ঘুম ঘুম চোখে মাঝারি ধাঁচের একটা পার্সেল হাতে বিছানায় বসলো ইসরাহ। পার্সেলটাতে আধোতে কি আছে জানা নেই তার। ইসরাহর জানা মতে সে এই সপ্তাহে কোনো প্রডাক্ট ই অর্ডার করেনি। তাহলে পার্সেল আসলো কোথা থেকে? বুঝে আসলো না ইসরাহর।
ডেলিভারি বয় কে বলেছিলো; ঠিকানা ভুল করেছে হয়তো। কিন্তু বক্সের উপর গোটা ইংরেজি অক্ষরে
"ইসরাহ জাওয়ান সিকদার!"
নামটা দেখেই অভ্যন্তরীণে কাঁপন ধরলো ইসরাহর। বুক পাঁজরে কামড়ে ধরলো অস্বস্তিরা। "জাওয়ান?" তার নামের পাশে জাওয়ান কে লিখলো? "ইসরাহ মুনতাসীর" কেটে "জাওয়ান"। ইসরাহর বাবার নাম মুনতাসীর জামান ছিলো। সেই হিসেবে জন্মের পর ইসরাহর নামের পাশে মুনতাসীর যুক্ত হয়েছিলো। বাবা চলে গেলে ও নামটা আর কাটা হয়নি। বরং পাশে সিকদার টা সংযুক্ত করা হয়েছিলো।
কিন্তু জাওয়ান কেউ কি ভুলে লিখেছে নাকি ইচ্ছে করেই এমন ভুল করা। বুঝে আসলো না ইসরাহর। ভাবনা গুলোকে সাইডে রেখে। কাঁচি দিয়ে পার্সেল টা অনপ্যাক করলো সে। ভেতরে ছোটো একটা বক্স আর চার ভাঁজের একখানা চিরকুট। বক্স টা হাতে নিয়ে চোখের সামনে খুলে ধরলো ইসরাহ। মূহুর্তেই চিৎকার করে তা হাত থেকে ছুঁড়ে মেঝেতে ফেলে দিলো সে।
--" আহহহহ!"
বকটাতে একটা "ব্লাড ডপ বেসলেট।" ইসরাহর জানা মতে মানুষের র*ক্তের ফোঁটা দ্বারা এমন বেসলেট বানানো হয়। কিন্তু এমন অদ্ভুত উপহার তার জন্য কে পাঠালো। ভয়ে গলা শুকিয়ে এলো ইসরাহর। কাঁপা হাতে চিরকুটার ভাঁজ মেললো। পরোক্ষণে আবারো সে চেঁচিয়ে উঠলো। চিরকুট টা ও র*ক্ত দিয়ে লেখা। র*ক্ত দিয়ে লেখার কারণে অক্ষর গুলো কালো বর্ণ ধারণ করেছে। গা গুলিয়ে উঠলো ইসরাহর। দৌড়ে বিছানা থেকে নেমে হুড়মুড়িয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো সে। মিনিট পাঁচেক পর নিজেকে ধাতস্থ করে হাত মুখ পানি ছিটিয়ে বেরিয়ে এলো ওয়াশরুম থেকে। ফের বিছানাতে চোখ বন্ধ করে মাথা চেপে বসলো ইসরাহ। পর পর উঠে গিয়ে মেঝে থেকে চিরকুট আর বেসলেট টা তুলে নিলো। বেসলেট টা মুঠোয় নিয়ে চিরকুট টা পড়ার নিমিত্তে ভাঁজ খুললো ইসরাহ।
--"বিয়ে করছো লিটল গার্ল? তুমি ভেবেছো, এতো সহজে আমার থেকে মুক্তি পাবে। রিয়েলি? আমি ফিরছি বেইবি গার্ল। বারো বছর হিসেব তোলা আছে? এতো কিছু বাকি রেখেই বিয়ের পিঁড়িতে উঠবে? নো নো!"
ইতি,
ইউর ডেস্টিনি!
চিঠিটা জুড়ে হুমকি বাক্যে ছিলো নাকি অধিকার বোধ ঠিক বুঝলো না ইসরাহ। তবে চিঠিটার মাধ্যমে অপর প্রান্তের ব্যক্তিটি খুব জোরালো ভাবেই নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে চাইলো মনে হলো তার। চিঠিটা রেখে আবার বেসলেট টা নিরট মুখে চাইলো ইসরাহ। বেসলেট টা দেখতেই ইসরাহর মনে হলো ;
কেউ হয়ত নিছক ফাজলামি করে এমন অদ্ভুত উপহার পাঠিয়েছে। না হলে কেউ নিজের শরীরের আসল র*ক্ত দিয়ে আর যাইহোক ইসরাহ কে গিফট পাঠাবে না।
এতো ভালো সম্পর্ক ইসরাহ সাথে কারো নেই। তার পুরো পৃথিবী জুড়ে কেবল বাবা - মা আর রবিন , জাইমা। রবিন বা জাইমা কেউ ই এতোটা সাহসী না যে নিজের শরীর থেকে র*ক্ত নিয়ে এমন বেসলেট বানাবে বা চিরকুট লিখবে।
চিঠি টা ভাঁজ করে রাখলো। আপাতত এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর ইচ্ছে নেই ইসরাহর।
পর পর পার্সেলের বক্সটাতে জিনিস গুলো রেখে বইয়ের তাকটাতে তুলে রাখলো সে। অন্য কেউ এগুলো দেখলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। কাবার্ডে রাখলে আসফা বেগমের চোখে পড়ার সম্ভাবনা আছে। তাই সেই রিস্ক নিলো না ইসরাহ। নিজের রুম থেকে বেরোতে নিয়ে ও থামলো সে। গভীর ভাবে শ্বাস টেনে ছাড়লো। শান্ত মনে মাথা থেকে পার্সেলটার চিন্তা ঝেরে রুম থেকে বেরলো।
--------
পেপার হাতে সামনে চায়ের কাপ নিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে আছেন আরহাম সিকদার। ইসরাহ এসে ওনার পাশের চেয়ারে বসলো। মেয়ে কে বসতে দেখে পেপার টা সরিয়ে স্নেহের দৃষ্টিতে ইসরাহর দিকে চাইলো আরহাম। অমায়িক হেসে সুধালেন তিনি:-
--" তোমার মাকে নাকি বলেছিলে কোথাও ঘুরতে যাবে?"
বাবার দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ইসরাহ বললো:-
--" তুমি যাবে?"
--" আজ আমি একদম ফ্রি! কেউ যদি সাথে নেয়! তবে আমি যাবার জন্য রাজি আছি।"
চেয়ার থেকে উঠে এসে আরহাম সিকদারের গলা জড়িয়ে ধরলো ইসরাহ। আদুরে আদুরে কন্ঠে সুধালো:-
--" নিবো বাবা।"
মেয়ের মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে আরহাম সিকদার আদেশ করলেন:-
--" আগে নাশতা টা শেষ করো। তোমার মা কে বলবে , যাতে দুপুরের রান্না না করে।"
নিজের জায়গায় এসে বসলো ইসরাহ। সামনের প্লেট টা উল্টে পরোটা নিয়ে বাটিতে সবজি সাজিয়ে জগ থেকে পানি ঢেলে নিলো। মনোযোগ সহকারে সম্পূর্ণ খাবার টা শেষ করে উঠে পড়লো। বেসিনে হাত ধুয়ে কিচেনে গিয়ে আসফা বেগমের পাশে দাঁড়ালো।
--" আম্মু বাবা বলেছে দুপুরের রান্না না করতে।"
চপিং বোর্ড থেকে কাঁটা পেঁয়াজ গুলো কড়াইয়ের তেলে ছেড়ে পাশ ফিরে; অবাক কন্ঠে বললেন আসফা:-
--" এখন কি তোরা দুজনে কিচেনে ও নাক গলানো শুরু করবি? তবে আমি আগেই বলে দিচ্ছি , খুন্তির বাড়ি কিন্তু তোর পিঠে দিবো।"
--" দূর ! তোমার এসব রান্না - কান্না আমরা করতে যাবো কোন দুঃখে? ওটা বরং তুমি ই সামলাও। আজ আমরা দুপুরে বাইরে খাবো।"
--" ওহ , তাই বল।"
--" তুমি বলার সুযোগ দিলে তো, বলবো!"
ইসরাহ কে চোখ রাঙানো দিলো আসফা বেগম। মা কে চোখ রাঙাতে দেখে বড় বড় কদমে পালালো ইসরাহ।
-------
অমাবস্যার অন্ধকারে পৃথিবী আচ্ছাদিত। হাতের পাঁচ আঙুল ও অদৃশ্যমান অন্ধকারের চাদরে।
প্যালেসের ছাদে অনাবৃত দেহে বসে আছে ফারিস। শীতের মাঝে ও সদ্য শাওয়ার নিয়ে এসেছে সে। ফারিসের চুল থেকে টুপটাপ পানি ঝরছে। শীতল বাতাসে ও অনড় বসে আছে সে। সামনে একশো একটা মোমবাতি জ্বলছে। হালকা শীতল বাতাসে মোমবাতির আগুন নিভু নিভু হয়ে জ্বলছে।
মোমবাতির লালচে আলো আঁধারে অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে ফারিস কে। বার বার শ্বাস - প্রশ্বাস নিঃসরণ ও গ্রহণের ফলে ; তাল মিলিয়ে উঠানামা করছে ফারিসের প্রশস্ত বুক। শীতের প্রকোপে ক্ষণ পর পর ঢোক গেলার দরুন গলার অ্যাডাম’স অ্যাপল খানা ধীরে নড়ছে। লালচে খয়েরি রঙের ওষ্ঠ জোড়া শীতের তীব্রতায় ফাঁটল ধরেছে। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে চোখ খুললো ফারিস জাওয়ান।
মনে মনে কিছু একটা পড়লো সে। অতঃপর সামনে সাজিয়ে রাখা; প্রয়োজনীয় সামগ্রীর মাঝ থেকে লাল রঙের "মায়ার ধুলোর " চিমটি পরিমাণ ধূলো নিয়ে সামনের ক্যানভাসে থাকা ইসরাহর ছবিটার , মেদহীন উদরের অংশখানা ছুঁয়ে দিলো ফারিস। পর পর হাত খানা বাড়িয়ে চেপে ধরলো ইসরাহর কোমল ওষ্ঠ জোড়ায়।
ঘুমের ঘোরে নড়ে চড়ে উঠলো ইসরাহ। ফারিস ফের মিনমিনিয়ে উচ্চারণ করলো কিছু শব্দ। সামনের অগ্নিকুন্ডে ছুঁড়ে দিলো মুঠো ধুলো।
আচানক ধড়মড়িয়ে বিছানায় উঠে বসলো ইসরাহ। অস্বস্তিতে আড়ষ্ট হয়ে হাত বাড়িয়ে বেড সাইড টেবিল থেকে টেবিল ল্যাম্প টা অন করলো সে। ভর্য়াত চোখে পরোখ করলো পুরো রুম। কেউ নেই! কেউ না! কিন্তু ইসরাহর মনে হলো কেউ তাকে ছুঁয়েছে। সেই স্পর্শ টা নিছক স্বপ্ন বা ঘোর মনে হয় নি তার। বরং সে কেউ একজনের শক্ত উপস্থিতি টের পেয়েছিলো পাশে।
যার হাতের উষ্ণ স্পর্শ এখনো মেখে আছে ইসরাহর শরীরে। গ্লাস থেকে এক ঢোক পানি পান করলো ইসরাহ। পাশ থেকে ফোনটা নিয়ে সময় দেখলো। রাত শেষের দিকে।
চারটা পঞ্চান্ন। উঠে পড়লো ইসরাহ। ফজরের আজান পড়ে গেছে। ওযু করে জায়নামাজ পেতে নিয়ত বাঁধলো।
ফারিস শেষ মুঠো মায়ার ধূলো আগুনে দিতেই মোমবাতি গুলো নিভে গেলো। বসা থেকে উঠে পড়লো সে।উঠে গিয়ে ছাদের কার্নিশ ঘেঁসে দাঁড়ালো ফারিস। রাতের পাহাড়ের চূড়ায় চেয়ে ফিচেল কন্ঠে সুধালো:-
--" মাই লিটল গার্লললল!
লাভ ইউ সো মাচ বেইব। এতো সব তোমার জন্যই মাই ওয়াইফি। এই বার দেখার পালা। আমার সামনে তোমার মায়ের কান পোড়া কতোটা টিকে। তোমাকে অনেক ভালোবাসা দেওয়া বাকি আমার বিষাক্ত এনজেলস ট্রাম্পেট।"