ওয়াশরুমের ফ্লোরে শাওয়ার ছেড়ে হাঁটুতে থুতনি ঠেকিয়ে, বসে আছে ইসরাহ। পানির স্রোতে ফুলের পাপড়ি গুলো নেতিয়ে বোঁটা থেকে খসে পড়েছে। পানির স্রোতের সাথে বেসে যাচ্ছে গোলাপ আর গাঁদা ফুলের পাপড়ি গুলো।
ওয়াশরুমের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে ধ্যান ভাঙলো ইসরাহর। শাওয়ার টা অফ করে উঠে দাঁড়ালো সে। নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে র*ক্ত গুলো উঠেছে কিনা আরেকবার দেখলো ইসরাহ। হাত গুলো লাল হয়ে আছে। আধ ঘন্টা যাবত দু'হাত ঘষে ছিলো সে। অতঃপর সাবান পানিতে চুবিয়ে রেখেছিলো। তবুও হাতের দিকে তাকাতে অস্বস্তি লাগছে ইসরাহর। মনে হচ্ছে তার শরীরের চামড়ার মধ্যে র*ক্তের গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। শরীর জুড়ে অস্বস্তি মন জুড়ে মেঘাচ্ছন্নতা।
--" ইসরাহ আম্মু, হয়েছে তোর?"
মায়ের ডাকে ওয়াশরুমের দরজার ছিটকিনি খুলে দরজার সামনে দাঁড়ালো ইসরাহ। মেয়ের এমন দশা দেখে ভয় পেলেন আসফা বেগম। অনেকক্ষণ ধরে পানিতে ভেজার কারণে চোখ জোড়া লাল হয়ে উঠেছে ইসরাহর। পরণের হলুদ শাড়িটা ভিজে গায়ের সাথে সিটিয়ে আছে। এখনো ইসরাহ কে ভেজা শাড়িতে দেখে হাহাকার করে উঠলেন আসফা বেগম;-
--"একি, তুই এখনো ভেজা শাড়ি জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছিস যে? দাঁড়া আমি শুকনো পোশাক দিচ্ছি।"
তড়িঘড়ি করে রওনাফদের বাড়ি থেকে দেওয়া শাড়ি গুলো থেকে একটা লাল সুতির কাপড় নিয়ে এলেন তিনি। টাওয়াল টা নিয়ে মেয়ের হাতে ধরিয়ে দিলেন আসফা বেগম।
--" শাড়ি টা পাল্টে আয়। ওয়েদার চেন্জ হচ্ছে। এখন শরীর খারাপ হলে, কি হবে। কালকেই তোমার বিয়ে। আর আজ এমন বাচ্চামো করছো কেন আম্মু?"
--" কিছু বলতে এসেছিলে আম্মু?"
--" ওও হ্যাঁ, রওনাফরা বাড়ি ফিরবে। রওনাফ আর ওর মা একবার তোর সাথে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করছে।"
মায়ের কথার প্রতিউত্তরে ক্লান্ত কন্ঠে ইসরাহ সুধালো;-
--" ওহ, আমি আসছি আর পাঁচ মিনিট সময় দাও।"
--" আচ্ছা।"
আসফা বেগম চলে গেলেন। ইসরাহ ভেজা শাড়ি টা পাল্টে মাথায় টাওয়াল পেঁচিয়ে, বিছানায় এসে বসলো। বিছানায় বসতেই তার চোখ পড়লো; ওইদিন পড়ার টেবিলের উপর রাখা পার্সেলটার উপর।
তড়িৎ বেগে বিছানা থেকে উঠে এসে বইয়ের তাক থেকে বক্স টা নিলো সে। ফের ব্লাড ডোপ ব্রেসলেট টা বের করে উল্টে পাল্টে দেখলো ইসরাহ। পর পর কি যেনো ভেবে, ব্রেসলেট টা হাতে পরে নিলো সে। ইসরাহর ফর্সা হাতে লাল ব্রেসলেট টা দারুণ মানালো।
--"যেনো শুভ্র বরফের বুকে একখানা কৃষ্ণচূড়া।"
বার কয়েক নিজের হাত টা উল্টে পাল্টে দেখলো সে। ফের চিঠি সমেত বক্স টা জায়গা মতো রেখে বিছানায় এসে বসলো ইসরাহ।
--" আসবো ইসরাহ মা?"
রওনাফের মায়ের কন্ঠে দরজার দিকে তাকালো ইসরাহ। রওনাফ, আতিফা আর আসফা বেগম দাঁড়িয়ে আছেন। সবার পেছনে দাঁড়ানো রওনাফ। লম্বা হওয়ার দরুন আসফা আর আতিফার পেছনে দাঁড়ানোর পর ও রওনাফের মুখশ্রী খানা দিব্বি দেখা যাচ্ছে। হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা। পেছনে পড়ে থাকা কাপড়ের আচঁল টা পিঠে জড়িয়ে সুধালো ইসরাহ;-
--" আসুন আন্টি।"
ভেতরে আসতে আসতে আতিফা বললেন;-
--" তোমার সাথে দেখা করার জন্যই এতো রাত অব্দি অপেক্ষা করা। এখন কেমন লাগছে তোমার মা?"
আতিফা ভূঁইয়া এসে ইসরাহ পাশে বিছানায় বসলেন। রওনাফ এসে সোফায় বসলো।
--" ভালো আন্টি, আপনারা সবাই খেয়েছেন?"
--" হ্যাঁ মা, ওসব নিয়ে তোমার চিন্তা করতে হবে না। আর শুনো; আলতার বিষয়টা নিয়ে ওতো চিন্তা করো না তো। হতে পারে আলতা টা নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো।"
--" কাল তোমার আলতা পরার প্রয়োজন নেই।"
রওনাফের শীতল কন্ঠের কথায়, ওর দিকে চোখ তুলে তাকালো ইসরাহ। রওনাফের কথার সাথে তাল মিলিয়ে আসফা বেগম বললেন;-
--" আমি রিতা আর জাইমা কে মেহেদী পরিয়ে দিতে বলেছি। ওসব আলতা টালতার নাম ও আর নেওয়ার প্রয়োজন নেই এই বিয়েতে।"
--" মেহেদী গুলো ইসরাহ কসমেটিক্সের সাথেই আছে আন্টি। দেখে নিলেই পেয়ে যাবেন।"
রওনাফের কথা শেষ হতেই আতিফা সুধোলেন;-
--" আপা শুনুন, আমার সাথে একটু বাহিরে আসুন।"
আতিফা দাঁড়িয়ে আসফার উদ্দেশ্যে বললেন। আসফার কিছু বলার আগেই আতিফা ভূঁইয়া ওনার হাত ধরে টেনে বাহিরে বারান্দায় নিয়ে এলেন। ইসরাহর রুমের বাইরে এসেই গদগদ কন্ঠে আতিফা বললেন;-
--" ওরা একটু একা কথা বলুক। আমার ছেলেটার ইসরাহ মাকে ভারি পছন্দ হয়েছে আপা।"
মাকে বেরিয়ে যেতে দেখে সোজা হয়ে বসলো রওনাফ। আশে পাশে দেখতে দেখতে তার দৃষ্টি এসে স্থির এলো ইসরাহর পানে। মুগন্ধ চোখে তাকালো লাল সুতি কাপড় পরা মেয়েটার দিকে। তার হবু বউ, কালকের পর থেকেই মেয়েটার নামের পাশে তার নাম বসবে। মিসেস রওনাফ ভূঁইয়া। ভূঁইয়া পরিবারের একমাত্র বউ। মেঝের দিকে তাকিয়ে থেকেও; ইসরাহ বুঝতে পারলো রওনাফ তাকে দেখছে। খানিক অপ্রস্তুত হলো সে।
--" আমার মেহেদী পরতে ভালো লাগে না, রওনাফ। শুকোনোর জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়।"
--" উমম...আমার জন্য একটু পরবেন? সামান্য দুহাতের তালু আর উপরি পৃষ্ঠে পরলেই হবে। এর বেশি পরতে হবে না।"
--" আচ্ছা।"
ইসরাহর সম্মতি পেয়ে গাড়ো হলো রওনাফের ওষ্ঠের হাসি। সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবী টা ঠিক করে; ঘর থেকে বেরোতে নিয়ে ও থামলো সে। ইসরাহর দিকে তাকিয়ে কন্ঠে দরদ মিশিয়ে সুধালো রওনাফ;-
--" সাবধানে থাকবেন, আগামী কাল মধ্যাহ্ন এসে আপনাকে সারাজীবনের জন্য আপন করে নিবো। ততক্ষণ পর্যন্ত নিজের খেয়াল রাখবেন প্রিয় বেগম।"
আর দাঁড়ালো না রওনাফ। মিষ্টি হেসে বেরিয়ে গেলো সে। আজ রাতে আর তার ঘুম হবে না। সারাটা রাত ইসরাহ কে ভেবেই কেটে যাবে। ইসরাহর রুম থেকে বেরিয়ে মায়ের কাছে এসে তাড়া দিয়ে রওনাফ সুধালো;-
--" তোমাদের কথা হয়েছে দুই আম্মু?"
--" হয়েছে আব্বা, চল।"
আসফা বেগমের পাশ এসে দাঁড়ালো রওনাফ। ডান হাত টা বাড়িয়ে আলতো জড়িয়ে ধরলো তাকে। পর পর নম্র কন্ঠে সুধোলো;-
--" আসছি আম্মু।"
খুশিতে ছলছল করে উঠলো আসফা বেগমের দু'চোখ। হাত বাড়িয়ে মুছে দিলেন রওনাফের মাথা।
--" বেঁচে থাকো বাবা। আমার মেয়ে কে নিয়ে সারাজীবন সুখী হও।"
--" অবশ্যই আম্মু।"
আতিফা ভূঁইয়া আর রওনাফ বেরিয়ে পড়লো। আরহাম সিকদার আর মনির সাহেব ওনাদের বাইরেই গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এলেন।
---------
রাত আড়াইটে বাজে!
হলুদের অনুষ্ঠানের ঝামেলা শেষ করে আধ ঘন্টা আগে সিকদার ভিলার সবাই শুয়ে পড়েছে। কেবল আরহাম সিকদার আর মনির সাহেব বাদে। ওনারা বাবুর্চিদের রান্নার তদারকি করছেন। কিছুর প্রয়োজন হলে ঘর থেকে এনে দিচ্ছেন।
অন্ধকারের মাঝে সিকদার ভিলার বাইরে একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ি টা রাত দশটার দিকে এসে থেমে ছিলো। তার পর থেকে এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িটার মালিক আর কেউ না। সিকদার ভিলার একমাত্র উত্তরাধিকারী " ফারিস জাওয়ান সিকদার।" রাত বাড়তেই গাড়ির দরজা খুলে বেরোলে ফারিস। কালো হুডির টুপিটা মাথায় চাপিয়ে, মুখে কালো রুমাল পেঁচিয়ে নিলো।
চারপাশে নির্জনতায় চেয়ে আছে।বাড়ির মূল ফটকে গার্ডরা পাহারা দিচ্ছে। নিঃশব্দ পায়ে বাড়ির পেছন দিকে এসে থামলো ফারিস। ফোনের ফ্ল্যাশ টা অন করে; ফোনটা বুক পকেটে নিয়ে, আম গাছটায় উঠে পড়লো সে। আম গাছ থেকে পা বাড়িয়ে দেয়ালে উঠলো ফারিস। অতঃপর লাফ দিলো বাগানের নরম ঘাসের উপর। ইসরাহর রুমের বারান্দার সাথে লাগোয়া বড় কদম গাছটার ঢাল বেয়ে উঠে লাফিয়ে বারান্দায় নামলো ফারিস।
গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে ইসরাহ আর জাইমা। আলতো হাতে বারান্দার দরজা টা খুলে রুমে ঢুকে পড়লো ফারিস জাওয়ান। রুম জুড়ে পিনপতন নীরবতা। হালকা সবুজ আলোর ড্রিম লাইট জ্বলছে। সারা ঘর জুড়ে কাঁচা ফুল আর মেহেদীর সুভাষ ভাসছে। ফারিস কোনো দিকে না তাকিয়ে বিছানার দিকে তাকালো। ইসরাহ আর জাইমা ঘুমিয়ে আছে।
ইসরাহ কে চিনতে বেশি একটা কষ্ট করতে হলো না তাকে। ইসরাহর পরণে সুতির একখানা লাল কাপড়। ফারিস অনুভব করলো তার শরীর কাঁপছে। হৃদপিন্ড জুড়ে ঝড় বইছে অশান্ত বেগে। অবাধ্য অনুভূতি আর হরমোনেরা ছুটোছুটি করছে র*ক্ত কণিকা জুড়ে। শিরশির করছে শরীরের বিশেষ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ গুলো।
কাঁপা কাঁপা হাতে পকেট থেকে হলুদের প্যাকেট টা বের করলো ফারিস। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে বিছানার পাশে হাঁটু মুড়ে বসলো সে। হলুদ টা ফারিস ই হামান - দিস্তায় পিষে এনেছে।
ফারিস বাটা হলুদ থেকে সল্প পরিমাণের হলুদ দু'আঙুলে নিয়ে ছুঁয়ে দিলো ইসরাহ কোমল গালে। পর পর একই ভাবে হলুদ টা ছুঁয়ে দিলো ইসরাহ পায়ে। সাথে আদুরে কন্ঠে সুধালো সে ;-
--" বরের হাতের হলুদের ছোঁয়া না লাগলে কি বিয়ে হয় নাকি লিটল গার্ল। সন্ধ্যা থেকে কতো গুলো আবর্জনা তোমাকে হলুদ মাখিয়ে গেছে। আমার একদম পছন্দ হয়নি। তাই তোমাকে হলুদ ছোঁয়াতে এলাম।"
উঠে এসে ইসরাহর সিউরে বসলো সে। তার লিটল গার্ল! দীর্ঘ বারো বছর! এক যুগ? সত্যিই এক যুগ! তার লিটল প্রিন্সেস কে সে এক যুগ ধরে দেখেনি। ছুঁইনি, গায়ের গন্ধ নেয় নি। কথা বলেনি, কাছে ডাকেনি। ইসরাহর কাপড়ের আচঁল টা তার উদোর থেকে সরিয়ে, উদভ্রান্তের ন্যায় ইসরাহর উদোরে মুখ ডুবালো ফারিস জাওয়ান। সেকেন্ড ফেরোতেই মুখ উঠিয়ে নিলো সে। নিচু স্বরে বললো ফারিস;-
--" কাঁচা হলুদের স্মেল নেই। বউ বউ ফিল আসছে না। দাঁড়াও পেটেও একটু হলুদ মাখিয়ে দেই সুইট হার্ট? রাগ করবে তুমি?"
ঘুমন্ত ইসরাহ উত্তর দিলো না। ঘুমন্ত মানুষ আবার উত্তর দিতে পারে নাকি। ফারিস নিজেই বললো:-
--" রাগ করবে না , তাই না সুইট হার্ট। কেনো রাগ করবে শুনি? আমি তো তোমার বর হই। তিন কবুল বলা বর।বরের ছোঁয়াতে কেউ রাগ করে নাকি? বর তো ভালোবেসে ছোঁয়। তাই না সুইট হার্ট?"