি হঠাৎ এখানে?"
--" তোমার সাথে দেখা করতে এলাম।"
--" ওহ।"
পূর্ণ দৃষ্টিতে ইসরাহ কে একবার দেখলো রওনাফ। সাধারণ একটা মেয়ে। তবুও কি অসাধারণ সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে। পর পর মুচকি হেসে মাথা চুলকে রওনাফ সুধালো;-
--" উমম, সামনেই একটা রেস্টুরেন্ট আছে। চলো বসে কথা বলি? সাথে একটু কিছু খাওয়া ও হলো। সকালের পর থেকে আর কিছুই খাওয়া হয়নি কাজের চাপে।"
ইসরাহ চুপ করে পাশে দাঁড়ানো রবিনের দিকে চাইলো। গর্দভ টা অবাক চোখে সব দেখছে। কিছুই বুঝতে পারছে না। ম্রনতা কাটিয়ে ইসরাহ কে প্রশ্ন করলো রবিন;-
--" তুই যাবি ইসু?আমি তাহলে যা....।"
রবিনের বাকি কথা শেষ করার আগেই তার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিলো রওনাফ। স্নেহের কন্ঠে আদেশ দিলো;-
--" তুমি ও আসো ভাইয়া। মুনতাসীর কমফোর্ট ফিল করবে।"
কথা শেষে আগে আগে হাঁটা ধরলো রওনাফ। পকেট থেকে গাড়ির চাবিটা বের করে নিলো সে। ইসরাহ ও পা বাড়ালো রওনাফের পেছনে। কিন্তু তার ব্যাগ টেনে ধরলো রবিন। নিচু কন্ঠে প্রশ্ন করলো;-
--" এই ছেলেটাই ফারিস?"
--" না।"
--" তাহলে কে?"
--" আম্মুর ঠিক করা পাত্র।"
শয়তানি হাসি দিলো রবিন। নেভি-ব্লু শার্টটার ঘাড় উঁচিয়ে সুধালো;-
--" ওরেহ, চল চল আজ তাহলে ছেলেটার পকেট ফাঁকা করার দায়িত্ব আমার মুনতাসীরর।"