She is my Obsession

পর্ব - ৫

🟢

নিজের ঘরে বসে এস্যাইনমেন্ট বানাচ্ছে ইসরাহ।

আর কয়েকটা লাইন লিখলেই সমাধান হয়ে যাবে এস্যাইনমেন্ট টা। হাতের গতি বাড়ালো সে। শেষ শব্দ টা লিখে। কলম টা টেবিলে রেখে পড়ার টেবিলেই মাথা নামিয়ে শুয়ে পড়লো ইসরাহ। পিঠ থেকে কোমর অব্দি ব্যথায় টনটন করছে। কোমর নিয়ে বসে থাকা দায়। সন্ধ্যা থেকে একই ভাবে সোজা হয়ে বসে থাকার দরুন এমন হয়েছে।

সোজা হয়ে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ালো ইসরাহ। বেড সাইড টেবিল থেকে ফোনটা হাতে নিতেই বেজে উঠলো তা। আননোন নাম্বার থেকে কল এসেছে। মনে মনে নাম্বার টা একবার

আওড়ালো ইসরাহ। তার চেনা পরিচিত কোনো নাম্বার না। তাহলে এতো রাতে কে কল দিলো। অবহেলায় ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেললো ইসরাহ। পরিচিত নাম্বার হলে ধরতো। কিন্তু অপরিচিত নাম্বারের ফোন ধরার মানেই হয় না। খোলা চুল গুলো হাত খোঁপা করে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো সে। এশার নামাজ টা আদায় করা বাকি। ঘড়ির কাঁটা এগারো টা পনেরো ছুঁই ছুঁই।

ওযু শেষে সবেই ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছে ইসরাহ। কার্বাড থেকে জায়নামাজ টা নিতেই বিকট শব্দে আবারো তার ফোনটা বেজে উঠলো। বিরক্তিতে এগিয়ে এসে ফোনটা রিসিভ করলো ইসরাহ। ঝাঁঝালো কন্ঠে ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তিটাকে সুধালো ;-

--" কি সমস্যা ভাই? দেখছেন ফোন তুলছি না। তবু ও ছ্যাচড়ামি করে কল দিয়েই যাচ্ছেন!"

--" বেগম একটু তো মার্জনা করুন। এতো কর্কশ কন্ঠে কথা বললে বুকে লাগে।"

রওনাফের কন্ঠ শুনে ফোনটা কান থেকে নামিয়ে নাম্বার টা আরেক বার দেখলো ইসরাহ। এই লোক তার নাম্বার জোগার করেছে কোথা থেকে? এই নাম্বার টা মা , বাবা , জাইমা আর রবিন ই জানে শুধু। তাহলে?

--" হ্যালো?"

ইসরাহর কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে পুনরায় হ্যালো বললো রওনাফ। ভাবনা ছেড়ে কথায় ফিরলো ইসরাহ। অনুসন্ধানী কন্ঠে রওনাফ কে প্রশ্ন করলো :-

--" আমার নাম্বার কোথায় পেয়েছেন?"

--" তোমাদের গলির মোড়ে একটা পোস্টারে লেখা ছিলো।"

আঁতকে উঠলো ইসরাহ। তার নাম্বার গলির মোড়ে পোস্টারে লেখা? মানে কি! ছেলেটা মজা নিচ্ছে নাকি?

--" ফাজলামি করছেন?"

ইসরাহর প্রশ্নে গমগমে কন্ঠে রওনাফ বললো :-

--" তুমি আমার বেয়াইন হও? যে ফাজলামি করতে যাবো।"

--" কোন পোস্টারে দেখেছেন? ছবি পাঠান!"

--" কেন?"

--" আমার নাম্বার পোস্টারে পোস্টারে কে ছড়াচ্ছে তা দেখা লাগবে না আমার?"

--" ফাজলামি করছিলাম।"

মুখ বাকালো ইসরাহ। টেবিলের খোলা বই টা বন্ধ করে শক্ত কন্ঠে সুধালো:-

--" হাসি আসলো না আমার। ফোন রাখলাম।"

--" এইইই এইইই শুনো!"

--" দুই মিনিট সময় দিলাম। যা বলার দ্রুত শেষ করুন।"

রওনাফ দৃঢ় কন্ঠে অকপটে আওড়ালো:-

--" মা বলছিলো বিয়ে ডেট টা ফিক্সড করতে। সামনের মাসেই অফিসের কাজে দেশের বাইরে যাবো। তার আগেই বিয়ে টা সেরে ফেললে ভালো হতো। তুমি কি বলো?"

--" উমমমম।"

--" তুমি রাজি?"

--" বাবা আর আম্মু রাজি থাকলে আমার আপত্তি নেই।"

বিস্তর হাসলো রওনাফ। আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে। মন কুঠুরিতে আঁকতে চাইলো ইসরাহ সুন্দর মুখশ্রী খানা। মায়ের সাথে কথা বলার সময়ের সেই সুন্দর হাসিটা। তার ভাবনার মাঝেই ইসরাহ বললো:-

--" দুই মিনিট শেষ।"

কল টা কেটে দিলো ইসরাহ।

ফোনটা রেখে জায়নামাজ টা বিছিয়ে নিয়ত বাধলো সে। ভালো ভাবে নামাজ আদায় করে। মোনাজাত ধরলো ইসরাহ। সবার জন্য একে একে দোয়া করা শেষে ; অক্ষিপটে ভেসে উঠলো ঝাপসা এক যুবকের ছবি। চাঁদ বদন তাহার মুখখানা। চোখ বন্ধ করে যাকে সু-পুরুষ বলা যায়।

মূহুর্তেই চোখ মেলে তাকালো ইসরাহ। আমিন পড়ে উঠে পড়লো জায়নামাজ থেকে। সে ভাববে না ওই মানুষটার কথা। মাকে দিব্বি কেটেছে ইসরাহ। জাওয়ানের কথা ভাববে না সে। এমনকি ছোটো বেলার ওই খেলার ছলের বিয়ে টা নিয়ে ও না।

ওটা সত্যিকারের বিয়ে হলে ফারিস জাওয়ান তার খোঁজ নিতো। বারো বছরে একবার হলে ও দেশে ফিরতো। বরের অধিকার নিয়ে ইসরাহর সামনে দাঁড়াতো। কিন্তু সে তেমন কিছুই করেনি। বছরে একবার বাবার ফোনে ফোন দিয়ে বেঁচে থাকা টা জানান দেয়। ইসরাহর জীবনে এই অব্দিই মানুষটার অস্তিত্ব। হঠাৎ ইসরাহর সরল মনে একটা প্রশ্নের তীব্র খোঁচা লাগলো;-

--" আচ্ছা? ফারিস জাওয়ান কি বিদেশে বিয়ে করেছে? এই জন্যই কি দেশে আসতে চায় না? পুরুষটা কেমন হয়েছে দেখতে?"

জিভ কাটলো ইসরাহ। কি ভুল চিন্তা ভাবনা মাথায় আনছে সে। বিধাতা তার ভাগ্যে যা লিখেছে তাই হবে। মাকে আর কষ্ট দিবে না সে।

----------

রাতের নিকষ কালো অন্ধকারের মাঝে ও ; পূর্ণিমার পূর্ণ চাঁদের আলোয় চারপাশ পরিষ্কার। চাঁদের শুভ্র রুপোলি আলোয় স্নান করে মন মাতানো রুপ ধারণ করেছে প্রকৃতি।

ছাদের বেতের সোফাটাতে বসে আছেন আরহাম সিকদার। হাতে ওনার স্মার্ট ফোনটা। আকাশের দিকে তাকিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন আরহাম সিকদার। আজ খুব করে ওনার ফারিসের মায়ের কথা মনে পড়ছে।

জীবনের প্রথম ভালোবাসা। সহজে ভোলার মতো নয়। ওনার শেষ চিহ্ন হিসেবে ফারিস ই শুধু আছে আরহাম সিকদারের কাছে। মা হারা ছেলেটা আজ বারো বছর ওনার কাছে নেই। পাক্কা এক যুগ! ছেলেটা এখন দেখতে কেমন হয়েছে আরহাম সিকদার জানেন না। শেষ যখন আমেরিকা পাঠিয়ে ছিলেন। তখন আরহামের চোখ ভর্তি ছিলো রাগের স্ফুলিঙ্গ। মনে ছিলো তুমুল ঝড়। পেছনে না তাকিয়েই বড় বড় পায়ে এয়ারপোর্টে ঢুকে পড়ে ছিলো ছেলেটা। তাকালে দেখতে পেতো এক অসহায় বাবার হতাশাগ্রস্ত চেহারা।

তার পর দেখতে দেখতে কতো সময় পেরোলো। ভাবনা রেখে ফোনের সাইড বাটনে প্রেস করলেন আরহাম। কল দিলেন ফারিস দিয়ে সেভ দেওয়া নাম্বারে। প্রথমবারেই কল টা রিসিভ করলো ফারিস। গম্ভীর কন্ঠে সুধালো সে;-

--" হ্যালো "

দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে মলিন কন্ঠে আরহাম সিকদার জিজ্ঞেস করলেন;-

--" কেমন আছো ফারিস?"

--" যেমন টা থাকার জন্য দেশের বাহিরে পাঠিয়ে ছিলেন! তেমন ই আছি।"

ছেলে যে এমন ত্যাড়া উত্তর দিবে তা ভালোই জানে আরহাম সিকদার। ভণিতা না করেই তিনি বললেন:-

--" ইসরাহর বিয়ে ঠিক করেছে আসফা। খবর টা তোমাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ হলো।"

আচানক গলার সুর বদলালো ফারিস। কাঠ কাঠ কন্ঠে সুধালো সে:-

--" আপনার স্ত্রী একটু বেশিই উড়ছে সিকদার সাহেব। ওনাকে জানিয়ে দিবেন ফারিস জাওয়ান কে যাতে দেশে আসতে বাধ্য না করে।"

--" উনি তোমার মা হয় জাওয়ান। একটু তো সম্মান দাও।"

--" আমার কোনো মা নেই। একজন ছিলো! সে মরে গেছে।"

আরহাম সিকদারের বুক ছিঁড়ে বেরিয়ে আসলো হতাশাগ্রস্ত শ্বাস। ছেলেটা কাউকে পরোয়া করে না। এমন অদ্ভুত হলো কি ভাবে?

--" এনি থিংক এলস?"

--" না।"

ফোন রেখে দিলো ফারিস। অশাহত হয়ে বেতের সোফাটাতে পিঠ এলিয়ে দিলেন আরহাম সিকদার। তিনি ভেবেছিলেন, এক জীবনে ছেলেটাকে কিছুই দিতে পারেননি। মা হারানোর পর অনাদরে অবহেলায় ছেলেটা বড় হয়ে ছিলো। সবশেষে আঠারো বছর হতেই ইসরাহ কে চেয়ে ছিলো। তখন ও তিনি দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়ে ছিলেন। এখন ইসরাহর বয়স বেড়েছে। আগে কার মতো আর ছোটো নেই। তাই এই বার বিয়ের কথা ভাবাই যায়। সেই বিষয়ে ভেবেই ছেলেকে ফোন দিয়ে ইসরাহর বিয়ের কথা জানিয়ে ছিলেন। ভেবেছিলেন ইসরাহর কথা শুনে কিছু টা নরম হবে ফারিসের মন। দেশে ফিরতে রাজি হবে। কিন্তু তার কথায় তেমন কিছুই মনে হলো না আরহাম সিকদারের।

---------

দক্ষ হাতে পাঞ্চিং ব্যাগটাতে একের পর এক ঘুষি মেরে যাচ্ছে ফারিস।

রাগে তার কপালের মাঝ বরাবরের সব রগ গুলো নীল হয়ে আছে। শেষ পাঞ্চ টা দিয়ে থামলো ফারিস। পাঞ্চিং ব্যাগটা চেপে ধরে তীক্ষ্ম কন্ঠে সুধালো:-

--" এ লট হ্যাজ হ্যাপন্ড। এনাফ ইজ এনাফ। দিস টাইম ইউ ওয়ান্ট অর নট! আই উইল টেক ইউ অ্যাওয়ে লিটল গার্ল। আই থট আই উড ফ্লাই ইন দ্য ওপেন স্কাই ফর আ ফিউ মোর ডেজ। বাট ইয়োর মাদার ক্যান্ট বিয়ার ইট।"

--" তোমার ব্রেইন ওয়াশ করা? দেখাচ্ছি তোমার মা কে। বিয়ে করা গোচ্ছাছি বেইব।"

ফারিস হাতের গ্লাভস খুলে ছুড়ে মারলো মেঝেতে।

-------

ঘুম ঘুম চোখে মাঝারি ধাঁচের একটা পার্সেল হাতে বিছানায় বসলো ইসরাহ। পার্সেলটাতে আধোতে কি আছে জানা নেই তার। ইসরাহর জানা মতে সে এই সপ্তাহে কোনো প্রডাক্ট ই অর্ডার করেনি। তাহলে পার্সেল আসলো কোথা থেকে? বুঝে আসলো না ইসরাহর।

ডেলিভারি বয় কে বলেছিলো; ঠিকানা ভুল করেছে হয়তো। কিন্তু বক্সের উপর গোটা ইংরেজি অক্ষরে

"ইসরাহ জাওয়ান সিকদার!"

She is my Obsession গল্পটি নবনীতা চৌধুরী-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সাসপেন্স-এ মাতানো রোমান্টিক থ্রিলার